অজানা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ

অমর রায় চৌধুরী (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)

সহস্রাধিক রেখাচিত্র, শতাধিক সংগীত, অর্ধশতাধিক গ্রন্থ এবং একটি পরিপূর্ণ রবীন্দ্রনাথ যিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পঞ্চম পুত্র সেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এখনো বঙ্গবাসীর কাছে এক বিস্ময়। বিস্ময়ের কারন শুধু তাঁর অত্যাশ্চর্য প্রতিভা নয়, জীবনের সায়াহ্নে তাঁর স্বেচ্ছানির্বাসনও। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে প্রাণোচ্ছ¡ল এই সুদর্শন গুণধর কেন শেষ জীবনে রাঁচির মোরাবাদী শৈলে অগস্তযাত্রা করলেন, কেন তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের সহচর প্রিয়তম কনিষ্ঠ ভাই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন, আজও তা জিজ্ঞাসু গবেষকদের কাছে সম্পূর্ণ অগোচর। একদিকে বীরভূমের শান্তিনিকেতন, অন্যদিকে রাঁচির শান্তিধাম- ।

দুই শান্তির মাঝখানে ভৌগলিক দূরত্ব যত অল্পই হোক না কেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যতদিন জীবিত ছিলেন, বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ তালিকায় রাঁচি নামক মনোরম ভূখন্ড কখনো স্থান পায়নি। আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ? রবীন্দ্রনাথ স্থায়ীভাবে বসবাস করার আগে কতবার তিনি গিয়েছেন শান্তিনিকেতনে, কিন্তু তারপর একবারও এই আশ্রম তার প্রাণের আরাম মনের আনন্দ আত্মার শান্তিরূপে ধরা দেয়নি। “নোবেল” পুরস্কার প্রাপ্তির পর সবচেয়ে আনন্দিত হওয়া কথা যাঁর, সেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের কাছে একটি অভিনন্দন বার্তা পর্যন্ত পাঠাননি। এটি কি পারিবারিক কলহ? খ্যাতির ঈর্ষা? কাদম্বরীর আত্মহত্যা ? না, কোন কারণই দুই ভ্রাতার চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায়না। ১৯১২ সালে কলকাতার কয়েকজন সাহিত্যিক যখন রাঁচিতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে যান, প্রথম দর্শনেই তিনি আচমকা বলে ওঠেন, “আপনারা আমাকে রবি ভাবেননি তো?”–এই অসতর্ক উক্তির মধ্যে ঈর্ষার বীজ লুকিয়ে থাকার ইঙ্গিত কেউ কেউ করলেও এ কথা নি:সন্দেহে বলা যায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মানসিক গঠনের সঙ্গে এই রিপুটির সম্পর্ক আদৌ স্থাপন করা যায় না। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের বেলায়। তাছাড়া তিনিইতো কথাচ্ছলে রবীন্দ্রনাথের ইউরোপ যাত্রা অসুস্থতাহেতু স্থগিত হওয়ায় আক্ষেপ করেন এবং মৃত্যুর আগে রবিকে দেখার জন্যে দিনরাত ছটফট করেন। শোনা যায়, শেষ দেখার জন্যে তিনি রবীন্দ্রনাথকে রাঁচিতে আসার জন্য চিঠি লিখে আহ্বান জানান। কিন্তু সম্ভবত তাঁর সেই চিঠি রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছয়নি। নইলে জ্যোতিদাদার শেষ ডাকে তিনি কখনই নীরব থাকতে পারেন না।

এই জ্যোতিদাই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সব। বয়সের ব্যবধান মাত্র বারো বছরের, কিন্তু মনের দিক থেকে দুজনের কোন ব্যবধান ছিলো না। অযাচিত প্রেম ও প্রশ্রয় তিনি পান এই সর্ববিদ্যাপারঙ্গম সর্বজনপ্রিয় জ্যোতিদার কাছে। চিত্রে সংগীতে নাট্য অভিনয়ে সাহিত্য রচনায় ভাষা শিক্ষায় ব্যবসায়ী সংগঠনে স্বাদেশিকতায় এই অসাধারণ রূপবান মানুষটি সহজ প্রতিভার দীপ্তিতে ঠাকুর বাড়ি  জ্যোতির্ময় করে রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, ” জ্যোতিদাদা” যাঁকে আমি সকলের চেয়ে মানতুম, বাইরে থেকে তিনি কোনদিন আমাকে বেঁধে রাখেননি। তাঁর সঙ্গে অনেক তর্ক করেছি, নানা বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেছি বয়স্যের মতো। তিনি বালককেও শ্রদ্ধা করতে জানতেন। আমার আপন মনের স্বাধীনতার দ্বারাই তিনি আমার চিত্ত বিকাশে সহায়তা করেছেন। তিনি আমার ‘পরে কর্তৃত্ব করবার ঔৎসুক্যে যদি দৌরাত্ম করতেন, তাহলে ভেঙেচুরে তেড়েবেঁকে যা হয় একটা কিছু হতুম। সেটা হয়তো ভদ্রসমাজের সন্তোষজনক হ’তো, কিন্তু আমার মতো একেবারেই হ’তো না।” তাই প্রথম বারের ইউরোপ ভ্রমণের কাহিনী ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’ গ্রন্থের উৎসর্গে তিনি লেখেন, ‘ভাই  জ্যোতিদাদা, ইংল্যান্ডে যাঁহাকে সর্বাপেক্ষা অধিক মনে পড়িত, তাঁহারই হস্তে এই পুস্তক সমর্পণ করিলাম।’

রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন মাত্র চোদ্দ, তখন থেকেই তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ছায়াসঙ্গী। “সরোজিনী” নাটকের প্রুফ পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথের মনে হয় উপসংহারে একটি সংগীত থাকা দরকার। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানিয়ে পিয়ানোতে আঙুলের ঝড় তোলেন, আর রবীন্দ্রনাথ ঝড়ের সঙ্গে বিদ্যুতের চমক লাগিয়ে মুখে মুখে সুরের কথা জোগান–“জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ পরাণ সঁপিবে বিধবাবালা।” কনিষ্ঠ ভ্রাতার বিস্ময়কর পারদর্শিতায় বিমুগ্ধ হয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলেন, ‘সরোজিনী প্রকাশের পর হইতেই আমরা রবিকে প্রমোশন দিয়া আমাদের সমশ্রেণীতে উঠাইয়া লইলাম। এখন হইতে সংগীত ও সাহিত্য চর্চাতে আমরা হইলাম তিনজন– অক্ষয় চৌধুরী রবি ও আমি।’ ওই সময়ের সুখস্মৃতিচারণা করে রবীন্দ্রনাথও বলেন, “এইবার ছুটল আমার গানের ফোয়ারা। জ্যোতিদাদা পিয়ানোর উপর হাত চালিয়ে নতুন নতুন ভঙ্গীতে ঝমাঝম সুর তৈরী করে যেতেন, আমাকে পাশে রাখতেন। তখনি তখনি ছুটে চলা সুরে কথা বসিয়ে বেঁধে রাখবার কাজ ছিল আমার।”

এইভাবেই তৈরী হয়েছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাটকের শেষ গান ‘আয় তবে সহচরী’, তৈরী হয়েছে বাল্মীকি প্রতিভা ও কালমৃগয়ার গান এবং এইভাবেই আরো অন্তত কুড়ি পঁচিশটি রবীন্দ্র সংগীতের জ্যোতিরিন্দ্র-সুর চাপা পড়ে আছে গীতবিতানের পাতায়। দুই ভাই মিলে শুরু করেছিলেন সংগীতদ্রোহিতা। হিন্দুস্তানি বৈঠকী গানের গৎমিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বিলিতি সুরে, তৈরী হয়েছে স্কচ-ভূপালী কিংবা ইতালিয়ান-ঝিঁঝিট। গানের পর গান, পালার পর পালা। এই গানের ঝরণা তলাতেই জন্ম নিয়েছে পরবর্তীকালের রবীন্দ্রসংগীত। জন্ম নিয়েছে রবীন্দ্র সাহিত্য।

ইংরেজি, ফরাসি, সংস্কৃত এবং মারাঠি সাহিত্যে সুপন্ডিত জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাটক, প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, অনুবাদ অজস্র ধারায় উৎসারিত হয়েছে প্রতিদিন প্রতিরাত্রি, আর সেই ধারায় নিত্য স্নান ক’রে নতুন রসের সন্ধান পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ছবি আঁকা আর অভিনয়ও চলেছে সমান তালে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজের নাটক মানময়ীতে ইন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের কালমৃগয়ায় দশরথ, রামনারায়ণ তর্করতেœর নবনাটকে নটী। প্রতি নাটকের কনসার্ট দলে হারমোনিয়াম বাজাতেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। তাছাড়া সমান দক্ষতায় বাজাতে পারতেন বেহালা, সেতার এবং অতি অবশ্যই পিয়ানো। সংগীত সাহিত্য চিত্রকলা ও অভিনয় চর্চার ষোলকলা পূর্ণ হ’লো কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের শুভবিবাহের পর। ছিলেন দুই, হলেন তিন। মধ্যমণি রইলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ।

১৮৪৯ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের যখন জন্ম হয় তখনও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের দান সাগর যজ্ঞের জোয়ারে প্রিন্স দ্বারকানাথের ঐশ্বর্য নি:শেষ হয়ে যায়নি। প্রচুর বৈভব ও বিলাসের মধ্যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের শৈশব কাটে। ঐশ্বর্যবান ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে রূপবান এই বালকের আদি শিক্ষা বাড়ির ঠাকুরদালানের পাঠশালায়। সেই সঙ্গে চলে হীরা সিং পালোয়ানের কাছে কুস্তি শিক্ষা এবং বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে সংগীত চর্চা। কুস্তি ও সংগীতের সঙ্গে একাধারে পাশাপাশি চলে সাঁতার বন্দুক চালনা ও ঘোড়ায় চড়া। চিত্রাঙ্কনের হাতেখড়িও সেই সময়ে। বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের একটি পিয়ানো ছিল। সেটি নাড়াচাড়া করতে করতে তিনি আয়ত্ত করেন বিলিতি এই বাদ্যযন্ত্রের নানান কলাকৌশল। অল্পবয়সে হারমোনিয়াম ও বেহালা বাজানোতেও অল্প বয়সে হাত পাকালেন। ঠাকুর দালানের পাঠশালার পাঠ শেষ করে তিনি গেলেন সেন্টপলস্ স্কুলে। তারপর মন্টেজ একাডেমি ও হিন্দু একাডেমি। এরপর প্রেসিডেন্সী কলেজ। সেখানেই তাঁর সহপাঠী ছিলেন কবি নবীনচন্দ্র সেন।

রবীন্দ্রনাথের চিত্তের উদ্বোধন ঘটে দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের দ্বারা আর তেমনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বিকাশ ঘটে মেজদা সত্যেন্দ্রনাথের আশ্রয়ে। প্রবাসী সত্যেন্দ্রনাথের ডাকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কখনো যান বোম্বাই (মুম্বাই), কখনো পুনা, কখনো কারোয়ার। সেখানে মেজদা আই.সি.এস সত্যেন্দ্রনাথ তাঁকে নানা বিদ্যায় কুশলী হতে সহায়তা করেন। সেখানে তিনি নিজে এবং বন্ধু মনোমোহন ঘোষ ভাইকে শেখান ফরাসী ভাষা, মারাঠী ভাষা শেখাতে রাখা হয় মারাঠা পন্ডিত এবং নিয়মিত সেঁতার শেখাতে রাখা হয় একজন গুজরাটি ওস্তাদকে। অবনীন্দ্রনাথের জ্যাঠামশাই গনেন্দ্রনাথকে লেখা সত্যেন্দ্রনাথের পত্রাংশ এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য—–

“জ্যোতি আমার নিকট ফরাসী ভাষা শিক্ষা আরম্ভ করিয়াছে। আমি তাহার জন্য একজন ড্রয়িং মাস্টারও নিযুক্ত করিয়া দিয়াছি। কিন্তু জ্যোতি পারিবে কি না জানি না। জ্যোতি সেতার শিক্ষা করিতেছে”….. বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সংগীত চর্চা নিয়ে চমৎকার একটি ছড়া বাঁধেন সেই সময়-

বয়ালা কী মিঠে                  অমৃতের ছিটে

ঐ হাতটিতে শুনায়

পিয়ানো ঢং ঢং                 ঢং ঢং ঢং

সেতার গুনগুনায়।

মহারাষ্ট্র-প্রবাস জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনের ভিত্তি তৈরির কাল। মঁলিয়ের, গতিয়ের, কালিদাস, শেক্সপিয়ার তুকারাম থেকে এতো অনুবাদ এবং সংগীতে ও চিত্রাঙ্কনে এতো বৈচিত্র্য সত্যেন্দ্রনাথের অভিভাবকত্ব না থাকলে এতো অনায়াসে হ’তো না। তাছাড়া সংগঠন শক্তির শিক্ষাও সত্যেন্দ্রনাথের কাছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পরিচালিত বিভিন্ন সংস্থার তালিকা যেমন বিচিত্র তেমনি বিপুল। তিনি ছিলেন আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক, বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধির জন্য সারস্বত সমাজের ও ভারত সংগীত সমাজের প্রতিষ্ঠাতা। স্বাদেশিকতার মন্ত্র উচ্চারণের জন্য সঞ্জীবনী সভার পৃষ্ঠপোষক। “ভারতী পত্রিকা” তাঁরই সৃষ্টি। দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন নামেই সম্পাদক। যাবতীয় পরিকল্পনা ও কাজকর্মেও  ভার ছিলো জ্যোতিরিন্দ্রনাথের হাতে। কল্পনা বালক সাধনা এবং ভারতীতে তিনি ছিলেন নিয়মিত লেখক। প্রথম হিন্দু মেলায় পড়েন উদ্বোধন নামক কবিতা, দৃপ্তকন্ঠে সভাস্থলে বলেন—জাগ জাগ জাগ সব ভারত সন্তান, মাকে ভুলি কতকাল রহিবে শয়ান। তিনি হাটখোলায় পাটের আড়ৎ খুলেছিলেন। শিলাইদহে শুরু করেছিলেন নীলের চাষ। তাছাড়া বরিশালে স্বদেশী স্টীমার চালাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হন। বিলাতি কোম্পানিগুলির সঙ্গে প্রতিযোগীতায় নেমে যাত্রী ভাড়া কমাতে কমাতে অবশেষে যখন যাত্রী আকর্ষণের জন্য ভাড়া নেওয়ার বদলে মাথাপিছু টাকা দেওয়া শুরু হ’লো তখনই ধরে নেওয়া গিয়েছিল এই স্টিমার কোম্পানী গুলিই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সর্বনাশ ঘটাবে। স্বদেশীয়ানা দেখানোর জন্য বাড়িতে তিনি দেশী তাঁত খোলেন এবং সেই তাঁতে প্রস্তুত স্বদেশী একমাত্র গামছা মাথায় বেঁধে তিনি আনন্দে সর্বত্র ঘুরে বেড়ান। শোলার টুপি ও পাগড়ি লাগানো এবং পাজামা-ধূতির মিশ্রনে তৈরী স্বদেশী পোষাকও তার সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ এই সম্পর্কে বলেছেন–“জ্যোতিদাদা অম্লানবদনে এই কাপড় পরিয়া মধ্যাহ্নের প্রখর আলোকে গাড়িতে গিয়া উঠিতেন আত্মীয় এবং বান্ধব, দ্বারী এবং সারথি সকলেই অবাক হইয়া তাকাইত। ইহাতে তিনি কোন ভ্রুক্ষেপ করতেন না।”

নাট্যরচনা, রঙ্গালয় স্থাপন এবং অভিনয়–এই তিন দিকেও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিভা প্রসারিত করেন। এ ব্যাপারে তাঁর সহযোগী ছিলেন তাঁর খুরতুতো ভাই এবং অবনীন্দ্রনাথের পিতা গুণেন্দ্রনাথ। দুজনে ছিলেন গলায় গলায় বন্ধু অর্থাৎ হরিহর আত্মা। জোড়াসাঁকো নাট্যশালা জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই সৃষ্টি। সেখানে অভিনীত হয় মাইকেল মধুসূদনের কৃষ্ণকুমারী, একেই কি বলে সভ্যতা, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মানময়ী, কুরুবিক্রম, এমন কর্ম আর করবো না ইত্যাদি। নাটুকে রামনারায়ণের নব নাটক এই মঞ্চে অভিনীত হয়। শুধু নাটক প্রচার নয়, সঙ্গীত প্রচারের জন্য জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রকাশ করেন সংগীত বিষয়ক দু’টি পত্রিকা-

 বীণাবাদিনী এবং সংগীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা।

পরিণত বয়সে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল “ফ্রেনোলজি” বা “শিরোমিতিবিদ্যা”। “সাধনা” পত্রিকায় তিনি প্রবন্ধ লেখেন “আধুনিক মস্তিষ্কবিদ্যা ও ফ্রেনোলজি”। বাল্যবয়সে তাঁর সৃষ্ট প্রবন্ধ “মুখচেনা”।

বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র রাজনারায়ণ বসু, রামগোপাল ঘোষ প্রমুখের চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন, তাঁদের মুখের ও মাথার গড়ন দিয়ে। এই বিদ্যার অনুশীলন করতে গিয়ে এঁকেছেন অসংখ্য শতাধিক রেখাচিত্র। তাঁর তুলি ও পেন্সিলের স্পর্শে আরো শতশত ছবি প্রাণবন্ত হয়েছে। এতসব কর্মকান্ডের মাঝখানে তাঁকে সামলাতে হয়েছে জমিদারী এবং এই কাজে  বারবার যেতে হয়েছে কটক ও শিলাইদহে। হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে বন্দুক হাতে প্রায়ই বাঘ শিকারে বেরিয়ে পড়তেন। পদ্মায় সাঁতার কাটতেন। এটি ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস। পিয়ানো বাজানোর মতো ঘোড়ায় চড়া ছিল তাঁর সাবলীল প্রক্রিয়া। ১৮৬৮ সালে কাদম্বরী দেবীকে বিয়ের পর নববধূকে ঘোড়সওয়ার ক’রে তিনি গড়ের মাঠে যেতেন হাওয়া খেতে। গানবাজনা নাটক অভিনয় সাহিত্য চর্চা/শিক্ষা শিকার ব্যবসা এবং বিদুষী রূপসী সহধর্মিনীতে উজ্জ্বল এই জীবনে একমাত্র অভাব ছিল সন্তানের। সেই অভাব পূর্ণ হয়েছিলো স্ত্রী কাদম্বরী দেবী আর ভ্রাতা রবীন্দ্রনাথের সাহচর্যে। কিন্তু এতো সুখ কারো জীবনে সহ্য হয় না। ১৮৮৪ সালে কাদম্বরী দেবী করলেন আত্মহত্যা। রবীন্দ্রনাথ হলেন উদভ্রান্ত, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সবরকম কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে হলেন আত্মস্থ। ১৯০৫ সালে পিতৃবিয়োগের তিন বছর পর তিনি চিরকালের মতো রাঁচিতে চলে গেলেন। এবং সতেরো বছরের একক নিঃসঙ্গ জীবনের সমাপ্তি ঘটলো ১৯২৫ সালে।

 

Scroll to Top