অসাম্প্রদায়িক চেতনায় নেত্রকোণা

যতীন সরকার

যদি বলি, নেত্রকোণায় সাম্প্রদায়িক ভাবনা ও কর্মকান্ডের অস্তিত্বমাত্র নেই, কোনো দিন ছিল না এবং ভবিষ্যতে কোনো দিন হবে তেমনটি ঘটবেও না- তা হলে অনেকের কাছেই এমন কথা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু আমি কথাটি বলছি একান্ত আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে। নেত্রকোণার আবহমান কালের ইতিহাস ও ঐতিহ্যই আমাকে এমন আত্মপ্রত্যয়ের অধিকারী করেছে। বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন ভাবে আলো ফেলে বিষয়টির অবিসংবাদিত প্রমাণ উপস্থাপন করা যেতে পারে। আমি শুধু এ এঞ্চলের সংগীত ঐতিহ্যের একটি দিক উপস্থাপন করেই এ অঞ্চলের অসাম্প্রদায়িকতা তথা সা¤প্রদায়িকতা-বিরোধিতার সামান্য নমুনা এখানে তুলে ধরছি। এতেই আমার মনে হয়, গোস্বপদে আকাশ দর্শনের মতো সমগ্র বিষয়টির স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যাবে।

 অখন্ড বাংলার বৃহত্তর জেলা ময়মনসিংহের যে অংশটিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ‘পূর্ব ময়মনসিংহ’ নামে। সেখান থেকেই সংগৃহীত হয়েছিল ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র গাথাগুলো। মৈমনসিংহ গীতিকার মাধ্যমেই সে অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সম্পদ বিশ্বের বুধজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবু বলতেই হবে যে, মৈমনসিংহ গীতিকার গাথাগুলোর মধ্যে এখানকার ব্যাপক ও গভীর জনসংস্কৃতি অল্প অংশই ধরা পড়েছে। একান্ত রক্ষণশীল তথা প্রথাগত অ্যাকাডেমিক বিচারে যেসব সাহিত্য ও সংস্কৃতি-সম্পদ লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি রূপে বিবেচিত হয়ে থাকে, সেসব তো আছেই, এর বাইরেও এ অঞ্চলে আছে এমন সাহিত্যসম্পদ যেগুলো সৃষ্টি করেছেন সেই ধরণের প্রতিভাবান কবিবৃন্দ, যাঁদের আমি বলি ‘বাংলার মুলধারার কবি’। এককালে পূর্ব ময়মনসিংহের নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও তার আশেপাশের সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কিছু অংশ, এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদি প্রভৃতি এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছিল একটি বিশিষ্ট সংস্কৃতি-অঞ্চল। সে অঞ্চলের কবিদের মধ্যে নারায়ণ দেব, দ্বিজবংশী দাস, চন্দ্রাবতী, গঙ্গারাম-এরকম কয়েকজনই মাত্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থগুলিতে ‘মধ্যযুগের কবি’ বলে স্থান পেয়েছেন। এঁদের বাইরে আছেন যে-কবিবৃন্দ, তাঁদের সবাইকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘লোককবি’ অভিধায়। এ রকমই ‘লোককবি’ সুনামগঞ্জের হাসন রাজা ও রাধারমণ, নরসিংদির দ্বিজদাস ও হরিচরণ আচার্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মনোমোহন দত্ত, নেত্রকোণার লাল মামুদ, লুসা গাইন, বিজয়নারায়ণ আচার্য, দীন শরৎ (শরৎচন্দ্র নাথ), কিশোরগঞ্জের রামু মালী, রামগতি শীল, রামকানাই নাথ। এঁরা এবং এ-রকম আরো যেসব কবি পূর্ব ময়মনসিংহ ও তার আশপাশের অঞ্চলে উনিশ শতকে বাংলা কবিতার মূলধারাকে সচল রেখেছিলেন, তাঁদেরই প্রত্যক্ষ উত্তরসাধক বিশ শতকের জালাল উদ্দীন খাঁ এবং খুবই কৃতী ও সার্থক উত্তরসাধক।

জালাল খাঁ যাঁদের উত্তরসাধক তাঁরা জন্মসূত্রে কেউ ছিলেন হিন্দু, কেউ মুসলমান। কিন্তু ওই হিন্দুত্ব বা মুসলমানত্ব ছিল তাঁদের ইচ্ছা-নিরপেক্ষ বাস্তবতা। সেই অমোঘ বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তাঁরা হিন্দু কিংবা মুসলমান সমাজের অন্তর্গত হয়ে জীবন যাপন করেছেন, সেই সমাজের আচার-রীতিও বহুল পরিমাণে মেনে চলেছেন। কিন্তু অন্তরের গভীরে তাঁরা ছিলেন অন্যরকম। তাঁদের নিজস্ব ধর্মবোধ শাস্ত্রীয় হিন্দু, বৌদ্ধ বা ইসলাম ধর্মের হুবহু অনুসৃতি ছিল না। তাঁদের ইশ্বর-বিশ্বাসও শাস্ত্রীয় ঈশ্বর বিশ্বাস থেকে পৃথক। ঈশ্বরকে ও বিশ্বব্রহ্মা-কে তাঁরা মানবদেহের মধ্যেই উপলব্ধি করেছেন। ‘যা নাই ভবে, তা নাই ব্রহ্মান্ডে’- অর্থাৎ সারা ব্রহ্মান্ডে’যা আছে তার সবই আছে মানবদেহের ভেতরে- এটিই তাঁদের ধর্মবোধ ও জীবনবোধের ভিত্তি। এই বোধ থেকেই তাঁরা ‘সোহংবাদী’ বা ‘আনাল হকবাদী’ অর্থাৎ আমিই ঈশ্বর বা আমি সত্য- এ রকম ভাবনার অনুসারী।

আবার সেই ভাবনা থেকেই তাঁরা ‘মানুষভজন’কারীও, মানুষ গুরুত্বকেও তাঁরা ঈশ্বররূপে মান্য করেন। তাঁদের ঈশ্বর-উপাশনার রীতি-পদ্ধতিও শাস্ত্রীয় ধর্মের রীতি-পদ্ধতি থেকে অন্যরকম না-হয়ে পারে না। এবং সে কারণেই শাস্ত্র-ব্যবসায়ী ধর্মযাজক বা মোল্লা পুরোহিতের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ উত্তুঙ্গ হয়ে ওঠে। শাস্ত্রের পুঁথিপত্র না-ঘেটে তাঁরা যে নিজেদের মত করে ‘সত্যসিন্দু জলে’ ডুব দিতে চান, তাঁরা যে শাস্ত্রীয় পুরাণের লৌকিক ভাষ্য রচনা করেন কিংবা সম্পুর্ণ পৃথক পুরাণই নির্মাণ করে নেন-এ রকম সব কিছুই শাস্ত্রীয় ধর্মের চাঁইদের ক্ষুদ্ধ করে তোলে। তবে সেই ক্রোধকে তাঁরা থোড়াই পরোয়া করেছেন। কখনো সোজাসুজি তাঁরা শাস্ত্রীয় ধর্মের প্রবক্তাদের বিরোধিতায় নেমেছেন, কখনো নানা গলি খুঁজে নিয়ে বাঁকা পথে হেঁটেছেন। কখনো কখনো তাঁরা আপন আপন সাধনার কথা সর্বসমক্ষে প্রকাশ না-করে নানা আড়ালের আশ্রয় নিয়েছেন, প্রকাশ্যে সমাজের কর্তৃত্বশীল ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও ভেতরে ভেতরে আপন স্বাতন্ত্রকেই বজায় রেখেছেন। কথায় ও আচরণে তাঁরা এক ধরনের ক্ষ্যাপামি ও পাগলামিরও প্রকাশ ঘটিয়েছেন এবং স্বরচিত গানের ভণিতায় পাগল বলে আত্মপরিচয় দিয়েছেন।

 ‘পাগল’-এর প্রতিশব্দই তো ‘বাতুল’, এবং বাতুল থেকে ‘বাউল, শব্দের উদ্ভব বলে অনেক পÐিতেরই অভিমত। তাই পূর্ব ময়মনসিংহ ও তার আশপাশের অঞ্চলের পাগল পরিচয়দানকারীদের রচিত গানও হয়তো ‘বাউল’ বা ‘ বাউলা’ গানরূপেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। আসলে কিন্তু ‘বাউল’ নামে বিশিষ্ট সাধন-প্রণালীটির সঙ্গে এ-অঞ্চলের প্রচলিত বাউল বা বাউলা গানের কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। তবে তা না থাকলেও, বাউলসহ সকল লৌকিক ধর্মেরই অন্তসার যে বিদ্রোহী-চেতনা, সে-চেতনা এ-গান পুরোপুরিই ধারণ করে। শুধু কথায় বা গানে নয়, এক সময় এ-রকম বিদ্রোহী চেতনা এ অঞ্চলে সমাজ বিপ্লবের অগ্নিকুসুমও ফুটিয়ে তুলেছিল। টিপু পাগলা নামক একজন লৌকিক ধর্মগুরুই হয়েছিলেন সে বিপ্লবের নায়ক।

 টিপু পাগলার পিতা (মতান্তরে তাঁর গুরু বা পীর) ছিলেন করম শাহ্। করম শাহ ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে এ অঞ্চলে ‘পাগলপন্থা’ নামে পরিচিত একটি লৌকিক ধর্মের প্রচার করেছিলেন। ‘সকল মানুষই এক আল্লাহর সৃষ্টি, কোনো মানুষই কোনো মানুষের অধীন হতে পারে না কিংবা কেউ কেউ ছোট বড় হতে পারে না: তাই আল্লাহর সৃষ্ট জমিনের ওপর মালিকানা দাবি করে ‘জমিদার’ হওয়ার বা জমির খাজনা পাওয়ার অধিকার কারো থাকতে পারে না। ‘এ-রকমই ছিল করম শাহ-প্রচারিত পাগলপন্থার মূলমর্ম। করম শাহ মারা যান ১৮১৩ সালে। এরপর নেত্রকোণারই এক গ্রাম লেটিরকান্দায় টিপু পাগলা পাগলপন্থার প্রচারক ও সংগঠকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে ওঠেন কৃষক-বিদ্রোহের নায়ক। তাঁরই নেতৃত্বে বিদ্রোহী কৃষকরা সুসঙ্গ ও শেরপুরের জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে পড়ে এবং এরই এক পর্যায়ে ১৮২৫ সালে, জমিদারদের উৎখাত ও শেরপুর শহর দখল করে এক স্বাধীন কৃষকরাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। এই কৃষকরাজ্যের ব্যবস্থাপনা ছিল অনেকটা আদিম সাম্যসমাজের মতো। দু’বছর সে রাজ্যটি টিকে ছিল। এরপর ইংরেজ সৈন্যদের কামান-বন্দুকের আক্রমণে এর পতন ঘটে। টিপু পাগলা বন্দি হন এবং ইংরেজ বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। টিপুর উত্তরাধিকারীরা কৃষক-বিদ্রোহের নায়ক হতে পারেনি কেউ কিন্তু পাগলপন্থার বিদ্রোহী ধর্মচেতনার ধারাটি তাঁরা বংশানুক্রমে ও শিষ্যানুক্রমে বহন করতে থাকে। এঁদের মধ্যে বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিলেন আছমত আলী শাহ ফকির। ইনি ছিলেন পাগলপন্থী কৃষক-বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী কোন এক ফকিরের প্রত্যক্ষ বংশধর। পাগলপন্থী কৃষক-বিদ্রোহটি দমিত হয়ে যাওয়ার পর লেটিরকান্দায় টিপু পাগলের বাড়িটি লৌকিক ধর্মচেতনার ধারক-বাহকদের তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়। এই তীর্থকেন্দ্রটিকে ঘিরেই জমে ওঠে নেত্রকোণা ও এর সন্নিহিত এলাকার বিশেষ ধরণের ‘বাউল গান’। গোলাম এরশাদুর রহমান তাঁর ‘নেত্রকোণার বাউলগীতি’ বইয়ে টিপু পাগলার শিষ্য-প্রশিষ্যদের পরিচয় সন্নিবেশিত করে লিখেছেন-

 ‘টিপু পাগল ছিলেন নি:সন্তান। কিন্তু টিপু পাগলের একান্ত ভক্ত শিষ্য-কন্যার বিয়ে হয় করম শাহ পাগলের সঙ্গী কাইদা পাগলের সঙ্গে। কাইদা পাগলের দুই ছেলে-বরণ পাগল ও বাদল পাগল। এ বাদল পাগলের ঘরে ১৮৮৪ সালের ২৮ জুলাই জন্মনেয় প্রখ্যাত সেকান্দর পাগল। তাঁর পুত্র বুরুজ পাগলকে রেখে ১৯৪৪ সালের ১২ ডিসেম্বর নিজের বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। উক্ত বুরুজ পাগল গোলাম হোসেন তালুকদারের বড় কন্যাকে বিয়ে করেন। বিখ্যাত আছমত আলী ফকির ছিলেন উক্ত তালুকদারের বড় মেয়ের জামাতা। লেটিরকান্দার পাগল বাড়ির সঙ্গে মোহনগঞ্জের ঝিমটি গ্রামের খ্যাতনামা পীর বাড়ির ফতেহ শাহ সাহেবদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিল। তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল বারহাট্টা থানার নোয়াগাওঁয়ের পাঠানবাড়ি, মোহনগঞ্জের সুবিখ্যাত মুসলিম পরিবারগুলোর। তাছাড়া আছমত ফকিরের প্রিয় ভক্ত ছিলেন মুক্তাগাছার জমিদার রাজা জগৎ কিশোর’।

 ‘রাজা জগৎ কিশোরের পুত্র জিতেন্দ্র কিশোরের জন্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আছমত ফকিরের ‘কেরামত’ সম্পর্কীয় একটি লোকশ্রুতি উল্লেখ করার পর গোলাম এরশাদুর রহমান জানিয়েছেন,- জিতেন্দ্র কিশোর বড় হয়ে গ্রহণ করেন আছমত ফকিরের শিষ্যত্ব। জিতেন্দ্র কিশোর ছাড়া পুড়াকান্দুলিয়ার গৌরাঙ্গ সাহা, ধর্মপাশা থানার আহামদপুরের সোনা মিয়া ফকির, মোহনগঞ্জ থানার সহিলদেও গ্রামের মনফর ফকির, লেন্দু ফকির, কেন্দুয়া থানার ধাইবন্যা গ্রামের রইচ উদ্দিন ফকির, নেত্রকোণা থানার বালি অনন্তপুর গ্রামের হাছেন আলী ফকির, হরমুজ তালুকদার, মিরাজ আলী এবং বালুয়াকান্দার তোতা মিয়া ফকির সহ এ অঞ্চলের অসংখ্য সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল আছমত আলী ফকিরের শিষ্য ও ভক্ত’।

 এখানে এই ‘সম্ভ্রান্ত পরিবার’ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করার বিশেষ তাৎপর্য আছে। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে, এ-অঞ্চলে এই সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর প্রায় সবই ছিল মূলত বর্ধিষ্ণু কৃষক বা জোতদার। এই পরিবারগুলোর সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল যথেষ্ট। সম্ভ্রান্ত হলেও এ-সব পরিবারের সদস্যরা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন স্বতন্ত্র ছিলেন না, কৃষির সূত্রেই উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে এঁদের ছিল প্রত্যক্ষ সম্পর্ক, কৃষক সমাজের মূলধারার সঙ্গেই সম্পৃক্ত এঁদের জীবনাদর্শন। তাই এঁদের ধর্মচিন্তায় গোঁড়ামি বা রক্ষণশীলতা ছিল না, ধর্মের লৌকিক ভাষা বা লৌকিক ধর্মের প্রতিই ছিল এঁদের আনুগত্য। বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ও অনেক কম বাধায় এ-অঞ্চলের লৌকিক ধর্মানুসারী পীর-ফকিররা যে তাঁদের সাধনা চালিয়ে যেতে ও নিজেদের মতামত প্রচার করতে পেরেছেন, তার একটি বড় কারণ হচ্ছে ওই কৃষক-চেতনাদীপ্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর আনুকূল্য। এখানকার বিদ্রোহী চেতনা সম্পন্ন কবি, গায়েন ও বয়াতিরা সব সময়েই ওই সব পরিবারের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছেন এবং এ-রকম পৃষ্ঠপোষকতা নিয়েই লেটিরকান্দা ‘পাগলবাড়ি’র মতো আরো অনেক পীর-ফকিরের মাজারই রক্ষণশীল শাস্ত্রীয় ধারার বিরোধী লৌকিক ধর্মানুসারীদের মিলনকেন্দ্র্র হয়ে ওঠে। এসব মাজারের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্য হলো শাহ সুলতানের মাজার। এটির অবস্থান নেত্রকোণা শহরের ছয় মাইল দক্ষিণে মদনপুর গ্রামে। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসে ‘উরস’ উপলক্ষে এখানে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাবেশ ঘটে। এছাড়াও বছরের প্রায় সব দিনেই এখানে বসে হালকা-জিকির ও বাউল-মারফতি গানের আসর। এসব হালকা-জিকির ও সংগীত-সাধনাকে মোটেই ভালো চোখে দেখেন না ‘বিশুদ্ধ’ শরিয়তের প্রবক্তাবৃন্দ। তা না দেখলে কী হবে? এ-অঞ্চলে লৌকিক ধর্মচর্চাকারীদের প্রতাপের সামনে তাঁদের অবস্থান যে একান্তই দুর্বল, তা বার বার প্রমাণিত হয়েছে। শরিয়তপন্থীরা যাঁদের ‘বেশরা ফকির’ বলে নিন্দা করেন, তাঁদের কেউ কেউ এখানে ইমামতিও করেছেন। বাংলাদেশের অন্য কোন অঞ্চলে এ-রকমটি হতে পেরেছে বলে মনে হয় না। একান্ত বিস্ময়ের সঙ্গে গোলাম এরশাদুর রহমান লিখেছেন-

 ‘অবাক হতে হয়, যখন দেখা যায় বিরহী উকিল মুনশি একদিকে যেমন করছেন মসজিদে বা ঈদের জামাতে, মিলাদ মাহফিলে ইমামতি অন্যদিকে একতারা হাতে করছেন বাউল গান। এক্ষেত্রে শরিয়তপন্থীরা আলেমরা ছিলেন অসহায়। উকিল মুনসি মদন থানার বরান্তর, শ্যামপুর, জালালপুর, চাঁনগাঁও মসজিদে এবং ঈদের জামাতে ইমামতি করেছেন। এ বিচিত্র কর্মকান্ড অকল্পনীয় হলেও সত্য। আর এ ইমামতির জন্য তিনি মুনশি উপাধি লাভ করেন। এ-অঞ্চলে মসজিদের ইমামদের মুনশি বলে ডাকার প্রথা আছে’। তবু ‘শরিয়তপন্থী আলেম’রা যে একেবারে নিশ্চেষ্ট ও নিস্ক্রিয় হয়ে বসে ছিলেন, তা নয়। বিশেষ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নতুন পাকিস্তানি জোশকে তাঁরা বাউল-মারফতি গান তথা লৌকিক ধর্মের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে চাইলেন এ বিষয়ে গোলাম এরশাদুর রহমানের পর্যবেক্ষণ:

‘বাউল গানকে নিষিদ্ধ করার জন্য ১৯৫১ সালের ২৮ জানুয়ারি এ অঞ্চলের শরিয়তপন্থী আলেম সমাজ সদর থানার বালি অনন্তপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাউলগান-বিরোধী প্রচারপত্র বিলি করে এক বিরাট ধর্মসভার আয়োজন করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে শরিয়তপন্থী আলেমদের এটাই ছিল মালজোড়া বাউলগান-বিরোধী সবচেয়ে বড় সাহসী উদ্যোগ। এ ধর্মসভায় মৌলানা আতাহার আলী, মৌলানা মঞ্জুরুল হক এবং মৌলানা আকবর আলী রেজাবী সাহেব বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আলেম সমাজের এ উদ্যোগে বাউল সাধকগণ আদৌ ভীত হন নি। বাউল সাধকগণ লেটিরকান্দার আছমত আলী শাহ ফকিরের পৌরাহিত্যে ঐ দিন একই সময়ে বালি-অনন্তপুর গ্রামে মিরাজ আলীর বাড়ির সামনে রশীদ উদ্দিন, উকিল মুনশি, উপেন্দ্র সরকার, মিরাজ আলী সহ এ অঞ্চলের খ্যাতনামা বাউল সাধক ও পীর ভক্তদের উপস্থিতিতে জলসার আয়োজন করেন। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম তীর্থস্থান, ১৯৪৫ সালের সারা ভারত কৃষক সমাবেশের অন্যতম সংগঠক ‘রেড’ বালিতে, এ অঞ্চলের জনগণ সা¤প্রদায়িকতা ও মৌলবাদী চেতনায় সৃষ্ট পাকিস্তান আন্দোলনের চার বছরের মাথায় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়- মৌলবাদ অপরাজেয় নয়। বাউল সাধকদের গান ও পীরভক্তদের জিকিরে ভেসে গেল আহুত বাউল-বিরোধী ধর্মসভা। তড়িঘড়ি ধর্মসভা শেষ করে সসম্মানে বিদায় নিতে বাধ্য হন আলেমগণ। আর সেই স্থানে সে দিন থেকে শুরু করে রাত অবধি চলে বাউলদের জলসা। এ পরাজয়ের পর আর কোন দিন বাউল গানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোন বিদ্রোহ এ-অঞ্চলে সৃষ্টি হয় নি। তাই বাউল সাধকদের জন্য এ অঞ্চলের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ সার্বিক সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল খুবই উপযোগী। আর বাউল গান ছিল জনমানুষের প্রাণ’।

 ‘মালজোড়া’ হচ্ছে বাউল গান পরিবেশনেরই একটি বিশেষ রীতি বা প্রকরণ। একতারা বাজিয়ে আপন মনে গায়ক একক সংগীত পরিবেশন করেন, মালজোড়া বাউল গানের রীতি তার থেকে আলাদা। এতে দুই প্রতিদ্বদ্বী গায়ক বিভিন্ন তত্ত¡কথা নিয়ে গানে গানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। গানের ভেতর দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রীতিটি দীর্ঘকাল ধরেই প্রচলিত ছিল ‘কবিগান বা কবির লড়াইয়ে। পরে সেটি বাউল গায়কদের মধ্যে নতুন রূপ ধারণ করে হয়ে যায় মালজোড়া গান। কবিগান ও মালজোড়া গানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার রীতিতে কিছুটা পার্থক্য আছে। কবির লড়াইয়ে প্রতিদ্ব›দ্বী দুই কবি আসরে ওঠেন দুই সামাজিক বা পৌরাণিক চরিত্রের ভূমিকা নিয়ে। যেমন-একজন কবি আসরে উঠে নিজের পরিচয় দিলেন ‘রাবণ’ বলে, আর প্রতিপক্ষের কবিকে সম্বোধন করলেন ‘রাম’ বলে। অর্থাৎ একজন কবি রাবণের ও অন্যজন রামের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গেলেন।

তারপর রাবণ রামকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে তুলবেন, এবং রাম সে-সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাবেন। প্রশ্ন ও উত্তর- দুই-ই হবে তাৎক্ষণিক ভাবে রচিত গানে গানে। মালজোড়া বাউল গানেও দুই কবি গানের জবাব দিয়ে বিতর্কের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন, তবে কবিগানের কবিদের মতো তাঁরা অন্য কোন পৌরাণিক বা সামাজিক চরিত্রের ভূমিকা গ্রহণ করেন না, সোজাসুজিই একে অন্যকে নানা প্রশ্ন করেন ও প্রশ্নের উত্তর দেন। কবিগান ও মালজোড়া গান-উভয় প্রকরণেই লোকমানসের একটি বিশেষ প্রবণতার পরিচয় ধরা পড়ে। সে প্রবণতাটি হচ্ছে যুক্তিবাদের। আধুনিক নাগরিক শিক্ষিত মানুষদের ধারণা: গ্রামীণ সমাজের মানুষ একান্তই বিশ্বাস প্রবণ, তারা যা শোনে তাই বিশ্বাস করে, যুক্তিবিচারের ধার তারা ধারে না, যুক্তি দিয়ে কোন কিছুকে বিচার করে নেওয়ার মতো শিক্ষা বা যোগ্যতাই তাদের নেই। এ রকম ধারণা কিন্তু মোটেই ঠিক নয়। লোকসমাজের মানুষ কোন কিছু বিশ্বাস করার আগে তা যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে চায়, লৌকিক ধর্মও তাই ‘অনুমান’ এর উপরে স্থান দেয় বর্তমানকে। লৌকিক ধর্মের অনুসারী কবিরাও যুক্তির সুতো দিয়েই তাঁদের গানের মালা গাঁথেন, এক কবি আরেক কবির যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানান, জনসমক্ষে তাঁরা বিতর্কে অবতীর্ণ হন। জনগণও নিজেদের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেই কবিদের যুক্তির সারবত্তা বিচার করেন, নিজেরাও যুক্তিবিচারে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ধর্মকে এভাবে বিশ্বাসের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে যুক্তির খোলা হাওয়ায় নিয়ে আসাটা শাস্ত্রীয় ধর্মের প্রবক্তরা একেবারেই পছন্দ করেন না। সর্বপ্রযতেœ তারা একে প্রতিহত করতে চান। তবে আমরা দেখেছি যে, নেত্রকোণা অঞ্চলে তাঁদের সে প্রযতœ সার্থক হতে পারেনি। এ অঞ্চলের মালজোড়া গানে কবিরা ঈশ্বরের স্বরূপ সম্পর্কে নানা মতের বিচার করেছেন, এমনকি ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপনেও দ্বিধা করেননি। ১৯৪৯ সালে নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া থানার বাসাটি গ্রাসে এক মালজোড়া গানের আসরে জালাল উদ্দীন খাঁ ‘ধরাট প্রশ্ন রেখেছিলেন-

আল্লা বলতে কেউ নাই এ সংসারে।

মিশে গেছে আলো হাওয়ায়

বিশ্ব জুড়ে তালাশ কর কারে?

 জালালের প্রতিপক্ষ বাউল ইদ্রিস এই ধরাটের উত্তর দিয়েছিলেন নেত্রকোণার আরেক প্রখ্যাত বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের রচিত একটি গানের সাহায্য নিয়ে-

জালাল তুই ভাবের দেশে চল / আল্লাকে দেখবে যদি

 চর্মচক্ষের পর্দা খোল। / গিয়া তুই ভাবনগরে

চেয়ে থাকো রূপ নেহারে / মনরঙে প্রেমতরঙ্গে তোমার দিলের কপাট খোল।

 দেখবে তোমার মাবুদ আল্লা / সামনে করে ঝলমল।

 দেখবে আল্লার রঙ ছুরত / অবিকল তুই জালালের মত

 তোর সঙ্গে অবিরত / করে চলাচল।

 তোর রঙে রঙ ধরেছে / হয়েছে এক মিল

তোরে দেখলে তারে মিলে / আর কারে তুই দেখবে বল।

এখানে আল্লার অস্তিত্ব ও স্বরূপ-প্রকৃতি নিয়ে যে ধরনের যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে এবং সেরকম যুক্তি প্রয়োগে লোকসমাজের কবিরা যে দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করেছেন, প্রথাবন্ধ শাস্ত্রীয় ধর্মের অনুসারীরা অবশ্যই এ রকম যুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির ঘোর বিরোধী। এঁদের বিরোধিতাকে আগ্রাহ্য করেই লোকসমাজ সম্পর্কে তাদের স্বাধীন চিন্তার উৎসারণ ঘটিয়েছে। সে সমাজের কবি নিজের ভেতরেই যেমন ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করেছেন, তেমনই বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের সংকীর্ণ ঈশ্বর-ভাবনাকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ রকম প্রত্যাখ্যান তো বিদ্রোহী-চেতনারই দ্যোতক।

জালাল খাঁর রচনায় ঘটেছে এ রকম বিদ্রোহী চেতনারই স্পষ্ট অভিব্যক্তি। নেত্রকোণা অঞ্চলে তাঁরই সমগোত্রীয় কবি ছিলেন অনেক। বিশ শতকের গোড়ায় এখানে একজন অসাধারণ প্রতিভাবান কবির আবির্ভাব ঘটেছিল। তাঁর নাম-শরৎচন্দ্র নাথ। তাঁর রচনায় তিনি ‘দীন শরৎ’ ভনিতায় ব্যবহার করতেন। দীন শরতের বাড়ি ছিল কেন্দুয়া থানার সাজিউড়া গ্রামে, জালাল খাঁর বাড়ি থেকে মাইল আটেক দক্ষিণে। দীন শরতের দেহতত্তে¡র গানগুলি আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে এক সময় সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চলেই ছড়িয়ে পড়েছিল। ‘দীন শরতের বাউল গান’ ও ‘দীন শরতের এসলাম সংগীত’ নামে তাঁর দুটো সংকলনগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছিল। দুটো গ্রন্থই এখন দু®প্রাপ্য। তবে পল্লী অঞ্চলে এখনো তাঁর গান লোকপ্রিয়তা হারায়নি। ‘দীন শরতের বাউলগান’ (প্রকাশ ১৩৪১) এর একটি দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছিলেন কামিনীকুমার কর রায়। তিনি দীন শরতের বৈষ্ণবভাবাপন্ন কতকগুলো গানের উল্লেখ করে মন্তব্য করেছিলেন,-এ ই গানগুলি যেন চন্ডীদাসের প্রতিধ্বনি। কোনও জীর্ণ ভূর্জপত্রে এইগুলি পাওয়া গেলে, ‘দীন শরৎ’ চন্ডীদাসের মর্যাদা নিশ্চয় লাভ করিতেন। ইহা কিরূপে সম্ভব হইল? আমরা বলিব, এই গ্রাম্য কবিও সেই চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, গোবিন্দ দাস, জ্ঞানদাস প্রভৃতিরই কনিষ্ট সহোদর, সকলেই একই রাজ্যের লোক, তাই এইরূপ সম্ভব হইয়াছে, যুগে যুগে আরও হইবে’।

জালাল খাঁ সেই, ‘একই রাজ্যের লোক’। সে-কারণেই দীন শরতের রচনা তাঁকে খুবই অনুপ্রাণিত করতো। দীন শরতের অনেক গান তিনি খাতায় লিখে রেখেছিলেন। দীন শরত ও জালালের উত্তরাধিকারীগণ এখনো এ-অঞ্চলে মুক্তবুদ্ধি ও সা¤প্রদায়িকতা বিরোধী ভাবনার ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছেন। সংগীত-কাব্য তথা সাহিত্য সংস্কৃতির মধ্যদিয়েই তো জনচেতনা প্রবাহমান থাকে। নেত্রকোণার ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

 

 লেখক:

 ১. বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।

 ২. প্রাবন্ধিক ও উপন্যাসিক।

৩. জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক।

Scroll to Top