বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শাহজাহান মিয়া
একাত্তরের সেই ৭ মার্চের কথা আমি আজও ভুলিনি, ভুলতে পারব না কোন দিন। সেই দিনের সেই স্মৃতি গুলো, ঐতিহাসিক রমনা রেসকোর্সের ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাখো লাখো জনতার উদ্দেশ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনামূলক বজ্রকন্ঠে যে ভাষন প্রদান করেছিলেন এবং সেই ভাষণটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যারা শ্রবণ করেছিলেন, সেই জনসভার জনস্রোত যারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাদের হৃদয় পিঞ্জরে যেভাবে ভেদ করেছিল সেই ওমর কবিতার ভাষায় বজ্র কন্ঠের ভাষণখানি, তাদের জীবনে কখনও সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি ভুলবার নয়।
প্রতিবছর ৭ মার্চ এলেই আমি ফিরে আসি একাত্তরের সেই মার্চে। অনেক জাতীয় অনুষ্ঠানে আমি মার্চ মাসের বিভিন্ন দিবসে সেই ৭ মার্চ ও ২৫ মার্চের স্মৃতিচারণ করে নব প্রজন্মদেরকে সেদিনের সেই স্মরণীয় কথাগুলো জানাতে চেষ্টা করি। একাত্তরের মার্চ মাসে আমার বয়স ছিল ২৮ বছর। কালের চক্রে সেই মার্চটি আরও ৫০ বার অতিক্রম করায় আমার বর্তমান বয়স ৭৮ বছর। সেভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পার হয়ে গেছে। তেমনি ৭ মার্চের বয়সও ৫০ বছর গত হয়েছে। একাত্তরে আমি টগবগে যুবক ছিলাম। তখন বুক টান করে অসীম সাহস নিয়ে দু’পায়ে হাটতাম, তবে আজ ৭৮ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণ ও শারীরিক অসুস্থতায় এক লাঠিতে ভর করে তিন পায়ে পিলপিল করে চলাচল করি। পরপারে যাবার কখন ডাক পরে, কখন চলে যেতে হবে না ফেরার দেশে ক্লান্ত দেহ মন নিয়ে। দেহে সেই সাহস, সেই মনোবল, সেই উদ্যম আজ নেই। মাঝে ২১ টি বছর স্বৈরাচারী শাসক গোষ্ঠীর অবিচার অত্যাচারে একাত্তরের সেই ৭ মার্চ দিবসের কথা ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তারা আমাদেরকে দাবায়ে রাখতে পারেনি। কেননা আমরা যে মুক্তিসেনা, আমরা যে মরণে করিনাকো কখনও ভয়। তাই তারা শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে।
মার্চ আমাদের স্বপ্ন দেখার মাস। এ মাসেই আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম ভবিষ্যৎ জয়ের। আর এই মার্চের অনেক ঘটনাবলী থেকেই শক্তি আহরণের চেষ্টা করি বর্তমানকে খোঁজবার জন্য। স্মৃতি জাগরূগ রাখি আর দেখি বর্তমানের প্রতিবন্ধকতা কিছু নয়, আমরা সঠিক পথে এগুচ্ছি জয়ের দিকে। একাত্তরের ১ মার্চ। আমি তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে, টেলিকমিউনিকেশন বেইজ স্টেশনের একজন দক্ষ ওয়্যারলেস অপারেটর। সেদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা চলছিল। বিসিসিপি ও আন্তর্জাতিক একাদশ ক্রিকেট খেলা। সাদা পোশাকে খেলা দেখতে এসেছিলাম দুপুর ১২ টার দিকে ঢাকা স্টেডিয়ামে। আমার সাথে ছিল অপারেটর শহীদ। স্টেডিয়াম প্রায় ভর্তি দর্শকে। চাপা টেনশন থাকলেও শহর ছিল শান্ত। বেলা ১ টার সময় রেডিও পাকিস্তান থেকে বেতার ভাষণ প্রচার করা হয় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের। যার মূল কথা ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত। ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণটি শেষ হতে না হতেই পুরো শহরটি বদলে যেতে লাগলো।
যেন আরমোরা ভেঙ্গে জেগে উঠেছে সারা শহর। আমি অপারেটর শাহীদকে নিয়ে স্টেডিয়ামের ভিতর থেকে বাইরে এসে দেখতে পেলাম পল্টন মাঠ থেকে ছোট ছোট মিছিল করে গুলিস্থান, পুরানা পল্টন ও পূর্বানী হোটেলের দিকে এগিয়ে আসছে। মিছিলকারীরা জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে এগিয়ে যাচ্ছে। খন্ড খন্ড মিছিলের ভিতর দিয়েই আমরা ২ জন পায়ে হেঁটে চলে আসলাম রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে এবং অফিসে ঢোকার পরপরই দেখতে পেলাম ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্প নগরী) ফজলুর রহমানের মৃত দেহ নিয়ে ২টি গাড়ি পুলিশ লাইন্সের ভিতরে ঢুকছে। জানতে পারলাম কালিগঞ্জ থানার শিল্প নগরী এলাকায় বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মাঝে বিরাজমান দাঙ্গা নিবারণের জন্য লাঠি চার্জ করলে ফজলুর রহমান সাহেবকে অবাঙালি শ্রমিকরা ধারালো অস্ত্র, রামদা ও বর্শা দিয়ে আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই দৃশ্য দেখে পুলিশ লাইন্সের বাঙালি পুলিশ সদস্যরা ক্ষোভে দুঃখে উত্তেজিত হয়ে অস্ত্র হাতে নিয়ে সবাই কালিগঞ্জ অভিমুখে অগ্রসর হয়ে সেই হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক এমন সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর দপ্তর জনাব এ এস এম শাহজাহান সাহেব রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে এসে উত্তেজিত বাঙালি পুলিশ সদস্যদেরকে নিবৃত করেন। সেদিনই ঢাকার জেলা পুলিশ সুপার জনাব জয়নাল আবেদিন বদলী সূত্রে ফরিদপুর জেলা পুলিশে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন এবং ফরিদপুর জেলা থেকে জনাব ই.এ. চৌধুরী সাহেব ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। মৃত দেহটি পুলিশ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে উভয় পুলিশ সুপারসহ রাজারবাগের পুলিশ সদস্যগণ এবং নিহত পুলিশ সুপারের পরিবারবর্গ সেখানে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লে এক হৃদয় বিদারক ঘটনার সৃষ্টি হয়।
অবশেষে মরহুম ফজলুর রহমানের মৃতদেহ প্যারেড গ্রাউন্ডে নিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব ওনার দিয়ে জানাযা শেষে মৃত দেহটি সিলেটে নিয়ে তার পারিবারিক কবরস্থলে কবরস্থ করা হয়।
অপরদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলাটি পন্ড হয়ে যায়। খেলোয়াররা স্টেডিয়াম থেকে দৌড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে ড্রেসিংরুমে। স্টেডিয়ামের কোথাও জ¦লছে আগুন। সব মানুষ যেন রাস্তায়। হোটেল পূর্বানীর সামনে লোকে লোকারণ্য। বিকেল ৩ টায় সেখানে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পার্টির বৈঠক। বঙ্গবন্ধু ক্ষুদ্ধ জনতাকে শান্ত হতে বলে ২ দিনের সময়সূচি দিলেন আর বললেন ৭ মার্চ হবে জনসভা। সেখানে তিনি তাঁর বক্তব্য দিবেন। সেই প্রতিশ্রুতিতে সেদিন থেকেই শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর আহবানে অসহযোগ আন্দোলন।
১ থেকে ৭ মার্চ প্রতিদিন কিছু না কিছু ঘটতে থাকে ঢাকা শহরে, সারা বাংলাদেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জনতার সামনে বাংলাদেশের আন্দোলন চরম রূপধারণ করে। এইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল সবুজের পতাকা উত্তোলিত করা হয়। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ আর গগন বিদারী স্লোগান ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। সন্ধ্যায় জারী করা হয় কার্ফ্যু। সারা ঢাকার রাজপথ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় আর মানুষ বলে ‘জয় বাংলা’। ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’। আবার কার্ফ্যু ভঙ্গ করে মানুষ বলে ‘জয় বাংলা’ আর গুলি খায়, আবারো বলে ‘জয় বাংলা’, আবারো গুলি খায়। হাসপাতালে গুলি বিদ্ধ মানুষের ভীড় বাড়তে থাকে। আর গভীর রাতে শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে বলেন ‘বাংলাদেশে আগুন জ্বালাবেন না, যদি জ্বালান সে দাবানল থেকে আপনারাও রেহাই পাবেন না। সাবধান! শক্তি দিয়ে জনগণের মোকাবেলা করবেন না’। টেলিগ্রাফের মাধ্যম সারা শহরে বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত বিবৃতি প্রচার করা হয়। আমি ও শহীদ সাদা পোষাক পরিধান করে গভীর রাত অবধি সারা শহরে ঘুরে বেড়াই এবং জনতার মিছিলে মিটিংয়ে যোগদান করে অনেক রাতে আমরা ২ জন ২০৬ নিউ সার্কুলার রোডস্থ ওয়্যারলেস ব্যারাকে ফিরে আসি।
একাত্তরের ৩ মার্চ আগের রাতের শহীদদের নিয়ে মিছিল বের হয়। পল্টনের এক জনসভায় শেখ মুজিব ঘোষণা করেন- গণতান্ত্রিক নিয়মে প্রণীত এক শাসনতন্ত্র যদি না চান তাহলে আপনাদের শাসনতন্ত্র আপনারা রচনা করেন। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র আমরাই রচনা করবো। তখন জয় বাংলার ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে পল্টন মাঠের চারিদিক।
শেখ মুজিব বলেন-‘বাংলার মানুষ খাজনা দেয়, ট্যাক্স দেয় দেশ পরিচালনার জন্য, গুলি খাওয়ার জন্য নয়। গরীব বাঙালির কেনা টাকায় গুলি করছো বার বার কাপুরুষের মত’। গণহত্যার বদলে অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেন। ২৩ বছর ধরে রক্ত দিয়ে এসেছি। প্রয়োজনে আবার বুকের রক্ত দেবো, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বীর শহীদদের সঙ্গে বেঈমানী করতে পারবো না। বক্তৃতায় শেষ পর্যায়ে বলেছেন ‘ভায়েরা আমার আমি থাকি আর নাই থাকি, আমার সহকর্মীরা আছেন। তাঁরাই নেতৃত্ব দেবেন। আর যদি কেউ না থাকেন তবুও আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। বাঙালির প্রতিটি ঘরে ঘরে বাঙালিকে নেতা হতে হবে এবং নির্ভয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে’। তখন চারদিক থেকে গগণবিদারী গর্জন শুনা যায় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে ৩ মার্চের এক ফাঁকে বিকেল বেলায় ২০৬ নিউ সার্কুলার রোডে ওয়্যারলেস ব্যারাকে এসেছিলাম দুপুরের খাবার খেতে। ঐ সময়েই এক ট্রাক ভর্তি পাক সেনা অস্ত্র উঁচিয়ে মগবাজার রোড অতিক্রম করে মৌচাক মার্কেট মোড় পার হয়ে রামপুরা টিভি সেন্টারের দিকে অতিক্রম করাকালীন সময়ে মালিবাগস্থ আবুজর গিফারী কলেজের ভিপি ইকবাল ফারুকের নেতৃত্বে ৫০/৬০ জন ছাত্রসহ পাক সেনাদের গাড়ীর পিছন পিছন ধাওয়া করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করে পিকেটিং করতে শুরু করলে আমি এবং সহযোদ্ধা অক্ষয় কুমার বড়–য়া, ইকবাল ফারুকের আহবানে একত্রিত হয়ে পাকসেনাদের ট্রাকটির পিছু পিছু অতিক্রম করে রামপুরা টিভি সেন্টারে পৌছলে পাকসেনারা গাড়ী থেকে নেমে আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে গুলি ছুড়তে থাকে। প্রথমেই ইকবাল ফারুক বুলেট বিদ্ধ হয়ে আমার বুকের উপর ঢলে পরে। ভিপি ফারুককে বাঁচানোর জন্য বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই এবং মালিবাগ রেলওয়ে লেভেল μসিং অবধি আসা মাত্র ফারুক শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। আমরা তার মৃত দেহ কাঁধে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবধি প্রদক্ষিণ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মÐলী ও ছাত্রছাত্রিরা তার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন এবং লাশের সহিত অনেকটা পথ প্রদক্ষিণ করেন। পরে সেখান থেকে ইকবালের পরিবারবর্গ এবং কলেজ কর্ত ৃপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে কলেজ গেইটে জানাজার পর কবরস্ত করা হয়। প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন ভিপি ইকবাল ফারুক তাদের মধ্যে অন্যতম। জাতির তাঁকে স্মরণ করা উচিৎ। ইকবাল ফারুকের হৃদয়বিদারক মৃত্যুর স্মৃতি বার বার মনে পরে। বিজয়ের মাসে আজ আমি তাকে স্যালুট জানাই এবং তাঁর আত্মার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট প্রার্থনা করি তাঁকে যেন বেহেস্ত নছিব করেন।
রাতে সারাদেশে জনতা কার্ফ্যু ভেঙ্গে নেমে আসে রাস্তায় আর বলে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’। ৭৫ জন লাশ হয়ে পরে থাকে রাস্তায়। অগণিত মানুষ গুলি খেয়ে কাতরায় তবুও বলে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’। ৭ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ শুধু চিৎকার করে বলেছে জয় বাংলা এর বদলে পেয়েছে গুলি। অনেকে ভাবলেন কি বলবেন মুজিব! তিনি কি বলবেন-আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে? কিন্তু বলার আর কি বাকি বরং তিনি যদি না বলেন তাঁকে ছেড়ে এগিয়ে যাবে মানুষ। ইতিমধ্যে উত্তোলিত হয়েছে স্বাধীন বাংলার পতাকা আর বাংলাদেশে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠেছে সেই গগনবিদারী আওয়াজ ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা-য়’। ৬ তারিখ আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির আলোচনায় বিবেচনা করে দেখা হলো যে যদি আন্দোলনের জোয়ার ধরে রাখা এবং জনগনের ঐক্য জোরদার করা যায় তাহলে ইয়াহিয়া ও সামরিক জান্তার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে পরদিন খোলাখুলি স্বাধীনতার ঘোষণার অবস্থান নেয়া হবে না। ইয়াহিয়ার উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে স্বাধীনতাকে চুড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে সুনির্দিষ্ট দাবী তুলে ধরা হবে এবং ঐ সব দাবীর সমর্থনে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
৭ মার্চ দুপুর থেকে ঢাকা শহর এগুতে থাকে রমনা রেসকোর্সের দিকে। মনে আছে সে দিন পুলিশ টেলিকমিউনিকেশন এর ডিএসপি মোজাম্মেল হক সাহেবের নির্দেশে একটি এফএমফাইভ-বি ওয়্যারলেস সেট একটি পিকআপ গাড়ীতে কিট করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনসভাকে কভারেজ করতে হবে। ওয়্যারলেস অপারেটর মনিরকে সাথে নিয়ে ওয়্যারলেস ষ্টোর রুমের ওসি আব্দুর রহমান সাহেবের নিকট থেকে আমেরিকার তৈরি হেলিকপ্টারস কোম্পানীর একটি এফএমফাইভ-বি ওয়্যারলেস সেট নিয়ে গাড়ীতে সেটিং করছি। উক্ত সেটের এন্টেনাটি ছিল ম্যাগনিফাইট। তাই অতি সহজে গাড়ীর অগ্রভাবে এন্টেনাটি সেট করে ১২ ভোল্টের ব্যাটারিটি মাঝের কামড়ায় রেখে সামনের সিটে ওয়্যারলেস যন্ত্রটিসহ ড্রাইভারকে নিয়ে বসার ব্যবস্থা করি। পিছনে ওয়্যারলেস অপারেটর মনিরসহ আরও ৪ জন এসএএফ এর লোক বসেন। আমাদের সাথে সে টিমের ইনর্চাজ ছিলেন সার্জেন্ট এজাজ আহমেদ। এই ওয়্যারলেস সেটের ২টি চ্যানেল ছিল এবং ক্রিষ্টল ফ্রিকোয়েন্সি ছিল ভেরী হাই, ১৫১ এবং ১৫২ মেগা হার্টস। আমাদের প্রস্তুতি দেখার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এস এম শাহজাহান এবং ডিএসপি মোজাম্মেল হক সাহেব এগিয়ে এসে আমাদেরকে ব্রিফ করেন। আমাদেরকে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের পাশ দিয়ে রেসকোর্স মাঠে প্রবেশ করে মঞ্চের অতি কাছাকাছি স্থানে অবস্থান করতে বলেন এবং এ এস এম শাহজাহান সাহেব জানান সম্ভব হলে জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষনের উল্লেখযোগ্য বক্তব্যগুলো যেন রিলে করে শুনাবার চেষ্টা করি।
আমরা সরকারি ভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে যথারীতি বেলা ১২টা মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নিয়ে ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সঠিক পেয়ে যাই। এতো মানুষের ঢল দেখে হতবাক হয়ে যাই। যেন পুরো ঢাকা শহর জমায়েত হয়েছে রমনা রেসকোর্স মাঠে। আমাদের রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বাঙালি পুলিশ, ঢাকা জেলার পুলিশ, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের পুলিশ সদস্যরা উক্ত জনসভায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকগণ নিজেরাই মিছিলের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করতে থাকেন। পুলিশ বরং জনসভার সমাবেশ থেকে একটু দূরে থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শ্রবণ করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। রেসকোর্স মাঠের এক প্রান্তে স্লোগান ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’।
অন্যদিকে পাঞ্জাব না বাংলা-বাংলা বাংলা। মাঝদিকে জাগো জাগো বাঙালি জাগো, আবার অন্যদিকে ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’। অন্য কোথাও ‘তোমার নেতা আমার নেতা- শেখ মুজিব শেখ মুজিব’। মঞ্চের সামনের স্লোগান-‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব। বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। দুপুর ৩ টার সময়ই লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় রমনা রেসকোর্স ময়দান। রেডিও পাকিস্তান ও টেলিভিশন এখানকার মতো তখনও সরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল। শেখ মুজিব পূর্বে জেনে শুনেই বলেছিলেন- মনে রাখবেন রেডিও, টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শুনে, তবে কোনও বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশনে আমাদের কথা না হয়, আমাদের নিউজ না দেয় কোনও বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। তাই রেডিও পাকিস্তান ও টেলিভিশনে ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের ব্যবস্থা করলো। রেডিও ঘোষকরা আগে থেকেই রেসকোর্স থেকে ইস্পাত দৃঢ় লক্ষ দর্শকের নজিরবিহীন উদ্দীপনার কথা প্রচার করা হলো। পাকিস্থান রেডিওতে পাঞ্জাব সেনা কর্মকর্তারা বাঙালিদেরকে অনেক বাঁধা বিপত্তি হুমকি ধামকি প্রদান করেও দাবায়ে রাখতে পারল না। বাঙালিরা পাকিস্তানি অনেক সামরিক কর্মকর্তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন আমরা যদি সারে সাত কোটি মানুষের কন্ঠ প্রচার করতে না পারি তাহলে কাজই করবোনা। একথা বলার সাথে সাথে বেতার ভবন নীরব হয়ে গিয়েছিল। রেডিও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি একান্ত আস্থা ছিল বলেই শেষ অবধি শত বাঁধা, আপত্তি অতিক্রম করে অবশেষে রেডিওতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণটি প্রচার করা হয়।
শেখ মুজিব এসে মঞ্চে উঠলেন। সারা রেসকোর্স কাঁপিয়ে ঝড়ো হাওয়ার মতো সেই শব্দটি বয়ে গেল ‘জয় বাংলা’। কি যে যাদুমাখা ছিল সেই স্লোগানে তারই যান্ত্রিক শক্তির পরিধি নিরূপনের ক্ষমতা বুঝি কারো নেই। গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ স্লোগান বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। জীবন বাজি রেখে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এই উক্তি যে উদ্দীপনা যোগাতো তার কোনও তুলনা নেই। তাই জয়বাংলা ধ্বনি আমাদের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল। ঐ দিনের জনসভায় রেসকোর্স ময়দানে লাল সূর্যের সহিত বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত গাঢ় সবুজ রঙের পতাকা হাতে হাতে উড়ছে হাজারে হাজারে। বড় পতাকাটি উড়ছে বঙ্গবন্ধু যেখানে ভাষণ দেবেন তার ওপরে।
যারা ৭ মার্চ দেখেননি তাদের বুঝার জন্যে এটি প্রয়োজন। এই সময় বহু মহিলা এসেছেন বাঁশের লাঠি নিয়ে, বহু লোক এসেছেন তীর ধনুক নিয়ে যেন যুদ্ধ আসন্ন। মানুষ সেদিন কতটা মরিয়া হয়ে ওঠেছিল এই দৃষ্টান্ত থেকে বুঝা যাবে। ওই সময় প্ল্যান্ট প্রটেকশনের একটি বিমান জনসভার অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। লোকজন ওটাতেই পাক সেনা আছে ভেবে কেউ কেউ লাঠি ছুরে মারে। কারও কারও অনুমান এতে ঠিক্কা খান আছে। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠলেন। সাদা পাজামা পাঞ্জাবী আর কালো মুজিব কোট পরনে। সভায় কোনও আনুষ্ঠানিকতা নেই। কালো ভারি ফ্রেমের চশমাটি খুলে রাখলেন ঢালু টেবিলের উপর। শান্ত গম্ভীর কন্ঠে বললেন- ‘ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারক্রাান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং সবই বুঝেন’। উনিশ মিনিটের ভাষণ প্রদান করেন, লিখিত নয়। কিন্তুএকটি বারের জন্যেও থমকাতে হয়নি। পরে অবশ্য বিবিসির ভিডিও ক্লোজ আপে অনেকে দেখেছিল আবেগে কাঁপছে তাঁর মুখ। কিন্তু সমস্ত অবয়বে তাঁর প্রতিজ্ঞার ছাপ বুঝা যায়, তিনি পিছুবেন না।
৭ মার্চ যিনি রেসর্কোস ময়দানে ছিলেন না, তাকে বুঝানো যাবে না যে ৭ মার্চ কি ছিল বাংলাদেশের জন্য। বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি মাত্রই জানেন। এই ভাষণের প্রতিটি উক্তিই উদ্ধৃতিযোগ্য। কিন্তু মূল বক্তব্যটি ছিল ‘আমার বুকের উপর আর গুলি চালাবার চেষ্টা কর না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবানা। আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি এদেশের মানুষের আত্ম অধিকার চাই। আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি, তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবা। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ’। সর্বশেষ বলেন-‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয়বাংলা’।
বঙ্গবন্ধু শেষের দিকে তিনি জনতাকে শান্ত ও অহিংস থাকতে উপদেশ দিলেন। যে জনতা সাগরের ঢেউয়ের মতো আবেগ নিয়ে রেসকোর্সে ভেঙ্গে পড়েছিল ভাটার টান ধরা জোয়ারের মতো তারা ঘরে ফিরে চললো, আসা জনতার ঢলের মতোই। ফিরে আসছে তারা একান্ত সন্তুষ্ট চিত্তে ঐশিবাণী বুকে ধারণ করে। তাদের ভেতরকার সেই আগুন যেন নিভে গেছে। ইচ্ছে করলে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের উদ্দেশ্যে সেই আগুনকে ধাবিত করা যেত।
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ
অনেকে হতাশও হয়েছিলেন তৎকালিন আন্ডার গ্রাউন্ডের কতিপয় নেতাও সেই ভাষণ শোনার জন্য রমনা রেসর্কোস ময়দানে এসেছিলেন। তাদেরসহ অনেক লোকের ধারণা ছিল শেখ মুজিব আজ তাঁর ভাষণে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন এবং বড় ধরনের একটা ঘটনা ঘটবে। কিন্তু সেদিন তারা নিরাশ হয়ে ফিরে যান। সদর দপ্তর থেকে টেলিফোনে অনেকের সহিত কথোপকথন কালে একজন উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা জানান যে প্রধান সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন এই পরিস্থিতিতে এটাই ছিল সবচেয়ে উত্তম ভাষণ।
১৯৭১ এর মার্চ মাসের অসহযোগ আন্দোলন প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরী হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাখান, পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাখানের মধ্য দিয়ে এই প্রতিরোধের সূত্রপাত। শেখ মুজিবুর রহমান একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক কার্যμমের মধ্য দিয়ে এই প্রতিরোধকে একটি রাষ্ট্র গঠনে বদলে দেন। এক পথে অসহযোগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাখান অন্য পথে অসহযোগ মাধ্যম একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রবর্তনের সম্ভাবনাকে জনগনের মাঝে সত্য করে তোলে। এই রণকৌশল শেখ মুজিবুর রহমান ৩৫টি নির্দেশনার মধ্য দিয়ে সম্ভব করে তুলেন। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের ভিত্তি করে দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্বেই স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নীতিমালার নির্দেশ প্রদান করেন। এই রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বের ক্ষেত্র জনসাধারণ। এই কর্তৃত্বের স্বরূপ সিভিল এবং সিভিল কর্তৃত্বের অন্তর্গত পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী। শেখ মুজিবুর রহমান এভাবেই বঙ্গবন্ধু ও জাতির জনকে পরিণত হন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এক্ষেত্রেই। এভাবেই সৃষ্টি হয় একটি সমান্তরাল রাষ্ট্রের।
সে দিক থেকে বিচার করলে ২৫ মার্চের গভীর রাতে স্বাধীনতা ঘোষণা ছিল একটি ফর্মাল ডিক্লারেশান মাত্র। আসলে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের পত্তন ৭ মার্চ। এভাবেই বাংলাদেশ এগুতে থাকে ২৫ মার্চের দিকে। ঐ সে দিন শেখ মুজিব আঙ্গুল তুলে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাঙালি তা মেনে নিয়েছিল, পরাজিত পাকিস্তানে আর তারা ফিরে যায়নি।
লেখকঃ
১. ৭১ এর ২৫ মার্চের রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের সশস্ত্র প্রথম প্রতিরোধ যোদ্ধা, পাকসেনা কর্তৃক ঢাকা আক্রমণের সংবাদ সারাদেশে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে প্রেরণকারী ওয়ারলেস অপারেটর।
২. ১১নং সেক্টরের উল্লেখযোগ্য সম্মুখ যুদ্ধের সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত এসআই।
৩. মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক লেখা এ যুদ্ধের শেষ কোথায় গ্রন্থের লেখক
