একুশ শতকে শচীন: কেন প্রাসঙ্গিক?

মো: ইমাম হোসাইন

এক শিল্পী, বহু দিগন্ত শচীন দেব বর্মণ-ভারতীয় উপমহাদেশের জনপদ থেকে সিনেমার রূপালি পর্দা-এই দুই প্রান্তকে সুরের সেতুতে বেঁধে দিয়েছেন যিনি। লোকরীতি, ধ্রুপদ, আঞ্চলিক ভঙ্গি ও আধুনিক অনুভব-সবকিছুর সমন্বয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন এক স্বতন্ত্র সুর জগত, যা একই সঙ্গে সহজ ও গভীর, গ্রামীণ অথচ নগরেরও, ব্যক্তিমনস্ক অথচ সার্বজনীন। বাংলা ও হিন্দি দুই পরিসরেই তার সুর আজও তাজা; নদীর জলের মতোই চিরপ্রবাহমান। এই দীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা তার জীবনযাত্রা, সঙ্গীতভাবনা, শিল্প-সাধনা, চলচ্চিত্র-সঙ্গীতে অবদান, সহযোগীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া, আত্মকণ্ঠের বৈশিষ্ট্য, পুরস্কার-স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকারের নানা মাত্রা বিশদে পর্যালোচনা করব।

জন্ম, রক্তের ঐতিহ্য শৈশব-লোকভূমি উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ত্রিপুরা-কমিল্লার নদীপাড়, বিল-ঝিল, ধানক্ষেত ও মৌসুমি হাওয়া যে সুরভূমি গড়ে তুলেছিল, শচীন কর্তার সঙ্গীতদৃষ্টি তারই ভিতের ওপর দাঁড়ায়। রাজবংশীয় বংশপরিচয় সত্তেও তার শৈশব-কৈশোর ঘনিষ্ঠ হয়েছিল জনজীবনের সঙ্গের-নৌকায় ভেসে যাওয়া ভাটিয়ালি, কীর্তনের সাড়, জারিসারি, বাউলবিষাদ; গ্রামের উৎসবে ঢোল-মন্দিরা, শহর-কলেজের মঞ্চে আধুনিক গান। জীবনের এই দ্বিবিধ সম্বন্ধ-অভিজাত্যের শৃঙ্খলা আর লোকজের মেলবন্ধন-পরে তার সুরে ‘সরল-ষড়িত’ নীতি তৈরি করে: কম কথায়, সহজ সুরে, গভীরতম অনুভব।

সাধনাপথ: গুরু-শিষ্য পরম্পরা ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি শচীনের সুরের ভেতরে লোকরস থাকলেও ভিতটা শাস্ত্রীয়। গুরুশিষ্য পরম্পরায় ধ্রুপদ-খেয়ালের শিক্ষার পাশাপাশি সেতার-সরোদ-বাঁশির অলঙ্কারকে তিনি গ্রহণ করেন লয়ের আবহে, কিন্তু কখনোই গানকে ‘রাগদাঙা’র দম্ভে ভারী করেননি। তার শেখার ধাঁচ ‘শিক্ষা মানে অন্বেষণ’: রাগ-রূপক ঐশ্বর্যকে তিনি চলচ্চিত্রভাষার উপযোগে রূপান্তরিত করেছেন-মেলোডির বোধ অক্ষত রেখে মাত্রা, তালের অভিব্যক্তি সরিয়ে নিয়ে গেছেন দৃশ্যের নাট্যকেন্দ্রে। তাই তার কম্পোজিশনে শুদ্ধতা যেমন আছেই, তেমনি আছে সংযম, সংক্ষেপ ও আবেশ।

কলকাতা পর্ব: গ্রামোফোন, বেতার ও আধুনিকতার অভ্যুদয় কলকাতার সাংস্কৃতিক ভুবন শচীনকে শিল্প-পরীক্ষার অবকাশ দিয়ে ছিল। গ্রামোফোন রেকর্ডিং ও বেতারে (আকাশবাণী) গায়ক-সুরকার হিসেবে তিনি যে ‘ভয়েস-সিগনেচার’ তৈরি করেননাকসুর ভেজা, গ্রামীণ অথচ রিফাইন-তা পরবর্তী জীবনেও তার পরিচয়। এই সময়েই তিনি বাংলা আধুনিক গানে লোকচেতনার সঙ্গে নাগরিক প্রেম-ব্যথা, বিরহ-উদ্দীপনার সুরমিল ঘটান-প্রায়শই অত্যল্প বাদ্যবীণ্যাসে, যেন শব্দের ভিড়ে নয়, নীরবতার ভেতরেই সুরের লেশহীন দীপ্তি।

বোম্বে অভিযান: চলচ্চিত্র-সঙ্গীতে ‘শচীনীয়’ ভাষা চল্লিশের দশকের শেষভাগ থেকে বোম্বে (আজকের মুম্বাই) হয়ে ওঠে শচীন দেব বর্মণের প্রধান কর্মক্ষেত্র। সেখানে তিনি চলচ্চিত্রের ভাষায় সুরানুবাদ করেন-দৃশ্যের আবেগ, চরিত্রের গতি, কাহিনীর নাট্যউত্তেজনা-সবকিছুকে মাথায় রেখে সুরের মিনিমাল, অর্থবহ কাঠামো গড়ে তোলেন। নব্যকেতন ব্যানার (দেব আনন্দ), গুরু দত্তের চলচ্চিত্রভুবন-এসব সহযোগিতার জায়গাগুলোতে তিনি অগণিত অমরধ্বনি রেখে গেছেন।

কণ্ঠশিল্পী শচীন: নিজের গলায় নিজের সুর যতখানি তিনি মিউজিক ডিরেক্টর, ততখানি তিনি স্মরণীয় গায়ক। তার কণ্ঠে আছে নদীর ধারে এক সন্ধ্যার হাওয়ার স্বাদ-কৃষ্ণচূড়ার ছায়া পড়া শূন্যপথে হেঁটে যাওয়া একাকী সিঁদুর-রঙা ক্লান্তি। উচ্চারণে আঞ্চলিকতার স্নেহ, স্বরের শরীরে হালকা ‘নাসাল টুইঙ্গ’, আর টানে রয়েছে লোকজ নিনাদ। তার গাওয়া গানগুলোর অনেকটাই চলচ্চিত্র-সঙ্গীতের ভেতরে ‘ন্যারেটরের কণ্ঠ’-যা গল্পের বাইরের অথচ গল্পের চাবি। সুরের খামতি ঢাকতে তিনি গান ধরেননি; বরং সুর-চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে নিজের গলা ব্যবহার করেছেন।

সহযোগিতার রসায়ন: গায়ক-গায়িকা, গীতিকার, পরিচালক শচীন দেব বর্মণের জীবন আসলে সহযোগিতার মহাগাঁথা।

►কণ্ঠশিল্পীরা: গীতা দত্তের আবেগঘন স্বর, লতা মঙ্গেশকরের নৈর্ব্যক্তিক স্বচ্ছতা, আশাবোঁসালের নিয়ন্ত্রিত উচ্ছাস, মোহাম্মদ রফির নরম আগুন, কিশোর কুমারের দুষ্টুমিষ্টি স্বাধীনতা-প্রতিটি কণ্ঠের স্বরস্বভাব, রেঞ্জ, ফ্রেজিং অনুযায়ী তিনি সুর ‘কাস্ট’ করেছেন। ‘একই টিউন-সব গলার জন্য’-এই ভাবনার বিরোধী ছিলেন তিনি।

►গীতিকাররা: সাহির লুধিয়ানভির সামাজিক অন্বেষণ, শৈলেন্দ্রর মানবিক সরলতা, মাজরুহ সুলতানপুরীর নাগরিক রোমান্টিকতা, কাইফি আজমির মৃদু বিষাদ-এসবকে তিনি সুরের সঠিক কাঁধ দিয়েছেন। ফলে শব্দ ও সুর আলাদা ‘বিভাগ’ নয়; একই লতার দুই পাতা।

►পরিচালক-প্রযোজকরা: গুরু দত্তের বিষণ্ন সৌন্দর্য, দেব আনন্দের অদম্য প্রাণশক্তি-এই দুই চরমের মাঝখানে শচীনের সুর থাকে ‘মধ্যপথের স্ফটিক’-যা অনুভবকে তীব্র করে, কিন্তু কখনোই দৃশ্য-অভিনয়কে গ্রাস করে না।

►লোকসুরের আধার: ভাটিয়ালি, কীর্তন, জারিসারি শচীন দেব বর্মণের সুরের অনুপ্রেরণার বড় উৎস ছিল নদীপারের গান। ভাটিয়ালির দীর্ঘ টান, জারিসারির কণ্ঠ-গর্জন, কীর্তনের উচ্ছাস-সবকিছু তিনি পরিশীলিত করে পর্দার উপযোগী করেছেন। কোনো লোকসংগীতকে ‘সরাসরি’ তোলেননি; বরং ‘লোকীয়তার ভাব’ চুরি করেছেন-তালের সহজতা, চালের গতি, টোনাল ফ্লেভার। এ কারণেই শহুরে দর্শকও গ্রামীণ সুরে আত্মীয়তা খুঁজে পান; আর গ্রামের শ্রোতাও সিনেমার গানে ‘আপন’ শ্বাস অনুভব করেন। গীতিকার-সুরকার-নির্দেশকের ত্র্যুহ: কয়েকটি কেস স্টাডি

১. মানবিক বিষাদ ও সমাজবোধ সাহির লুধিয়ানভির সামাজিক চেতনা যখন গুরু দত্তের বিষাদমাখা ফ্রেমে ওঠে, শচীনের সুর সেখানে ‘নরম প্রতিবাদ’। বিষাদকে তিনি করুণায় পরিণত করেন, কিন্তু সেন্টিমেন্টালিটি এড়িয়ে যান-মেলোডিতে থাকে সংযত দাঁতালতা, যেন ‘সহিষ্ণু বিদ্রোহ’।

২. প্রেম, রোমান্টিসিজম ও স্বপ্নদেব আনন্দের নায়কচরিত্র-স্বপ্নবাজ, রোমান্টিক, আশাবাদী। সেখানে শচীনের সুর ‘হাওয়ায় উড়ে যাওয়া কাগজ’-হালকা, ছন্দময়, নাচুনে; কিন্তু ভেতরে ভেতরে আছে সুরের স্থিরতা।

৩. নারীস্বরের ভিতরকার মর্যাদা নারী-নায়িকার অন্তর্দ্ব›দ্ব, অপমান, আত্মমর্যাদা-এসব প্রকাশে শচীন লতা-আশা-গীতার কণ্ঠকে চরিত্রের মনের অন্দরমহলে নিয়ে যান। উচ্চারণে পরিমিত ‘স্বরবর্ণ’, আওয়াজে কম্পিত নয়, ধারালোও নয়; ‘সংযত দৃঢ়তা’।

তাল, লয়, গতি: ছোট পায়ে অদ্ভুত দৌড় তার গানে কেহরোয়া, দাদরা, রূপকের সহজ ছন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে অদলবদল লয়ের সযতœ ব্যবহার। জটিলতা নয়; বরং ‘সহজতার ভেতর চমক’। গানকে তিনি কখনোই ‘বাজনার দাপট’ দিয়ে টানেননি; বরং তালের ছোট ছোট ব্রিজে ভোকাল ফ্রেজকে শ্বাস নিতে দিয়েছেন। ফলে শ্রোতা ‘সঙ্গে গাইতে’ পারেন-এটাই তার জনপ্রিয়তার মূল কারণ।

পারিবারিক-শিল্প ঐতিহ্য: মীরা দেব বর্মণ ও আর. ডি. বর্মণ শচীন দেব বর্মণের সঙ্গীত-ভুবনে স্থায়ী সঙ্গী ছিলেন মীরা দেব বর্মণ-গীতরচনার মাধ্যমে, সুর-আলোচনার মাধ্যমে, সংসার-শিল্পের আচারে। তাদের একমাত্র সন্তান রাহুল দেব বর্মণ (আর. ডি.বর্মণ) ভারতীয় চলচ্চিত্র-সঙ্গীতকে পরবর্তী প্রজন্মে আধুনিকতার মেট্রোনোমে চালিয়ে দেন। বাবা-ছেলের ‘শৈলী’ আলাদা বাবার মিনিমাল মেলোডি বনাম ছেলের রিদম-হার্মনি-সাউন্ডের সাহসী মিশ্রণ; কিন্তু দুজনেরই ‘প্রিন্সিপল’ একই-গানে মেলোডিই নেতা। আর. ডি. বহু জায়গায় সহকারী হিসেবে বাবার সংগে কাজ করেন; আবার অনেক সময় বাবার গান তিনি অ্যারেঞ্জও করেছেন। এই উত্তরাধিকার চলচ্চিত্র-সঙ্গীতের ধারাবাহিকভাবে আধুনিকায়নের এক অভিনব দলিল।

শিল্পনৈতিকতা: সৌন্দর্য বনাম জনপ্রিয়তা শচীনের সাফল্য এখানেই যে, তিনি ‘জনপ্রিয়’ হতে চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কখনোই ‘জনপ্রিয়তার জন্য’ সুর করেননি। সহজ সুর-হ্যাঁ; সস্তা সুর-না। চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক চাপে থাকতে হয়েছে; তবু তিনি গানের রুচি ‘নিচে নামাননি’। তার গান শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সেই একযোগে প্রিয়-কারণ সহজের সঙ্গে শালীনতার এই সঙ্ঘবন্ধন খুব বিরল।

স্বীকৃতি পুরস্কার চলচ্চিত্র-সঙ্গীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একাধিকবার বড় পুরস্কার পান; তার মধ্যে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ কর্মজীবনে বাংলাভাষী ও হিন্দিভাষী পরিসরে যে সম্মান তিনি পেয়েছেন, তা সংখ্যায় নয়, প্রজন্মের স্মৃতিতে পরিমিত। কেননা পুরস্কার মৌসুমি; তার গান চিরকালীন।

জীবনযাত্রার অন্তিম: এক নদীর থেমে যাওয়া সত্তরের দশকের মাঝামাঝি শারীরিক জটিলতা বেড়ে গেলে তার কাজ গতি কমায়। ৩১ অক্টোবর ১৯৭৫-সুরের নদী থেমে যায়। কিন্তু নদী কি আদৌ থামে? যে গান একদিন পর্দায় বাঁধা ছিল, আজও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম-রেডিও-প্রাইভেট কনসার্টে বেঁচে আছে-তার মানে নদী স্রোত বদলেছে, থামেনি।

বাংলা গানে শচীন: শহুরে আধুনিকতার নির্মল শ্বাস বাংলা আধুনিক গানকে তিনি ‘আড়ম্বরের ভেতর হারিয়ে’ যেতে দেননি। শুদ্ধ উচ্চারণ, লোকস্বাদের বুনন, সংযত বাদ্যযন্ত্র-এই ত্রিভুজ বাংলা গানে তার স্বাক্ষর। রোমান্টিক প্রেম এখানে লঘু হাসি, মৃদু হঠাৎ-ব্যথা, কখনও বা দিগন্তে নৌকোর আলো-সারি-ভাটিয়ালির নাড়ির টান। বাংলা ভাষার স্বরধ্বনির সঙ্গে তার মেলোডির মিতালি এমন ছিল যে, অনেক সময় সহজ শব্দও গানে আধ্যাত্মিক আবেশ পায়।

হিন্দি চলচ্চিত্র-সঙ্গীতে শচীনের নির্মাণ হিন্দি গানে শচীনের অবদান ‘মেলোডি-র্ফাস্ট’ নীতির প্রতিষ্ঠান। বড় বড় চলচ্চিত্রে তিনি দেখিয়েছেন-গান গল্পের শিরায় রক্ত, নায়কের স্টাইলে কণ্ঠস্বর, শহরের আকাশে হারিয়ে যাওয়া বাঁশির এক ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস। রোমান্স, ট্র্যাজেডি, সোশ্যাল কমেন্টারি-সব ধারায় তিনি ‘সুর’কে থিসিস বানাননি; করেছেন অ্যালবাম-মানুষের প্রাণ। এই সামঞ্জস্যই তাকে একদিকে ‘সুরের গুরু’, অন্যদিকে ‘ফিল্মমেকারদের ভরসা’ করে তোলে।

কিশোর কুমার: এক গলার মুক্তি কিশোর কুমারের মিউজিক্যাল ‘পারসোনা’ তৈরি করতে শচীনের অবদান অসামান্য। কিশোরের ‘হাসিখুশি দুঃখ’-এই বিরল গলার মেজাজকে তিনি উপযুক্ত সুরের মাঠ দিয়েছেন। রফির রাজত্বে কিশোরের উঠতিএখানে শচীনের কাস্টিং-চিন্তা ও সুরের খেলা কাজ করেছে। কিশোরের স্বাভাবিক উচ্চারণ, মুক্ত হাসি, ঝরনা-ছন্দ-সবকিছু শচীনীয় মেলোডির সঙ্গে এমন নেচেছে যে, পরে কিশোর হয়ে উঠেছেন ‘মেলোডি-ফ্রেন্ডলি’ কণ্ঠের প্রতীক।

লতা-আশা-গীতা: তিন রঙ, এক বাগান

►লতা-স্বচ্ছ, বেদনার দীপ্তি; তার কণ্ঠে শচীনের সুর হয় ‘আলোর পাতলা শাড়ি’।

►আশা-ছন্দে দুষ্টুমি, স্বরে স্থিরতা; শচীনের মাপা নাচুনে সুরে আশার উচ্ছাস শোভন।

►গীতা-আবেগের কাঁচা-রঙ; বিষাদে আলো মেশানো একরকম শৈল্পিকতা-যা শচীনের মিনিমালিজমে অপূর্ব সাযুজ্য পায়।

সিনেমার সঙ্গে সুরের সংলাপ: দৃশ্য-সচেতনতা চলচ্চিত্রে গান ‘আইটেম’ নয়, ‘কাহিনীর অংশ’। শচীন দৃশ্যের কন্টেক্সট থেকে টেম্পো ঠিক করেন, চরিত্রের আরক থেকে স্কেল নির্ধারণ করেন, আবহের রঙ থেকে যন্ত্র বাছেন। রাতের দৃশ্যে ফ্লুটে নরম নোট, ভোরে তানপুরার আলগা টান, শহরের পথে গিটারের টকটক-এগুলো কেবল ‘সাউন্ড’ নয়; দৃশ্যের ‘মেজাজ’। তাই তার গান আলাদা শুনলেও ভালো লাগে, কিন্তু সিনেমায় তো আরও ‘মানানসই’।

রেকর্ডিং-অ্যারেঞ্জমেন্ট: সাউন্ডের বুদ্ধিৎ স্টুডিও ছিল সীমাবদ্ধ-কম ট্র্যাক, কম সুবিধা। এই সীমাবদ্ধতাই শচীনকে ‘ইঞ্জিনিয়ারড সিম্পলিসিটি’ শিখিয়েছে। ডাবল-ট্র্যাকিং এড়ানো, কোরাসে মাত্র কয়েক গলা, লিড ইন্সট্রমেন্টে নরম মাইক্রোফোনিং, বেস লাইনকে অতিরিক্ত ‘বুম’ না করা-এসব সিদ্ধান্তে তার সুর ‘ক্লিন’ থেকেছে। আজও তাই রিমাস্টার ছাড়াই তার গান পরিষ্কার শোনায়; কারণ সুর-লাইন সবসময় সামনে।

পুরস্কার বনাম প্রভাব: কোনটি বড়? পুরস্কার সময়ের সন্তান; প্রভাব ইতিহাসের। শচীন দেব বর্মণের গান ভারতীয় সঙ্গীতরুচিকে ‘গতি’ দিয়েছে-ফোক ও ক্ল্যাসিক্যালের অচলা টানাপোড়েনকে ‘সমঝোতা’ করিয়েছে, চলচ্চিত্র-সঙ্গীতকে ‘অতি-বড়’ নয়, ‘অতি-সত্য’ হতে শিখিয়েছে। এই প্রভাব-অসংখ্য সুরকার, গায়ক, লিরিসিস্ট, অ্যারেঞ্জারের কাজের ভেতর জীবিত। তার নাম উচ্চারণ না করলেও ‘শচীনীয়’ বোধ-বাংলা-হিন্দি গানে আজও সুরকারদের অদৃশ্য শিক্ষক।

একুশ শতকে শচীন: কেন প্রাসঙ্গিক? স্ট্রিমিং যুগে গান দ্রুত শোনা, দ্রুত ভুলে যাওয়া-এ রীতির মধ্যে শচীনের গান টিকে থাকে কেন? কারণ তিনি ‘হুক’ দিয়ে নয়, ‘হার্ট’ দিয়ে গান বানিয়েছেন। প্লেলিস্টের স্কিপ-বাটনের যমানায়ও তার সুর বাধ্য করে ‘সম্পূর্ণ’ শুনতে, কারণ কথার সঙ্গে সুরের সম্পর্কটি গল্পের মতো। মিউজিক-প্রোডাকশনের বহু চমক আজ সম্ভব; তবু শচীনের নীতি শেখায়-যত প্রযুক্তি, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন রুচি।

উত্তরাধিকার: ধারার ভিতের পাথর বাংলা আধুনিক গানের সংযমী সৌন্দর্য, হিন্দি চলচ্চিত্র-সঙ্গীতের মেলোডি-কেন্দ্রিক নন্দন, লোক-শাস্ত্রের শান্ত সমঝোতা-এসবের ভিতর শচীন দেব বর্মণ এক ‘ফাউন্ডেশন স্টোন’। তার উত্তরাধিকার শুধু আর. ডি.-র কাজেই নয়; শত শত সুরকার-গায়কের ‘দৃষ্টিভঙ্গি’তে-সহজকে শালীন রাখা, সংযমকে চিত্তাকর্ষক করা, নীরবতাকে আবেগধ্বনি বানানো।

নদীর নাম শচীন শচীন দেব বর্মণকে মনে পড়লে চোখে ভাসে এক নদী-ভাটিয়ালির ঢেউ, শহরের বাতির প্রতিফলন, আর মাঝিতে-মাঝি দাঁড়ানো এক গায়ক-সুরকার-যিনি নদীর দুই তীরকে সুরে মিলিয়ে দেন। তিনি প্রমাণ করেছেন-সিনেমা, বেতার, রেকর্ড-সবই মাধ্যম; কিন্তু সুরের মূল ঘর মানুষের বুকের ভেতর। তাই তার গান সময়ের সীমানা মানে না; প্রজন্ম পার করে ‘নতুন’ থাকে। ৩১ অক্টোবর ১৯৭৫-এ শারীরিক জীবন থেমেছে-কিন্তু সুরের জীবন? আজও নদী বয়ে যায়। শোনার কান থাকলেই বোঝা যায়: শচীন দেব বর্মণের সুরে আমরা নিজেদেরই শুনি-নিজেদের গ্রাম, শহর, প্রেম, হারানো, স্বপ্ন ও স্বদেশ। আর তাই, তার সঙ্গীত শুধু ইতিহাসের পাঠ নয়; আমাদের আজকেরও অনুশীলন। 

শচীন দেব বর্মণের জনপ্রিয় বাংলা গান (নির্বাচিত) – আধুনিক/নন-ফিল্ম (বেশিরভাগ গীতঃ মীরা দেব বর্মণ)

শোনো গো দখিন হাওয়া 

নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক 

বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে 

কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া 

বাঁশি শুনে আর কাজ নাই

যে না জানে বিরহের মানে 

প্রারম্ভিক গ্রামোফোন রেকর্ড (Hindustan Records, ১৯৩২)

ডাকিলে কোকিল রোজ বিহানে (হেমেন্দ্র কুমার রায়) 

এ পথে আজ এসো প্রিয় (শৈলেন রায়) 

অন্যান্য বহুলশ্রুত/লোকধারার স্বাদে

আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই (বাংলাদেশের ঢোল) 

নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে 

বধুঁ গো এই মধুমাস 

ওরে সুজন নাইয়া 

যদি দখিনা পবন 

প্রেমের সমাধি তীরে

কুমিল্লায় শচীন দেব বর্মণের পৈতৃক ভিটা-সংরক্ষণের বর্তমান অবস্থা

► অবস্থান: কুমিল্লা নগরীর চর্থা এলাকায় শচীন কর্তার পৈতৃক বাড়ি। এটি ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রত্নতত্ত¡ অধিদপ্তরের   সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ তালিকায় ওঠে।

► আগের সমস্যা: সংস্কার কাজ বহু আগেই শেষ হলেও অধিগ্রহণ/হস্তান্তর জটের কারণে দেখভালে ঢিলেঢালা অবস্থা ছিল-  জেলার প্রশাসন দেখাশোনা করলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর আটকে ছিল। 

► অর্থায়ন ও পরিকল্পনা: ২০১৫ সালে প্রাথমিক সংস্কার বরাদ্দের পর ২০২২ সালে ১.১০ কোটি টাকা প্রকল্প অনুমোদনের   খবর প্রকাশিত হয়, লক্ষ্য ছিল কালচারাল কমপ্লেক্স করা।

► সর্বশেষ পদক্ষেপ (২০২৫): সরকার পূর্ণাঙ্গ সংগীত জাদুঘর/মিউজিকাল মিউজিয়াম হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ  নিয়েছে-এ নিয়ে সরকারি বার্তা সংস্থা ও জাতীয় দৈনিকে খবর এসেছে।

► স্থানীয় অংশগ্রহণ: প্রতিবছর ‘শচীন মেলা’ হয়; ভক্ত-সংস্কৃতিকর্মীরা স্থায়ী সংরক্ষণ ও জাদুঘর চালুর জোর দাবি জানিয়ে   আসছেন। 

লেখক: 

১. উদ্যোক্তা, পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশ।

২. কান্ট্রি এডিটর, এশিয়ান স্টেট আন্তর্জাতিক জার্নাল।

Scroll to Top