নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়
— হেলাল হাফিজ
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
মিছিলের সব হাত কন্ঠ পা এক নয়।
সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,
কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার ।
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার
শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে
অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহবানে,
কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে
কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয়।
যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় ।
শুধু তোমার জন্য
— নির্মলেন্দু গুণ
কতবার যে আমি তোমাকে স্পর্শ করতে গিয়ে
গুটিয়ে নিয়েছি হাত, সে কথা ঈশ্বর জানেন।
তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও
কতবার যে আমি সে কথা বলিনি
সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে
জেগে উঠবার জন্য
দরজার সঙ্গে চুম্বকের মতো আমি গেঁথে রেখেছিলাম
আমার কর্ণযুগল; তুমি এসে আমাকে ডেকে বলবে:
‘এই ওঠো, আমি, আমি।
আর আমি এ-কী শুনলাম
এমন উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে
কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে
কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য,
আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য,
আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যুহবে তোমার জন্য।
তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে,
আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্য।
নদী ও নারী
— শহীদ মেহের আলী
নদী ও নারীর এক গতি, একই মতি।
নদী আনে ভাঙন, নারী জ্বালে প্রেমের আগুন।
কূল ভাঙা কীর্তিনাশা নদীর মতো
নারীও নিজেকে দীপ্তিহীন প্রেমের আগুনে দহন করে,
কখনও ব্যাকূল–
ভেঙে, সমাজ সংসারের বাঁধন অতিক্রম করে ছুটে যায়
নদীর মতো নারীও উদ্দাম, অনির্দিষ্ট।
তার মধ্যে বেগ আছে, নিষেধ নেই।
( কবি নারীকে নদীর মতোই শক্তিশালী, বেগময়, স্বাধীনচেতা ও বাঁধনমুক্ত সত্তা হিসেবে চিত্রিত করেছেন
—— ২০/০৯/১৯৬৪- শহীদ মেহের আলীর ডায়েরী থেকে সংগৃহীত))
টিনা জিলে ফুটবল
— শ্যামলেন্দু পাল
টিনা জিলে সমান তালে
লড়বে নাকি মাঠে
কোথায় গিয়ে ভিড়বে তরী
কোন যে নদীর ঘাটে।
টিনার দলে আমি আছি
জিলের দলে গিন্নি
কে জিতবে কে হারবে
কার ভাগ্যে সিন্নি।
যে যেটা লাইক করি
হৈ হল্লা নয়
খেলা হবে খেলার মত
করবে মন জয়।
ভূতের বাড়ি
— মাজেদুল হক
পুকুর পাড়ে ঝোপের ধারে
ঐ যে তেঁতুল গাছে,
রাত নিশিতে পাই দেখিতে
ভূত-পেতিনী নাচে।
মনের ভয়ে বউ-ঝি লয়ে
দেয় না কেউ এ পথ পাড়ি,
বলছে সবে এটাই তবে
হয়তো ভূতের বাড়ি।
জোয়ান নারী রঙিন শাড়ি
সেদিন গেল পরে,
ভূতের নজর করছে আছর
রয় না এখন ঘরে।
ওঝায় গিয়ে ঝাড়-ফুঁক দিয়ে
বলছে এটা দৃষ্টি,
ডাক্তার বলে টেনশন হলে
হয় মনোরোগ সৃষ্টি।
ঔষধ খেয়ে সুস্থ মেয়ে
নেইতো কোন রোগ,
ভূতের গল্প গুজব অল্প
মিথ্যে অভিযোগ।
লক্ষ ফুল একটি মন
— মোঃ রুহুল আমীন
একটি মন ছিল ফুলের মত
সকলকে ভালবাসিত কত,
ডালে প্রুস্ফুটি হলো যখন
দেখিতে যেন চাদের মতন।
পরের জন্যই যেন ফুল ফুটিল,
সমাজ সেবা কতই না করিল।
মালীর চোখে পড়বে বলে চকিতে
সংকোচিত হয় নাই প্রুস্ফুটিত
হায়! নিষ্ঠূর মালী কোথায় ছিল !
ডাল হতে ফুল ছিড়ে নিল।
কিন্তু, ফুলটির প্রতি মালীর কদর কত
ছিড়ল তাই ত্রিশ লক্ষ ফুলের মত।
আজ সেই সব ফুলের উদ্দেশ্যে
শত ফুল আসছে মিনারে।
(স্বাস্থ্য কর্মকর্তা- শহীদ মেহের আলীকে নিয়ে লেখা – ১৯৮৬)
নেত্রকোণা ও খালেকদাদ চৌধুরী
— নির্মলেন্দু গুণ
সে এক সময় ছিল মহানন্দাময়,
-তার কেন্দ্রে ছিলে তুমি;
সমর্পিত, পক্বাকশ, প্রবীণ লেখক
সাহিত্যের পাদপদ্মে আনত আভূমি।
স্নেহবৎসল, তাম্বুলরঞ্জিত মুখে
জর্দার সুরভিমাখা শ্বাস;
প্রযত্নে সিদ্দিক প্রেস, কোর্ট রোড,
তাকে ঘিরে আমাদের আনন্দ উৎসব,
পর্বত স্মৃতির গাত্রে লেখা আছে সব।
সেই মুগ্ধ স্মৃতির সন্ধানে
অপসৃত অতীতের টানে
যখন তাকাই ফিরে, মনে পড়ে
ক্ষীণস্রোতা মগ্রা নদীটিরে।
কতদিন এর তীরে বসে
রচনা করেছি কাব্য মনের হরষে;
অলিখিত সে-সব কাহিনী
রাতের তারার মতো
দিনাকাশে মিশে আছে জানি।
ছিল দেবযানী, বেনুমতী সে আমার।
আমি কচ, কর্তব্যে নিষ্ঠুর প্রেম
পরাক্সমুখ, পাষাণ-হৃদয় এক কবি।
উপেক্ষা করেছি যার গোপন প্রণয়,
গোপনে হৃদয় আজও আঁকে তার ছবি
নিশিদিন মনের হরষে।
মুহূর্ত স্মরণমাত্র তাই সে সতত
হৃদয়ে জাগ্রত হয়,
সচকিত বিদ্যুতের মতো দীর্ঘশ্বাসে।
বুঝি, যা ছিল সে আজও আছে তাই,
আমি তার কিচ্ছু ভুলি নাই।
মনে পড়ে, অপটুহাতের আঁকা,
স্মৃতির রুমালে বোনা
আমার প্রথম প্রেম, প্রথম গোলাপ,
মহুয়া সুন্দরী নেত্রকোণা।
তুমি ডাক দিলে
— হেলাল হাফিজ
একবার ডাক দিয়ে দেখো
আমি কতোটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থূল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার।
তুমি ডাক দিলে নষ্ট কষ্ট সব নিমিষেই ঝেড়ে মুছে
শব্দের অধিক দ্রুত গতিতে পৌঁছুবো
পরিণত প্রণয়ের উৎসমূল ছোঁব
পথে এতোটুকু দেরিও করবো না।
তুমি ডাক দিলে সীমাহীন খাঁ খাঁ নিয়ে মরুদ্যান হবো,
তুমি রাজি হলে যুগল আহ্লাদে এক মনোরম আশ্রম বানাবো।
একবার আমন্ত্রণ পেলে
সব কিছু ফেলে তোমার উদ্দেশে দেবো উজাড় উড়াল,
অভয়ারণ্য হবে কথা দিলে
লোকালয়ে থাকবো না আর
আমরণ পাখি হয়ে যাবো,
— খাবো মৌনতা তোমার।
