কবি হেলাল হাফিজের কালজয়ী প্রেম

টি. এম. সারোয়ার জাহান আরেফিন

আজ আশা নেই, ভালবাসা নেই, তবু চিরাচরিত নিয়মে বসন্তে কোকিল কুহু কুহু ডাকে। ভাটির

টানে নদীতে নৌকা চলে বিরামহীন, আর ঢেউয়ের তালে, তালে খোলা আকাশের নীচে মাঝি মনের সুখে গান গায়-

আমারে ধরিল প্রেমের বিষে/নতুন বয়সে,

কেমন করে ঘুমাই আমি/এই না আষাঢ় মাসে।

প্রেম, বিরহ, ভালবাসার অপরূপ লীলা ভূমি নেত্রকোণার ভাটি অঞ্চল। এই ভাটির মুলুকেই সৃষ্টি হয় মহুয়া, মলুয়া, দেওয়ান মদিনা, সোনাই মাধব এর মতো অনেক প্রেম কাহিনি, যা আজও অজপাড়া গাঁয়ের মানুষের মুখে, মুখে ধারন করে আছে। তারই এক জ্বলন্ত প্রেম বিরহের বেদনার বহিপ্রকাশ ঘটে প্রয়াত কবি হেলাল হাফিজের জীবনে। প্রেম, বিরহ, ভালবাসা, বেদনা ভরা প্রতিটি মানুষের অন্তর, কখনো বা সুপ্ত প্রেমের বহিপ্রকাশ ঘটে মর্মস্পর্শী ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের জ্বলন্ত অঙ্গার, প্রেম শুধু শারিরীক সম্পর্কের তাগিদে সৃষ্টি হয় না, প্রেম আসে স্বর্গের উপঢোকন হিসাবে। যে প্রেম চাওয়া নেই, পাওয়া নেই, শুধু মনের আকুতি প্রকাশ, শেষ মিলনের অপেক্ষা করে। কবির ভাষায়-

অনেক কষ্টের দামে জীবন গিয়েছে জেনে, মূলতই

ভালোবাসা মিলনে মলিন হয় বিরহে উজ্জ্বল।

কবি হেলাল হাফিজ তাদেরই একজন, কৈশোর, যৌবনের সন্ধিক্ষনে বেড়ে উঠা, হেলাল হাফিজ মনের অজান্তে ভালবেসে ফেলেন তার প্রতিবেশী কিশোরী হেলেনকে। ছেলেখেলার ছলে দুজনের মাঝে প্রেমের বন্ধন ক্রমে ক্রমে গভীর হতে থাকে, একজন অন্যজনকে মূহূর্তের জন্য আড়াল করতে পারে না। নাওয়া, খাওয়া, ভুলে সর্বক্ষণ একসাথে ঘুরতে, খেলতে যেন স্বর্গের সুখ অনুভব করে। এই ভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলা প্রেম, এক সময় প্রকাশ পায়, এবং দুই পরিবারের মধ্যে ঘটনাটি জানাজানি হয়। কিন্তু হেলাল হাফিজের বাবা কোনভাবেই তা মেনে নিতে চাননি, কারণ হলো হেলেনের বাবা ছিলেন দারোগা, আর হেলাল হাফিজের বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তাই আদর্শের দিক থেকে প্রস্তাবটা প্রত্যাখান করেন। বিষয়টা যখন অভিভাবক পর্যায়ে চলে আসে তখন হেলাল হাফিজ মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যান। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে হেলাল হাফিজ নিজেকে আলাদাভাবে প্রস্তুত করতে থাকেন। কারণ তার বাবার নৈতিকতার বিরুদ্ধে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়, এই চিন্তা করে মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে তোলেন। এই ভাবে বেশ কিছুদিন তাদের মাঝে কোন কথা বা দেখা হয়নি, একদিন এক সুযোগে হেলাল হাফিজ তার প্রিয়তমা হেলেনকে একান্ত নীরবে পেয়ে বিয়ের কথা বললে হেলেন লজ্জায়, অভিমানে, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার দিক বিবেচনা করে কোন অভিমত ব্যক্ত করেনি। হেলেন নীরব নিস্তব্ধ কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়ে। সে কি বলবে, কি করবে, তাই নিয়ে চিন্তার সাগরে সর্বক্ষণ হাবুডুবু খাচ্ছে। এইভাবে আরো কয়েক মাস কেটে গেল, কিন্তু হেলাল হাফিজের পরিবার থেকে কোন সম্মতি সূচক উত্তর আসেনি তাই হেলেনের বাবা হেলেনকে পাত্রস্থ করার জন্য পায়তারা চালিয়েছেন, কারণ বিষয়টা বাহিরে প্রকাশ পেলে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া কঠিন হবে। সে দিক চিন্তা করে খুব দ্রুত পাত্র দেখার জন্য ঘটক নিয়োগ করলেন। এরমধ্যে একজন পাত্র পাওয়া গেল, পাত্র ঢাকার বাসিন্দা, সনামধন্য একটি সিনেমা হলের মালিক। তখনকার সময়ে একটা সিনেমা হলের মালিক মানে বিশাল বড় লোক। অল্পদিনের মধ্যেই বিয়ের দিন তারিখ ধার্য্য করা হয়। এদিকে কার সাথে হেলেনের বিয়ে হবে কোন কথা বলেননি, বিয়ে হওয়ার পর হেলাল হাফিজ বেশ কয়েক দিন একদম নির্বাক ছিলেন। তিনি প্রেম, ভালবাসার পরিবর্তে জন্ম নেয় ঘৃণা। বুকের মাঝে জমে ব্যথার পাহাড়। সে যন্ত্রণা তিনি মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত মন থেকে মুছতে পারেননি। হেলেন ঢাকা স্বামীর সংসারে এসে নিজেকে নতুনভাবে গড়তে থাকে। এখন সে স্বামীর সংসার নিয়ে ব্যস্ত, খুব আনন্দের মাঝে দিন কাটছে। হেলাল হাফিজ বেশ কিছুদিন মনমরা হয়ে থাকেন, তারপর তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান, আর কোনদিন তিনি নেত্রকোণায় আসেননি। 

হেলাল হাফিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন, এবং নিয়মিত  ক্লাশ করা শুরু করেন। এদিকে বুকভরা ব্যথাবেদনা লাঘব করার জন্য পথ হিসাবে বেঁচে নেন কবিতা লেখা। তখন আধুনিক কবিতা খুব একটা প্রসার লাভ করেনি, হেলাল হাফিজ সরল, সহজ ও ব্যতিক্রমধর্মী কবিতা লেখায় অল্প দিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সারা পড়ে যায়। তার প্রথম সে কবিতা আলোড়ন তোলে-

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এ কবিতা যখন সারা দেশব্যাপী লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, হেলাল হাফিজ সে সময়ে যৌবনের কবি হিসাবে সু-পরিচিতি লাভ করেন। সবদিক থেকে যখন খ্যাতির রব উঠে তখন ১৯৮৬ সনে একুশের বইমেলায় তার কবিতার বই “যে জলে আগুন জ্বলে” প্রকাশিত হয়। আর সেই বইমেলার প্রধান আকর্ষণ হয় হেলাল হাফিজের বইটি। জানা যায় এসময় একুশের বইমেলায় সবচেয়ে বেশী বই বিক্রয় হয় “যে জলে আগুন জ্বলে” বইখানি। এই মেলায় ঘটনাক্রমে চলে আসে হেলেনের স্বামী, তিনি মেলা থেকে অন্য বইয়ের সাথে হেলাল হাফিজের “যে জলে আগুন জ্বলে” কবিতার বইটি কিনে বাসায় আনেন। হেলেনের কাছে সব কয়টি বই দিয়ে তিনি বাহিরে চলে যান। কথায় আছে-না যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত হয়। হেলেন সব কয়টি বইয়ের মধ্যে প্রথমেই চোখে পড়ে, হেলাল হাফিজের “যে জলে আগুন জ্বলে” কবিতার বইখানি। হেলেন বইটি হাতে নিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লেন, এবং সব বইজুড়ে বিধৃত আছে হেলেন-হেলালের প্রেমোপাখ্যান। আছে হেলালের কষ্টের ইতিবৃত্ত, আর হেলেনের জন্য হেলালের শব্দে শব্দে নিঃশব্দ হৃদয়ের হাহাকার। 

বইটি হাতে নিয়েই হেলেন ধীরে ধীরে বিছানায় পড়ে যায় এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে। হেলেনকে এইভাবে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে দেখে তার শাশুড়ি ছেলেকে টেলিফোন করেন বাসায় আসতে, আর কাজের বুয়া হেলেনের মাথায় পানি ঢালতে থাকে। হেলেনের শাশুড়ি ভাবছেন বউ হয়তো অন্তসত্তা হতে পারে, তাই তিনি অতি উৎসাহে হেলেনের দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠান। কিন্তু কয়েক দিন চিকিৎসা করার পর, চিকিৎসকগণ কোন রোগ নির্ণয় করতে পারেননি। এইভাবে প্রায় মাসদুয়েক চলে গেল কোন উন্নতি হয়নি। বরং যতই দিন যাইতেছে ততই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। তারপর তার স্বামী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নিয়ে যান কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। হেলেনের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে যায়। কিছুদিন পর স্বামীর নিকট থেকে তালাকপ্রাপ্ত হয়। আর সেই থেকে নেত্রকোণায় নিজ পিত্রালয়ে অবস্থান করে আসছে, এবং দিন দিন উচ্ছৃঙ্খল হতে থাকে। তাকে হাতে-পায়ে শিকল দিয়ে তালা দিয়ে রাখতে হয়। এদিকে হেলাল হাফিজ ঢাকা শাহবাগের একটি হোটেলের নির্জন কক্ষে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একাই জীবন কাটাতে থাকেন। প্রয়োজন ছাড়া কাহারো সাথে কোন কথা বলতে শুনা যায়নি, তিনি তার

কবিতায় প্রকাশ করেন-

আর কে দেবে আমি ছাড়া/আসল শোভন কষ্ট

কার পুড়েছে জন্ম থেকে কপাল এমন

আমার মতো কয়জনের আর/সব হয়েছে নষ্ট।

কবির মনের আকুতি তার কবিতার মধ্যে ব্যথা বেদনার কথা ব্যক্ত করেছেন, তিনি জন্ম থেকে কপালপোড়া অন্তরে কষ্টের ছেদ পড়েছে যেন তার জীবনের সব আজ নষ্ট হয়ে গেছে। কবির ভাষায়-

ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটা আমার মতো খুব ব্যথিত

ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে, পত্র দিও।

তিনি তার অন্তরের মর্মবাণী কবিতার দুটি চরণে খুব সুন্দর ও সাবলীলভাবে প্রকাশ করেছেন, তার ডাগর চোখ যেন তার প্রিয়তমার স্মৃতিকে কল্পনা করে ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে চেয়ে থাকে। কবি হেলাল হাফিজ কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে উপণিত হন। দেখতে দেখতে একসময় তার বিষাদময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। কবি হেলাল হাফিজ জীবনের দীর্ঘসময় একটি হোটেলের কক্ষে জীবনযাপন করে ১৮-১২-২০২৪ খ্রি. তারিখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এবং প্রেমকে করে গেছেন মহীয়ান।

লেখক: লোক গবেষক।

Scroll to Top