বিজয়ের স্বপ্নে দেখা ৭১

মৃনাল কান্তি চক্রবর্তী

ঘড়ির কাটা সকাল ৭টা ছুই ছুই।পূর্ব আকাশে শীতের কুয়াশা ভেদ করে  সূর্যের লাল আভা ধীরে ধীরে উদিত হচ্ছে।জানালা বন্ধ থাকলেও আধাপাকা টীনের ঘরের ভঙ্গুর জানালা ভেদ করে সকালের সূর্য কিরন অগোছালো বিছানায় শায়িত বিজয়ের  চোখে মুখে পড়ে কিছুটা যেন তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বিজয়ের মা মালতি দেবী বার বার ছেলেকে ডাকছিল। তবে ক্ষীন স্বরে, কারণ মধ্যরাতে ফেরা বিজয়ের আরেকটু ঘুম দরকার। কিন্তু আজতো ১৬ ডিসেম্বর ! বিজয়ের তো এতো বেলা অব্দি বিছানায় থাকার কথা নয়! ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্রæয়ারি কিংবা ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনার বা স্মৃতি সৌধের শীর্ষ চুড়ায় ফুল না দিলে তো বিজয়দের মন ভরে না। আজ তাহলে কি এমন হলো, বিজয় এখনো বিছানায় ঘুমের রাজ্যে মগ্ন। মালতি দেবী কাছে গিয়ে বিজয়কে আবার ফিসফিসিয়ে ডাকে । বিজয়, উঠ বাবা, কখন সকাল হয়ে গেছে! কখন যাবে স্মৃতিসৌধে?  আমাকেও  তো  মাঠে যেতে হবে, প্রতি বছরই যাই, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে  একটি রজনীগন্ধার ছড়া সহ কিছু উপহার গ্রহণ করি। ওপাশ ফিরে বিজয় বলে আমাকে ডেকোনা মা ঘুমাতে দাও। আমি আজ খুব বেশি ক্লান্ত, বেশি করে ঘুমাব। মালতি দেবী খুব বেশি চাপাচাপি করেন নাই।ছেলে যখন যেতে চাচ্ছেনা তখন ঘুমিয়ে নিক কিছুক্ষণ। তবে

রহস্যটা কি , কি এমন হলো যে বিজয় আজ স্মৃতিসৌধে যাবে না । ওপাশ ফিরে বালিশে মুখ গুজে বিজয় আবার ঘুমের রাজ্যে যেন হারিয়ে যায়।খুব আস্তে করে দরজাটা টেনে দিয়ে তার মা ঘর থেকে বের হয়ে যায়।  ঘুমের মধ্যে বিজয় যেন স্বপ্নে তার অতীত কে ফিরে পায়। ১৯৭১ এর রক্তিম মার্চ মাস। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার  সংগ্রাম! কেউ আমাদের আর দাবিয়ে রাখতে পারবেনা। বিজয়ের বয়স তখন  ৭ কিংবা ৮ হবে। সবকিছু তার

স্মৃতিতে অমলিন। তাদের বাড়িতে একটি কালো রঙের বড় সাইজের পুরাতন রেডিও ছিল । তার বাবা প্রতিদিন খবর শোনার সময় হলে রেডিওটা ছাড়তেন। পাশের বাড়ির নিতাই কাকা, বিমল দাদা কিংবা পশ্চিম পাড়ার সিরাজ চাচাও আসতো খরব শোনার জন্যে। রেডিওটা ছাড়লেই শোনা যেত  স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জাগরনী গান। খবরের বেশীর ভাগই থাকতো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনের সারমর্ম। কি করা উচিত!  বিভিন্ন এলাকায় মুক্তি বাহিনী গঠনের খবর। বাবা, নিতাই কাকা, বিমল দা এবং সিরাজ চাচারা প্রায়ই নিচু স্বরে আলাপ করতো। বিজয় কাছে গেলেই তাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হতো। তবে কিছু একটা হচ্ছে সেটা বিজয় ভালোই বুঝতে পারতো। ইদানিং  পশ্চিম পাড়ার তাহের মিয়ার এ পাড়ায় আগমনটা যেন একটু বেশী বেড়ে গেছে। প্রায়শই দেখা যেত দু/চারজন বখাটে ধরনের ছেলে নিয়ে বাড়ির পুকুর পাড় কিংবা বৈঠক ঘরের সামনে তার আনাগোনা বেশী । বিজয় দেখতো তাহের মিয়া আসলেই তার বাবা সহ সকলেই কিছুটা নিরব হয়ে যেত , তার সামনে তাদের আলোচনা বেশীদূর এগুতো না।  

২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তান ঘাতক বাহিনীর অতর্কিত  হামলায় ইতিহাসের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর সারা বাংলাদেশ যেন কেপেঁ উঠে। রেডিও এর খবরে শুধুই লাশের খবর আসছিল। তবে মাঝে মাঝে মুক্তি বাহিনীর প্রতিরোধের খবরও পাওয়া যাচ্ছিল। মার্চের  ২৮ কিংবা ২৯  তারিখ হবে। বিজয়দের পুকুর থেকে হঠাৎ তাহের মিয়ার সাঙ্গপাঙ্গদের মাছ ধরতে দেখা গেল। বিজয়ের বাবা না জানিয়ে মাছ ধরার কারন জানতে চাইলে  পান খেয়ে লাল করা মুখে মুচকি হাসি দিয়ে  তাহের মিয়া বলে “ দাদা, দেশের অবস্থা বালানা, কহন কিতা অয় কওয়া যায়? পুসকুনিত অততা মাছ রাইখ্যা লাভ কি! আপনেও খাইলেন, আমরাও খাইলাম।” বাবার অসহায় রুগ্নমূর্তি দেখে পাশে দাড়ানো বিজয়ের  ভয় হচ্ছিল। কি হতে যাচ্ছে দেশে। পরের দিন  পুকুর পাড়ের  নারকেল গাছে উঠে ডাবগুলো পেড়ে নিতে দেখা গেল। কিন্তু সবাই যেন অসহায়। সন্ধায় বিমল কাকা, নিতাই কাকা ও সিরাজ চাচা  আসলেন। সবার মুখেই দুশ্চিন্তার ছায়া দেখা যাচ্ছে।

শুকনো মুড়ি আর লাল চা হাতে মা এসে সিরাজ চাচাকে বলল “ সিরাজ ভাই এই দেশে মনে হয় আর থাকা যাইতো না! সিরাজ চাচা মাকে অভয় দিয়ে বলেন বেশী চিন্তা করার দরকার নেই। বঙ্গবন্ধুর ঘোষনায় দেশের সব জায়গায় প্রতিরোধ তৈরী হয়েছে। মুক্তি বাহিনী এখন

অনেক সংগঠিত। নিতাই কাকা বলে, তাহের মিয়ার পাওয়ারটা যেন একটু বেশী বেড়ে গেছে। ডাব নেয়া, মাছ নেয়া , ফসল কেটে নেয়া , কি চাইছে সে। বিমল কাকা বলে এতো উত্তেজিত হলে চলবে না। আমাদের ঠান্ডা মাথায় এগুতে হবে আমি পাশের গ্রামের হযরত ভাইয়ের সাথে আলাপ করেছি। আজ রাতেই একটি কঠিন সিদ্বান্ত নিতে হবে। প্রতিটি আলোচনায় বিজয় পাশে থেকে সব শুনতো। তার ভাবনা কি এমন কঠিন সিদ্বান্ত নিতে যাচ্ছে! ৩১ শে মার্চ ১৯৭১ সালের সুর্যোদয়টা ছিল বিজয়দের জীবনে অন্ধকারে ঢাকা। সকালে উঠেই রান্না বান্না শেষে তার মাকে জিনিষ পত্র গুছাতে দেখল বিজয়। কাসার থাল, গøাস, বাটি, কলসী সহ বিভিন্ন মুল্যবান জিনি বস্তায় ভরে মাটির নিচে রাখার ব্যবস্থা করছিল পরিবারের সবাই। গরু ছাগল সহ অন্যান্য সম্পদ পাশ^বর্তী  কারো বাড়িতে রাখার পরিকল্পনা হলো। আর কিছু প্রয়োজনীয়  জিনিষ বস্তায় ভরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হলো। মায়ের মনটা আজ ভালো নেই। বার বার তুলসী তলায় প্রনাম করছিল আর কেদেঁ কেদেঁ ভাসিয়ে দিচ্ছিল। বাবাও যেন নির্বাক হয়ে গেছে। বেশী কিছু বলছে না। বার বার পুকুর পাড়, বাড়ির পিছনের আঙিনা অশ্রæসজল চোখে দেখছিল। হয়তো পিতৃপুরুষের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া তীব্র কষ্ট তাকে কুড়েঁ কুড়ে খাচ্ছিল। সারাদিন একটা গুমোট পরিবেশে কাটার পর সন্ধা হওয়ার সাথে সাথে মা সবাইকে খেতে ডাকলেন। দ্রæত খাওয়া দাওয়া শেষ করে উঠতেই দেখি সিরাজ চাচা হযরত চাচা হাজির। অপেক্ষায় ছিলাম বিমল দাদা ও নিতাই কাকার পরিবারের জন্য। কিছুক্ষণ পর দেখলাম মাথায় ও কাধেঁ ব্যাগ/বস্তা নিয়ে  ওরা সবাই এসে হাজির হলো। সবার মুখ মলিন। নিতাই কাকার মেয়ে আমার খেলার সাথী মুক্তাকে দেখলাম জড়সড় হয়ে বসে আছে। সিরাজ চাচা বলল আর দেরী করা যাবেনা। এক্ষুনি রওয়ানা দিতে হবে। বিজয় জিজ্ঞেস করল কোথায় যাব চাচা? সিরাজ চাচা উত্তর দেয়ার আগেই নিতাই কাকা বলল অজানার

উদ্দেশ্যে…! বিজয় যেন ধাক্কা খেল! অজানার উদ্দেশ্যে! সবাই মিলে রাত্তিরে কোথায় চলছি আমরা। নিজের মতো করে সাজানো বাড়ি, পুকুর, পোষা কুকুর কিংবা বিছানার সঙ্গী সাদা বিড়ালটাকে রেখে? হযরত চাচা বলল সাবধানে যেতে হবে, তাহের মিয়ার সাঙ্গপাঙ্গরা ঘুরাঘুরি

করছে ওরা টের পেলে সমস্যা হবে। অবশেষে ভবিষৎতের স্বপ্নটাকে অন্ধকারে ফেলে এক বুক ব্যাথা, হতাশা  আর তীব্র কষ্টকে সাথে নিয়ে অজানার প্রান্তরে ছুটে চলা! সিরাজ চাচা বললো একটু জোরে পা চালাতে হবে। রাত পোহাবার আগেই বারহাট্রার শেষ সীমানা চিরাম পার হয়ে সিলেট জেলার পাইকুরাটী  বা শুনই গিয়ে পৌছাতে হবে। ওখানে সারাদিন বিশ্রাম নিয়ে পরের রাতে নৌকায় চড়ে  মহিষখলা শরনার্থী শিবিরে পৌছাতে হবে। সবাই জোরে হাটঁেতে পারছেনা। কারো মাথায় বস্তা ভরা মালামাল কারো বা কোলে কিংবা ঘাড়ে শিশু বাচ্চা। সবচেয়ে বেশী কষ্ট হচ্ছে ৬ মাসের গর্ববতী রতœা বৌদির। হাটঁতে হাটঁতে বার বার হোচঁট খাচ্ছিল সে। বিমলদা মাঝে মাঝে তাকে হাত ধরে সরু রাস্তা পার করছিল।  বারহাট্টা পার হয়ে চন্দ্রপুর গুদারা ঘাটে এসে বিড়ম্বনায় পড়তে হল। ঘাটে কোন নৌকা নেই। কিভাবে নদী পাড় হবো!  নিতাই কাকা কিছুটা ভাটিতে গিয়ে গলা হাকিঁয়ে ডাকছিল। আচমকা নদীর ওপার থেকে ৩ ব্যাটারী লাইটের আলো অন্ধকার ভেদ করে সকলের চোখে মুখে লাগলো। ওপাশ থেকে চিৎকার করে কেউ একজন বলছে “ কেডা  আপনারা! অহন নৌকা লইয়্যা আওন যাইতো না, পশ্চিম পাড়ার মাতবর সাব না কইর‌্যা গেছে রাইতে যেন কাওরে পার না করি, যুদি হেইল্যা জানতো পারে তাইলে আমার খবর আছে”  নিতাই

কাকা নিজের পরিচয় দিয়ে বলার পর মাঝি বলদাস বলল “  বাবু আপনেরা! বুঝতাম পারছি। ঘাটে নৌকায় তুলা যাইতো না একটু দক্ষিনে ভাটিতে আয়ুন তা অইলে পাড় করতাম পারবাম, না অইলে সমস্যা আছে”। অবশেষে রাস্তা থেকে নেমে একটু দক্ষিণে গিয়ে নদী পাড় করে পুনরায় অজানার পথে হেটেঁ চলা। ওপারে গিয়ে আরো একটি দল পেলাম।নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধা সহ ওই দলেও ১৫/২০ জন হবে। বাবা কাকাদের সাথে তারা যেন কি বলছে।  অবশেষে  সারারাত হেটেঁ সাবেক সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী পাইকুরাটী গ্রামে আশ্রয় নেয়া। রতœা বৌদি যেন গিয়েই শুয়ে পড়েছে। মায়ের মুখটা এখনো মলিন। ভিটো ছাড়ার কষ্ট আর সারারাতের হাটাঁর ক্লান্তি যেন মাকে কাবু করে ফেলছে। সারাদিন আশ্রয়দাতার বাড়িতে থাকার পর সন্ধা হওয়ার সাথে সাথে পাইকুরাটী থেকে কিছু পথ হেটেঁ সুনই গিয়ে নৌকায় উঠলাম। আজকে আর বেশী হাঁটঁতে হয় নাই। ছাউনি সহ পাল তোলা নৌকায় উঠে যেন ক্লান্তি সব ধুয়ে গেল। নৌকা ছাড়ার পর মধ্যনগর, দক্ষিণ বংশীকুন্ডা টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ি দিয়ে অবশেষে মহিষখলা বাজারের নিকট পৌছা। তখন ভোর আসন্ন। দূরের মসজিদে আজানের ধ্বনি ভেসে উঠল। অন্ধকার ভেদ করে যতোই আলোর শিখা ফুটে উঠছে দূরের পাহাড়ের চুড়াটা যেন ততই কাছে মনে হচ্ছে। সকালের সুর্য উঠার সাথে

সাথেই আমরা মহিষখলা বাজার বামপাশে রেখে পাহাড়ী পানির ছরার পাশ দিয়ে পৌছে গেলাম মহিষখলা ক্যাম্পে।  নিতাই কাকা ও বাবার পরিচয় সুত্রে খুব সহজেই একটি খুপরী ঘর পেয়ে গেলাম আমরা। অন্যদের ও খুপরী ঘরের ব্যবস্থা হলো। বাবার সাথে কি যেন কানা কানি কথা বলে একে অপরকে গলা জড়িয়ে অশ্রæসজল চোখে সিরাজ চাচা ও হযরত চাচা বিদায় নিল। মা সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিয়ে আসা বস্তা খুলে খাওয়ার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি ও অন্যদের উপর লাকড়ী সংগ্রহের দায়িত্ব পড়লো। লাকড়ী আনতে গিয়ে কিছু পাহাড়ী কাঠ আলু ও সংগ্রহ করে আনলাম। 

বেশীদিন আর  মহিষখলা ক্যাম্পে থাকা হলোনা। এসময় দ্রæত গতি মহিষখলা ক্যাম্পে কলেরা ছড়িয়ে পড়ছিল।তাই বাবা কাকাদের সিদ্বান্ত হলো দূর্গাপুর সীমান্তের ওপাড় বাঘমারা যাওয়ার। ওখানে আমাদের এলাকার লোক বেশী আছে।  অবশেষে একদিন সকালে  বাঘমারার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। দুইদিন দুই রাত কখনো হেটেঁ কখনো খোলা মাঠে বিশ্্রাম নিয়ে  পাহাড়ী দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এলেঙ্গা বাজার, মহাদেও , বেতগড়া, রংরা বাজার ও ফান্ডা বাজার পাড়ি দিয়ে বাঘমারা ক্যাম্পে পৌছা।  বাঘমারা ক্যাম্পে মহিষখলা থেকে অনেকটা স্বাছন্দ লাগলো। অনেক পরিচিত মুখ দেখতে পেলাম। দু একদিন পর বাবা ও নিতাই কাকা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাতের আধাঁেরে ক্যাম্প থেকে চলে গেলেন। সেই যে বাবার শেষ বিদায় আজো বাবার মুখ দেখতে পারিনি।পরে মা’র মুখে শুনতে পেলাম বাবা সীমান্তে প্রশিক্ষণ শেষ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে।  দেশ স্বাধীন হলে বাড়িতে ফিরে এসে শুধু ধ্বংস্তুপ ছাড়া কিছুই দেখা যায়নি। ঘরের টিন থেকে শুরু করে বাশঁ, গাছ সবকিছু কেটে নিয়ে পুরো বাড়িটাই যেন স্মশান করে রেখেছে। শুধু যে আমাদের বাড়ি তা নয় পাড়ার প্রায় সকলেরই বাড়ি একই অবস্থা।অনেক সন্ধান করেও বাবার কোন খোঁজ পাচ্ছিলাম না।  একদিন সকালে হযরত চাচা  এসে বলল মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্থান বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পাক বাহিনীর গুলিতে বাবা ও নিতাই

কাকা দুজনেই শহীদ হয়েছেন। মা যেন চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। সকলে এসে আমাদের সান্তনা দিতে লাগলো। অনেকেই বলছে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন এটাই বড় প্রাপ্তি। বড় প্রাপ্তির কাছে অতি প্রিয় মানুষকে হারিয়ে আমরা

যেন নির্বাক। দরজায় কড়া নেড়ে বিজয়ের ঘরে  বিপ্লবের প্রবেশ। কড়া নাড়ার শব্দে বিজয়ের স্বপ্নটা হঠাৎ ভেঙ্গে গেল।ঘাড় ফিরিয়ে ঘুম ঘুম চোখে বিজয় জিজ্ঞেস করলো,  কিরে! তুই এখানে কেন?  বিপ্লব বলল দারুন একটা খবর আছে। ওঠ, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। কি খবর? খুলে না বললে বুঝব কিভাবে। বিপ্লব বললো, বলার জন্যই তো তোর কাছে আসা। রাজাকারের ছেলে উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনরে  বিজয় দিবসের মাঠে প্রবেশ করতে দেয়নাই। মুক্তিযুদ্ধের  সন্তানদের আন্দোলন বৃথা হয় নাই। আমরা যে গত কিছু দিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছি বিষয়টি  সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নজরে পড়েছে। হয়তো বা  কোন বড় ধরনের সিদ্বান্তেই  উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েও আমিন উদ্দিন আজ প্যারডে সালাম নিতে পারবে না। তার পরিবর্তে ইউএনও কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিজয় যেন লাফিয়ে উঠে!  তুই কি সত্যি বলছিস বিপ্লব ? যে রাজাকারের জন্য আমার বাবার জীবন দিতে হলো ,শুধু বাবা নয় ,আরো অনেককে জীবন দিতে হলো , মা বোনদের ত্যাগ স্বীকার করতে হলো, সেই আজিজ রাজাকারের ছেলে আমিনের কাছ থেকে তাহলে ক্ষমতা  কেড়ে নেয়া হয়েছে? আহা! কি আনন্দ! যেন নতুন করে আজ আরেকটা বিজয় দেখতে পাচ্ছি।   ঠিক বলেছিস বিজয়, এটা আমাদের নতুন প্রজন্মের বিজয়। যেখানেই  দেশ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের দেখা যাবে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা নতুন প্রজন্মের সন্তানের আমিন কে বিজয় দিবসের মাঠে অবাঞ্চিত ঘোষনা করেছিলাম বলেই আজ

এমনটা করা সম্ভব হলো।বিজয় বলল, আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে, কালকে সারাটা রাত ঘুমাতে পারিনি। মা বার বার ডাকার পরও আমি উঠতে পারিনি। কেন উঠব দেশদ্রোহী রাজাকারের হাত হতে মাকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা নিতে হবে। এটা আমি মেনে নিতে পারছিলামনা। তাইতো শুয়ে শুয়ে ৭১ এর শরনার্থী জীবনের কষ্টের কথা স্বপ্নে দেখছিলাম। আর শিহরে উঠছিলাম। 

বিজয় বিছানা থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে সাদা পায়জামা আর লাল সবুজের পাঞ্জাবী পড়ে বিপ্লবকে নিয়ে মাঠের দিকে পা বাড়াল। মাঠ থেকে মাইকে  ভেসে উঠলো “ আমার সোনার বাংলা , আমি তোমায় ভালবাসি”।

বীরাঙ্গনা মিরাসের মা

আনোয়ার হাসান

“ এটা এমন কোনো কঠিন বিষয় না। বুড়াপীরের মাজারে গেলেই মিরাসের মা-কে পাওয়া যায়। আপনি এক্ষুনি যান। আপনারা বিষয়ের গুরুত্ব বুঝেন না। একটা মহান সুযোগ। এমন সুযোগ সবসময় আসে না। কানে ঢুকলো কিছু ?”

বড়কর্তা রেগে গেলেন। বসের ধমক খেয়েও আলাউদ্দিন মিয়ার ডিমা তেতালা ভাবগতির খুব যে হের- ফের ঘটলো এমন বোধ হলো না। লোকটা এ রকমই। তবে বড় কর্তা হঠাৎ হঠাৎ চটে গেলেও তার উপর বড় নির্ভর করেন। বসের মর্জি মাফিক কাজ করার দক্ষতা তার আছে। একটু ধীর প্রকৃতির হলেও বুঝে শুনে কাজ করেন। বড় কর্তার চেয়ে বয়সে বড় হবেন। থুতনির দিকে বর্শার ফলার মতো নিম্নগামী হয়ে ঝুলে থাকা কাঁচা-পাকা একগুচ্ছ লম্বা দাড়ি এরই ইশারা বহন করে। মাথায় টুপি না থাকলেও কপালের ঠিক মাঝখানটায় নামাজি মুসল্লির যে রকম থাকে, সে রকম টিকার মত কালো দাগ ফুটে রয়েছে, যা তাকে সবসময় একটা ভক্তিপূর্ণ মাননীয় আদল দিয়ে রাখে।  আলাউদ্দিন মিয়া ভালোই বুঝেন, এ সব সেনসিটিভ ইস্যু। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সরকার ক্ষমতায়, তবে বসকে বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের উদ্বিগ্ন দেখে ভেতরে ভেতরে তিনি কিছুটা বিরক্ত- এই যা।  বিরক্ত হবেন নাইবা কেনো !  সেই উনিশশ একাত্তর সালে এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোন যুদ্ধে কোন যুবতী নারীর ইজ্জত গেলো, নাকি বন্ধুক নিয়া যুদ্ধ করলো এতোদিন পর এর কি মূল্য আছে ! তাও ভদ্র ঘরের কোনো মেয়ে-ছেলে হলে কথা ছিলো। বুঝলাম সংগঠনের ইজ্জত বাড়বে। তাতে আলা উদ্দিন মিয়ার কি এসে যায় ? তার বেতন কি এক টাকা বাড়বে ? যত্তসব আহম্মকি কান্ডকীর্তি !  না না না না ! এসব বিষয়ে বিরক্ত হলে তো চলবে না। অনুষ্ঠানে যখন এম পি মহোদয় স্বয়ং উপস্থিত থাকবেন। 

আরে স্বাধীনতার প্রায় আঠাশ বছর পর একজন বীরাঙ্গনার আবিস্কার কি সামান্য ঘটনা ! না না আলা উদ্দিন মিয়া, আপনি কখন বিরক্ত হন আর কখন খুশী হন না বললেও আমি আন্দাজ করতে পারি ষোল আনা-মনে মনে বড় কর্তার ভাবনা এরকমই। তিনি স্থির  দৃষ্টিতে কড়া ভাব অংকিত করে আলা উদ্দিন মিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আলা উদ্দিন মিয়া বসের চোখের ভাষা বুঝতে পারেন। সুতরাং আর দেরি করা চলে না।  বুড়াপীরের মাজার একটা পরিচ্ছন্ন জঙ্গলই বলা চলে। বৃক্ষরাজির ছায়ায়  জায়গাটা বড় নিরিবিলি। জঙ্গলের মাঝ খানে বিশাল একটা পুরাতন বৃক্ষের ছায়ায় বুড়াপীরের পাক্কা কবর লাল শালুতে আবৃত। বৃষ্টি এড়ানোর জন্য চার চারটি পিলারের উপর ভর করে চাঁদুয়ার মতো পাকা ছাদ আলা উদ্দিন মিয়ার প্রথমেই চোখে পড়ে এবং এই প্রাচীন মাজারের প্রতি সমীহ জাগানো ভয়ও কাজ করে তার মধ্যে। যদিও তিনি মাজারের কেরামতিতে বিশ্বাস রাখতে পারেন না।  মাজারের দক্ষিণ পাশে কয়েকটা আম গাছের ছায়ায় একটা জীর্ণশীর্ণ কুঁড়ে লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরটা পরখ করে দেখার জন্য একটু দাঁড়ান। জায়গাটা ধোঁয়াময় অন্ধকার মনে হলেও গাঁজার উৎকট গন্ধ এসে নাকে সুরসুরি দিয়ে মানুষের উপস্থিতি বোধগম্য করে তুলে।  লোকজনের কাছে শুনে মীরাসের মা সম্পর্কে তার যে ধারণা, তা মুটেও সুবিধার নয়। দীর্ঘদিন দেশান্তরি ছিলো, কয়েক মাস আগে বুড়াপীরের মাজারের এই পরিত্যক্ত ঘরটিতে আশ্রয় নিয়েছে। শোনা যায় আবু হান্নান নামের এক উদ্যোমী যুবক শাহ আরেফিনের মাজার থেকে ধরে এনে এখানে থিতু করেছে তাকে। কোনো গাঁজাখোর ছাড়া তার হুদ্রায় কেউ আসে না সাধারণত। চারপাশের জনমানুষের কাছে মিরাসের মা কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নয় বরং সমাজচ্যুত, পরিত্যক্ত আবর্জনার মতো ঘৃণিত এক নারী মাত্র।

 মানুষের শোনা কথায় আলা উদ্দিন মিয়া যা ভয় পেয়েছিলেন তাই ঘটলো। প্রথমে তো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। হাড্ডিসারকালাকিস্টি মিরাসের মা একান্ত মনে গাঁজার কলকী টেনেই চলেছে। পুরুষের ভঙ্গিতে দুই হাতের তালুর মধ্যে সরু কলকিটি প্রণামের মতো চেপে ধরে কুচকি কুচকি টানের পর যখন বড় করে টান দেয় তখন তার কালো গন্ডদ্বয়ের দুইপাশ ভেতরে ঢুকে গিয়ে দুটি গর্ত তৈরী করে এবং সঙ্গে সঙ্গে পট পট আওয়াজ তুলে কলকির মুখে দপ করে আগুন জ¦লে উঠে। এরপর হা করে ধোঁয়া ছাড়ে। আর ধোঁয়ায় আড়াল হয়ে পড়ে তার মুখমÐল।  ঘরজুড়ে ভদ্রলোকর বসার মতো কোনো ব্যবস্থাতো নাই-ই কোনো মানুষ  মাটিতে, খড় বিচালির মধ্যে এমন বিশ্রীভাবে বাস করতে পারে আলা উদ্দিন মিয়ার ভাবতেই ঘেন্না লাগছে। যা হউক, আলা উদ্দিন মিয়া যখন তাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সংবর্ধনার কথাটা জানালেন, মিরাসের মা শুনে একেবারে টাসকি মেরে গেলো। গাঁজার কলকিটি ঠোঁট থেকে আলগা করে নিয়ে আলা উদ্দিন মিয়ার দিকে তীক্ষ  দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এরপর বকাঝকা শুরু হয়। আলা উদ্দিন মিয়া কোন্ ছার ! বড় কর্তাসহ মেম্বারচেয়ারম্যান-এমপিসহ পুরু সমাজকেই একচোট বকে নিলো।  বুড়ির তেজ দেখে আলা উদ্দিন মিয় ভরকে যায়। ভাবে, ফিরে  গেলেই ভালো হয়। কিন্তু তার অহঙে আঘাত লাগে, সামান্য একটা ফকিরনীর কাছে মাথা হেট হবে আজ ! বসের আদেশ বলে কথা। তিনি নিস্তব্ধ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে বুড়িকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ছোট্ট কুঁড়ের চারদিকের ভাঙ্গাচূরা বেড়া ছেদ করে বাইরে থেকে দিনের টুকরো টুকরো তীর্যক আলোক রেখা ঢুকে নোংরা বুড়িকে টিটকারি দিচ্ছে, না কি তাকে, বুঝতে পারছেন না। এই বোধগম্যহীনতার মধ্যে আলা উদ্দিন মিয়ার মনের ভাবগতি কেমন নরম হয়ে আসে এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বুড়ির কাছে গিয়ে বসেন। উৎকট গন্ধটা অগ্রাহ্য করে তার ঘোলা চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি পুনরায় বলেন,‘তুমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমরা তোমাকে সম্মানিত করতে চাই।  বুড়িও তখন কি মনে করে আর রেগে যায় না বরং আলা উদ্দিন মিয়ার থুতনির নিচে কুঁচের ফলার মতো দাড়িগুচ্ছের মৃদু কম্পন কেমন সম্ভ্রমের সাথে উপভোগ করে। আর তার কোটরাগত দু’চোখ ভরে উঠে অশ্রæতে। 

সেইবিগলিত অশ্রæ শুকনো গাল বেয়ে টপ টপ করে পড়তে থাকে। বুড়ি তখন একাত্তরের যুদ্ধের দিনগুলোর কথা ভাবে। থানার জমাদার সাব, যার বাসায় সে কাজের ঝি হিসেবে কর্মরত ছিলো ; যিনি থানায় অকস্মাৎ পাকবাহিনীর আগমন বার্তা টের পেয়ে মিরাসের মাকে তার নবজাত শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধেই চলে গেলেন কি না জানা নেই, আর ফিরে এলেন না। আর সেই গুরু দায়িত্ব পালনে তার চরম অক্ষমতার কথা স্মরণ হলে এখনও দারুণ কষ্টে ভেতরটা ফেটে যায়। ভাবে, সেতো এদেরকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেনি সেদিন। ধরা পড়ে গেলো। আর তার চোখের সামনে কুলাঙ্গার বাহনীর একটা বজ্জাত পশু শিশু সন্তানটিকে মায়ের কোল থেকে  হেচকা টানে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। শিশুটির চিৎকারও শোনা গেলো না পর্যন্ত, এখানেই খতম ! অতপর পিশাচের দল যুবতী শিশুমাতাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে মেরেই ফেলে এবং নিজেও ধর্ষিতা হয়।  মিরাসের মা ভাবে, সে কেমন করে বুকের মধ্যে প্রতিশোধের তীব্র আগুন লুকিয়ে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের  সাথে মিশে গিয়ে সশস্ত্র সংগামের সহযোগী হয়েছিলো সেইসব মর্মান্তিক কথা ! অথচ দেশ যখন স্বাধীন হলো, হানাদার মুক্ত হলো, তখন দেখে দেশ হয়ে গেলো ভদ্রলোকদের বাপ-দাদার সম্পত্তির মতো। যেখানে আদতে গরীবের স্থান অতি সামান্য। সে আরো বিস্মিত হয় যখন সে তার একমাত্র পুত্র এবং স্বামীর কাছে নির্মমভাবে পরিত্যক্ত হয়। সেভাবে, কেমন করে ক্রমেই সমাজচ্যুত হয়ে পড়েছিলো সেদিন। কেমন করে দেশ-বিদেশ ঘুরে শেষে তার বাড়ির পাশে এই বুড়াপীরের মাজারে আশ্রয় পেলো। এসবই তার ভাবনার জগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। তার জবান একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়।   আলা উদ্দিন মিয়া বুড়ির অন্তর্গত জগতের কোনো খুঁজই পেলেন না বরং  আরেক বিপদে পড়ে গেলেন । সে তো কথাই বলছে না এখন। অনুষ্ঠানের কি হবে। তার বসকেই কি জবাব দিবে। আলা উদ্দিন মিয়া তখন ধৈর্য ধরে অনেক অনেক আশার কথা শোনাতে থাকেন।সে নির্বাক হয়ে শিকারীর খাঁচায় বন্দি বাঘিনীর মতো কেবল পিট  পিট করে তাকায়। আলা উদ্দিন মিয়া খেয়াল করে দেখে মিরাসের মার পরনের শাড়ীটি যাচ্ছে তাই নোংরা এবং ছেঁড়া ফাড়া। তখন একটা নতুন শাড়ীর ভাবনা আসে তার মাথায় এবং বলেন, “বুঝতে পেরেছি অনুষ্ঠানে যেতে হলে তোমার  তো একটা শাড়ী লাগবে। একটু অপেক্ষা করো আমি এখনই নিয়ে আসছি।” 

আলা উদ্দিন মিয়ার কাছে এই মুহূর্তে একটা নতুন শাড়ীই বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হলো এবং তা মিটে গেলেই সব সমস্যা মিটে যায়। সুতরাং তিনি শাড়ী আনতে রওয়ানা হয়ে গেলেন। যেতে যেতে শুনলেন বুড়ি বলছে , “অতদিন পরে তোমরা কি আমারে সঙ সাজাইতা চাও ?” কথাটা বুদ বুদের মতো উড়ে ,উড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। ঘন্টা খানেক পরে নতুন শাড়ী নিয়ে আলা উদ্দিন মিয়া যখন ফিরে এলেন, মিরাসের মা-কে আর খুঁজে পেলেন না। 

একাত্তরের স্মৃতিকথা

শিল্পী ভট্টাচার্য

৭১’এর রক্তাক্ত ইতিহাস বহন করছে বেশির ভাগ পরিবার কিন্তু সবার কথা আমরা জানিনা। আমাদের পরিবারের সেই রক্তক্ষরণের কথা আমার মায়ের কাছে শোনা, কারণ আমি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম। রাতের আধাঁরে চেনা চেনা মানুষগুলো মুখে কেউ গামছা, কেউ চাদরে ঢেকে বাড়ি বাড়ি থেকে লোক উঠিয়ে নিতে লাগলো। আমার বাবা-মা তাঁদের স্পষ্টতঃ চিনে ফেলেছিলেন,কার নাকি গামছাও খসে পড়ে মুখ থেকে। উঠিয়ে নিয়ে গেলো আমার বাবা নৃপেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্য নিরীহ সৎ ব্রাহ্মণ পন্ডিত মানুষ, যিনি বাংলা ব্যাকরণ আর সংস্কৃতে ডবল এম এ পাশ করেছিলেন গোল্ড মেডেল সহ। আর উঠিয়ে নিয়ে গেলো আমার কাকাকে,কাকা ফনীন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্য। বাবার নামে মিথ্যা বানোয়াট দেশদ্রোহী মামলা হলো। জেল হাজতে বাবাকে নির্যাতিত হতে হয়েছে নির্মমভাবে। বাবার বিরুদ্ধে মামলা হলো,তারিখের পর তারিখ পড়লো,কোন সুরাহা হয়না। পরে বাবাকে ১মাস ৫ দিন পর ছাড়িয়ে আনা গেল কিছু সুহৃদ মানুষের সহায়তায়।  সেক্ষেত্রে পরম শ্রদ্ধেয় আজিজ মোক্তার কাকা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। মা ছুটে যেতেন উনার কাছে বাবাকে ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমার কাকাকে আমরা আজও খুঁজে পাইনি- জীবিত বা মৃত। কাকাকে যে রাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মধ্যরাতে সেই রাতেই নাকি অখিল সেন, হেম সেন,আলোকদার বাবাসহ আরো অনেককেই উঠিয়ে নেয়া হয়। আমার কাকার বয়স কম। সরকারী চাকরী করতেন,নীরিহ শান্ত মানুষ। সে’রাতে সেই যে কাকাকে উঠিয়ে নিলো কোন খবর আজও আমরা জানিনা। নেত্রকোণা শহরের কেউ জানে বলে আমরা আজও শুনিনি। আমার কাকীমা ১২ বছর শাঁখা-সিঁদুর ধারণ করেছেন স্বামীর পথ চেয়ে। বাবা জেল থেকে ছাড়া পাবার পর আমাদের পরিবার আমাদের সাতপাই-এর বাসা ছেড়ে তখন আমার এক কাকার বাড়ি শিবনগরে আশ্রয় গ্রহণ করে। শিব নগরে আশুকাক্কু বাবাকে রীতিমতো জোড় করে সেখানে নিয়ে যান। বাবা শিবনগর থেকে রোজ এসে মোক্তারপাড়ার ব্রীজের নীচ থেকে নদীর ধার ধরে দিনের পর দিন কাকার লাশ খুঁজে ফিরেছে  অনেক লাশের ভিড়ে।

 বাবা যেহেতু জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেলো তাই রাজাকাররা বাবার খোঁজে, বাবাকে মেরে ফেলার জন্য শিবনগর পর্যন্ত ধাওয়া করে বেশ কয়েকবার। তারপর একদিন শিবনগরের সেই বাড়ি-ঘর, ধানের গোলা সব জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আমাদের পরিবার, আশুকাক্কুর পরিবার পাটক্ষেতে লুকিয়ে, বিলে ডুবে জীবন রক্ষা করেন কোন রকম। পরে বাগমারা হয়ে নিঃসম্বল হাতে তারা বহুকষ্টে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। আমার কাকা ময়মনসিংহ কালেক্টরী অফিসে চাকরি করতেন। কাকার সরকারী কার্ড ছিলো, সে নিয়মে কাকাকে তো এ্যারেস্ট করা বা উঠিয়ে নেবার নিয়ম নাই। কিন্তু এই নির্মম পরিণতির শিকার হতেই বুঝি কাকা সেদিন ময়মনসিংহ থেকে নেএকোণা এসেছিলেন, ঐদিনই সন্ধ্যায়।  মায়ের কাছে শুনেছি কি নির্মমভাবে গরুরগাড়ীর পিছনে বেঁধে আলোকদার বাবাকে সারা শহর ঘুরিয়েছে। পরদিন,কি নিদারুণ কষ্ট দিয়েছে উজ্জ্বল কাক্কুর জ্যেঠামশাইকে। আমার বাবার নামেই ছিলো উনার নাম। সেদিন রাতে নাকি অখিল সেন,হেম সেনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ১১টা ফায়ারিং এর বিকট আওয়াজে সারা শহর কেঁপে ওঠে ! তাহলে কি আমার কাকা-কেও সেদিনই গুলি করে মেরে ফেলা হয় ব্রীজের উপর নিয়ে গিয়ে! সেদিন ছিলো ১৪ই আগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। স্বজন হারানোর ব্যথা তারাই বোঝে যারা স্বজন হারায়। মা বলতেন, আজিজ মোক্তার (শফী আহমেদ এর বাবা) না থাকলে বাবাকে নাকি বাঁচানো যেতোনা সেদিন। মা ছুটে গেছেন ডাঃ হামিদ কাকার কাছে,অছিমুদ্দিন সাহেবের কাছে। আমার নিষ্ঠাবান বাবা জেল হাজতে দানা পর্যন্ত মুখে তুলতেননা। 

খেয়ে না খেয়ে,শারিরিক মানসিক নির্যাতন সহ্য করেও বেঁচে ছিলেন আমার বাবা। কোন সম্মাননা,কোন স্বীকৃতি, কোন সংবর্ধণা বেঁচে থেকে স্বাধীন দেশে আমার বাবা পাননি। শহীদ হয়ে আমার কাকাও পাননি। শুধু হায়দার জাহান চৌধুরীর লিখা ‘মুক্তিসংগ্রামে নেত্রকোণা” নামক বইয়ে ১১৮ নাম্বার পৃষ্ঠায় আমার এই স্মৃতিময় লিখাটি ছাপার অক্ষরে স্থান পেয়েছে। 

সেই ভোরের কান্না

আহমেদ সামির

মরিয়ম বেগমের ঘুম ভাঙল আজানের শব্দে নয়—বাইরের অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ। গ্রামের আকাশে তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটেনি, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের অস্বস্তি, যেন অদৃশ্য কোনো ছায়া চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ছেলে, আঠারো বছরের কিশোর রাশেদ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্থির হয়ে উঠেছিল। গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে গোপনে মিটিং করত, রাতের অন্ধকারে কোথায় যেন যেত। মরিয়ম বুঝতেন—দেশে ঝড় উঠেছে, আর সেই ঝড় তাঁর ছেলেকেও টেনে নিচ্ছে। কিন্তু তিনি কখনো বাধা দেননি। শুধু বলতেন, “বাবা, সাবধানে যাস। তোরে ছাড়া আমার আর কেউ নাই।”সেদিন ভোরে রাশেদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আজ একটু দূরে যেতে হবে। হয়তো ফিরতে দেরি হবে।” মরিয়ম তার মুখে হাত রেখে বললেন, “খোদা তোরে হেফাজত করুক, বাবা।”রাশেদ হেসে বলল, “মা, দেশ স্বাধীন হলে তোমারে নতুন শাড়ি কিনে দেবো।” এই ছিল তাঁর সঙ্গে রাশেদের শেষ কথা।

যুদ্ধের আগুনে হারিয়ে যাওয়া

সেদিন দুপুরের দিকে হঠাৎ গুলির শব্দে কেঁপে উঠল পুরো গ্রাম। পাকিস্তানি সেনারা হানা দিয়েছে—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই মানুষ ছুটোছুটি শুরু করল। মরিয়ম দৌড়ে বেরিয়ে এলেন, কিন্তু চারদিকে শুধু ধোঁয়া, আগুন আর মানুষের আর্তচিৎকার।গ্রামের এক বৃদ্ধ চিৎকার করে বললেন, “মরিয়ম! রাশেদদের দলটার দিকে সেনারা গেছে! ওরা নদীর ধারে ছিল!” মরিয়মের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। তিনি খালি পায়ে দৌড়াতে লাগলেন নদীর দিকে। পথজুড়ে পোড়া ঘর, ছড়িয়ে থাকা কাপড়, ভাঙা হাঁড়ি—যেন পুরো গ্রামটা এক মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নদীর ধারে পৌঁছে তিনি দেখলেন—মাটিতে রক্তের দাগ, ছড়িয়ে থাকা স্যান্ডেল, আর ছেলেদের ব্যবহৃত কিছু কাপড়। কিন্তু রাশেদ নেই। কেউ নেই। শুধু নদীর বাতাস আর ভাঙা নৌকার পাশে পড়ে থাকা একটি ছেঁড়া গামছা—যেটা রাশেদ প্রায়ই ব্যবহার করত। তিনি গামছাটা বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। “বাবা… তুই কোথায় গেলি? একবার ডাক দে, বাবা…” কেউ উত্তর দিল না। সন্ধ্যার পর খবর এল—সেনারা কয়েকজন তরুণকে ধরে নিয়ে গেছে। কেউ বলল, তাদের ট্রাকে তুলে নিয়ে গেছে শহরের দিকে। কেউ বলল, নদীর ওপারে গুলি করে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারল না রাশেদ বেঁচে আছে কি না।

একজন মায়ের অপেক্ষা”

দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়—মরিয়ম প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ির সামনে বসে থাকেন। তাঁর চোখ রাস্তার দিকে, যেন রাশেদ হঠাৎ ফিরে আসবে। গ্রামের মানুষ তাঁকে সান্ত্বনা দেয়, কেউ বলে রাশেদ শহীদ হয়েছে, কেউ বলে হয়তো বেঁচে আছে। কিন্তু মরিয়মের হৃদয় কোনো সিদ্ধান্ত মানতে চায় না। একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গ্রামে আসে। তাদের একজন মরিয়মকে চুপচাপ একটি ছোট কাপড়ের থলে দেয়। ভেতরে রাশেদের নাম লেখা একটি কাপড়ের টুকরো, আর একটি মরিচা ধরা বুলেট। যোদ্ধা বলল, “খালা, রাশেদ খুব সাহসী ছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছে। আমরা তাকে পাইনি… কিন্তু তার লড়াই আমরা দেখেছি।” মরিয়ম থলেটা বুকে চেপে ধরে শুধু বললেন, “আমার ছেলে বীর ছিল… এটাই আমার সান্ত্বনা।”দেশ স্বাধীন হলো ১৬ ডিসেম্বর। গ্রামে উৎসব, আনন্দ, বিজয়ের গান। কিন্তু মরিয়মের ঘর নিস্তব্ধ। তিনি দরজার সামনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা, দেশ স্বাধীন হইছে। তুই তো বলছিলি, স্বাধীন হলে আমারে নতুন শাড়ি দিবি… আমি এখনো অপেক্ষা করি, রাশেদ।”বাতাসে শাড়ির আঁচল দুলে উঠল। যেন রাশেদ কোথাও থেকে ফিসফিস করে বলছে— “মা, আমি আছি… দেশের মাটির ভেতরেই আছি।”মরিয়ম চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মুখে অশ্রু, কিন্তু সেই অশ্রুর ভেতর গর্বও আছে—একজন শহীদ মায়ের গর্ব।

 

Scroll to Top