নজরুলের ‘হয়ে উঠা’-গোড়ার কথা

স্বপন পাল

রবীন্দ্রনাথ বলেন,

‘আমার সমস্ত শরীর মন হৃদয় নিয়ে আমি কেবলই হয়ে উঠতে থাকব। ছাড়তে-ছাড়তে বাড়তে-বাড়তে মরতে-মরতে বাঁচতে-বাঁচতে আমি কেবলই হব। পাওয়াটা কেবল এক অংশে পাওয়া, হওয়াটা যে একেবারে সমগ্রভাবে হওয়া-সে তো লাভ নয়, সে বিকাশ।’

নজরুলের জীবনের দিকে তাকালে এই ‘হয়ে উঠা’র,- বিকশিত হওয়ার বিষয়টি আমরা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি।

অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র্র পাল ১৯৩৫ সালে ‘মানিকগঞ্জ সাহিত্য-সভায়’ নজরুল সম্পর্কে বলেছিলেন-

‘এঁর কবিতার সাথে পরিচিত হয়ে দেখলাম, এ-তো কম নয়। এ খাঁটি মাটি থেকে উঠে এসেছে। …তাঁর কবিতায় গ্রামের ছন্দ, মাটির গন্ধ পাই। দেশে যে নূতন ভাব জন্মেছে তাঁর সুর তা-ই। তাতে পালিশ বেশি নেই, আছে লাঙ্গলের গান, কৃষকের গান। মানুষের একাত্মসাধন। এ অতি অল্প লোকেই করেছে।’ (কল্লোল, জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৬)

যে গ্রামে নজরুলের জন্ম, সেই চুরুলিয়া গ্রামে হিন্দু মুসলিম জনবিন্যাস প্রায় সমান সমান। বাউড়ি, বাগদী, তাঁতি, নাপিত, বামুন, সদগোপ, কাজী, শেখ, সৈয়দ সব মিলেমিশে একাকার। তাইতো এখানকার কবি লিখতে পারেন- ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’।

নজরুলের প্রপিতামহ কাজী গোলাম হোসেন, পিতামহ কাজী আমিনুল্লাহ, পিতা ফকির আহমেদ এবং মাতা জাহেদা খাতুন। নজরুলের পিতা ছিলেন সৎচরিত্রের মুক্তমনা ধার্মিক মানুষ। নজরুলের পরিবার সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত না করলে বোঝা যাবেনা যে চুরুলিয়ার মতন অজ পাড়া গাঁ থেকে কিভাবে ‘ধূমকেতু’র মতন কবির আবির্ভাব ঘটতে পারে!

সর্ব অর্থে পিতা ফকির আহমেদ ছিলেন মানবতাবাদের পূজারী, সুফী ফকির। সাংসারিক জীবনে একেবারে অনভিজ্ঞ, আত্মভোলা। তাই বন্ধু, আত্মীয় স্বজনের কাছে বারে বারে প্রতারিত হয়েছেন তিনি। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রাও ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছে অনেক সময়। এদিকে প্রথম সন্তান সাহেবজানের পরে পর পর চারটি সন্তানের অকালমৃত্যু ঘটে। তাই ষষ্ঠ সন্তানের নাম রাখা হয় দুখু মিঞা। এমন নাম রাখা হয়েছিল এই ভেবে যে, ‘অপদেবতার’ নজর যেন না পড়ে। এই দুখুই হচ্ছেন পরবর্তীকালে নজরুল, এটি নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো ‘দুখু মিঞা’ কি করে ‘নজরুল’ হয়ে উঠলেন, সেই হয়ে উঠার প্রকরণটিতে নজর দেওয়া এবং অনুধাবন করা।

নজরুলের চাচা কাজী বজলে করিম ছিলেন কবি, লোকগানের গীতিকার, সুরকার এবং লেটো গানের দলের ওস্তাদ; যাঁর হাত ধরেই নজরুলের লেটো গানের দলে যোগদান। বাংলা, উর্দু, আরবী, ফার্সি ভাষায় বজলে করিমের পারদর্শিতা ছিল। তিনি নিজেই গজল রচনা করে তাতে সুরারোপিত করে গাইতেন। প্রসঙ্গত বলা যে, লেটো গান একসময় বীরভূম এবং বর্ধমান জেলা, বিশেষ করে বর্তমান পশ্চিম বর্ধমানে বহুল প্রচলিত ছিল। এটি মুখ্যত ছিল যাত্রা আশ্রিত লোকসংগীত পালা।

সুন্দরবনের বনবিবি পালার মতন লেটো গানও হত একেবারে ধর্ম নিরপেক্ষ। পালা শুরু হতো হিন্দু দেব দেবী বিশেষ করে সরস্বতী বন্দনা এবং আল্লাতালার বন্দনা গান দিয়ে। এছাড়াও বন্দনা করা হত আসরের, গুরুর, পিতার, গ্রামদেবতার এবং সমবেত শ্রোতৃ মন্ডলীর।

বজলে করিম রচিত লেটো গানের একটি আসর বন্দনা-

‘এস আসরেতে বারিতাল্লা/ তুমি না তরাইলে, নাহি কোন হিল্লা।/ তোমার পদে স্মরণ করি, ওগো বারি,/ তুমি না তরাইলে, কেমনে তরি।’

নজরুলের আসর বন্দনা-

‘এসো বীণাপানি, বিদ্যা তরঙ্গিনী, ভক্তিভরে আমি করি মা প্রণাম।/ ডাকি মা কাতরে, এস এস এ আসরে, মোদের উপরে হও কৃপাবান।’

লেটো গানের দলের মুখ্য নায়ক হতেন সংদার, তাঁকে সহযোগ করতেন দোহারেরা। যাত্রা পালার ঢঙে,  আসরের দুই দিকে বসতেন যন্ত্র সংগীত শিল্পীরা তাঁদের ঢোল, তবলা, বাঁশি, ক্লারিওনেট, করতাল, হারমোনিয়াম ইত্যাদি নিয়ে, যাঁদেরকে বাজনদার বলে ডাকা হত। এছাড়া অনেক আসরে যাত্রার মতন ঝাঁঝর, সারিন্দা, মাটির কলসী, ঘুঙুর ইত্যাদিও বাজতে দেখা যেতো। মহিলা চরিত্রে পুরুষেরাই অভিনয় করতেন, এঁদের বলা হত বাই বা সখী। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছোট ছেলেরাই মেয়ে সাজত আবার প্রয়োজনমত ছেলেও সাজত। এই ছোট ছেলেদের লেটোর দলে ডাকা হত ‘বেঙাচি’ বলে, অর্থাৎ ভবিষ্যতে বড় শিল্পী হবে।

কাজী নজরুল ইসলাম শৈশব ও কৈশোরকালে তাঁর চাচার অনুপ্রেরণায় পঁচিশটির মতন লেটো পালা রচনা করেন। তার কয়েকটির নাম এরকম- রাজপুত্রের সঙ, চাষার সঙ, আকবর বাদশা, শকুনি বধ, কবি কালিদাস, মেঘনাদবধ, সিন্ধু বধের সঙ,  বিদ্যাভুতুম, দাতা কর্ণ, নীলকুঠি,হাস্যরসাত্মক সঙ ইত্যাদি ।

কিশোর বয়সেই ‘চাষার সঙ’ এ নজরুল লিখেছিলেন,-

            ‘চাষ কর দেহ জমিতে

            হবে নানা ফসল এতে

নামাজে জমি উগালে

            রোজাতে জমি সামলে

            কলেমায় জমিতে মই দিলে

            চিন্তা কি হে ভবেতে

            সুখে থাকবে তুমি-

            কয় নজরুল ইসলামেতে।’

কিন্তু দেখার মতন ব্যাপার হলো, ওইটুকু বাচ্চার মনেও তখন ইংরেজ জাতির প্রতি বিতৃষ্ণা জেগেছিল। তাইতো তাঁর লেখায় পাই-

            ‘মোরা ভাই বাউল চারণ।

            মানি না শাসন বারণ-

            জীবন মরণ মোদের অনুচর রে।’

আরো তীব্রভাবে, কষাঘাত করে, ইংরেজি আদব কায়দাকে বিদ্রুপ করে এমন একটি লেটো গান লিখলেন যে বিশ্বাস করা শক্ত এটি একটি অতি কম বয়সী কিশোরের রচনা।

‘রব না কৈলাশপুরে/ আই এম ক্যালকাটা গোয়িং।/ যত সব ইংলিশ ফেসেন/ আহা মরি, কি লাইটনিং।/ ইংলিশ ফেসেন সবি তার/ মরি কি সুন্দর বাহার,/ দেখলে বন্ধু দেয় চেয়ার,/ কামন ডিয়ার গুড মর্নিং।/বন্ধু আসিলে পরে,/ হাসিয়া হেন্ডশেক করে,/ বসায় তারে রেসপেক্ট করে,/ হোল্ডিং আউট এ মিটিং।।/ তারপর বন্ধু মিলে/ ড্রিঙ্কিং হয় কৌতূহলে/ খেয়েছে সব জাতি কূলে/ নজরুল ইসলাম ইজ টেলিং।’

আবার মরমী হৃদয়স্পর্শী ভাষায় অন্ধক মুনির পুত্রের শরাঘাতে মৃত্যু যন্ত্রণা বর্ণনা করেছেন-

            ‘কে মারিল জ্বলন্তবাণ, হারাইব এবার পরান,

অন্ধ পিতামাতা আছে, কে দেখিবে তায় গো- কে দেখিবে তায়।।

            ওরে নিষ্ঠুর মারিলি বাণ, বিনা দোষে বধিলি প্রাণ

            কিশোর মেরে পাবিনা ত্রাণ, দয়া কি তোর নাই।।

            দুখু কাজী ভেবে বলে, লেটোর এই আসর তলে,

            জলভরণের শব্দ তুলে, মরলে তুমি ভাই।।”

            শকুনি বধ পালার একটু নমুনা পেশ করছি-

            “শিবা হয়ে পরাজিতে পশুরাজে সাধ?

            জ্ঞান নাই কি তোর কান্ডকান্ড হয়েছিস উন্মাদ।

            অজা হয়ে কোন সাহসেতে বাধ সাধিস মহাবলী বাঘের সাথে,

            ভেক হয়ে ফণীর সাথে বাধ, তুই বাদ!”

হাস্যরসাত্মক সঙে সতীশ নামক চরিত্রের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে অসাধারণ কবিতা-

            ‘থাকব নাক বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে

            কেমন করে ঘুরছে মানুষ, যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে’।বুঝতে অসুবিধা হয়না, ছোট্ট নজরুলের এই কবিতাটা ছিল বীজ, যা পরে অঙ্কুরিত হয়ে পরিণত হয় ‘সংকল্প’ কবিতায়। সেই রকমই  আরো একটি এরকম অসাধারণ গান-

            ‘ভাঙ ঐ কারার দুয়ার জোরসে টান

            অত্যাচারীর মাথার উপর খড়্গ হান,

            পালারে অত্যাচারী জেগেছে আজ সকল প্রজা।।

            লাঠি মার লাঠি মার কারার দ্বারে,

            ঝনঝনিয়ে ভাঙুক কারা ভয় কারে রে।’

বোঝাই যায় এটাই ছিল দুখু মিয়ার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা ‘ভাঙার গান’ এর রূপকল্প।

এর থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায়, নজরুলের আনুষ্ঠানিক সৃষ্টিকাল যদিও ১৯১৮ থেকে ধরা হয়, যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯, কিন্তু এর অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে তাঁর ‘হয়ে উঠা’র প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়াকে যদি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ না করি, তাহলে নজরুল সম্পর্কে একটা ‘মিস থিংক’ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা পুরোটাই থাকে, যেটা নজরুল ভাবনায় ‘মিস লিড’ হিসেবে কাজ করতে পারে বা এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে করছে।

            নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করলে এটা সহজেই চোখে পড়বে যে নজরুল সমস্ত অর্থেই ছিলেন লোকায়ত। তাঁর জীবন একদমই স্বপ্নময় নয়। তাঁর আনুষ্ঠানিক সৃষ্টিশীল জীবন মাত্র ২৩ বছরের-১৯১৮ থেকে ১৯৪১। এর সাথে এটা মনে রাখা জরুরি, এই ২৩ বছরের সবটা সময় অবিভক্ত বাংলা তথা ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের শিকার। শৈশব থেকেই নজরুলকে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল দারিদ্র অবরুদ্ধ প্রতিকূল এক জীবনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষাকারী কঠিন যুদ্ধে। বিশেষত ১৯০৮ সালে মাত্র নয় বছর বয়সে পিতাকে হারানোর পর থেকে এই সংগ্রাম খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। আক্ষরিক অর্থেই দু’বেলা-দু’মুঠো খাবার যোগানোই দুরূহ হয়ে পড়ে। পারিবারিক এই সংকটকালে নয় বছর বয়সে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে যেমন তাঁকে বঞ্চিত হতে হয়েছে, তেমনি সৃজনশীলতা বিকাশের প্রত্যাশিত অনুকুল আঙিনাও পাননি নজরুল। মক্তবের শিক্ষা শেষ করে যখন তাঁর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় যাবার কথা সেই সময়ই তাঁকে মক্তবেই শিক্ষকতার কাজ করতে হয়েছে অর্থ উপার্জনের জন্যে সেই বয়সেই যুক্ত হতে হয়েছে নানা কাজে। বিস্তারিত না বললেও এটুকু বলা যায়, সেই বয়স থেকেই একটি বিষয় নজরুল চরিত্রে ভালোভাবেই জড়িয়ে গিয়েছিল, তা হল পারিবারিক আর্থিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন এর মত আত্মদানের শিক্ষা, যার চর্চা তাঁকে পরবর্তী জীবনে সবসময়ই করতে হয়েছে। 

ছেলেবেলা থেকেই পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদন জন্য মাজারের খাদেম, মসজিদের ইমামতির পাশাপাশি করেছেন লেটো দলের গান, বৈষ্ণব ধর্মের গান-কীর্তন, যাত্রা, মিলাদ মাহফিল, ভক্তিমূলক লোকায়ত গানের আসর বিশেষত অষ্টাদশ শতাব্দীর রামপ্রসাদী, আগমনী ও বিজয়ার গান, নিধুবাবুর টপ্পা। ব্যাপক অর্থে বাংলা সাহিত্যের বাউল সুফি বৈষ্ণব মরমিয়া সাধকদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ প্রেরণা সম্ভার, এক কথায় যে বিচিত্র গানগুলোকে ‘বাংলা গান’ বলে চিহ্নিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ, সেই বিচিত্র সম্ভারের সাথে ঘনিষ্ট পরিচয় ছোটবেলাতেই নজরুলের হয়ে গিয়েছিল।

ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি জানতে মক্তবের শিক্ষকতা, মাজারের খাদেমের কাজ, মসজিদের ইমামতি ইত্যাদি নজরুলকে ব্যাপক সহায়তা করে। ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যসূত্রে অল্প বয়সেই নজরুল জেনেছিলেন ইসলামি রীতিনীতি ও আদর্শ। ইসলামি রীতিনীতি আত্মস্থ করলেও নজরুল তাঁর জানাকে কেবল ইসলাম ধর্মের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখেননি।

প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় সুশীলকুমার গুপ্তের এই মন্তব্য:

‘যেখানে কীর্তন হত, কথকতা হত, যাত্রাগান হত, মৌলবীর কোরান পাঠ ও ব্যাখ্যা হত, দুরন্তবালক গভীর আগ্রহ ও মনোযোগের সঙ্গে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন। বাউল, সুফী, দরবেশ, সাধু -সন্ন্যাসীর সঙ্গে তিনি অন্তরঙ্গভাবে মিশতেন।’

আগেই উল্লেখ করেছি জীবিকা নির্বাহের জন্য নজরুলকে লেটোর দলে গান রচয়িতার কাজ নিতে হয়েছিল। নিজ ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে সেই সময় তাঁকে জানতে হয়েছিল রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবত পুরাণের নানা গল্প ও অনুষঙ্গ। এর ফলে তাঁর মানসলোকের চেতনা হয়েছে আরো প্রখর। ভারতীয় পুরাণ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে তাঁর চিত্তলোক নতুন মাত্রায় উদ্ভাসিত হয়েছিল এবং আপন ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি নির্মাণ করতে সমর্থ হলেন তৃতীয় এক মাত্রা। উত্তরকালে নজরুলের কবিতা এবং গানে হিন্দু মিথ-পুরাণের যে ব্যবহার আমরা দেখি, তার বীজ উপ্ত হয়েছিল লেটোর দলে গান বাঁধতে গিয়ে তাঁর আলোকোদ্ভাসিত মানস-মৃত্তিকায়।

জীবনের একটা সময়ে তাঁকে কিছুদিনের জন্য থাকতে হয়েছিল ময়মনসিংহের দরিরামপুর ও কাজীর সিমলায়। সময়টা অল্প হলেও ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকায়ত জীবনে বহমান অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ ও সম্প্রীতি নজরুলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। এ-অঞ্চলে প্রচলিত গীতিকা, জারি, যাত্রা, কবিগান, পালাগান ও পুঁথিপাঠের আসরে তিনি ছিলেন কৌতূহলী শ্রোতা। রাত জেগে-জেগে তিনি নানা ধরনের পরিবেশনা দেখেছেন এবং এভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে তিনি পেয়েছেন অফুরান যোগান। একজন নজরুল গবেষক বলেছেন, ‘…এ অঞ্চলে [ময়মনসিংহ] বেশ যাত্রা, কবি ও খেমটা গান হত – আনতেন অবস্থাপন্ন স্থানীয় হিন্দু জমিদারগণই। তখন পৌষসংক্রান্তি, দোল, দুর্গাপূজা ও অন্যান্য উৎসবে পূর্বধলা ও বৈলর জমিদার বাড়িতেও খেমটা, কবি, যাত্রা ইত্যাদি গানও হত -চলতো ৭/৮ দিন। …এছাড়া স্থানীয় বা বাইরের জারি, ঘাটু এবং পুঁথির গান তো ছিলই। জায়গীর বাড়িতে বালিশ কাঁথার নিচে শুইয়ে রেখে ছনের সেই ঘরের খোলা জানালা দিয়ে বের হয়ে যেত-আসতো শেষ রাতে ঘুম ঢুলুঢুলু। …নজরুল পরদিন শুকনির বিলের ধারে এসব গান গেয়ে শোনাতো-অবিকল, বিশেষ করে যাত্রার বিবেকের গান।’ 

লোকায়ত নজরুল সম্পর্কে বলতে গিয়ে ড. হুমায়ুন আজাদ বলেন, ‘নজরুল বাংলা ভাষায় পুঁথিসাহিত্যের প্রাণের আগুনটুকু গ্রহণ করেছেন, তার জীর্ণ কঙ্কাল বহন করেননি।’

জীবিকার তাগিদে নজরুল যোগ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে এবং সে-সূত্রে তাঁর স্বল্পকালীন করাচি-বাস। করাচি-পর্ব নজরুলের মানসলোকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে পালন করে দূরসঞ্চারী ভূমিকা। এ-সময় তিনি বিশেষভাবে পরিচিত হয়েছিলেন ওমর খৈয়াম, রুমি, হাফিজ প্রমুখ প্রখ্যাত কবির কবিতা ও জীবনাদর্শের সঙ্গে। পারস্যের এই কবিদের রচনায় প্রচলিত ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে মানবধর্ম বড় হয়ে উঠেছে। পরমত বা অন্য ধর্মকে সম্মান জানানো, সংস্কারমুক্তি ও প্রচলিত প্রথার বাইরে গিয়ে জীবনযাপন ও মানবমুক্তির বাণী নজরুল পেয়েছিলেন এইসব কবির কাছ থেকে। করাচি-ফেরত নজরুল কলকাতা বসবাসের সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের সাহচর্য পেয়েছিলেন-এতে তাঁর জীবনাচরণ ও ভাবনা আরও শানিত হয়। সাম্যবাদী নেতৃত্বের স্পর্শে মানবসম্প্রীতি ও সাম্যচিন্তায় নজরুল পেলেন এক বাস্তবানুগ সাহিত্যিক ভিত্তি। কমিউনিস্ট নেতা মুজফ্ফর আহমদ, বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশসহ সমাজবাদী ও মানবতন্ত্রী নেতৃত্ব প্রচলিত ধর্ম ও সংস্কারের চেয়ে যে মানুষ অনেক বড়-এই বোধে উজ্জীবিত করেছেন তাঁকে। কবিচিত্তের সহজাত মানবতাবোধ ও আত্মজৈবনিক এইসব অভিজ্ঞতা নজরুলের মানসলোকে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে নানামাত্রিক প্রণোদনা সঞ্চার করেছে। ফলে বাঙালি সমাজে তিনি আবির্ভূত হতে পেরেছেন একজন প্রকৃত মানবতাবাদী লেখক হিসেবে, একজন প্রকৃত দ্রোহী কবি হিসেবে এবং এর মধ্যে দিয়ে বিনয় সরকারের ভাষায় তিনি হয়ে উঠেছেন, ‘বিপ্লবের কবি নজরুল, মানুষের কবি নজরুল’।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ‘প্রফেশনের’ সন্ধানে ঘুরে বেরিয়েছেন, কখনো কখনো ‘প্রফেশন’ আর ‘প্যাশন’ মিলে গেছে বলেই প্রকৃত বাঙালি কবি নজরুলকে আমরা পেয়েছি। অভিজ্ঞতা, চিন্তায়, অনুভবে ও সক্রিয়তায় কোন ভেদরেখা নেই বলেই নজরুল থেকে যা উৎসারিত হয়েছে, তার উচ্চারণ হয়েছে ঋজু ও দ্বিধাহীন, উষ্ণ ও আবেগতপ্ত, কখনো তা আবার ¯স্লোগানে পরিণত হয়েছে। প্রেমে ও রণে সতত মৃত্যুঞ্জয়ী গান শুনিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাই তো তিনি বলেছেন,

‘সুর আমার সুন্দরের জন্য, আর তরবারি সুন্দরের অবমাননা করে যে, সেই অসুরের জন্য’।

অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায় বলেছেন, নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত জীবন তাঁর সাহিত্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর মতে,

‘নজরুল উঠে এসেছিলেন সমাজের অতি পিছিয়ে থাকা শ্রেণি থেকে। শুধু দারিদ্র্যই নয়, শিক্ষার অভাবের মধ্যে দিয়ে তিনি বড় হয়েছিলেন- প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে থেকে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাঁর জীবন কেটেছিল’।

এর সাথে যোগ করে তিনি আরও পরিস্কার করে বলেছেন,

‘নজরুলের গান ও কবিতা একেবারে নিচ থেকে ওঠা মানুষের গান, তাদের কথা। যারা দলিত, যারা অত্যাচারিত, যাদের ভাষা ছিল না, নজরুলের কলমে তারা ভাষা খুঁজে পেল।’

 নজরুল সম্পর্কে একাধিক গ্রন্থের লেখক অধ্যাপক মুস্তফা নুরুল ইসলামের মতে, প্রতিকূলতায় ভরা ওই জীবনের মধ্যে দিয়েই তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল। তিনি বলেন,

‘তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ ছিলেন নজরুল। যে পথ দিয়ে তিনি গেছেন, যে প্রকৃতিতে তিনি লালিত হয়েছেন, যে পারিপার্শ্বিকতায় তিনি বেড়ে উঠেছেন, সেগুলো তাঁর অজান্তেই তাঁর ওপরে ছাপ ফেলে গেছে। তারই বহি:প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর গানে ও কবিতায়’।

 

নজরুলের ‘হয়ে উঠা’র এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিশদ গবেষণার প্রয়োজন। আমি এখানে সূত্রগুলো ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ভবিষ্যতের গবেষকগণ এটিকে আরও অনেক দূর নিয়ে যাবেন এবং এর মাধ্যমেই এক সম্পূর্ণ নজরুল আমাদের মধ্যে জীবন্ত হয়ে থাকবেন।

 

Scroll to Top