নিখিল ভারত কিষাণ সম্মেলন নেত্রকোণা-১৯৪৫

এমদাদ খান

অবিভক্ত ভারতে কৃষক সমিতির উদ্যোগে পূর্ব বাংলায় দু’বার নিখিল ভারত কিষাণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবার ১৯৩৮ সালে বিশিষ্ট আইনবিদ কামিনী দত্তের প্রচেষ্টায় কুমিল্লায় এবং দ্বিতীয়বার অনুষ্ঠিত হয় কমরেড মণিসিংহের প্রচেষ্টায় ১৯৪৫ সালে নেত্রকোণায়। অভিভক্ত ভারতে কৃষক সমিতির উদ্যোগে ইহাই ছিল শেষ কৃষক সম্মেলন। সম্মেলনের মূল অনুষ্ঠান ছিল দুই দিন, ৮ ও ৯ এপ্রিল, ১৯৪৫। এছাড়া ১৯৪৩ সালে ময়মনসিংহের নালিতাবাড়ীতে কৃষক সমিতি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রদেশিক কৃষক সম্মেলন। সেই প্রাদেশিক সম্মেলন ময়মনসিংহের কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল।

নিখিল ভারত কিষাণ সম্মেলন ময়মনসিংহ জেলায় করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল কোলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির এক সভায় ১৯৪৪ সালে। এ প্রসঙ্গে কমরেড মণি সিংহ বলেন, ‘কমরেড মুজফফর আহমদ প্রাদেশিক কমিটির এক সভায় প্রস্তাব করেন যে, সারা ভারত কৃষক সম্মেলন করতে হবে বাংলায়। তিনি আরও বলেন আমি মনে করি একমাত্র ময়মনসিংহ জেলাই এ ভার নিতে পারে। অবশ্য আমরা সবাই সাহায্য করব।’ আমি বললাম, ‘আমি এজন্য প্রস্তুত হয়ে আসিনি। আমাদের জেলা কমিটিতে তা আলোচিত হয় নাই।’ তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আপনারা এটা পারবেন। অন্য কোনো জেলা এখন পারবে না। অবশেষে আমি এতে রাজি হলাম। এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মৌলভী আবদুল হান্নান বলেন, ‘কমরেড মুজফফর আহমদ যখন কমরেড মণি সিংহকে এর দায়িত্ব নিতে বললেন, বড় ভাই মণি সিংহ আমাকে জবাব দিতে বললেন। আমি মুজফফর আহমদকে উদ্দেশ্য করে বললাম, ‘এত বড় সম্মেলন সম্বন্ধে আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কী প্রয়োজন, আমাদের কী করতে হবে শুনলে বলতে পারি আমাদের পক্ষে সম্ভব কি না। কথা হলÑ লক্ষ লোকের সমাবেশ চাই। রাজী হলাম। পঞ্চাশ হাজার টাকার তহবিল চাইÑ সম্মতি দিলাম। পেন্ডেল তৈরির অনেক বাঁশ চাইÑ বললাম, যত লাগে তত দিব। মাসব্যাপী সর্বক্ষণ কাজ করবে এমন দু’শ ভলাণ্টিয়ার চাইÑ বললাম আরো বেশী দেওয়া যাবে।’ হাততালি দিয়ে আমার বক্তব্যকে অভিনন্দন জানানো হলো। ময়মনসিংহ জেলায় সম্মেলন হবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিরে এলাম। নেত্রকোণায় সম্মেলন হবে এই সিদ্ধান্ত চ‚ড়ান্ত হলো ময়মনসিংহ জেলা কৃষক সমিতির সভায়। নেত্রকোণায় সম্মেলন করার ব্যাপারে কমরেড মণি সিংহ সভায় যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, নেত্রকোণায় সম্মেলন করলে পাহাড় অঞ্চল থেকে কৃষকদের এনে র‌্যালি করা যাবে। নেত্রকোণার কৃষকদের মাঝেও রয়েছে কৃষক সমিতির প্রভাব। র‌্যালির ব্যাপারে তারাও সাহায্য করতে পারবে। তার এই যুক্তি সবাই এক বাক্যে মেনে নিলেন। নেত্রকোণাতেই সম্মেলন করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।

 সম্মেলন সফল করার দায়িত্ব অর্পিত হলো ময়মনসিংহ জেলা কৃষক সমিতির কর্মীদের উপর। মূল দায়িত্ব ছিল নেত্রকোণা মহকুমা কৃষক সমিতির। শুরু হলো সম্মেলন প্রস্তুতির কাজ। প্রথমে শুরু হলো অর্থ সংগ্রহ অভিযান। মৌলভী আবদুল হান্নান বিপ্লবী রেবতী মোহন সাহা রায় ও কৃষক সমিতির নিবেদিতপ্রাণ ক’জন কর্মী নিয়ে নেমে পড়লেন অর্থ সংগ্রহে। মাত্র আড়াই মাসে তারা পঞ্চাশ হাজার টাকার তহবিল সংগ্রহে সমর্থ হলেন। এ প্রসঙ্গে মৌলভী হান্নান বলেন, ‘প্রোগ্রাম করে আমরা মহকুমা ব্যাপী জনসংযোগে বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য সম্মেলনের প্রচার ও তহবিল সংগ্রহ। এই সময়ে মেদেনীপুরের একজন কমরেডকে সাথী হিসাবে পেয়েছিলাম। তিনি পথ চলতে চলতে একটা গান গাইতেন …

‘মরণ শিউরে দলাদলি করে কেমনে বাঁচিবে বল।

গ্রামের চাষী পাঁচু রহমান, একসাথে মাঠে কাটে নাকো ধান।

মন্দিরে বাজে না শঙ্খ-আরতি, মসজিদে দেয় না আজান

কী হলো তাদের বল’।

 তিনি ছিলেন সুকণ্ঠের অধিকারী। তাঁর গান শুনে শ্রোতারা মুগ্ধ হতো। সারা ভারত কৃষক সম্মেলন হবে নেত্রকোণায় এই বক্তব্য জনমনে অদ্ভ ুত সাড়া জাগিয়েছিল। যেখানে গিয়েছি কেউ বিমুখ করেনি। মানুষ যথাসাধ্য দিয়েছে। কেউ দিয়েছে অর্থ, কেউ দিয়েছে চাল। ময়মনসিংহ জেলার রাজনৈতিক জীবনে কমিউনিস্ট পার্টি আর কৃষক সমিতির স্থান বড় কম নয়। সম্মেলনে সাহায্য করতে কেউ কার্পণ্য করেনি। এদের মধ্যে অনেক লীগ সমর্থক ও কংগ্রেস ভক্তও ছিলেন। সম্মেলনের হিসাব রক্ষক ছিলেন সুকুমার ভাওয়াল। একাজে তিনি ছিলেন খুবই দক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য। পরে কোলকাতা থেকে দু’জন দক্ষ হিসাব রক্ষক এসেছিলেন।’

শহরঘেরা মগড়া নদীর ওপারে ছিল একশো একর জমির একটি বিশাল মাঠ। মাঠটির নাম ছিল নাগড়ার মাঠ। বর্তমানে সরকারী কৃষি ফার্ম। এই মাঠটি নির্দিষ্ট হলো সম্মেলনের জন্য। হিন্দু আর মুসলমান চাষীরা ছিল এই ফসলী মাঠের মালিক। অবশ্য এর অধিকাংশ জমির মালিক ছিলেন পারলার যোগীন্দ্র তালুকদার নামে এক ধনাঢ্য ব্যক্তি। তিনি ছিলেন একজন বরেণ্য স্বদেশী। এপ্রিল মাস, জমি আবাদের সময়। তবু কৃষক সমিতির ডাকে সকলেই অম্লান বদনে জমি ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। নেতাদের বসবাসের জন্য যোগীন্দ্র তালুকদার তার বসত বাড়িটি ব্যবহার করতে দিলেন। তাছাড়া পারলার দেওয়ান মজলিশ সাহেবও তার নিজের বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন নেতাদের থাকার জন্য।

 তিনি ছিলেন এলাকার একজন সম্ভ্রান্ত, সুশিক্ষিত এবং অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তি। নাগড়ার নিকটবর্তী কাইলাটি গ্রামের অনেক চাষীও তাদের বাড়ি-ঘর সম্মেলনকারীদের ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে কমরেড মণি সিংহ বলেন, ‘সারা ভারত সম্মেলনের প্রস্তুতির জন্য আমরা ১২৫ জন ভলান্টিয়ার পাহাড় থেকে আনলাম। তারা সভাস্থল বেড়া দিয়ে দিবে, মঞ্চ তৈরি করবে। তাছাড়া হাসপাতাল বানাবে। এই সকল কাজে তাদের লাগানো হলো।

কমরেড মুজফফর আহমদ নিখিল ভারত কিষাণ সম্মেলনের প্রধান অতিথি

আমরা আশেপাশের গ্রাম থেকে শত শত বরাক বাঁশ চেয়ে আনলাম। পাহাড় অঞ্চল থেকে পঞ্চাশ হাজার ডলু ও তরুই বাঁশ আনানো হল। খুশিমনে সবাই এইসব দিলেন। বাঁশের এক শহর তৈরি হতে লাগল। পঁচিশটি টিউবওয়েল পোতা হল। পাঁচশ হ্যাজেক লাইট বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা হলো। মারোয়ারী রিলিফ কমিটি আমাদের অনুরোধে হাসপাতালের খরচ বহন করতে রাজি হলো। গুদাম ঘর তৈরি করা হলো। বিভিন্ন স্থান থেকে কৃষক ও জনসাধারণ চাল দিয়ে ও অন্যান্যভাবে সাহায্য করলেন! চাল এনে গুদামে জমা করা হতে লাগল। লাকড়ির জন্য জেলা বোর্ডের রাস্তার দু’পাশের গাছ থেকে ডাল কাটার অনুমতি আনা হলো। আমরা নদীর উপর তিনটি বাঁশের পুল বানালাম। তখন নদীর উপর কোনো পাকা পুল ছিল না। এই সকল পরিকল্পনায় ছিলেন কোলকাতার অজিত বসু। তিনি ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার।’

সম্মেলন স্থল সম্পর্কে মৌলভী আবদুল হান্নান বলেন, ‘নাগড়ার মাঠে এক মাস ধরে তৈরি হতে থাকে বাঁশের শহর। দু’টো খেলার মাঠের সমান লম্বা ২টি ছাউনি এমন করে তৈরি হলো যাতে প্রতিনিধিরা বৃষ্টির মধ্যেও বসতে পারেন। লাখ দেড়েক লোক বসতে পারে এমন স্থান চাঁটাই দিয়ে ঘিরে দেয়া হলো। শ’পাঁচেক লোক বসার উপযোগী বৃহৎ এবং সুন্দর একটি মঞ্চ করা হলো। রান্নাঘর-তাতে উনান, প্রদর্শনী স্থান, দোকান-পাট, হাসপাতাল, পায়খানা, অনুসন্ধান অফিস সবই মজবুত করে তৈরি হলো। এসবই পরিকল্পনা মতো করা হলো।

 সম্মেলনের সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে কমরেড সোমনাথ লাহিড়ী তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশের কৃষক সভা আর ময়মনসিংহের কর্মীদের মুশকিল আরও বাড়লো। এতগুলি ধাক্কা সামলে উঠে বাংলাদেশ কি সারা ভারত সম্মেলনের মর্যাদা রাখতে পারবে? তার সংঘবদ্ধ শক্তি কি আশেপাশের হিন্দু-মুসলমান সমস্ত কৃষককে সম্মেলনের পতাকাতলে সমবেত করতে পারবে? এই ছিল সকলের মনে প্রশ্ন আর সংশয়। এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন ময়মনসিংহের উত্তর এলাকার হাজার হাজার গারো ও হাজং চাষীর দল। জবাব দিয়েছিলেন নেত্রকোণার আশে-পাশের গ্রামের অগণিত মুসলমান চাষী যারা কয়েক বছর ধরে কৃষক সভাকে লীগের মতোই ভালোবাসতে শিখেছিলেন। আর জবাব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের বহু দেশভক্ত মানুষ, যাদের জীবনে কৃষক সভা অসামান্য প্রভাব ফেলেছিলো। তাই মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে সম্মেলনের জন্য কৃষক আর অকৃষকদের অকুণ্ঠিত দানে পঞ্চাশ হাজার টাকার তহবিল গড়ে উঠেছিল।’

 

 বাঁশ সংগ্রহ অভিযান সম্পর্কে মৌলভী আবদুল হান্নান বলেন, ‘শুরু হ’ল বাঁশ সংগ্রহ। খুঁটির জন্যই প্রায় হাজার দশেক বরাক বাঁশ সংগ্রহ করা হলো। আমার বাড়িতে প্রথম কাটা আরম্ভ হয়। উদ্বোধন করেন কমরেড মণি সিংহ। সঙ্গে ছিলেন খোকা রায়, আলতাব আলী ও যুঁইফুল রায়। তারপর ৮/১০ মাইলের মধ্যে যত গ্রাম ছিল, প্রত্যেক গ্রাম থেকেই বাঁশ পাওয়া গেল। কোনো কোনো কৃষক নিজের ঝাড় উজার করে বাঁশ কেটে দিলেন। বাঁশ সংগ্রহে শৈলেন রায় চৌধুরী, রতুরায় চৌধুরী প্রশংসনীয় ভ‚মিকা পালন করেন। পাহাড় এলাকা থেকেও প্রচুর ডলু ও তরুই বাঁশ সংগ্রহীত হলো।’

 সম্মেলনে স্থানীয় কৃষকদের সহযোগিতা সম্পর্কে কমরেড সোমনাথ লাহিড়ি তার প্রতিবেদনে বলেন, ‘স্থানীয় কৃষকরা প্রায় নগদ পাঁচ হাজার টাকা আর একশত মন চাল দান করেন। শেষ পর্যন্ত যানবাহনের অভাবে অনেক চাল ডাল নেয়াই সম্ভব হ’ল না। কৃষকরা নিজ নিজ ঘরের টিন নিজেই খুলে বহন করে দিয়ে গেলেন নাগড়ার মাঠে। এক অন্ধ কৃষক মাথায় করে নিয়ে আসেন তার ঘরের টিন। টংক আন্দোলন এলাকার গারো-হাজংরা এ সম্মেলনকে তাদের নিজেদের অনুষ্ঠান মনে করে ছুটে আসে সম্মেলনস্থলে।  তাদের সম্পর্কে সোমনাথ লাহিড়ি বলেন, ‘সত্যি, টংক এলাকায় মোট লোক সংখ্যাই এক লাখের কিছু উপরে। তার মধ্যে থেকে একেবারে ৩৫০০ লোক বাড়িঘর ফেলে এতদূর চলে এসেছেÑ কৃষকসভার কতখানি প্রভাব থাকলে তা সম্ভব এথেকেই বোঝা যায়।’

কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বিরোধিতা : সম্মেলনের প্রচার অভিযান যখন তুঙ্গে তখন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পক্ষ হতে দু’টি লিফলেট বিলি করে জনগণকে সম্মেলনে যোগদান করতে নিষেধ করা হলো। এ বিষয়টি সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের ভাবিয়ে তুললো। কমরেড মণি সিংহ ক’জন সহকর্মীকে নিয়ে মুসলিম লীগ নেতা উকিল খান বাহাদুর কুবির উদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা করেন। তিনি তাকে বুঝিয়ে বলেন এ সম্মেলন মুসলিম বা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নয়। কমিউনিস্টদের আন্দোলন টংক প্রথার বিরুদ্ধে। এ সম্মেলনে সারা ভারত থেকে নেতৃবৃন্দ আসবেন। কুবির সাহেব কথা দিলেন। এ সম্মেলনে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে আর বাধা দেয়া হবে না। তিনি নেত্রকোণার কংগ্রেস নেতা শ্রী শধর মহাশয়ের সাথে দেখা করে তাকেও একই কথা বলেন।

নিখিল ভারত কিষাণ সম্মেলন, নেত্রকোণা – ১৯৪৫

 কংগ্রেস এর পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেয়া হবে না বলে তিনিও কথা দেন। এই সময় নেত্রকোণার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে একটা আবেগের সৃষ্টি হয়েছিল। কমিউনিস্টরা সারা ভারত সম্মেলন করছে, যা মুসলিম লীগ বা কংগ্রেস করতে পারেনি। নেত্রকোণার জন্য এটা গৌরবের বিষয়। বিরোধীরাও এর ব্যর্থতার দায় বহন করতে চায়নি। বরং সারা ভারত থেকে প্রতিনিধিরা এসে অসুবিধায় পড়লে নেত্রকোণার বদনাম হবে। এই বদনাম হতে কেউ দিতে চায়নি। সকলে হাত বাড়িয়ে দিল। নেত্রকোণার শহরবাসীরা তখন প্রতিদিন দলে দলে বাঁশের পুলের উপর দিয়ে কমিউনিস্টদের বাঁশের তৈরি সম্মেলনস্থল দেখতে যেতেন, লাকড়ির পাহাড় দেখে অনেকেই সন্দেহ করেন। এতো লাকড়ি দিয়ে এরা কী করবেন? এ দিয়েতো পুরা নেত্রকোণা শহর পুড়িয়া দেয়া যায়। আসলে সম্মেলনের আয়োজনের বিশালতা দেখে সকলেই বিস্মিত, বিমুগ্ধ ও আশ্চর্য বোধ করছিলেন।

পুলিশও নানা অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছিল-ওখানে গেলে সৈন্য দলে ভর্তি করিয়ে নিবে। পুলিশের গুলি হতে পারে। কলেরা বসন্ত দেখা দিতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু সভা ভÐুলের সকল অপচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। আশে-পাশের গ্রাম ও শহরবাসীরা এগিয়ে এলেন সাহায্যের হাত প্রসারিত করে। বার লাইব্রেরির সদস্যগণ ছেড়ে দিলেন নিজেদের বাড়ি। মোক্তার লাইব্রেরি ও মিউনিসিপালিটি ছেড়ে দিলেন নিজেদের কার্যালয়। বালিকা বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া হয় নারী অতিথিদের জন্য। ছেলেদের স্কুলগুলো ছেড়ে দেওয়া হয় হাজং কমরেডদের বসবাসের জন্য। পৌর চেয়ারম্যান ছয়টি টিউবওয়েল ব্যবহার করতে দিলেন। আর দুটো সম্মেলন স্থলে বসিয়ে দেওয়া হলো। নেত্রকোণা এভাবেই তার মর্যাদা রক্ষা করল।

 অনুষ্ঠানের প্রচার অভিযান চলল তিন মাসব্যাপী। সম্মেলনের কিছুদিন আগে প্রচার কার্যে নামেন জুঁইফুল রায় ও কমরেড মণি সিংহের বড় বোন নির্মলা সান্যাল। নির্মলা সান্যাল পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসে প্রচার কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বিভিন্ন জেলা থেকে বহু কমরেড সম্মেলনে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তাদের সবাইকে প্রচার কার্যে নামানো হলো। সম্মেলনস্থলের প্রবেশ পথে তৈরি করা হলো আট ফুট উঁচু একটি মূর্তি-‘হৃদয়’ নামে একজন হাজং কমরেডের আদলে। মূর্তিটি এমনভাবে করা হলো যে হাতের শিকল ভেঙ্গে গিয়াছে বটে কিন্তু পায়ের শিকল এখনও রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই ভাস্কর্যটি দর্শকদের নয়ন-মন ভরিয়ে দেয়। মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন কৃষ্ণনগর থেকে আসা লক্ষীপাল নামক এক বিখ্যাত ভাস্কর্য শিল্পী।

 

মঞ্চে ঢোকার পথে যে কেউ দাঁড়িয়ে যেতো এই মূর্তির সামনে। এই মূর্তি সম্পর্কে সোমনাথ লাহিড়ি বলেন, ‘প্রথমেই চোখে পড়ে এক বিরাট মূর্তি। সবল কৃষকের সংগ্রামী জীবনের রূপ। কোলে ধানের গুচ্ছ, বা-হাতে কাস্তে। উঁচু করে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, জোরালো পেশিগুলো টান টান হয়ে ফুটে বেড়িয়েছে, হাতের শৃংখল ভেঙ্গে পড়েছে, পায়ের শৃংখল যায় যায়। যারা ঢোকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর নানা জল্পনা-কল্পনা।

ভেতরে ঢুকতে মূর্তিটি ডানে বা বাঁয়ে রেখে সামনে দূরে ছিল বিশাল মঞ্চ। মঞ্চের সামনে ছিল লাখ দেড়েক লোকের বসার ব্যবস্থা। ডানদিকে ছিল প্রদর্শনী ও বইয়ের দোকান। মূর্তির বাঁ দিকে ছিলো অনুসন্ধান অফিস ও চিকিৎসা কেন্দ্র। বসার ব্যবস্থাটি ছিল অর্ধ বৃত্তাকার। এর ভেতর দিয়ে ছিল আটটি পায়ে চলার পথ। আটটি পথই মঞ্চের সামনে এসে এক বিন্দুতে মিলেছে। মুসলিম লীগের আপত্তি সত্তে¡ও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্মেলনের সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছে স্থানীয় মুসলিম স্টুডেন্ট লীগ। ছাত্রলীগ নেতা ওয়াজেদ আলী, ফজলুল রহমান খান ও আবদুল খালেকের ভ‚মিকা ছিল প্রশংসনীয়।

তাঁদের আমন্ত্রণে ঢাকা থেকে মুসলিম ছাত্রলীগের দুই প্রখ্যাত নেতা সামছুল হক ও সামসুদ্দিন নেত্রকোণায় এসে সম্মেলন স্থলে একটি বইয়ের দোকান খুলেছিলেন। সম্মেলন বাস্তবায়নের জন্য সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি ছাড়াও বেশ ক’টি উপকমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক করা হয়েছিল কমরেড সচীন চক্রবর্তীকে। চিকিৎসা উপকমিটির দায়িত্বে ছিলেন ডা. খুশু দত্ত। স্বেচ্ছাসেবক উপকমিটিতে ছিলেন কমরেড খোকা রায়, খুশু দত্ত, ললিত সরকার, জহুর উদ্দিন মাষ্টার ও মৌলভী আবদুল হান্নান। রন্ধনশালার দায়িত্বে ছিলেন রবিদাস তালুকদার ও রবি নিয়োগী। মঞ্চ ও বেড়া তৈরীর মূল দায়িত্বে ছিলেন কোলকাতা থেকে আগত ইঞ্জিনিয়ার অজিত বোস।

 সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ৮ ও ৯ই এপ্রিল ১৯৪৫। কিন্তু ৬ এপ্রিল থেকে লোক সমাগম শুরু হয়ে যায়। অঘোষিতভাবে চলতে থাকে নৃত্য, সংগীত, আলোচনাসহ নানা অনুষ্ঠান। সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ৮ এপ্রিল। পতাকা উত্তোলন করে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন, তেত্রিশ বছর আটক থেকে সদ্য কারামুক্ত পাঞ্জাবের বর্ষীয়ান কৃষক নেতা বাবা কেশর সিং। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কমরেড মুজফফর আহমদ, অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন কমরেড মণি সিংহ। সম্মেলনের শুরুতেই সভাপতিকে নিয়ে পঞ্চাশ হাজার লোকের বিশাল র‌্যালী নেত্রকোণা শহর প্রদক্ষিণ করে। সোমনাথ লাহিড়ি এর বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে- ‘শহরের একটা সুবিধাজনক স্থান দখল করার জন্য দৌড়াচ্ছিলাম। শহরের ভেতরে তখন দোকানের ধারে, বাড়ির দরজা ও জানালায়, রাস্তার মোড়ে মোড়ে সারা শহরের লোকজন ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে ভলান্টিয়ার তারপর গরুর গাড়ির উপর রথের মঞ্চের মতো ঘোরাটোপ-রক্তধ্বজা চিহ্নিত সভাপতির আসন। সেই আসনে আসীন হাজার নির্যাতনের বীর নেতা মুজফফর আহমদ- কিন্তু এত সম্মানে যেন সংকুচিত, লজ্জিত। তারপর মহিলা ডেলিগেটর ও বহিরাগত দর্শক কাতারে কাতারেÑ তার মধ্যে শহুরে মেয়ে, কৃষক মেয়ে, হাজং মেয়ে নানা অফুরন্ত সমারোহ। তারপর র্দীর্ঘকায় পাঞ্জাবী ডেলিগেটর দল তারা যেন সভাপতির বডিগার্ড। তারপর যুক্ত প্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, গোয়ালিয়র, বোম্বাই, অন্ধ্র, মালাবর, আসামী মনিপুরী, গীর্জা, গারো, হাজং, বার্মিজÑ ভারতের সকল প্রদেশের নর-নারী। সারা ভারতই যেন মিছিল করে চলেছে। এমনকি দু’জন ইউরোপিয়ান সৈন্য এবং একজন ইউরোপিয়ান মহিলাও র‌্যালিতে অংশ নিয়েছেন।

র‌্যালির পর শুরু হলো মূল সম্মেলন। সম্মেলনের শুরুতেই উপস্থিত বিশিষ্ট নেতাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। তারপর উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কমরেড মণি সিংহ। সরোজিনী নাইডু, আবুল হাসেম, আসাম পরিষদের স্পীকার বসন্ত কুমার দাস, মাদ্রাজের ভ‚তপূর্ব মন্ত্রী ডা. রাজন প্রমুখের অভিনন্দন বার্তা পাঠ করে শুনানো হলো। লাখো জনতার উপস্থিতিতে বক্তব্য রাখলেন আরাকানের প্রখ্যাত জননেতা উপিনার্য ডিহার। তার বক্তৃতা সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলেন। তিনি দেশে ফিরে গিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন। তারপর বক্তব্য রাখেন সম্মেলনের সভাপতি কমরেড মুজফফর আহমদ। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে বিখ্যাত নেতৃবৃন্দ সম্মেলনে এসে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ভবানী সেন, বঙ্কিম মুখার্জী, পিসি যোশী, কৃষ্ণ বিনোদ রায়, সোমনাথ লাহিড়ি, গুরু মুখ সিং, হর কিষণ সিং, সুরজিৎ ভান সিং, চন্দ্রভান সিং, গাড়োয়াল, গোদাবেরী পারুলেকর, না¤্রদিপাদ, সুন্দরায়া, কোরোলিয়ান, ডা. জেড এ আহমদ, যদু নন্দন শর্মা, নীলমনি, বড় ঠাকুর, ইরাবত সিং, বিষ্ণু রাতা, কল্পনা যোশী প্রমুখ।

 ভারতের সকল প্রদেশ থেকে শিল্পীরা এসেছিলেন। তারা গান গেয়ে এবং নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন। ভাষা ভিন্ন হলেও শ্রোতাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। সঙ্গীত পরিবেশন করলেন বিনয় রায়, নির্মলেন্দু চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, হেনা দাস, জীতেন সেন, জারী গানের শিল্পী নিবারণ পন্ডিত, বাউল শিল্পী রশিদ উদ্দিন ও আবদুল মজিদ। বিখ্যাত বাউল গায়ক রশিদ উদ্দিন ও আবদুল মজিদের গানেই শ্রোতারা সাড়া দিয়েছিলো বেশি। পরদিন ৯ এপ্রিল, বিকাল তিনটায় আবার অধিবেশন বসে। শ্রোতার সংখ্যা হাজার পঞ্চাশের মত। বক্তব্য রাখেন বঙ্কিম মুখার্জী, ভবানী সেন। সেনের বক্তব্য শেষ হতে না হতেই ঝড় শুরু হয়। সেই সাথে শিলাসহ মুষলধারে বৃষ্টি। বাধ্য হয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

প্রস্তাবনা : সম্মেলনে টংক উচ্ছেদ, তেভাগা আন্দোলনের প্রস্তুতি, অধিক ফসল উৎপাদন ইত্যাদি প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো।

উদ্দেশ্য : সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই দেশের নিপীড়িত কৃষকদের সংঘটিত করা। সম্মেলনের মাধ্যমে এই উদেশ্য সম্পূর্ণরূপে সফল ও সার্থক হয়।

 

লেখকঃকবি ও গবেষক।

Scroll to Top