নেত্রকোণার প্রবন্ধ-সাহিত্য
রাখাল বিশ্বাস
লোকসাহিত্য মৌখিক ধারার সাহিত্য যা অতীত ঐতিহ্য ও বর্তমান অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে রচিত। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমন্ডলে একটি সংহত সমাজমানস থেকে এর উদ্ভব। সাধারণত অক্ষরজ্ঞানহীন পল্লিবাসীর স্মৃতি ও শ্রুতির ওপর নির্ভর করে এর লালন হয়। মূলত ব্যক্তিবিশেষের রচনা হলেও সমষ্টির চর্চায় তা পুষ্টি ও পরিপক্বতা লাভ করে। এজন্য লোকসাহিত্য সমষ্টির ঐতিহ্য, আবেগ, চিন্তা ও মূল্যবোধকে ধারণ করে। বিষয়, ভাষা ও রীতির ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারাই এতে অনুসৃত হয়। কল্পনাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও পরিশীলিত চিন্তার অভাব থাকলেও লোকসাহিত্যে শিল্পসৌন্দর্য, রস ও আনন্দবোধের অভাব থাকে না।
লোকসাহিত্য লোকসংস্কৃতির একটি জীবন্ত ধারা, এর মধ্য দিয়ে জাতির হৃদয়ের স্পন্দন শোনা যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে ‘জনপদের হৃদয়-কলরব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। লোকসাহিত্যকে প্রধানত লোকসঙ্গীত, গীতিকা, লোককাহিনী, লোকনাট্য, ছড়া, মন্ত্র, ধাঁধা ও প্রবাদ এই আটটি শাখায় ভাগ করা যায়। বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্য চর্চার ঐতিহ্য হাজার বছরের। এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি সমৃদ্ধ এবং গৌরবময়। বিশ্বখ্যাত এই জনপদের পালাগান। বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ মৈমনসিংহ গীতিকাই তার প্রমাণ। কারো মতে বাংলায় ফোকলোর চর্চার ক্ষেত্রে প্রায় দু’শ বছরের ইতিহাস পাওয়া যায়। যদিও বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফোকলোর চর্চা কখন থেকে শুরু হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস জানা নেই। তবে অনেকের মতে কাহ্নপা থেকে হাল আমল পর্যন্ত অনেক ব্যক্তি ফোকলোর চর্চা করে আসছেন।
নেপালের রাজদরবারে ‘চর্যাপদ’ খুঁজে পাওয়ার পর বৃহত্তর ময়মনসিংহের ফোকলোর চর্চার ইতিহাসকে অনেকটা অতীতের দিকে নিয়ে যায়। কারণ, কাহ্নপার জন্মস্থান বৃহত্তর ময়মনসিংহে নেত্রকোণার আটপাড়ায় বলে অনেকের ধারণা। যার জন্ম আনুমানিক দশম শতকে, তারপর আসে কবি কঙ্ক (পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দী) মূলত এদেরকে অনুসরণ করেই বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফোকলোর চর্চা শুরু হয়।
শতাব্দী ও দশক বিবেচনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহের ফোকলোরবিদদের নাম ও তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিম্নে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো:
কাহ্নপা (আনুমানিক দশম শতক) চর্যাপদের রচয়িতা। তার প্রকাশিত গ্রন্থের নাম ‘কাহ্নপা গীতিকা’। তারপর পূর্ণানন্দ গীরিরাজ পরমহংস ও কবি কংক (পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দী) বারমাসী ও পালা গানের রচয়িতাও। তিনি মলুয়ার বারমাসী, পালাগানের রচয়িতা, সত্যপীরের পাঁচালী লিখেও ব্যাপক সমাদৃত হন। এছাড়াও মলুয়ার বারমাসী, বিদ্যাসুন্দর কাব্য ও পালাগান রচনা করেন তিনি। আরেকটি পালাগানের নাম ‘কঙ্ক ও লীলা’। এই পালাগানটি ড. দীনেশ চন্দ্র সেন সম্পাদিত মৈমনসিংহ গীতিকার অন্যতম পালাগান হিসাবে বিবেচিত।
সতের শতকের বৃহত্তর ময়মনসিংহের কবিয়াল, বাউল শিল্পী ও পুঁথি লেখক এবং পালাগান রচয়িতা হলেনÑ নয়ন চাঁদ (সতের শতক), বরকত সরকার (১৭৩২-১৮১০), মনসুর বয়াতী (সপ্তদশ-অষ্টাদশ), দ্বিজ কানাই (সতের শতক), শ্যামচাঁদ গুপ্ত (১৭৭৪-১৮৫৪), হারাধন বাগচী (সতের শতক), রাজা রাজসিংহ (১৭৫০-১৮২১) প্রমুখ। নয়ন চাঁদ (সতের শতক) মৈমনসিংহ গীতিকার অন্যতম পালাগান রচয়িতা। বরকত সরকার (১৭৩২-১৮১০) পুঁথি লেখক। তার রচিত পুঁথির নাম ইমাম সাগরের পুঁথি। মনসুর বয়াতী (সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দী) প্রখ্যাত লোককবি ও পালাগান রচয়িতা। তার বিখ্যাত পালাগানের নাম ‘দেওয়ানা মদিনা’। লোকসাহিত্য সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে হবিগঞ্জের বানিয়াচং থেকে পালাগানটি সংগ্রহ করেন। দ্বিজকানাই (সতের শতক) প্রখ্যাত লোককবি। নদের চাঁদ ও মহুয়া পালা রচয়িতা। তার সম্পর্কে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন,”… দ্বিজ কানাই নমশূদ্র সমাজের অতি হীন কুলজাত এক সুন্দরী প্রেমে মত্ত হইয়া কষ্ট সহিয়া ছিলেন। এই জন্যই ‘নদের চাঁদ’ ও ‘মহুয়ার কাহিনীতে তিনি এরূপ প্রাণঢালা সরলতা প্রকল্প করিতে পারিয়াছিলেন। তার মতে পালাগানগুলো সতের শতকের। শ্যামচাঁদ গুপ্ত (১৭৭৪-১৮৮৫) সারি গানের রচয়িতা ও সংগ্রাহক। তার প্রকাশিত গ্রন্থের নাম: সারিগান। হারাধন বাগচি (সতের শতক) সারিগান রচয়িতা। তিনি অজস্র ছড়া ও সারি গান রচনা করেছেন। রাজা রাজসিংহ (১৭৫০-১৮২১) গীতিকবি। তার প্রকাশিত গ্রন্থের নাম- ১. রাগমালা, ২. মনসার পাঁচালী।
প্রবন্ধসাহিত্যের বড় শক্তি হচ্ছে তথ্য-উপাত্ত, সূত্র-সূত্রের সত্য-সত্তা ও প্রমাণাদি।যেহেতু প্রবন্ধসাহিত্য গবেষণাধর্মী-সেহেতু অনেকেই এ কাজে ব্রতী হতে চান না। সে কারণে জেলায় সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় শুধু প্রবন্ধকারের সংখ্যা হাতেগোনা বলা চলে। জেলায় অল্পসংখ্যক প্রাবন্ধিকের গ্রন্থ ছাড়া অনেকেরই প্রবন্ধ গ্রন্থ নেই। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় কেউ কেউ নিয়মিত প্রবন্ধ লিখে যাচ্ছেন।
নাট্যসাহিত্য ও কথাসাহিত্যের তুলনায় নেত্রকোণা জেলার প্রবন্ধসাহিত্যের বিকাশ তুলনামূলক কম নয়। প্রাবন্ধিকের সংখ্যা কম হলেও তাঁদের রচনশৈলী, প্রবন্ধের মান ও প্রকরণ, বিষয়-বৈচিত্রে যথেষ্ট মানসম্পন্ন এবং তথ্যবহুল ও বস্তুনিষ্ঠ। সাহিত্যের গুণাবলিতে ‘সৃজনশীলতা’ একটি আবশ্যকীয় উপাদান। নেত্রকোণা জেলার প্রাবন্ধিকগণ তথ্য উপাত্তের সমন্বয়ে তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক লেখনীতে সৃজনশীলতার সমাবেশ ঘটিয়েছেন বেশ দক্ষতার সাথে। বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ পড়ার সৌভাগের কারণে বলতে পারছিÑ প্রবন্ধ ও নিবন্ধের মধ্যে যে প্রার্থক্য আছে তাও এখানের লেখকদের লেখায় সহজ-সারল্যে প্রমাণিত। এক্ষেত্রে প্রাবন্ধিকের সংখ্যা কম হলেও নিবন্ধকারের সংখ্যা যথেষ্ট এবং তাদের রচনাতে বোধগম্য আগামী দিনে ভাল প্রবন্ধকারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
নেত্রকোণা জেলার প্রবন্ধসাহিত্য নিয়ে আলোচনায় সকল প্রাবন্ধিকগণের নাম ও তাঁদের রচিত গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করতে পারলে প্রবন্ধের গতি-প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি আরও বেশী উপলব্ধি করে উপস্থাপন করা যেতো। কিন্তু সংগ্রহ সংকটে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তার পরও মহান স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী অর্থাৎ তৎকালীন প্রবন্ধ লেখক বিজয় আচার্য, কমলকৃষ্ণ সিংহ, যোগেন্দ্র চন্দ্র বিদ্যাভূষণ, মনোরঞ্জন মহোদয়, অধ্যাপক সামছুদ্দিন আহমেদ, খোরশেদ আলী তালুকদার, আবদুল হাই, এএফএম শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক নূরুল হক, মৌলানা ফজলুর রহমান খান, মোঃ নূরুল আমীন, নূরুল ইসলাম কাসিমপুরী, চন্দ্রকুমার দে, রওশন ইয়াজদানী, সিরাজ উদ্দিন কাসিমপুরী প্রমুখগণ প্রবন্ধসাহিত্য রচনা করে নেত্রকোণাকে বিশেষ মর্যাদায় আসীন করে গেছেন।
বর্তমান নেত্রকোণার জীবন্ত কিংবদন্তী সমাজচিন্তক প্রাবন্ধিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক যতীন সরকার, প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান, খগেশ কিরণ তালুকদার, প্রয়াত সন্তোষ সরকার, অধ্যাপক মতীন্দ্র সরকার, আলী আহম্মদ খান আইয়ূব, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আহম্মদ খান এফসিএ, রফিকুল ইসলাম আপেল, অধ্যাপক বিধান মিত্র, প্রফেসর ননী গোপাল সরকার, অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা, নূরুল ইসলাম, স্বপন পাল, সঞ্জয় সরকার, হামিদুর রহমান, আবদুল লতিফ, ইকবাল হাসান তপু প্রমূখ প্রবন্ধকারগণ সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন সমকালীন বিষয় নিয়ে বিস্তর লিখেছেন এবং লিখে যাচ্ছেন। তাঁদের লেখনিতে নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যের নেত্রকোণাকে আরও নতুন করে চিনে শিখবে তাতে সন্দেহ নেই।
দেশবরেণ্য প্রাবন্ধিক ও সমাজচিন্তক অধ্যাপক যতীন সরকার স্যারের ১৯৬৭ সনে বাংলা একাডেমি পত্রিকায় ‘পাকিস্তানোত্তর পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসের ধারা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত প্রবন্ধটির জন্য তাঁকে ডক্টর এনামুল হক সাহিত্যপদক দেওয়া হয়। ইতঃপূর্বে তাঁর কোন বই সংকলিত না হলেও, এদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের যে সব গবেষক বাংলাদেশের উপন্যাস নিয়ে গবেষণা করেছেন তাঁদের অনেকেই এই প্রবন্ধটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি তাঁর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ গ্রন্থের ভূমিকায় আরও লিখেছেন, কালের ব্যবধানে উপন্যাস সম্পর্কে নিজ মতের অনেক পরিবর্তন ঘটলেও নির্বাচিত প্রবন্ধে অন্তর্ভূক্ত করতে গিয়ে লেখাটিকে অপরিবর্তিত রাখাই সমচীন মনে করেছেন। ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ গ্রন্থের জন্য তাঁর চারটি গ্রন্থ থেকে প্রবন্ধগুলো সংযুক্ত করেছেন। গ্রন্থগুলো হলো-সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ (১৯৮৫), বাঙ্গালী সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য (১৯৮৭), দ্বি-জাতিতত্ত¡, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞান চেতনা-(২০০৬) এবং সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবী সমাচার (২০০৭। অধ্যাপক যতীন সরকারের ‘নির্বাচিত প্রবন্ধের শিরোনাম গুলো- পাকিস্তানোত্তর পূর্বপাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসের ধারা, মানবজমিন রইলো পতিত, কথক শরৎচন্দ্র তাঁর কথা সরিৎসাগর, ইকবাল আমাদ, ইতিহাস ব্যাখ্যায় সামাজিক মনস্তত্ত¡ ও সাহিত্য, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ও সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য, বাঙ্গালীর লৌকিক ঐতিহ্যে সমাজতান্ত্রিক উপাদান, আমি দ্বি-জাতিতত্তে বিশ্বাস করি, আমি ‘অ-দৃষ্টে, বিশ্বাসী’, নিয়তিবাদ’, এবং ‘বিজ্ঞান সচেতন’, চেতনার বিজ্ঞান, মার্কসবাদের খন্ডীভবন ও সমাজতন্ত্রের সংকট, কেবল মুসলমানের লাগিয়া আসেনি কো ইসলাম, বাঙালীর মানুষ হওয়া, কমল হীরের পাথর চাই, সাংস্কৃতিক পূর্ণগঠনে লৌকিক ঐতিহ্য, বাংলার লোকসমাজে পুরুষতন্ত্র ও নারী চেতনা, সুশীল সমাজ মানে ব্রাহ্মণ সমাজ।
অধ্যাপক যতীন সরকার স্যার তাঁর প্রবন্ধের একস্থানে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি লেখা উল্লেখ করেছেন-
‘অদৃষ্টেরে শুধালেম, চিরদিন পিছে
অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?
সে কহিল, ফিরে দেখো, দেখিলাম থামি
সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি’।
এই ‘পশ্চাতের আমি’ কেবল মানুষ ‘আমি’ নয়, প্রকৃতি ‘আমিও’। প্রকৃতি ও প্রকৃতি-উদ্ভুত মানুষ উভয়েরই বিকাশের একটি ধারাবাহিকতা আছে, ধারাবাহিকতার নিয়মও আছে। এই ধারাবাহিকতার নিয়মটিই ‘নিয়তি’। এই নিয়তিরই অপর নাম ‘প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা’। এই দ্বা দ্বান্দ্বিকতাই সামাজিক নিয়তিরও অন্তঃসার। এতে মনে করা যায়, ইত্যাদি প্রবন্ধ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রবন্ধসাহিত্যে অনেক নতুন প্রাবন্ধিকের সৃষ্টি হয়েছে এবং হচ্ছে। নেত্রকোণা জেলায় সাহিত্যচর্চা ও প্রবন্ধ লেখার পরিমাণ উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সাহিত্যের বিবিধ ক্ষেত্রসমূহ প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সমন্বয়ে বহুমাত্রিক ধারণায় বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ হবে নেত্রকোণার লেখকদের প্রবন্ধসাহিত্য-এমন প্রত্যশা অমূলক নয়।
লেখক:
১. পালাকার, নাট্যাভিনেতা ও নাট্যপরিচালক।
২. লোকগবেষক ও লেখক।
