পরশমণি জ্বলে
গোলাম ফারুক খান
‘…মানুষের ভিতরে মানুষ, পরশমণি জ্বলে-
অন্তরে অনন্ত লীলা, দেখবে আত্মসাধন হলে।
রূপের সিদ্ধি করছে যারা, অধরাকে ধরছে তারা
আপনার ছবি সামনে খাড়া ভেবে কয় জালালে;
সেই আলোকে আঁধার নাশে, তত্ত জ্ঞান শিখিলে-
আলোক চেয়ে রাস্তা ধর থাকে যদি কর্মফলে।।’
জালাল উদ্দীন খাঁ
আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে শ্রাাবণের এই তারিখে প্রায়ান্ধকার, ক্লান্ত সন্ধ্যায় তিনি মরণ পৃথিবীর বাস ত্যাগ করেন। ফুল-লতাপাতায় ঢাকা নিজের দোতলা টিনের ঘরটিতে শুয়ে তিনি কথা বলছিলেন একজন শিষ্যের সঙ্গে। কথা বলতে বলতে চুপ করে পাশ ফিরে শুলেন। একজন গৃহকর্মী তাঁকে কিছু দিতে এসে ডাক দিলে তিনি সাড়া দিলেন না। হতচকিত গৃহকর্মীর চিৎকারে ছুটে গিয়ে দেখলাম, আমার পিতামহ বাউল কবি ও দার্শনিক জালাল উদ্দীন খাঁ আর আমাদের সঙ্গে নেই। বুঝতে পারলাম, আমাদের পরিবার ও জনপদের জীবনে একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। বুঝতে পারলাম, আমরা যেমন আমাদের বটবৃক্ষসম অভিভাবককে হারিয়েছি, তেমনি আমাদের জনপদ হারিয়েছে সেই মানুষটিকে যিনি তাঁর গানে, কথায়, নিত্যদিনের তত্ত বিচারে কাছের ও দূরের মানুষজনের শিল্পতৃষ্ণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণাকে তৃপ্ত করার চেষ্টা করতেন। যাঁর সার্বক্ষণিক চেষ্টা ছিল মানুষের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে বের করে তাকে পরশমণি বানিয়ে তোলার, যাতে তার স্পর্শে অন্যরাও পরশমণি হতে পারে। তত্ত জ্ঞানের আলোয় আঁধার নাশ করার জন্য যিনি আত্মসাধনের জীবনব্যাপী ব্রত গ্রহণ করেছিলেন।
যখন খুব ছোট ছিলাম তখন পিতামহের হাত ধরেই হাটবাজার, মেলা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব-অনুষ্ঠানে যেতাম। নৌকায় ঘুরে বেড়াতাম এদিক-সেদিক। বাউলগান আর কবিগান তো বটেই, এ ছাড়াও নানাবিধ পালা-পার্বণ আর গীতরঙ্গের অন্তরঙ্গ পরিচয় পেয়েছি তাঁর সঙ্গে থেকেই। নিজ গ্রামে কিংবা আশেপাশের গ্রামগুলোতে এরকম কোনো উপলক্ষ ঘটলেই নিয়মিত অতিথি হিসাবে তিনি যেতেন আর তাঁর সঙ্গী হতাম আমরা, তাঁর শিশু-পৌত্ররা। তিনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন গ্রামীণ সমাজ-সংস্কৃতির বিচিত্র সব দিকের সঙ্গে প্রকাশ্য যে জীবনধারা বয়ে চলে তার সঙ্গে তো বটেই, অন্তরালে ও অবতলে কৃষিজীবী আর বৃত্তিজীবী মানুষের আনন্দ-বেদনা, ভাব-ভাবনা এবং সৃজনশীলতার যে কলরোল চলে, তার সঙ্গেও। তিনিই চিনিয়েছিলেন রাতের আকাশের তারা, বাংলাদেশের ছয় ঋতুর রং, প্রাণ ও প্রকৃতির সমারোহে চারদিকে মানুষের বেঁচে থাকার আয়োজন। শৈশবে আমাদের যতটুকু চোখ ফুটেছিল তার অনেকটাই তাঁর অবদান।
আমাদের লোক-ঐতিহ্যে যে সহজ মানুষের কথা বলা হয়েছে, সেরকম একজন সহজ মানুষ ছিলেন জালাল উদ্দীন খাঁ। তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সরল, অনাড়ম্বর এবং নিরন্তর আত্ম-সন্ধানমুখি। মানুষের সান্নিধ্যে খুব প্রীত বোধ করতেন। প্রতিদিনই তাঁর কাছে আসতেন হরেক রকম অতিথি। টুপি-আলখাল্লাপরা মৌলানা, কণ্ঠি ও নামাবলিধারী বৈষ্ণব, জটাজুটধারী ফকির সন্ন্যাসী এবং বেশ কিছু শিষ্য-সাগরেদ ছিলেন তাঁর নিত্যদিনের আলাপের সঙ্গী। তাঁদের সঙ্গে ধর্ম, সমাজ, নীতি-নৈতিকতা, সঙ্গীত ইত্যাদি বিষয়ে শাস্ত্র আর তত্ত¡বিচার করে তাঁর অনেকটা সময় কাটত। বাকি সময় তিনি নিজের ঘরে শুয়ে বুকের নিচে বালিশ চাপা দিয়ে লিখতেন। লিখতে লিখতে মাঝেমাঝে চোখ বন্ধ করে কী জানি ভাবতেন। মাঝেমাঝে গজারি কাঠের খুঁটিতে ঝোলানো দোতারাটি টেনে নিয়ে নিজের লেখা কথাগুলো সুর করে গাইতেন।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক শিষ্য-সাগরেদ মাসের পর মাস তাঁর নিচের ঘরটিতে থাকতেন। কখনো আবার বেশ নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হতো। মনে পড়ে, একবার একজন রক্তচক্ষু, উন্মাদপ্রায় মানুষ আমাদের বাড়ির সামনে এসেই ‘জালাল বাবা, জালাল বাবা’ বলে চিৎকার করতে করতে বর্ষার ভরা পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। পুকুর থেকে তুলে আনা হলে তিনি মাটিতে গড়াতে গড়াতে বৈঠকখানার বারান্দায় বসা জালাল উদ্দীন খাঁর কাছে এসে থামলেন। লোকটির উদ্ভট আচরণ দেখে আমরা শিশুরা খুব ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু জালাল উদ্দীন খাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পর দেখলাম তাঁর ভিন্ন রূপ। তখন তিনি সম্পূর্ণ শান্ত, স্বাভাবিক এক মানুষ। তাঁকে একটি লুঙ্গি দেওয়া হলো এবং কয়েকদিন গুরুর সঙ্গে থেকে তিনি প্রসন্ন মনে ঘরে ফিরে গেলেন।
প্রায়ই আমাদের বাড়িতে বাউলগানের অনুষ্ঠান ও হালকা-জিকির হতো। বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিখ্যাত বাউলগুরুরা এইসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। বিশেষভাবে মনে পড়ে উকিল মুনশি, উমেদ আলি, আবদুল মজিদ তালুকদার, প্রভাত সূত্রধর, আবেদ আলি প্রমুখের কথা। উকিল মুনশির কাটাবিচ্ছেদ গান শুনে শ্রোতাদের চোখের জলে বুক ভিজে যেত। আর তর্কপ্রবণ বাউল উমেদ আলি যখন একতারা হাতে মারমুখি ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতেন তখন তত্ত¡বিচারের উত্তেজনায় সমাবেশে এক টানটান পরিবেশ সৃষ্টি হত। শেষমেষ মঞ্চে উপস্থিত গৃহকর্তা জালাল উদ্দীন খাঁর ওপর অনেক কূটপ্রশ্ন সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হতো। তখন তিনি একতারা বা দোতারা হাতে উঠে গানের মাধ্যমেই সেইসব প্রশ্নের সমাধান তুলে ধরতেন। বিশ শতকের বিশ, তিরিশ এবং চল্লিশের দশকে তিনি ময়মনসিংহ ও সিলেটের সমসাময়িক কিংবদন্তিতুল্য বাউলদের সঙ্গে অনেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। সেইসব তর্কমুখর, সংগীতসুধাসিক্ত অনুষ্ঠানের রেশ অনেকদিন জনস্মৃতিতে জীবন্ত ছিল। আমরাও ছেলেবেলায় প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এসব অনুষ্ঠানের কথা শুনেছি। নেত্রকোনা শহরের গৌরীপুর কাছারি, গরুহাট্টা মাঠ এবং হাওর-জনপদের নানা জায়গায় এরকম বড় বড় অনুষ্ঠানগুলি হয়েছে। বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি-গবেষক মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী তাঁর ‘বাংলাদেশের লোক-সংগীত পরিচিতি’ (বাংলা একাডেমি, ১৯৭৩) বইয়ে জানিয়েছেন, ১৯২১ সালে জালাল উদ্দীন খাঁ ঢাকায় ১৩০ ফরাশগঞ্জ নর্মাল হোস্টেলে ‘শুকাইল কমলের কলি নতুন গাছের ডালে/পিয়ার লাগি শরীর কালো ভাসি নয়ন জলে’-এই গানটি পরিবেশন করে শহরের সংগীত পিপাসু মানুষকে মুগ্ধ করেছিলেন। সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর ভাষায়: ‘যেদিন গানের আসরে এই গান গাহিয়াছিলেন সেই দিন হইতে তাঁহার গানের সুর ঢাকা শহরময় ছড়াইয়া পড়ে। ইহার পর ক্রমে তিনি ঢাকার মুসলিম হলের মিলনায়তনে, নবাব সাহেবের মঞ্জিলে এবং অপরাপর বিশিষ্ট সংগীত প্রিয় ব্যক্তির বাসস্থানে গান গাহিয়া বেশ স্মরণীয়ও।
লেখক:
১. বিশ্বব্যাংক, ঢাকা, শিক্ষা বিষয়ক কনসালটেন্ট।
২. সাবেক উপ সচিব (১৯৮২ ব্যাচ)
৩. লেখক ও গবেষক।
৪. সাধক জালাল খাঁর নাতী।
