প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ সন্দর্শনঃ বিদ্রুপের আড়ালে দীপ্তিময় মননশীলতা
তিতাস মিয়া-প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, নেত্রকোণা সরকারী কলেজ
হিউমানিজম বা মানবতাবাদ কথাটির পিছনে পাঁচশো এর অধিক বছরের ইতিহাস আছে। রেনেসাঁর পূর্বে বিশ্বব্যাপী ভাবুকরা ডিভানইকে কেন্দ্র করে ঘুরতেন। তার বদলে ‘যারা হিউম্যানকে কেন্দ্র করে চিন্তা ভাবনার পুনর্বিন্যাস করতেন, গির্জার না গিয়ে যারা ল্যাবরেটারি বা লাইব্রেরিতে গিয়ে আবিষ্কার করতে মরিয়া, থিওলজির (Theology) পরিবর্তে যারা ফিলসফি (Philosophy) চর্চা করেন, মানুষের অধ্যয়নের বিষয় যে মানুষ এই মনবতা যারা প্রচারিয়ে যান ও মানবনিয়তির ধ্যানে যারা বিভোর থাকেন, তাঁরাই হিউম্যানিস্ট ও তাঁদের এই মতবাদই হিউম্যানিজম’ (রায়, ১৯৫৪)। সে দৃষ্টিকোন থেকে প্রমথ চৌধুরী একজন সাচ্চা হিউম্যানিস্ট।
অবশ্য গৌতম বুদ্ধের মত প্রমথ চৌধুরীর কাছে মানব-জীবন ধ্যানের বিষয় নয় বরং সেটি অধ্যয়নের বিষয়। লালন ফকির বা রবীন্দ্রনাথের মতও হয়ত মানব জীবন তাঁর কাছে অনুভবের উপকরণ নয়, বিচার বিশ্লেষণের উপকরণ। তিনি হৃদয়ের শিকড় চালিয়ে মানব রস আহরণ করেননি, বুদ্ধির যন্ত্রে মানব রস নিষ্কাশিত করেছিলেন। জীবনের রূপ-রস-রঙের অন্ধ পূজারী প্রমথ চৌধুরী নন, বরং মানব জীবনের সত্যরূপের অনুসন্ধানই প্রমথের একমাত্র লক্ষ্য। সেজন্য জনৈক অতুলচন্দ্র চৌধুরী রহস্য করে বলেছিলেন-
“ছয়কোটি বাঙালির মধ্যে প্রমথবাবু চার কোটি লোককে চেনেন”(রায়, ১৯৫৪ তে উল্লিখিত)।
প্রমথ চৌধুরী যুগধর্মের পতাকাবাহী একজন প্রাবন্ধিক। সুতরাং তাঁর সাহিত্যে বুদ্ধির-মননের লীলাখেলা অনিবার্য। তার কাছে জীবনের উন্নতি ও অবনতির কৃতিত্ব ও দায় ঈশ্বরের ঘাড়ে না চাপিয়ে, তিনি বলতে চেয়েছেন মানবের ইচ্ছা শক্তিই মানবের উন্নতি ও অবনতির মূল কারণ। সেদিক থেকে বলা যায় প্রমথ চৌধুরী হয়ত কার্ল মার্ক্সের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism) এ বিশ্বাস স্থাপন করে থাকবেন। প্রাণের ধর্ম যে প্রকৃতি ও সমাজ থেকে রস সংগ্রহ করে জীবন প্রবাহ রক্ষা করা, নব নব সৃষ্টির দ্বারা সৃষ্টি রক্ষা করা, এটিই তাঁর কাছে স্বীকৃত। সুতরাং সে বিবেচনায় প্রমথ চৌধুরী একজন মননশীল ও সৃষ্টিশীল লেখক। সজল হৃদয়বৃত্তি নয়, তীক্ষ ও উজ্জ্বল বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে তিনি পৃথীবিকে, মানুষের মনোবৃত্তিকে, মানুষের সমাজ ও সভ্যতা-সংস্কৃতিকে দেখেছেন এবং বিচার করেছেন।
প্রমথ চৌধুরী নিজ নামের পাশাপাশি বীরবল ছদ্মনামে লিখতেন। তাই তিনি এই ছদ্মনামে সমাধিক পরিচিত। তাঁর সাহিত্য আজ বীরবলী সাহিত্য, তাঁর লিখার স্টাইল আজ বীরবলী স্টাইল বলে পরিচিত। উল্লেখ্য, বীরবল সম্রাট আকবরের সভাকবি ও সেনাপতি হলেও তাঁর পারদর্শীতা ইতিহাসে যোদ্ধা হিসেবে নয়; বরং রাজসভার বিদূষক হিসেবেই প্রসিদ্ধ ছিল। বীরবলের রসময় ও চাতুর্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তি(Wit), বাকপটুতা, ব্যঙ্গতামাশা আকবরের রাজদরবারে খুবই গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ ছিল। রাজসভার বীরবল যেমন আকবরের নবরতেœর একজন ছিল, প্রমথ চৌধুরীও বাংলা সাহিত্যে তেমনি এক রতœ যিনি ‘বাঙালি জাতির একজন শ্রেষ্ঠ বিদূষক’। রসিকতাচ্ছলে তিনি অনেক সত্য কথা বলতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। গম্ভীরভাবে বললে যে কথা মোটেও সহ্য হয় না, হাসিমুখে তিনি সেটা বলে দিতেন বলেই তিনি বাংলা সাহিত্যের বীরবল। তাঁর লিখার একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো- জীবনের অসঙ্গতির আবিষ্কারে, তার নতুন মূল্যায়নে, যুগধর্মের স্বরূপ বিচার-বিশ্লেষণে, সংক্ষিপ্ত বিদ্রুপাত্মক উক্তি (Epigram) ও আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও সত্যবর্জিত নয় এমন বচন (Paradox) রচনায় তাঁর মুন্সিয়ানা ছিল। যেমন তিনি বলেছেন- “যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শুন্য, সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী। তার পর যে জাতি মনে বড়ো নয়, সে জাতি জ্ঞানেও বড়ো নয়; কেননা ধনের সৃষ্টি যেমন জ্ঞান সাপেক্ষ, তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টিও মনসাপেক্ষ(‘বই পড়া’ প্রবন্ধ)।”
আবার ‘হালখাতা’ প্রবন্ধেও এমন Paradox এর উদাহরণ পাই। প্রবন্ধের একটি জায়গায় তিনি বলেছেন- “পৃথিবীতে মানুষের উপর মানুষ অত্যাচার করবার জন্য দুটি মারাত্মক জিনিসের সৃষ্টি করেছে, অস্ত্রশস্ত্র ও শাস্ত্র।”
এভাবে তাঁর মতামত ও কথোপকথনকে বুদ্ধির তুলিতে বিদ্রূপের কালিতে চিত্রিত করে পাঠকের বুদ্ধিকে তিনি আকৃষ্ট করতে চেয়েছেন। সেদিক থেকে তাঁর লেখার গায়ে কাঁটা থাকলেও মাথায় মধুহীন গন্ধহীন ফুল দেখে পাঠক অবশেষে আত্মতৃপ্ত হবেন। তাঁর সাহিত্যের মজলিশী রস অমার্জিত নয়- সুরুচি ও আভিজাত্যের স্পর্শ আছে তার মধ্যে। তিনি সাহিত্যে কৌতুক পছন্দ করেন, যে কৌতুককে রসিকতা(Humour) না বলে রসময় ও চাতুর্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তি (Wit) বললে বেশি অর্থবহ হয়। তাঁর এই Wit এর উদ্দেশ্য একদিকে যেমন ছিল লোক হাসানো, তেমনি লোকভাবানোও। যেমন কৌতুক(ডরঃ) ভরে তিনি বলতে পারেন- “কোনো কোনো লোক যেমন সংসারের প্রতি বীতরাগ হয়ে বনে গমন করেন, আমিও তেমনি সংসারের প্রতি বীতরাগ হয়ে লাইব্রেরীতে আশ্রয় নিয়েছি (‘বই পড়া’ প্রবন্ধ)।”
প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধে দেখি, রূপ-সৌন্দর্য, জ্ঞান ও সভ্যতার জয়গানের সুযোগ যখনই এসেছে তখনই তিনি তা গ্রহণ করেছেন। বাঙালির মধ্যে যে মধ্যে‘তেল-নুন-লাকড়ি’, ‘নানাকথা’, ‘বীরবলের হালখাতা’, ‘আমাদের শিক্ষা’, ‘বীরবলের টিপ্পনী’, ‘রায়তের কথা’ ইত্যাদি অনন্য। রবীন্দ্রযুগে তাঁর আবির্ভাব, কিন্তু তাঁর প্রবন্ধসাহিত্যের বিষয়বস্তুু আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল; এমনকি তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথকেও প্রভাবিত করেছিলো। ভীরুতা, অক্ষমতা ও প্রচলিত ব্যবস্থাকে আঁকড়ে থাকার প্রবণতা রয়েছে তা মুছে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পেয়েছেন,(‘হালখাতা’), ঘোর অমাবশ্যার মেঘাচ্ছন্ন রাত্রির আকাশে বিদ্যুৎ যেমন আশা জাগায় এমনি ভারতবর্ষের কান্নাভেজা সাহিত্যাকাশে হাস্যরস ছড়িয়ে দিয়ে বাঙালির ভাগ্যাকাশ আলোকিত ও শোভিত করে আশা জাগাতে চেয়েছেন,(‘খেয়াল-খাতা’), বঙ্গসাহিত্যের ভাষাকে সুকুমার করার প্রত্যয়ে লেখকরা যাতে অপ্রচলিত শব্দে রচনাকে কর্কশ না করে ভাষাকে সহজ, সুস্থ ও সাবলীল করার অভিপ্রায় গ্রহণ করেন সেই পরামর্শ দিয়েছেন,(‘মলাট সমালোচনা’), কিশলয়ের বাহক ও জীবনের পূর্বরাগের বেগুণি রঙ, অনন্তের তাৎপর্যমÐিত নীল রঙ, জীবনের পূর্ণরাগের লাল, এবং রসের, প্রাণের, সতেজতার ও সরসতার লক্ষণ প্রকাশক সবুজ রঙের প্রশংসা করেছেন,(‘সবুজ পত্র’), প্রকৃতি ও সমাজের জীবন জীবনপ্রবাহকে নিজের অন্তরে টেনে নিয়ে মনের যৌবনকে অক্ষয় করতে চেয়েছেন,(‘যৌবনে দাও রাজটিকা’), প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতেও জীবনের রূপ-রস সংগ্রহের মনোরঞ্জনের খেলায় অবচেতন মনে খেলতে চেয়েছেন,(‘সাহিত্যে খেলা’), কাব্য-কলার চর্চায় রুচি, পরিষ্কৃত বুদ্ধি, সংযত ভাষা ও বিনীত ব্যবহার আয়ত্ত করে জাতিকে রাঙিয়ে দিতে চেয়েছেন,(‘বই পড়া’), মুষ্টিমেয় স্বার্থবাদীদের স্বার্থে কুঠারাঘাত করলেও রসিকতাচ্ছলে সত্যকে সামনে ছোড়ে দেয়ার আর্টের গুণে নিজে গুণান্বিত হয়ে আত্মতৃপ্ত হয়েছেন,(‘বীরবল’), বীণার মত ভাব প্রকাশক না হয়ে বীণাবাদকের মত ভাব উদ্রেগ কাজকে অধিকতর মহৎ বলে স্বীকার করেছেন(‘বঙ্গ সাহিত্যের নবযুগ’)।
প্রমথ চৌধুরী মানুষের মনকে সবল, সচল, সরাগ ও সমৃদ্ধ করার ভার আজকের দিনের সাহিত্যের উপর ন্যস্ত করেছেন। তবে বর্তমান আর্টবর্জিত তথাকথিত সাহিত্যতাঁর সমালোচনা থেকে রক্ষা পায় নি। সে সম্পর্কে তাঁর নিঃশঙ্কোচ উচ্চারণ- “এ যুগের সাহিত্যমাত্রেই রোমান্টিক, অর্থাৎ তাতে আর্টের ভাগ কম এবং আত্মার ভাগ বেশি”(‘বই পড়া’)। তিনি আরো বলেছেন- “আমাদের নবসাহিত্যের যেন-তেন-প্রকারেণ বিকিয়ে যাবার প্রবৃত্তিটি যদি দমন করতে না পারা যায়, তা হলে বঙ্গসরস্বতীকে যে পথে দাঁড়াতে হবে সে বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহ নেই।”(‘বঙ্গ সাহিত্যের নবযুগ’)।
ফলে তিনি বর্তমান যুগের সাহিত্যের দেশপ্রেম, বিদ্রোহ, বস্তুবাদ, মানবতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবোধ নামক বৈশিষ্ট্যের প্রসংসা করলেও ‘বটতলার পুঁথি’র ন্যয় কিছু বস্তাপঁচা সস্তা কথায় ভরা নৈতিকতাহীন ও রুচিবর্জিত সাহিত্যকে ছোড়ে ফেলেছেন। মনের চাহিদা মেটাতে এ যুগের বাণিজ্য নির্ভর সাহিত্য ব্যর্থ হলে দরকার হলে পুরাকালের ক্যাসিক্যাল সাহিত্যে আছড়ে পড়তেও অনিচ্ছা নেই তাঁর। তিনি জানেন পৃথীবিতে সুরুচির দাম কম নয়। তাঁর ধারণা পাঠক যদি পুরাকালের ক্লাসিক্যাল সাহিত্যে মাঝে মাঝে ডুব দিত তাহলে সে “পুরাকালের সাহিত্য মানুষকে নীতিমান না করলেও রুচিমান করত।”
প্রমথ চৌধুরী জ্ঞানার্জন ও সাহিত্য চর্চার জন্য লাইব্রেরীকে যতটুকু গুরুত্ব দিয়েছেন আর কোনো সাহিত্যিক এত গুরুত্ব মনে হয় দেননি। তাঁর মতে- ধর্ম চর্চা চাইলে মন্দির-মসজিদের বাইরে করা চলে, দর্শনের চর্চা গুহায়, নীতির চর্চা ঘরে, বিজ্ঞানের চর্চা যাদুঘরে, কিন্তু সাহিত্যচর্চার জন্য চাই লাইব্রেরী। সাহিত্যচর্চার সে উদ্দেশ্য যাদুঘরেও সাধন হবে না, চিড়িয়াখানায়ও হবে না। নিশ্চই তিনি যথার্থ কথা বলেছেন। কারণ শিক্ষা কেউ কাউকে গিলিয়ে দিতে পারেনা। যদি অনিচ্ছায় জোর করে গিলানো হয়, তাহলে অরুচিকর সেই খাদ্যটির গলাধঃকরণের ফলে বমির উদ্রেগ করবে। তাছাড়া “সুশিক্ষিত লোক মাত্রেই স্বশিক্ষিত”। আবার এটাও সত্য- “বিদ্যার সাধনা শিক্ষার্থীকে নিজেই গ্রহণ করতে হয়, গুরু উত্তরসাধক মাত্র”(‘বই পড়া’)। সেজন্য লাইব্রেরি হচ্ছে সেই যায়গা যেখানে পাঠক তাঁর নিজের মনের শক্তি ও অভিরুচি অনুযায়ী নিজের মনকে আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আমাদের দেহ অসুস্থ হলে দেশে হাসপাতাল আছে। কিন্তু মন অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা কোথায় পাবো? পরিবারিক বন্ধনের শৈথিল্য ও অন্যান্য সামাজিক মূল্যবোধের ভাঙনের যুগে ব্যাক্তি মানুষ একাকীত্বে আক্রান্ত হলে কিংবা নষ্ট সমাজব্যবস্থার এই বিকৃতির যুগে মানব মন মনঃপীড়ায় আক্রান্ত হলে, তার চিকিৎসার জন্য লাইব্রেরীকে তিনি মনের হাসপাতাল রূপে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন।
প্রমথপূর্ব যুগে বাংলা সাহিত্যে লেখকদের একটি প্রবণতা ছিলো। চলিত ভাষায় তাঁরা সাহত্যচর্চায় হীনমন্যতায় ভুগতেন। লেখকরা সাধারণের মুখের ভাষাকে অবহেলা করে সংস্কৃত থেকে শব্দ চয়নে, ইংরেজি থেকে ভাব আমদানিতে ভাষার আভিজাত্য খুঁজে পেতেন। কিন্তু এমন তথাকথিত আমদানি নির্ভর ধার করা ভাব ও ভাষার পরিবর্তে প্রমথ চৌধুরী সাধারণের ভাব ও মুখে প্রচলিত ভাষার পক্ষপাতিত্ব করেছিলেন । সেজন্য তিনি বলেন- “ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ হতে মানুষের মুখে নয়। উল্টোটা চেষ্টা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে” (‘কথার কথা’ প্রবন্ধ)। ভিন্নদেশ থেকে আমদানিকৃত ভাব ও পুরাকালের ভাষার অপ্রচলিত শব্দে (যেমন- সংস্কৃত গুরুগম্ভীর শব্দে) বাংলা সাহিত্যের ভাব যে ঠিকমত ফুটে উঠতে পারছে না সেটি তিনি আঙ্গুল দিয়ে সমকালের সাহিত্যিকদের দেখিয়ে দেন। যার বদৌলতে তাঁর হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষারীতির প্রবর্তন ঘটেছে। এভাবে তিনি বাপ-ঠাকুরদাদাদের ভাষা বাদ দিয়ে অপ্রচলিত ও গুরুগম্ভীর সংস্কৃত কথা ব্যবহার করে বঙ্গসরস্বতীর কানে পরের সোনা পরাতে অস্বীকার করে বাংলা সাহিত্যে এক বিদ্রোহই করে বসেন।
প্রমথ চৌধুরী বাঙালি মনের একজন অদ্বিতীয় পর্যবেক্ষক। তাঁর সময়ে বাঙালিকে তিনি অর্ধেক অকালপক্ষ ও অর্ধেক কচি পেয়েছেন। অর্ধেক কচি রয়ে যাওয়ার কারণটিও তিনি অনুধাবন করেন বাঙালির চারপাশের বস্তুজগতকে পর্যবেক্ষণ করেই। এক্ষেত্রে তিনি হয়তবা মার্ক্সবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে তিনি পেয়েছেন- এই জাতির অন্তরের পুরুষটি যে পাকা না হয়ে কচি বা সবুজাভ হয়েছে তার কারণ তার চার পাশের বস্তুজগৎ সবুজে ঠাসা। যে সবুজ এদেশের বনস্পতিতে নিত্য বিকশিত হয়ে উঠেছে নিশ্চই সেই একই বর্ণ বাঙালির মনকেও কচি ও সবুজ করে রাঙিয়ে দিয়েছে। এজন্যই সজিবতা ও সরসতাই বাঙালি মনের স্বভাবগত ধর্ম(সবুজপত্র)। এভাবে তিনি তাঁর বস্তুবাদী দর্শনে প্রকৃতির সজিবতা ও বাঙালি মনের সরলতা ও কোমলতার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
প্রমথ চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ হলো- বাঙালির আত্মা আজো গড়ে ওঠেনি (বর্তমান বঙ্গসাহিত্য)। বাঙালি আত্মার এ অবস্থাটির জন্য যে বিজ্ঞানসম্মত কারণটিতিনি খুঁজে পেয়েছেন সেটি হলো-সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চায় ডুব না দেওয়া। সাহিত্যচর্চা জতির আত্মা গঠনের একমাত্র উপায় না হলেও একটি প্রধান উপায়। আমরা জানি, মানুষের দেহ যেমন দৈহিক ক্রিয়াগুলোর(যেমন-ব্যায়াম, খেলাধুলা ও হাঁটা-চড়া) মাধ্যমে গড়ে উঠে, মানুষের মনও তেমনি মানসিক ক্রিয়ার সাহায্যে গড়ে উঠে। জাতীয় আত্মা যেহেতু আবিষ্কার করবার বিষয়বস্তু নয়; নির্মাণ করবার বস্তু। তাই এ জাতির আত্মাকে দৃশ্যমান করার জন্য উদ্যম ও প্রযত্নের প্রয়োজন অনুভব করেছেন। আর এ ধরণের প্রযত্নের উপকরণ বা হাতিয়ার হবে সাহিত্য। তাঁর বিশ্বাস বঙ্গসাহিত্যকে যদি দু’চারজন লোকের দখলে না রেখে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া যায় তবেই বাঙালি জাতির মনন গড়ে উঠবে। ‘বঙ্গসাহিত্যের নবযুগ’ প্রবন্ধে নব সাহিত্যকে রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করেছে দেখে বীরবলকে তাই কিঞ্চিত হলেও আনন্দিত হয়েছেন বলে প্রতিয়মান হয়েছে।
প্রমথ চৌধুরী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন, তা সত্যি অনন্য।যশোহরে জন্মগ্রহণকারী এই উদার ও সংস্কারমুক্ত মানুষটি জ্ঞানের পথে ছিলেন নাব্য এক ভরা নদী। লিখার জন্য তিনি অনেক সময় পেয়েছেন, কিন্তু লিখেছেন কম। তাঁর রচিত প্রবন্ধের সংখ্যা কম হলেও সেগুলো আভিজাত্যে ও রুচিতে স্বতন্ত্র। তাঁর রচিত প্রবন্ধগ্রন্থসমূহের সেজন্যই বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষারীতির প্রবর্তক এবং বিদ্রূপাত্মক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বীরবলী এই প্রাবন্ধিক বাংলা সাহিত্যবৃক্ষের প্রবন্ধ শাখার সবুজপত্র হয়েই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি :
চৌধুরী, প্রমথ(২০১৬).নির্বাচিত প্রবন্ধ. ঢাকা: জয় প্রকাশ.
চৌধুরী, প্রমথ(২০১৬). প্রবন্ধ সংগ্রহ. ঢাকা: বিভাস.
চৌধুরী, প্রমথ(২০১৭). বীরবলের হালখাতা. ঢাকা: বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র.
রায়, জীবেন্দ্র সিংহ(১৯৫৪). প্রমথ চৌধুরী. কলিকাতা: ক্যালকাটা বুক ক্লাব লিমিটেড.
