” বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বীর মুক্তিযোদ্ধা তথা জাতির বীর সন্তানেরা কোন পরিবার বা গোষ্ঠীর নয় তারা পুরো বাঙ্গালী জাতির  অহংকার  “

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের একটি অমূল্য দলিল 

বীর মুক্তিযোদ্ধা এখলাছ আহমেদ কোরায়শী

বিচ্ছিন্ন বাঙালি, বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ, এর সার্বভৌমত্ব,- তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রদানে , কিংবা স্বাধীনতা দিতে গিয়ে – অফুরন্ত মেধা-শ্রমের মাধ্যমে , সুচিন্তিত যত কর্ম-কান্ড হয়েছে, এর দ্বারা দেশ ও বাঙালি জাতির যত হিত-সাধন হয়েছে, এতদ সংক্রান্ত যাবতীয় প্রসংশা- একমাত্র মহাকালের মহা নায়ক, সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জন সভায় বক্তৃতা-দানকারী- জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  ( ০৬/০২ / ১৯৭২ রবিবার কোলকাতা প্যারেড গ্রাউন্ডে ত্রিশ লক্ষ মানুষের জন সমাবেশ)। তেমনি- বাংলা- বাঙালি -মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব নগর যেন এক অভিন্ন নাম ।                              

১৯৪৮ সনে ১৪ আগস্ট- শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স মাত্র ২৮ বৎসর ৪ মাস ২৭ দিন । ১৯৪৮ সালের ১২ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান এই বয়সে ” ইত্তেহাদ ” পত্রিকায় যে বিবৃতি দিয়েছিলেন , তা ছিল নিম্ন রূপ :–

“পত্রিকার শিরোনাম ।

 * পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা দিবসে– ছাত্র সম্প্রদায়ের কর্তা- বিশিষ্ট লীগ কর্মী, শেখ মুজিবুর রহমানের বিবৃতি “

ঢাকা অফিস হতে প্রাপ্ত ::– ঢাকা ১২ই আগস্ট ।

অধুনা  বিলুপ্ত বঙ্গীয় প্রাদেশিক লীগ কাউন্সিলের সদস্য ও পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা- শেখ মুজিবুর রহমান নিম্নোক্ত বিবৃতি দিয়ে বলেছেন-

“১৯৪৭ সালের ১৪ আগসট আমরা যে আজাদী লাভ করিয়াছি, সেটা গণ আজাদী নয়, তা একটি বছরে সুষ্পষ্টভাবে প্রকাশিত হইয়াছে । জাতীয় মন্ত্রীসভা দীর্ঘ একটি বছরে জনগণের দুইশ বছরের পুঞ্জিভূত দুঃখ-দুর্দশা মোচনের চেষ্টা তো করেনই নাই- বরং সেই বোঝার উপর অসংখ্য শাঁকের আঁটি চাপাইয়াছেন । ভূখা- বিবস্ত্র- জরাগ্রস্থ ও শত অভাবের ভারে ন্যুব্জ জনসাধারণের ভাত-কাপড় , ঔষধ পত্র ও অন্যান্য নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যের কোন ব্যবস্থা তারা করেন নাই, বরং পাট, তামাক, সুপারী, ইত্যাদির উপর নয়া ট্যাক্স বসাইয়া ও বিক্রয় কর বৃদ্ধি করিয়া জনগণের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিসহ করিয়া তুলিয়াছেন । বিনা খেশারতে জমিদারী বিলোপের ওয়াদা খেলাপ করিয়া তারা জমিদার ও মধ্যস্বত্ব ভোগীদিগকে পঞ্চাশ- ষাট কোটি টাকা ক্ষতি পূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করিতেছেন । নুতন জরিপের নাম করিয়া তারা জমিদারি প্রথার সম্পূর্ণ বিলোপের আট বছর স্থগিত রাখার ষড়যন্ত্র করিতেছেন । শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার উছিলায় দেশভক্ত লীগ

কর্মীদের বিনা বিচারে কয়েদখানায় আটকাইয়া রাখিতেছেন । রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মুসলীম ছাত্র সমাজের উপর এবং আরো কতিপয় ক্ষেত্রে জনতার উপর লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার করিয়া এবং গুলি চালনা করিয়া- তারা আজাদীকে কলংকিত করিয়াছেন । আজ সেই মন্ত্রী সভাই উৎসবের সাময়িক সমারোহের দ্বারা নিজেদের অথর্বতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা  ঢাকিবার প্রয়াস পাইতেছেন । বস্তুত গণ আজাদীর পরিবেশ সৃষ্টি না করিয়া- আজাদীর উৎসব পালন করিতে যাওয়া এবং বন্যাক্লিষ্ট পীড়িত মরণমুখ জনগণকে সেই উৎসবে শরীক হইতে বলা , নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয় । এই প্রহসনে আত্মপ্রতারিত নেতারাই সন্তুষ্ট থাকিতে পারেন । জনতা বিশেষ করিয়া সচেতন ও জাগ্রত ছাত্র ও যুব সমাজ উহার দ্বারা বিভ্রান্ত হইবেনা , বরং পুর্ণ আজাদী লাভের চিন্তাই করিবে।”                  

১৯৪৮ সাল ১২ আগস্ট এই বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমে ২৮ বৎসরের যুবক শেখ মুজিব যে, নুতন করে স্বাধীনতা লাভের আকাঙ্খার কথা পরোক্ষে ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিলেন । এই জন্যেই আমি বলি – শেখ মুজিব প্রকৃতিগত নেতা । আমার মনে হয় – তৎকালীন সুবিধাবাদী চক্রের অদূরদর্শি নেতাদের পক্ষে সেই বিবৃতির বক্তব্যের তাৎপর্য্য বুঝে উঠা কঠিন হলেও , পরবর্তিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট- আয়ুব খানের বুঝতে অসুবিধা হয়নি । (সংক্ষেপিত)

Scroll to Top