বাউলের গানে যার বন্দনা
মো: রফিকুল ইসলাম
ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আর তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শত শহীদ বুদ্ধিজীবী। মুক্তির সংগ্রামে সমগ্র দেশজুড়ে সেসব বুদ্ধিজীবীগণ দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য কীভাবে আত্মোৎসর্গ করেছেন এবং কীভাবে জনগণ শ্রদ্ধাভরে শহীদদের আত্মত্যাগকে হৃদয়ে ধারণ করে শোকে মুহ্যমান হয়েছেন এবং কীভাবে শহীদ স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন- তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও মূর্ত প্রতীক শহীদ প্রভাষক আরজ আলীর আত্মদান ও জীবনী নিয়ে রচিত অদ্বিতীয় এই গানটি-
কই গেলা ভাই আরজ আলী?
তোমার জন্য কান্দিতেছে শত শত বাঙালি।
আল্লাহতালার রহমে, জন্ম নিলা নওয়াপাড়া গ্রামে;
পাশ করিলে বিএ, এমএ, ফুটলো দেশে গোলাপকলি।।
এই ফুলের মকরন্ধে, মোহিত করেছে গন্ধে;
মনেরই আনন্দে- গেয়ে ফিরে ভ্রমর অলি ।।
করলেন তিনি প্রফেসারী, দেশ-বিদেশে নামজারী;
পাগল হইয়া পুরুষ-নারী-দিতো কত পুষ্পাঞ্জলি ।।
আরেক কথা মনে উঠে, কইতে কলিজা ফাটে!
পাকিস্তানের পাল্লায় উঠে-
এই দেশেরই শয়তানগুলি,
এই দেশেরই শয়তানগুলি!
এই দেশেরই শয়তানগুলি।।
যুক্তি করে সেই কয়জনা, দেশে যোগ্য লোক রাখবোনা;
এই সাহেবকে মারলো নিয়া করিয়ে রাইফেলের গুলি।।
মৃত্যুকালে সাহেব বলে, ওগো আল্লাহ,
তুমি স্বাধীন করিও সোনার বাংলা!
জঁপতে জঁপতে ইল্লাল্লাহ, স্বর্গপুরে গেলেন চলি ।।
তাঁর মৃত্যুর খবর শুনি, কাঁদে মা গর্ভধারিনী;
কাঁদে তাঁর ভ্রাতা-ভগ্নী, আর যত বংশাবলী।।
আমি বাউলার মনের ব্যথা, ভুলতে না’রি ওনার কথা।
হাসরের দিন বিধাতা, দেখাইও তাঁর রূপাঞ্জলি।।
কই গেলা ভাই আরজ আলী?
তোমার জন্য কান্দিতেছে শত শত বাঙালি।
দুর্গাপুরের বিশিষ্ট বাউল নবী হোসেনের বরাতে জানা যায় যে, শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রভাষক আরজ আলীকে হারিয়ে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পুরো নেত্রকোণা ব্যাপী যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং দেশপ্রেমী সর্ব স্তরের ছাত্র-শিক্ষক-জনতা যখন আহাজারি আর শোকে মূহ্যমান, ঠিক তখনই নেত্রকোণার খাটপুড়ার বিখ্যাত বাউল চান মিয়া উদ্যোগ গ্রহন করেন এই গানটি রচনা ও প্রচার করার। সেই উদ্দেশ্যে তিনি খাটপুড়ায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিশিষ্ট বাউল আবেদ আলী, ঈদ্রিছ আলী, নবী হোসেনসহ নেত্রকোণার প্রখ্যাত সব বাউলদের। সেই আসরে শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রভাষক আরজ আলীর জীবনী, ব্যক্তিত্ব এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তার বীরোচিত আত্মত্যাগের কাহিনী ভিত্তিক বিরল এই গানটি রচিত ও সুরারোপিত হয়। স্বাধীনতার পর প্রায় একযুগ ধরে এ গানটি সমগ্র নেত্রকোণা ও বর্তমান উত্তর-পূর্ব ময়মনসিংহের বিভিন্ন বাউল গানের আসর ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আসরে ব্যপকভাবে এ গানটি গাওয়া হতো। কখনো বাউল শিল্পীগণ এ গানটি গাইতে ভুলে গেলে জনতার কাছ থেকে অনুরোধ আসতো এই গানটি গাওয়ার জন্য। শুধু তাই নয়, এই গানের অনুসরণে অনেক কবিয়াল ও লোকশিল্পীগণ কবিতা ও পুথি রচনা করে হাট-বাজারে ও ট্রেনে গাইতেন ও বিক্রি করতেন। সে সময়ে এ গান-কবিতা শুনে অনেকেই যে অশ্রæপাত করতেন তা বলাই বাহুল্য। মুক্তিযুদ্ধের একজন শহীদের ব্যক্তিনামের উপরে লেখা এ গানটি সর্বপ্রথম ‘বাংলাদেশ বেতার’ এর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিতে পড়ে ২০০১ সনে। ঐ সনে বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সক্রিপশন্স সার্ভিস শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রভাষক আরজ আলীর জীবনী ভিত্তিক যে নাটকটি সুসঙ্গ মহাবিদ্যালয়ের মাঠে মঞ্চস্থ করেছিল তার নামকরণ করা হয়েছিল – ‘বিজয়গাথা আরজ আলী- সব বাউলের একতারাতে’। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রায় অর্ধলক্ষ দর্শক পিনপতন নীরবতায় সেদিন বাউল নবী হোসেনের কন্ঠে সেই গানটি শুনে শোকার্ত ও বিমুগ্ধ হয়েছিলেন।
শোকে ও শ্রদ্ধায় সমস্ত শহীদদের উদ্দেশ্য করে বাংলাদেশে অনেক গান রচিত হয়েছে, কিন্তু শুধু একজন শহীদকে উদ্দেশ্য করে তার ব্যক্তিনামের উপরে এ গান ব্যতীত আর কোন গান রচিত হয়েছে কিনা তা অদ্যাবধি জানা যায়নি। সেদিক থেকে বাংলাদেশে শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রভাষক আরজ আলী অদ্বিতীয়। অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়ায় ফাঁসি হয়েছিল ক্ষুদিরাম বসুর। তিনি পান শহীদের মর্যাদা। কিন্তু লোককবি পীতাম্বর দাস মতান্তরে মুকুন্দ দাস তাকে নিয়ে যে গান রচনা করেছিলেন, যা ১৯৬৬ সালে গেয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত গায়িকা লতা মঙ্গেশকর। যার ফলেই সেই গানের আবেদন এবং শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ ব্যাপী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের কোন জাতীয় পর্যায়ের গায়ক-গায়িকা যদি শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রভাষক আরজ আলীকে নিয়ে বাউল চান মিয়া রচিত গানটি গাইতেন- তাহলে নিশ্চয়ই এ গানের আবেদন এবং শহীদের পরিচিত সমগ্র বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে যেতো।
বস্তুতপক্ষে একজন মানুষ কতটুকু শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করলে তার নামে শোক, শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় গান রচনা হতে পারে সেটিই বিবেচ্য বিষয়। মহামানবের খ্যাতি ছাড়া সেটি খুবই বিরল। মাত্র আটাশ বছরের একজন তরুণ প্রভাষক মানবিকতা, নৈতিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও দেশপ্রেমের অনন্য নজীর স্থাপন করে সেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। অতি সংক্ষেপে তার জীবনীটা জানলেও তা উপলব্ধি করা সম্ভব।
১৯৪৫ সালে সুসঙ্গ দুর্গাপুরের নওয়াপাড়া গ্রামে এক অসাম্প্রদায়িক আবহে শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রভাষক আরজ আলী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছাত্র হিসেবে মেধাবী আরজ আলী নওয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করে ভর্তি হন এন জারিয়া ঝাঞ্জাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৬১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয়ে। ভাল ফলাফল দেখে ১৯৬৩ সনে প্রিয় শিক্ষকদের অনুরোধে একই কলেজের প্রথম ব্যাচে বিএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সনে কৃতিত্বের সাথে বিএ পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইপ্সিত বিষয় দর্শনশাস্ত্রে। যথারীতি কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৭ সালে দর্শনশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চ শিক্ষা লাভ করেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিরহংকারী, ন্যায়পরায়ণ, অসাম্প্রদায়িক, অধিকার সচেতন, প্রতিবাদী, সংস্কৃতিপ্রেমী, দয়ালু ও পরোপকারী। তাঁর এই গুণাবলীর সুবাস ছড়িয়েছেন তিনি আমৃত্যু। এসব কারণেই ছাত্রবেলা থেকে তার সংস্পর্শে আসা প্রতিটি মানুষই ছিলেন বিমোহিত, বিমুগ্ধ। এসব বৈশিষ্ট্য ধারণ করেই ১৯৬৪ সালে স্নাতক শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় তিনি নিজ এলাকার যুবকদের সাথে নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে ভুমিকা রেখে নজর কাড়েন। ১৯৬৫ সালে আইয়ুবের দোসর স্থানীয় বিডি মেম্বারদের দুর্নীতি প্রতিরোধ করে তার সাহসিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় দেন। যতটুকু জানা যায়, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন থেকেই তিনি প্রচ্ছন্ন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সদস্য পদ লাভ করেন। তিনি ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ডাকসু ইকবাল হল শাখা সংসদে ১ নম্বর কার্যকরী সদস্য পদ অলংকৃত করেন। যে সংসদের ভিপি ছিলেন জননেতা তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধু প্রণীত ছয় দফার তিনি ছিলেন অন্ধভক্ত। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে শরীক হওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজ সংসদীয় এলাকায় ছয় দফা আন্দোলনের অন্যতম প্রচারক ও সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করেই বেশ ক’জন সহপাঠী ও বন্ধুদের সাথে ১৯৬৮ সালে(প্রতিষ্ঠিত) ঈশ্বরগঞ্জ কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে তিনি নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন। এই দু’টো প্রতিষ্ঠানেই অধ্যাপনা করাকালে প্রভূত জনপ্রিয়তা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন সর্বমহলের।
ছয় দফা প্রচারের ধারাবাহিকতায় তিনি দুর্গাপুরে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পরিচালনার সফল নেতৃত্ব দেন। তিনি ছিলেন ‘ছাত্রশিক্ষক-জনতা সন্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ এর আহবায়ক। সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দীন তালুকদার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজীজের ভাষ্য থেকে জানা যায় এ সময় তিনি সুসং মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন এই কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল প্রস্তাবক এবং প্রথম চাঁদা দাতা। ১৯৭০ এর নির্বাচনে পূর্বের সখ্যতা ও ঘনিষ্ঠতা সূত্রে- সাবেক এমএনএ এডভোকেট সাদির উদ্দিন এবং এমপিএ আব্দুল মজিদ তারা মিয়া প্রতিটি নির্বাচনী জনসভায় তাকে নেত্রকোণা থেকে সাথে করে নিয়ে যেতেন এবং তিনি সে সমস্ত জনসভায় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে ভাষণ দিতেন।
জনতাকে সংগঠিত করার প্রক্রিয়ায় তার বাড়িতে গণ জমায়েত করে-বেতারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শোনানোর আয়োজনও করেছিলেন তিনি। তখন থেকেই তিনি ঘনিষ্ঠ তরুণ-যুবা-ছাত্রদের বোঝাতে শুরু করেন যে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছাড়া আমাদের কোন বিকল্প নেই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর এ প্রভাষক প্রতিবেশী এক ভাতিজির নাম রাখেন ‘রাষ্ট্রন্নেসা’ আর আপন ভাতিজার নাম রাখেন ‘মুজিব’। তিনি সর্বপ্রথম তার বাড়িতে অবস্থানকারী আপন ভাগ্নে ওয়াজেদ বিশ্বাস, প্রতিবেশী-ভাতিজা আ: জব্বার মুনসী এবং পড়শী গ্রামের মতীন্দ্রকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠান। এ ধারা অব্যাহত ছিল আমৃত্যু।
দুর্গাপুরের প্রবীণতম বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব খলিফার বরাতে জানা যায় যে ১ মে ১৯৭১ তারিখে বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএ আমীর উদ্দীনের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এক গোপন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়, যে মিটিংএ অত্র সংসদীয় এলাকার এমএনএ, এমপিএ, থানা ও মহকুমা নেতৃবৃন্দের সাথে শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রভাষক আরজ আলীও উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকে তিনি অত্র এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহে, উদ্বুদ্ধকরণে এবং নিরাপদে ভারত গমনে তিনটি গ্রহনযোগ্য প্রস্তাব রাখেন। প্রস্তাব তিনটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলে এমএনএ এডভোকেট সাদির উদ্দীন আহমেদ প্রভাষক আরজ আলীকে বলেন, ‘সমগ্র নেত্রকোণা জুড়ে আপনার ভক্ত ছাত্রসমাজ। আপনি ভেতরে থেকে খুবই কৌশলে ও নিরাপত্তার সাথে ছাত্র-তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধে পাঠাবেন। আমরা তাদেরকে গ্রহণ করে নেবো’। প্রভাষক আরজ আলী এ নির্দেশ সাদরে মেনে নেন এবং ভেতরে থেকে কাজ করতে থাকেন। এদিকে তার বাড়িতে কলেজ অধ্যক্ষ কর্তৃক কলেজে যোগদানের নোটিশ গেলে তিনি কলেজে এসে যোগদান করেন। কলেজের অবসরে তিনি ছাত্র-তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে চিরকুটসহ পাঠাতে থাকেন বাঘমারা, রংড়াসহ অন্যান্য ইয়থ ক্যাম্পগুলোতে। পথিমধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধা তার নওয়াপাড়ার বাড়িতে সাময়িক আশ্রয় নিয়ে ছদ্মবেশে সীমান্ত অতিক্রম করতেন। এরই এক পর্যায়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে পাকি কর্ণেল রাজ্জাক মির্জা তাকে নেত্রকোণা সেনানিবাসে তলব করে জানিয়ে দেন যে, তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ, তিনি যেন আগামী সাতদিন কোন অবস্থাতেই স্টেশন লিভ না করেন। একদিনেই এ খবর পৌঁছে যায় আশেপাশের গুপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পগুলোতে। রাত্রিবেলায় ছদ্মবেশে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হান্নান ঠাকুর এসে হাজির হন প্রফেসরস মেসে। তিনি তাকে বলতে থাকেন, ‘আরজ তুমি ধরা পড়ে গেছো, তুমি এখনই চল আমার সাথে’। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, ‘এখন আর তা সম্ভব নয়, আমাকে ওরা না পেলে- বাড়িতে আমার মা, ভাই-ভাবী ও ছেলেমেয়েদের মেরে ফেলবে, আমার কলিগদের নির্যাতন করবে, আমি তো তা হতে দিতে পারি না’।
১২ আগস্ট পাক বাহিনী তাকে বন্দী করে নিয়ে যায় পিটিআই ক্যাম্পে। ও দিকে তার গ্রামের বাড়ি লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার মা ছাড়া অন্য সকলে দিক্বিদিক ছুটতে থাকে নিরাপদ আশ্রয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের নাম-তালিকা উদ্ধারের জন্য দু’দিন ধরে তার উপর চলে নির্যাতন। ১৪ আগস্ট চোখ বেধে- ট্রেনে করে শ্যামগঞ্জ হয়ে তাকে নিয়ে আসে জারিয়া স্টেশনে। সেখান থেকে গয়না নৌকায় কংস-সোমেশ্বরী হয়ে নিয়ে আসে বিরিশিরি সেনাক্যাম্পে। ক্যাম্প ইনচার্জ মেজর সুলতান প্রথম দু’দিন তার সাথে অতিথির ন্যায় আচরণ শুরু করেন এবং তাকে প্রস্তাব দেন, তিনি যেন তার সমস্ত অনুসারীদের নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে চলে আসেন, বিনিময়ে তিনি পাবেন অগাধ সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা। প্রভাষক আরজ এ প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন। এদিকে পাকি দোসরেরা ব্যাংকে জমানো ৩২ হাজার টাকা প্রাপ্তির জন্য চেকে প্রফেসরের সই নিয়ে নেয়। বিস্মিত পাকি মেজর ১৬ আগস্ট বিকালে প্রহসনের খেলা শুরু করে। প্রফেসরকে ছেড়ে দিয়ে এক কিলোমিটার দূর থেকে আবার ফেরত আনে। সন্ধ্যায় তার জীবনের শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে-প্রফেসর আরজ ওজুর জন্য পানি চান। তিনি অজু শেষ করে নামাজ পড়ে নেন। রাত দশটার দিকে সোমেশ্বরী নদীর লিচুবাগান ঘাটের পাশে তাকে হাজির করা হয়। মেজর সুলতান উচ্চস্বরে বলছে, ‘প্রফেসর, এখানে তোমাকে মেরে ফেলার জন্য হাজির করেছি, এখনো সময় আছে, তুমি যদি একবার পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলো, তাহলে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। ‘প্রভাষক আরজ ঘৃণাভরে মেজর সুলতানের মুখে থুতু ছিটিয়ে বলতে থাকেন, ‘এর চেয়ে মৃত্যুই আমার কাছে শ্রেয়’। এরপর পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলানোর জন্য তার উপর ২৯ বার চালানোহয় বেয়োনেট। কিন্তু তিনি প্রতিবারই নাকি বলেছিলেন জয়বাংলা। সমস্ত পৈশাচিক প্রয়াস ব্যর্থ হলে-পরাস্ত মেজর প্রভাষক আরজের বুকে গুলি ছুড়ে। প্রভাষক আরজ আর্তনাদ করে বলে উঠেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি স্বাধীন করো সোনার বাংলা’।
লেখক:
১. সহকারী অধ্যাপক, দুর্গাপুর কলেজে
২. শহীদ বুদ্ধিজীবি আরজ আলী সাহেবের ভাতিজা।
