বিরহী বাউল উকিল মুন্সি
সঞ্জয় সরকার
ছিলেন মসজিদের ইমাম। মুসুল্লিদের নামাজ পড়াতেন। কুরআন-কেতাব পড়তেন। জানাজায় ইমামতি করতেন। আবার একই সঙ্গে বাউল গান গেয়ে মাতিয়ে তুলতেন ভক্তদের আসর। ইমামতি করার কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে তিনি ছিলেনÑ ‘উকিল মুন্সি’। আবার বাউল গান করার কারণে ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেনÑ ‘উকিল বাউল’। আর একই সঙ্গে দু-দুটো পেশার কারণে দিনে দিনে সবার কাছে ওঠেছিলেন ‘বাউল উকিল মুন্সি’। হ্যাঁ, এমনই এক ব্যতিক্রম চরিত্রের মানুষ ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে বাউল গান ও ইমামতি করার মতো এমন উদাহরণ দ্বিতীয়টি আছে কি-না আমার জানা নেই। বোধকরি নিকট ভবিষ্যতেও এমন একটি চরিত্র পাওয়া দুষ্কর হবে। আর এ কারণেই আজকের সমাজ ব্যবস্থায় উকিল মুন্সি চরিত্রটি যেমন ব্যতিক্রম, তেমনি তার জীবনাচরণও বিষ্ময়কর!
উকিল মুন্সির আসল নাম আব্দুল হক আকন্দ। উকিল তার ডাক নাম। পরবর্তীতে নামের সঙ্গে ‘মুন্সি’ শব্দটি যুক্ত হয় মসজিদে ইমামতির কারণে। তাঁর জন্ম ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুন নেত্রকোনার হাওরদ্বীপ খ্যাত খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের নূরপুর-বোয়ালী গ্রামে। বাবার নাম গোলাম রসুল আকন্দ। মা’র নাম উকিলেন্নেসা। উকিলের বাবা একজন সম্পন্ন কৃষক ছিলেন। উকিলের আরেক ছোট ভাইয়ের নাম ছিল আব্দুল মজিদ। বাবা গোলাম রসুল আকন্দ গৃহশিক্ষক রেখে দুই ছেলের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। এ কারণে নিতান্ত শৈশবেই উকিল বাংলায় বাল্য শিক্ষার পাশাপাশি আরবি ও কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু উকিলের বয়স যখন মাত্র দশÑ তখন কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা। এর কিছুদিন পর তার মা উকিলেন্নেছা মদন উপজেলার হাসনপুর গ্রামের এক ব্যক্তিকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। উকিল আর তাঁর ছোট ভাইও মায়ের সঙ্গে চলে যান হাসনপুরে। কিন্তু সৎ বাবার সংসারে বেশিদিন থাকা হয়নি তাঁদের। এক পর্যায়ে আশ্রয় হয় কিশোরগঞ্জের ইটনার ঠাকুরবাড়িতে ফুফুর কাছে। কিছুদিন ঠাকুরবাড়িতে আবার কিছুদিন নিজ গ্রামে- এভাবে দিন কাটতে থাকে পিতৃ
মাতৃছায়াহীন দু’ভাইয়ের। এখানে-সেখানে ঘর-বন্ধনহীন বসবাসের কারণে কিছুটা উদাসীপনা পেয়ে বসে উকিলকে। বেচতে শুরু করেন বাবার রেখে যাওয়া জমি সম্পত্তি। ওই সময়ে নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে ঘাটুগানের ব্যাপক কদর ছিল। ১৭১৮ বছর বয়সে ঘর সংসারহীন উকিল ঘাটুগানের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ঘাটু গান গেয়ে ঘুরে বেড়ান গ্রাম-গ্রামান্তর। আর ঘাটু গান করতে করতেই এক সময় রপ্ত করে ফেলেন বাউল গান। বিশ শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি উকিল বাউল হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। চারদিকে ছড়াতে থাকে তাঁর সুনাম-খ্যাতি। এ সময় একদিন মোহনগঞ্জের জালালপুর গ্রামে চাচা কাজী আলিম উদ্দিনের বাড়িতে বেড়াতে যান তিনি। সেখানে থাকাকালে ওই গ্রামের কৃষক লবু হোসেনের সুন্দরী মেয়ে হামিদা আক্তার খাতুনের (লাবুশের মা) প্রেমে পড়ে যান উকিল। তাঁকে নিয়ে রচনা করেন গান: ‘‘ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে/সোনার জালালপুর/সেইখানেতে বসত করে/উকিলের মনচোর–।’’ তাঁদের প্রেমের কথা জানাজানি হলে বাধা হয়ে দাঁড়ান চাচা কাজী আলিম উদ্দিনসহ কাজী বাড়ির লোকেরা। পারিবারিক আভিজাত্যের কথা বিবেচনা করে তারা সাধারণ কৃষক লবু হোসেনের মেয়েকে বিয়ে করাতে অমত প্রকাশ করেন। উপরন্তু জালালপুরে যেতে মানা করেন তাঁকে। এমন সময়ে আরও একটি দুর্ঘটনার মুখে পড়েন উকিল। আকষ্মিক অসুস্থতায় মারা যান তাঁর ছোট ভাই আব্দুল মজিদ। একদিকে প্রেয়সীর সঙ্গে বিরহ, অন্যদিকে ভাইয়ের মৃত্যুর শোকে কিছুটা অপ্রকৃতস্থ বা উন্মাদ হয়ে যান উকিল। ফলে আবার বাড়ি ছাড়েন। এ পর্যায়ে (১৯১৫)
মোহনগঞ্জের বড়ান্তর গ্রামের মসজিদে ইমামতি ও ছেলে-মেয়েদের আরবি পড়ানোর কাজে যোগ দেন। মূলত ওই কাজে যোগদানের পরই ‘উকিল’ এর সঙ্গে ‘মুন্সি’ শব্দ যুক্ত হয়ে তিনি ‘উকিল মুন্সি’ নামে পরিচিতি পান।
জালালপুর আর বড়ান্তর কাছাকাছি গ্রাম। কাছাকাছি অবস্থানের কারণে প্রেয়সী হামিদার সঙ্গে আবারও যোগাযোগ ঘটে উকিলের। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে আত্মীয়-স্বজনের অগোচরে অনেকটা অনাড়ম্বরভাবে তিনি হামিদাকে বিয়ে করেন। এরপর বোয়ালীর বাড়ির জমিজমা বেঁেচ শ্বশুরের দেয়া জালালপুরের এক খÐ বাড়িতে ঘর বাধেন। দু’বছরের মাথায় আব্দুস সাত্তার নামে উকিল দম্পতির প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। সাত্তারের জন্মের পর উকিল মুন্সি মদন উপজেলার কুলিয়াটি গ্রামের মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন। কুলিয়াটিতে তিনি অনেক গজল সঙ্গীত রচনা ও সুর করেন। গজল শোনার জন্য তার কাছে আশপাশের এলাকার মানুষজন ভিড় করতেন। কুলিয়াটিতে থাকাকালেই তিনি হবিগঞ্জের রিচি গ্রামের পীর মোজাফফর আহম্মদের(রঃ) শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তখন পীরের নির্দেশে তিনি অন্যান্য বাজনা পরিত্যাগ করে শুধু একতারা ও চটিয়া বাজিয়ে গান শুরু করেন। বাউল গানের কারণে পীর মোজাফফর আহম্মদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেছিলেন উকিল। তাঁর শিষ্যরাও উকিলকে শ্রদ্ধা করতেন। কুলিয়াটিতে পাঁচ বছর থাকার পর তিনি মোহনগঞ্জের পালগাঁওয়ে চলে আসেন। সেখানেও মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের কোরআন-কেতাব পড়াতেন। ইমামতির পাশাপাশি তিনি বারহাট্টার চন্দ্রপুর, খালিয়াজুরীর আসদপুর, পূর্বধলার লেডিরকান্দা, মোহনগঞ্জের ঝিমটিসহ বিভিন্ন এলাকার পীর সাহেবদের আস্তানায় যাতায়াত করতেন। এভাবে বিভিন্ন এলাকার পীরদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। পীরদের আস্তানায় গান এবং শরিয়ত সম্পর্কে তাত্ত্কি আলোচনার
কারণে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। একদিন লেডিরকান্দা পাগলবাড়িতে গান গাইতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় প্রখ্যাত বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন, জালাল খাঁ ও উপেন্দ্র সরকারের। তাঁরা ছিলেন মালজোড়া বাউলগানের ¯্রষ্টা। তাঁরা উকিলকে মালজোড়া বাউল গানের প্রতি উৎসাহিত করেন। তাঁদের সংষ্পর্শে উকিল মুন্সি মালজোড়া বাউল গান রপ্ত করে মালজোড়া’র শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পালগাঁও ছাড়াও উকিল মুন্সি বিভিন্ন সময়ে চানগাঁও, শ্যামপুর ও নূরপুর-বোয়ালী গ্রামের মসজিদে ইমামতি করেছেন। শেষ জীবনে তিনি ছিলেন মোহনগঞ্জের জৈনপুর মসজিদের ইমাম। এক পর্যায়ে তিনি জালালপুর ছেড়ে জৈনপুর গ্রামেই সুরমা নদীর কূল ঘেষে বাড়ি করেন এবং সেখানে থিতু হন। সাত্তারের পর পুলিশ মিয়া নামে তাঁর আরও এক ছেলে এবং সন্তোষের মা ও রাবেয়া খাতুন নামে দুই মেয়ের জন্ম হয় তাঁর। এদের মধ্যে সাত্তার এন্ট্রাস পাশ করে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি বাবার হাত ধরে বাউল গান রপ্ত করে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বিভিন্ন এলাকার লোকজন বাবা-ছেলে দু’জনকে নিয়ে মালজোড়া বাউলের আসর জমাতেন। চল্লিশের দশকে তারা একে অপরের প্রতিদ্ব›দ্বী
হিসাবে বহু আসরে গান করেছেন। ষাটের দশকে উকিল মুন্সি আসরে গান গাওয়া ছেড়ে দেন। ১৯৭৮ সালে উকিল মুন্সির জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। ওই বছরের প্রথম দিকে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হামিদা খাতুন (লাবুশের মা) মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুর কয়েক মাস পর ৬ আগস্ট (১৯৭৮) অকালে মারা যান তাঁর প্রিয় ছেলে বাউল কবি আব্দুস সাত্তার। স্ত্রী-পুত্রের মৃত্যুর পর তাঁর চোখের জল আর থামেনি। ঘরে বসে তখন একা একা গান করতেন- ‘আমার শ্যাম সুখ পাখি গো/ ধইরা দে ধইরা দে–’। প্রিয়জন হারানোর শোকে মুহ্যমান উকিল মুন্সিও ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরপর জৈনপুর গ্রামে প্রিয় ছেলের কবরের পাশে সমাহিত করা হয় তাঁকে। তাঁর বংশধররা এখনও জালালপুরে বসবাস করছেন। উকিলের পুত্রবধূ ফুলবানুও (সাত্তারের স্ত্রী) ছিলেন গীতিকবি। তাঁর লেখা অসংখ্য বাউল গান আছে। উকিলের নাতনি আলেয়াও (সাত্তারের মেয়ে) বাউল গান করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন।
লালন ধারার বাউলদের জীবন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়Ñ তাঁদের অনেকে প্রচলিত ধর্মমতের বাইরে ছিলেন। অর্থাৎ তাঁদের নিজস্ব ঘরানার একটা ধর্মমত ছিল। এর নাম ‘বাউল ধর্ম’। বা ‘বাউল মতবাদ’। আবার তাঁদের অনেকে ছিলেন গৃহত্যাগী বা সন্ন্যাসী। কিন্তু নেত্রকোনা অঞ্চলের বাউলরা এক্ষেত্রে ছিলেন ব্যতিক্রম। তারা একই সঙ্গে বাউল গান করেছেন এবং প্রত্যেকে প্রত্যেকের ধর্ম চর্চাও করেছেন। এ অঞ্চলের বাউলরা কেউ গৃহত্যাগ বা সন্ন্যাস গ্রহণ করেননি। উপরন্তু তারা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে স্বাভাবিক রীতিতে সংসার করেছেন। উকিল মুন্সিও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি সম্পূর্ণভাবে শরিয়ত পন্থী, ভক্তদের মতে ‘আল্লাহওয়ালা মানুষ’ ছিলেন। মালজোড়া বাউল গানে শরিয়ত ও মারেফত সংক্রান্ত বিতর্কে তিনি সব সময় শরিয়তের পক্ষে
অবস্থান নিতেন এবং শরিয়ত সংক্রান্ত জ্ঞানে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন। তাঁর লেখা এবং সুর করা গজল গানও ছিল অসাধারণ এবং তথ্যবহুল। তাঁর ‘নবীজির খাসমহলে/যাবে যদি আয়রে মন/মাটির মতো হইয়া খাঁটি/পণ কর জীবন মরণ’, “ দ্বীন দুনিয়ার বাদশা তুমি/ উম্মতের জামিল/খাতেমুন নবীন–’ এরকম অসংখ্য গজল শুনে তখনকার বিশিষ্ট আলেম-উলামারা পর্যন্ত মুগ্ধ হতেন। শরিয়ত পন্থী হওয়ার কারণে তিনি কোনদিন নিজের ছবি তুলেননি। এ কারণে উকিলের কোন ছবি নেই। এছাড়া মৃত্যুর সময়কাল পর্যন্তও তিনি ইমামতি করেছেন। প্রায় জায়গা থেকে ঈদের নামাজে ইমামতি করার ডাক আসতো তাঁর। কেউ মারা গেলে প্রিয়জনরা চাইতেন তাঁর জানাজায় যেন উকিল মুন্সি ইমামতি করেন। এ কারণে গানের আসর স্থগিত রেখেও বহু জানাজায় ইমামতি করতে হয়েছে তাঁকে। এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এমনই আকর্ষণ ছিল তাঁর প্রতি।
এবার আসা যাক উকিলের বিচ্ছেদ গান প্রসঙ্গে। দেহতত্ত¡, সৃষ্টিতত্ত¡, আত্মতত্ত¡ ভিত্তিক বাউল গানে তাঁর অগাধ পান্ডিত্য থাকলেও বিচ্ছেদ গানে তিনি ছিলেন অপ্রতিদন্দ্বী। বিচ্ছেদ গানে পারদর্শিতার কারণেই তাঁর আরেক পরিচিতিÑ তিনি ‘বিরহী বাউল’। উকিল নিজেও সারা জীবন ‘বিচ্ছেদের অনলে পুড়ে অঙ্গার’ হয়েছেন। শৈশবে তিনি বাবাকে হারান। একই বয়সে মাকে হারান তাঁর (মা’র) দ্বিতীয় বিয়ের কারণে। কৈশোরে হারান পরিবারের একমাত্র আপনজন ছোট ভাইকে। এরপর প্রিয়তম প্রেমিকাকে কাছে পেতে গিয়েও পারিবারিক-সামাজিক বাধার কারণে বেদনায় নীল হতে হয় তাঁকে। শেষ জীবনে তাঁর কাঁধে তুলে নিতে হয় প্রিয় পুত্রের লাশ। চোখের সামনে দেখতে হয় প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু। এসব ঘটনাপ্রবাহ উকিলকে বিরহে ভাসিয়ে দেয়। আর বিরহে ভাসতে ভাসতেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘বিরহী বাউল’। শোনা যায়, উকিল মুন্সির মতো বিচ্ছেদ গানের সুর ও কণ্ঠ এ অঞ্চলে দ্বিতীয় কারও ছিল না।
অর্থাৎ তুলনাহীন ছিল তার কণ্ঠ ও সুর মাধুর্য্য। ধর্ম শাস্ত্র নিয়ে গান গাইতে গেলেও দর্শকদের অনুরোধে তাঁকে বিরহের গান গাইতে গয়েছে। বিচ্ছেদ গান গাইতে গিয়ে তিনি নিজে যেমন কেঁদেছেন, তেমনি কাঁদিয়েছেন হাজারও দর্শক-শ্রোতাদের। তাঁর গান শুনে দর্শক-শ্রোতারা রাতভর চোখের জলে ভেসেছেন। বিরহকাতর প্রেমিক-প্রেমিকারা মুহূর্তের জন্য হলেও হারিয়ে যেতেন তাঁর গানের মাঝে। দু’টো গানের উদাহরণ দেয়া যাক- ‘বন্ধু আমার নিঃদুনিয়ার ধনরে/তোরে দেখলে জুড়ায় জীবন আমার/না দেখলে মরণরে..।’ অথবা ‘এমন শুভদিন আমার কোনদিন হবে/প্রাণনাথ আসিয়া আমার দুঃখ দেখিয়া/নয়নের জল বন্দে-নি মুছিয়া নিবে…।’ এছাড়া উকিলের বিখ্যাত ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়/বন্ধুয়ারে কর তোমার মনে যাহা লয়—’ গানটি হয়তো অনেকেরই শোনা। এভাবেই সহজ-সরল কথায় আর বিরহ চাপা সুরে মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা কষ্টকে টেনে বেড় করতেন
তিনি। আর এ কারণেই সবার কাছে উকিল ছিলেন- ‘বিরহী বাউল সাধক।’
উকিলের জন্ম ও বেড়ে ওঠা হাওরের গহীন গ্রামে। তাঁর জন্মস্থান নূরপুর-বোয়ালী গ্রামটি হাওরদ্বীপ খালিয়াজুরীর সুবিশাল হাওরের পাড়ে অবস্থিত। আবার উকিলের শ্বশুরবাড়ি জালালপুরের (যেখানে দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন) অবস্থানও বিশাল ‘ডিঙ্গাপুতা হাওর’ এর পাড়ে। তাঁর শেষ বাসস্থান (তিনি যেখানে সর্বশেষ ইমামতি এবং বাড়ি নির্মাণ করেছেন) জৈনপুর গ্রামটিও ডিঙ্গাপুতা হাওরের কাছাকাছি সুরমা-ধনু নদীর জলধারার পাড়ে অবস্থিত। এ কারণে পূবালী বাতাস আর ঢেউ সমৃদ্ধ
হাওরের প্রকৃতি তাঁর চিরচেনা। তাই হাওরাঞ্চলের প্রকৃতিকে অপরূপভাবে বর্ণনা করেছেন তিনি। গানের কথা আর সুরে মনের গহীনের বিরহকে যেন প্রকৃতির সঙ্গে একাকার করে দিয়েছেন। যেমনÑ ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে/ পূবালী বাতাসে/ বাদাম দেইখ্যা চাইয়্যা থাকি/ আমার নি কেউ আসেরে-’। অথবা- ‘ভাইটাল তরী কে যাও বাইয়া রে/ ও মাঝি ঘাটে নাও ভিড়াও / মুই অভাগী চিরদুঃখী খবর লইয়া যাওরে-’। এমন আরও অসংখ্য ভাটিয়ালী এবং বিচ্ছেদী গান আছে তাঁর।
উকিলের পরিবার, স্থানীয় সংগ্রাহক ও বাউলদের মতে- তাঁর গান ও গজলের সংখ্যা সহস্রাধিক। এখানে উল্লেখ করা দরকার, চিত্র নির্মাতা প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’ এবং ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি’ গান দু’টি যুক্ত করে উকিল মুন্সিকে নতুন করে এ প্রজন্মের দর্শক-শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। বলা দরকার, একই চলচ্চিত্রে ‘সোয়া চান পাখি’ গানটিও উকিলের গান বলে প্রচার করা হলেও এটি নিয়ে বিতর্ক আছে। এর বাইরে উকিলের আর মাত্র ১০-১২টি গান এ অঞ্চলের বাউল-শিল্পীরা পরিবেশন করে থাকেন। বাকি গানগুলো এখন অস্তিত্বের সঙ্কটে। কারণ, উকিলের গানের কোন বই বা পান্ডুলিপি নেই। একটি আশার কথাÑ কবি মাহবুব কবির উকিল
মুন্সির ২০১টি গান সংগ্রহ করে ‘উকিল মুন্সির গান’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। এ যাবতকালে এটিই তাঁর গানের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ। এছাড়া বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত গোলাম এরশাদুর রহমানের ‘নেত্রকোনার বাউল গীতি’ বইয়েও উকিলের বেশ কিছু গান এবং জীবনী সন্নিবেশিত হয়েছে। ওয়াহিদ সুজন নামে অপর এক গবেষকও উকিল মুন্সিকে কেন্দ্র করে
‘উকিল মুন্সির চিহ্ন ধরে’ ভ্রমণকাহিনী রচনা করে তাঁর সম্পর্কে বেশকিছু অজানা তথ্য জানান দিয়েছেন আমাদের। ব্যস এইটুকুই; উকিল মুন্সির জীবন ও গান নিয়ে আর তেমন কোন কাজের কাজ হয়নি। কিন্তু আরও অনেক কিছু করা দরকার। বিশেষ করে তাঁর অনেক গানের সুর হারাবার পথে। তাঁর শিষ্যরা কেউ বেঁচে না থাকলেও প্রশিষ্যদের কাছ থেকে এসব গানের সুর রেকর্ড করে সংরক্ষণ করা আজ জরুরী। পাশাপাশি তাঁর যেসব গান এখনও সংগ্রহ করা হয়নিÑ সেগুলো সংগ্রহেও উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। তা না হলে উকিল মুন্সির অনেক গান এবং গানের সুর চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে। একই সঙ্গে হারিয়ে যাবে বিচ্ছেদ ও ভাটিয়ালী গানের বিশাল এক ভান্ডার।
সহায়ক গ্রন্থ:
১. নেত্রকোণার বাউল গীতি- গোলাম এরশাদুর রহমান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। প্রকাশকাল: ১৯৯৪।
২. উকিল মুন্সির গান, সংগ্রহ ও সম্পাদনা- মাহবুব কবির, ঐতিহ্য, ঢাকা। প্রকাশকাল: ২০১৩।
৩. উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে- ওয়াহিদ সুজন, ঐতিহ্য, ঢাকা। প্রকাশকাল: ২০১৫।
লেখক: সাংবাদিক ও ছড়াকার।
