ভাষা সৈনিক জনাব সানাউল্লাহ নূরী

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের ইতিহাসে জনাব  সানাউল্লাহ নূরীর[1] অবদান চিরস্মরণীয়। তিনি ছিলেন ভাষা সৈনিক। জন্ম ১৯২৮ সালের ২৮ মে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চর ফলকন গ্রামে। তার বাবা মাওলানা সালামত উল্লাহ ও মাতা -মা মনসুরা বেগম ।

শিক্ষা জীবন ও ভাষা আন্দোলনে অবদান : বাড়ির কাছের অ্যাংলো-অ্যারাবিক মাদরাসা থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চতর নিউ স্কিম মাদরাসায় ভর্তি হন। বাবা ইসলামিক ওয়াজ মাহফিল করবার জন্য বছরের বেশিরভাগ সময়ই নেত্রকোনায় থাকতেন। তাই   তার বাবা তাকে নেত্রকোনায় নিয়ে আসেন ১৯৪২ সালের দিকে এবং নেত্রকোনা শহরের আঞ্জুমান হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। জনাব নুরী [2]আঞ্জুমান হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। জনাব নুরী নেত্রকোনাতে ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও শহীদ বুদ্ধিজীবি  বীর মুক্তিমুযোদ্ধা মেহের আলী[3] [4][5][6][7][8][9]বাবা জনাব আক্তার আলীর বাড়ী ইসলামপুর গ্রামে থেকে পড়াশোনা করেন। এ বাড়ী থেকেই নেত্রকোনায় তেভাগা আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ত দিয়েছেন  তমদ্দুন মজলিসের নেত্রকোনা শাখার সভাপতি জনাব নুরী। জনাব নূরী মেহের আলীকে যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে গড়ে তুলেন। তিনি স্কুল ছাত্র মেহের আলীকে নিয়ে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন মিছিল   মিটিং এ অংশগ্রহন করতেন্।  ভাষা আন্দোলন [10][11]ও তমদ্দুন মজলিসের কাজে জড়িয়ে পড়ায় লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে। পরবর্তীতে জনাব নূরী ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়ে বিএ পাস করেন।উল্লেখ্য যে, নেত্রকোণা জেলা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী সাবেক এম.পি আব্দুল খালেক সাহেব  দীর্ঘ ১০/১২ বছর এই বাড়ীতে ছিলেন এবং এখান থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতি হতে দলীয় রাজনীতির নেতৃত্বে উঠে আসেন। প্রখ্যাত ভাষা সৈনিক আজিম উদ্দীন ও শহীদ মেহের আলীদের বাড়ীতে  ছিলেন প্রায় ২১/২২ বছর (১৯৪৭-১৯৬৯ পর্যন্ত)। ঐ বাড়ীটি তখন নেত্রকোণা  জেলার  রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছিল।

কর্মজীবন: সানাউল্লাহ নূরী ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘লুসি গ্রে’ এবং কিটসের ‘ফায়ারিং সং’ কবিতা অনুবাদ করেন। দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় আন্ধার মানিকের রাজকন্যা উপন্যাস লিখেছেন।তিনি বিভিন্ন সময় তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক, মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক মিল্লাত, মাহে নও, মাসিক সওগাত ও দৈনিক নাজাতে কাজ করেছেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সিলভার বার্ড নামে মার্কিন প্রকাশনা সংস্থর ঢাকা শাখার পাঠ্যপুস্তক বিভাগের খণ্ডকালীন সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনের ঢাকা শাখার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তানের জন্মলগ্নে তিনি এর সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। ১৯৭৯ পর্যন্ত এ পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৬ দৈনিক দেশ পত্রিকার সম্পাদক, ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ দৈনিক জনতার সম্পাদক এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ছিলেন। সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন নিরলস, দক্ষ ও নির্ভীক কলমসৈনিক। চল্লিশের দশক থেকে শুর“ করে আমৃত্যু সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে কাজ করেছেন। তার লিখিত গ্রন্থগুলো দেশের সুধী মহলে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন একাধারে সম্পাদক, ঔপন্যাসিক, কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ, সংগঠক, কলামিস্ট। ১৯৮৮ সালে তিনি ‘বাংলাদেশ কাউন্সিল অব এডিটরস’ গঠন করেন। জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ফুলকুঁড়ি আসরের সভাপতি ছিলেন ১৯৭৭ থেকে আমৃত্যু। তিনি বিভিন্ন সময় ৬০টির মতো দেশ ভ্রমণ করেছিলেন।

মৃত্যু : জনাব  সানাউল্লাহ নূরী ২০০১ সালের ১৫ জুন ইন্তেকাল করেন।

পুরষ্কার ও সম্মানণা : ১৯৮২ সালে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তাকে “একুশে পদক দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijuddho Research Institute Silver Award-2025” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়।

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকারের প্রবন্ধসমূহ:

বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকদাদ চৌধুরী

বাউল কবি রশিদ উদ্দিন: বাউলদের বাউল

নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর

লোক-সাহিত্য ও সংস্কৃতি  লোককবি নগেন সরকার 

একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক ভাষা সৈনিক  সানাউল্লাহ নূরী

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোনা

বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোঃ নুরুল ইসলাম খান (এন আই খান)

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. মো. ফজলুর রহমান খান

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম ফজলুল কাদের

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাছ আলী খান

অগ্নিযুগের সূর্য সৈনিকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী

স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী 

তথ্যসূত্রঃ

  1.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫),” ভাষা সৈনিক জনাব সানাউল্লাহ নূরী”, বিজয় একাত্তর ১১তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৯
  2.  Nuri, Sanaullah (25 June 1994). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali in Netrakona”. The daily Dinkal. p. 6.
  3.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৩ ডিসেম্বর ২০২২),” স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৩-৩৮
  4.  মোতালিব ,ভাষা সৈনিক শাহ আব্দল (ফেব্রয়ারী ২০০৮),”নেত্রকোনায় মহান ভাষা আন্দোলন”,ভাষা সংগ্রামে নেত্রকোনা স্মারক গ্রন্থ , পৃষ্ঠা ২৬-২৯
  5.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). নেত্রকোণার রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ মরহুম জননেতা আব্দুল খালেক এমপি”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা পৃষ্ঠা 01-06
  6.  আচার্য, সাংবাদিক জয়ন্ত,( ১৪ ডিসেম্বর ২০২১),মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধীজীবিবৃন্দ” সাপ্তাহিক-২০০০ পৃষ্ঠা ২০-২৪
  7.  আহমদ, ভাষা সৈনিক আজিম উদ্দীন (২০২২)। অসমাপ্ত গল্প। ঢাকা: অনির্বান পাবলিকেসন্স। পৃ. ২, ১২।
  8.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”, বিজয় একাত্তর ১১তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১-১২
  9.  চৌধুরী,বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান ( ১৪ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”, আলোরপথে ৫তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৫-২০
  10.  বিশ্বাস ,সাংবাদিক কুন্তল (ফেব্রয়ারী ২০০৮),”নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলন”,ভাষা সংগ্রামে নেত্রকোনা স্মারক গ্রন্থ , পৃষ্ঠা ২০-২২
  11.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (03rd Jan 2026)”নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস

Scroll to Top