রবীন্দ্রনাথের নেত্রকোণা
সঞ্জয় সরকার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুব পছন্দের একটি স্থান ছিল ‘নেত্রকোণা’। জীবদ্দশায় কখনো নেত্রকোণায় না এলেও তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নেত্রকোণাকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। নেত্রকোণার প্রতি বিশেষ এক ধরনের মায়া অনুভব করতেন তিনি। বোধ করি তাই তাঁর কবিতা, চিঠিপত্র ও কথোপকথনে বারবার এসেছে নেত্রকোণার প্রসঙ্গ । বরানগরের শশি—ভিলার একটি জানালারও তিনি নাম রেখেছিলেন ‘নেত্রকোণা’। [কবি নেত্রকোণা বানানে ‘ণ’–বর্ণ ব্যবহার করেছেন]। যতদূর জানা যায়, তাঁর এই নেত্রকোণা প্রীতির নেপথ্যে রয়েছে কিছু চমকপ্রদ ইতিহাস ও জনৈক ব্যক্তিবিশেষের ভূমিকা, যা সমকালের অনেকেরই অজানা।
নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামের সন্তান শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সহচর ও ছাত্র। রসায়নশাস্ত্র পাঠ করেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞ। খোদ রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিযুক্ত করেছিলেন বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ পদে। কবির অন্তত আড়াইশ গানের স্বরলিপি করেছেন তিনি। সম্পাদনা করেছেন একাধিক স্বরলিপিগ্রন্থ। দুই বাংলায় রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার-প্রসারেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ধারণা করা হয়, তিনিই রবীন্দ্রনাথের নেত্রকোণা প্রীতির বড় কারণ। শৈশব থেকে গানপাগল শৈলজারঞ্জন মজুমদার কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে পড়তে গিয়ে রবীন্দ্রসংগীতের অনুরাগী হন। যাতায়াত শুরু করেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। এভাবে একদিন পেয়ে যান ‘রবীন্দ্রনাথের গানের ভাণ্ডারী’ খ্যাত দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহচর্য। এভাবেই দিনে দিনে কবির প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন শৈলজারঞ্জন।
এই শৈলজারঞ্জন মজুমদারই শান্তিনিকেতনের বাইরে নেত্রকোণায় প্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করেন। ১৯৩২ সালে নেত্রকোণা সদরের দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে উদযাপন করা সেই জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের আগে বাংলার আর কোথাও রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনের খবর পাওয়া যায়নি। আর এটিই যে সত্য, তার সুস্পষ্ট
প্রমাণ মিলে খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বহস্তে লেখা এক চিঠিতে। উত্তর ভারতের শৈলাবাস থেকে শৈলজারঞ্জনকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘কল্যাণীয়েষু, তোমাদের নেত্রকোণায় আমার জন্মদিনের উৎসব যেমন পরিপূর্ণ মাত্রায় সম্পন্ন হয়েছে এমন আর কোথাও হয়নি। পুরীতে একবার আমাকে প্রত্যক্ষ সভায় নিয়ে সম্মান করা হয়েছিল। কিন্তু নেত্রকোণায় আমার সৃষ্টির মধ্যে অপ্রত্যক্ষ আমাকে রূপ দিয়ে আমার স্মৃতির যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, কবির পক্ষে সেই অভিনন্দন আরো অনেক বেশি সত্য। তুমি না থাকলে এই উপকরণ সংগ্রহ করত কে?’ জানা যায়, ১৯৩২ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত শৈলজারঞ্জন মজুমদার টানা ১০ বছর গ্রীষ্মের ছুটিতে নেত্রকোণায় গিয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন করেছেন। প্রতি বছর ঘটা করে নেত্রকোণায় রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপনের খবরে খুশি হতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছুটি কাটিয়ে শৈলজারঞ্জন যখন শান্তিনিকেতনে ফিরে যেতেন, তখন কবি রসিকতা করে জিজ্ঞেস করতেন, ‘তুমি নাকি ছুটিতে দেশে গিয়ে বাড়ি বাড়ি আমার জন্মোৎসব করার জন্য লোককে উৎপাত করে বেড়াও! তুমি কি জানো না তুমি আমার আপনার (আপন) লোক। ওরা নিজের থেকে তোমার কাছে আসবে, কয়েকবার বলবে, তারপর তো তুমি এর জন্য রাজি হবে।’ উত্তরে শৈলজারঞ্জন বলতেন, ‘ওটা আমার জন্মস্থান। ও সম্বন্ধে আপনার কোনো কথাই শুনব না।” “যাত্রাপথের আনন্দগান’–এ শৈলজারঞ্জন জানান, তার কাছে প্রায় সময় নেত্রকোণার খোঁজখবর নিতেন কবি। নেত্রকোণা শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ‘মগরা’ নদীর প্রসঙ্গ তুলে জানতে চাইতেন, ‘মগরা মানে কী?’ শৈলজারঞ্জন বলতেন, ‘মগরা মানে রাগী। যেমন—মগরা ঘোড়া।’ গ্রামের মানুষের এমন শব্দ বানানোর ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হতেন কবি। মগরা নামটিও ছিল তার পছন্দের।
শান্তিনিকেতনের যুগা কর্ম সচিব প্রশান্ত মহলানবীশ ও তাঁর স্ত্রী নির্মল কুমারী মহলানবীশ বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেক সেবাশুশ্রূষা করেছেন। তারা বরানগরের শশি-ভিলার যে বাড়িটিতে ভাড়া থাকতেন, সেখানে মাঝেমধ্যেই অতিথি হয়ে যাওয়া হতো কবির। কবি সেই শশি-ভিলার দোতলার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি ঘরের জানালার নাম রেখেছিলেন ‘নেত্রকোণা’। এ ছাড়া ‘শ্যামলী’ নামের যে কাব্যগ্রন্থটি নির্মল কুমারী মহলানবীশকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেটির ভূমিকায়ও লিখেছেন নেত্রকোণার কথা—“বেড়ার ওপারে মৈসুমি ফুলে রঙের স্বপ্ন বোনা/ চেয়ে দেখে দেখে জানালার নাম রেখেছি ‘নেত্রকোণা’।” নেত্রকোণাকে নিয়ে দারুণ এক রসিকতাও করেছেন কবি। ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে যুক্ত করা ‘স্নানসমাপন’ কবিতাটির নিচে কবি রচনাকাল ও স্থান হিসেবে উল্লেখ করেন— ‘নেত্রকোণা [বরানগর], ১৫ ফাল্গুন, ১৩৩৯।’ ওই প্রসঙ্গে পরিচিতজনদের কাছে কবি বলতেন, “দেখো, আমি ভাবিকালের ঐতিহাসিকদের জন্য একটা প্রবলেম তৈরি করে দিলুম। বিভিন্ন সময়ে নির্মলকুমারী মহলানবীশ ও প্রশান্ত মহলানবীশকে লেখা বহু চিঠিপত্রেও ‘নেত্রকোণা’র কথা উল্লেখ করেছেন কবি। প্রকাশ করেছেন নেত্রকোণায় আতিথ্যের প্রত্যাশা, নেত্রকোণাকে অধিকার করে নেওয়া ও নেত্রকোণায় পৌঁছেই সুড়সুড় করে বিছানায় ঢুকে পড়ার কথা। যদিও এই নেত্রকোণা মূলত ২৬৫/১৯ গোপাল লাল রোডের শশি-ভিলারই নেত্রকোণা, কবি নিজেই করেছিলেন যার নামকরণ। আগেই বলা হয়েছে, পূর্ব ময়মনসিংহের ভাটির দেশ খ্যাত নেত্রকোণায় কখনো পা পড়েনি রবীন্দ্রনাথের। ১৯২৬ সালে একবার নেত্রকোণার কাছাকাছি আঠারবাড়ির জমিদারবাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু উপরের আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, নেত্রকোণায় না এলেও কবিত্বের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি ঠিকই নেত্রকোণাকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যা নেত্রকোণাবাসীর জন্য বিরাট এক গর্বের ব্যাপার।
