শারদোৎসবের ইতিকথা
প্রিয়ঙ্কর বিশ্বাস তন্ময়
অয়ি জগদম্ব মদম্ব কদম্ব বনপ্রিয় বাসিনি হাসরতে,
শিখরিশিরোমনি তুঙ্গ হিমালয় শৃঙ্গনিজালয়া মধ্যগতে,
মধুমধুরে মধু কৈটভগঞ্জিনী কৈটভভঞ্জিনী রাসরতে,
জয় জয় হে মহিষাসুরমার্দিনী রম্যকপার্দিনী শৈলসুতে।
—শ্রীশ্রীচন্ডি
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। গ্রামেগঞ্জে একটা সময় ছিল যখন দুর্গাপূজায় যোগ দিতেন আপামর পল্লীবাসী। উৎসবমুখর সেই পরিবেশে উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতেন সবাই। ওই একটি দিন গ্রামীণ সমাজের একঘেয়ে জীবনযাপনে আসত বৈচিত্র্য। এ উপলক্ষে উন্নতমানের ভোজ এবং থিয়েটারসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো এবং সকলে আপনবোধে সেসব উপভোগ করত।
দুর্গাপূজা একটি প্রাচীন উৎসব, তবে কত প্রাচীন তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। মহিষমর্দিনী দুর্গার সবচেয়ে প্রাচীন যে মূর্তিটি পাওয়া গেছে তা পনেরো শতকের। প্রাচীনকালে যে দুর্গাপূজা হতো তার প্রকৃতি ও রূপ ছিল ভিন্ন। এখন বাংলাদেশে যে দুর্গাপূজা প্রচলিত তা সম্পূর্ণ বঙ্গীয় ব্যাপার, প্রাচীন পদ্ধতিরই লৌকিকরূপ, যা বর্তমানে পরিণত হয়েছে শারদীয় উৎসবে। এটি অকালবোধন নামেও পরিচিত, কারণ অতীতে দুর্গাপূজা হতো বসন্তকালে এবং ওটাই ছিল দেবীপূজার প্রশস্ত সময়, কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে রাম কর্তৃক অকালে (শরৎকালে) দেবীর পূজা করার প্রসঙ্গ থেকেই শারদীয় পূজার প্রচলন হয়।
বাংলাদেশে দুর্গাকে অবলম্বন করে উৎসবের একটি পরম্পরা অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত আশ্বিনের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন হয়। তারপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী এ তিনদিন পূজা হয় এবং বিজয়া দশমীতে হয় বিসর্জন। বিজয়ার পরদিন থেকে পনের দিন ধরে চলে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। এর পরের পূর্ণিমা তিথিতে হয় লক্ষীপূজা; কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে হয় কার্তিকপূজা এবং মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে হয় সরস্বতী পূজা; এর আগে সাধারণত কার্তিক মাসের আমাবস্যা তিথিতে হয় দুর্গারই আরেক রূপ কালীপূজা। আশ্বিনে দুর্গাপূজা দিয়ে যার শুরু, মাঘে সরস্বতী পূজা দিয়ে তার শেষ। এভাবে সকল দেবদেবীর আলাদা আলাদা পূজার বিধান থাকলেও গণেশ পূজার আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই, তবে অন্য যে কোনো দেবদেবীর পূজার আগে গণেশ পূজা করে নিতে হয়।
‘ওঁ গণেশায় নমঃ’ না বলে কোনো দেবদেবীরই পূজা করা চলে না।
বঙ্গে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন সম্রাট আকবরের চোপদার রাজা কংসনারায়ণ (বাংলার দেওয়ান এবং তাহিরপুরের রাজা) ষোল শতকে। দেওয়ান হওয়ার পর কংসনারায়ণ চেয়েছিলেন মহাযজ্ঞ করতে। তখন রাজপুরোহিত ছিলেন বাসুদেবপুরের ভট্টাচার্য বংশ। এ বংশের রমেশ শাস্ত্রী সে সময় সমগ্র বাংলা-বিহারে শাস্ত্রজ্ঞ হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি রাজাকে বলেন, যে চার রকমের যজ্ঞ করার নিয়ম আছে তার কোনোটিই এ আমলে করা সম্ভব নয়; রাজা যেন বরং দুর্গাপূজা করেন; এ পরামর্শ দিয়ে তিনি দুর্গাপূজার পদ্ধতিও লিখে দিয়েছিলেন। রাজা তখনকার সময়ের প্রায় আট-নয় লক্ষ টাকা খরচ করে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা করেন। সে থেকে দুর্গাপূজার শুরু। এখানে দুই ধর্মের এক সম্প্রীতিও পরিলক্ষিত হয়। সম্রাট আকবর মুসলিম ধর্মের অনুসারী হয়েও তাঁর চোপদার কংসনারায়ণের দুর্গাপূজার প্রচলনে সহায়তা করেছিলেন।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা হিন্দুদের সর্বজনীন এবং সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হতে প্রায় তিনশ বছর লেগেছিল। দুর্গাপূজা জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব হিসেবে প্রথম পালিত হয় কলকাতায় উনিশ শতকে। এরপর থেকে আস্তে আস্তে দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং একে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত করার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখেন জমিদারগণ।
তৎকালে ফরিদপুরের কোটালিপাড়ায় দুর্গাপূজার একটি চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় কৃষ্ণকুমার মিত্রের আত্মজীবনী থেকে। তার বর্ণনা অনুযায়ী ঢাকের বাদ্য ও প্রতিমা গড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হতো পূজোর উৎসব। শরৎকালে মাঠময় জল থৈ থৈ করত এবং তার মধ্য দিয়েই প্রায় ঘরে ঘরে দুর্গোৎসব পালিত হতো। পূজায় প্রচুর পাঁঠাবলি হতো; অবস্থাপন্ন গৃহস্থবাড়িতে তার সংখ্যা হতো কমপক্ষে ষাট। ঢাক, ঢোল ইত্যাদি বাদ্যে পাঁচ-ছয় দিন ওই জলময় অঞ্চল থাকত মুখরিত। গান, বাদ্য, আহার, বিহার এবং আমোদ-প্রমোদে নারী-পুরুষ, যুবা-বৃদ্ধ সকলে মাতোয়ারা হয়ে যেতো। দুর্গাপূজা উপলক্ষে তখন আনুষঙ্গিক বিষয় হিসেবে থিয়েটার, কীর্তন, ঢপ, যাত্রা প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হতো।
এভাবে ময়মনসিংহের মুক্তগাছা ও গৌরীপুরের জমিদাররাও ১৯৪০-৪১ সাল পর্যন্ত মহাসমারোহে দুর্গাপূজা করেছেন। পূজা উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত হতো যাত্রা, কবিগান, ঢপকীর্তন ইত্যাদি। মুক্তাগাছায় বিজয়ার দিন হাতির মিছিল হতো। প্রজারা পূজা উপলক্ষে একদিন রাজবাড়ির ভোজে আমন্ত্রিত হতেন। রাজবাড়ি ছাড়া সাধারণ গৃহস্থদের ঘরেও পূজা অনুষ্ঠিত হতো। পূজার সময় প্রবাসী সকলে নিজ নিজ বাড়ি এসে আনন্দোৎসবে যোগ দিতেন। ঐ সময় হিন্দু সমাজে বর্ণবিভেদ ছিল খুব বেশি। তখন দুর্গাপূজাই ছিল একমাত্র পূজা যেখানে ছিলনা তেমন কোনো বর্ণভেদ। সব সম্প্রদায়ের হিন্দুরাই পূজা করতে এবং পূজায় অংশগ্রহণ করতে পারতেন। তবে হ্যাঁ, বর্ণপ্রথার কিছুটা প্রভাব থেকেই যেত।
উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে ঢাকায় দুর্গাপূজা পালনের বিবরণ পাওয়া যায় বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্তের আত্মজীবনীতে। তখন মৈশুন্ডির এক বাড়িতে লাল দুর্গার প্রতিমা তৈরি করা হতো। সূত্রাপুরে ‘ঢাকার বাবু নন্দলালের’ বাড়িতে দোতলার সমান উঁচু প্রতিমা হতো। তবে রামকৃষ্ণ মিশনএর পূজাই ছিল বিখ্যাত। সেখানে দর্শনার্থীদের প্রচন্ড ভিড় হতো; সন্ন্যাসীরা কীর্তন করতেন। এ সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে ব্রাহ্মণেতর মানুষদের মধ্যে এক ধরনের জাগরণ ঘটে। তারা ব্রাহ্মণদের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করেন এবং কেউ কেউ পুরোহিত ছাড়া নিজেরাই পূজা করেন। নেত্রকোণার চন্দপাড়ায় এরকম কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল।
