বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ

অধ্যাপক মানিক সরকার

বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ এক ট্রাজিক অভিজ্ঞতা। ১৯৪৭ সালে অখÐ ভারত ভাগ, নতুন দুটি দেশের গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর কেউ কেউ পারস্পরিক গৃহ ও জমিজমা বিনিময় করে উভয় রাষ্ট্রে বসতি স্থাপন করলেও অধিকাংশ মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হয়, মুখোমুখি হতে হয় বাস্তবতার। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো অনেককে চলে যেতে হয় জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে। হাসান আজিজুল হকের মতো অনেককে ভারত ছেড়ে চলে আসতে হয় বাংলাদেশে। এই জন্মভূমি ছেড়ে আসার আঘাতের রক্তক্ষরণ, নির্মম সময়ের দাগ, দেশভাগের ভয়াবহতা, ভিটেমাটি ছাড়া জনমানুষের কথা প্রথম দিকে বাংলাসাহিত্যে তেমন ভাবে উঠে আসেনি। মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর এর মতো প্রণম্য সাহিত্য সাধকদেরও রেলের জমি দখল করে বাসা কিংবা শহরের ফুটপাতে সংসার যাপন করা মানুষগুলোর অমানবিক জীবনপাত সেই অর্থে স্পর্শ করতে পারেনি। তবে, যেহেতু ভারতীয় জীবনে দেশভাগ এক বিরাট অভিশাপের মতো, সেই হেতু দেশভাগের যন্ত্রণাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সাহিত্য সাধকদের পক্ষে সম্ভবপর ছিলনা। ফলে, পরবর্তীতে দেশভাগের পীড়া ও আর্তনাদ বাংলার কবি, নাট্যকার ও কথাকারদের মানসপটকে আলোড়িত করেছে। দেরিতে হলেও দেশভাগের পটভূমির উপর প্রকাশিত হয়েছে একাধিক স্মরণীয় সব উপন্যাস।

হাসান আজিজুল হকের ‘ আগুন পাখি’ অতীন বন্দোপাধ্যায়ের ‘ নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে ‘ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়াপাতার নৌকা’ মিহির সেনগুপ্তের ‘বিষাদ বৃক্ষ’ প্রভৃতি দেশভাগের প্রেক্ষাপটে লিখা উল্লেখযোগ্য সব উপন্যাস। সাহিত্য সমাজের দর্পন, বিষয়টি চিরকালীনভাবেই সত্য। ফলে এতবড় একটা সামাজিক রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়কে এড়িয়ে যাওয়া কবি সাহিত্যিকদের পক্ষে সম্ভবপর ছিলনা। কবি মঙ্গলাচরণ তাঁর কবিতার মধ্যে ব্যাপকভাবে তুলে ধরেছেন এই ভূমিহীন মানুষগুলোর কথা। বিষ্ণুদে’র কবিতাতেও দেশ ভাগের ফলে ভিটেমাটি ফেলে আসা ছিন্নমূল মানুষগুলোর জীবন পট ধরা পড়েছে। স্মৃতি আর নতুন অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন এই দুই মাত্রায় দেশভাগের সাহিত্য বিকশিত।

দেশভাগের সাহিত্যের একটা বড় অংশজুড়ে এই স্মৃতি আর ফেলে আসা যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। দেশভাগের এই গল্প সংকলনে দেবেশ রায়ের ‘উদ্বাস্তু ‘ প্রতিভা বসুর ‘দু’কূল হারা’ মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘মোজাহের’, অমলেন্দু চক্রবর্তীর ‘ভিটেমাটির রূপকথা’ ইমদাদুল হক মিলনের ‘দেশভাগের পর’, জাফর তালুকদারের ‘পিতৃভূমি’, জীবন সরকারের ‘কোষা’, সিকান্দর আবু জাফরের ‘ঘর’ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতার দাঙ্গা ও আমি’ বনফুলের ‘দাঙ্গার সময়’ ও ইসহাক চাখারীর ‘রায়ট’ প্রভৃতি গল্পের নামই যেন দেশ ভাগের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতবাহী।

তবে বাংলাদেশের সাহিত্যে এ নিয়ে কম লেখার কারণ মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান ভেঙ্গে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া এবং দেশ ভাগের চেয়ে মুক্তিযুদ্ধেরই বেশী প্রাধান্য পাওয়া। আর এটিই স্বাভাবিক। দেশ ভাগের পর একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস পেতে আমাদের ২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। জ্যোতির্ময়ী দেবীর ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন কেন্দ্র গড়ে উঠল। বাঙালি মুসলমান লেখক ও সংস্কৃতি কর্মীরা কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এলেন। বলা বাহুল্য, তারা বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত ধারার উত্তরাধিকারটিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।

এবার তাদের নবযাত্রা শুরু হলো। (বাংলাদেশের ছোটগল্প, ১ম খÐ, বাংলা একাডেমি ১৯৭৯ পৃষ্ঠা ৬) কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে সাহিত্যের এক নবযুগের সূচনা করেছিলেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে অন্যতম ঔপন্যাসিক হলেন শহীদুল্লাহ কায়সার, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনোয়ার পাশা, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী ও সেলিনা হোসেনের উপন্যাসেও দেশভাগের ইতিহাস রূপায়িত হয়েছে। বিভিন্ন নাটকেও ফোটে উঠেছে দেশভাগের করুণ চিত্র। সলিল সেনের ‘নতুন ইহুদি’ নাটকটি দেশভাগের অশ্রু ও কান্নার এক গভীর চিত্রপট।

প্রথম দিকে বাংলা কথাসাহিত্য দেশভাগ বিষয়ে কিছুটা চুপ থাকলেও পরবর্তীতে দেশভাগের উপরে কথাসাহিত্যে খুব ভালো রকম কাজ হয়েছে। প্রথম দিকে চুপ থাকার পর পঞ্চাশের দশকে উঠে আসা কথাকারদের কলমে জীবন্ত হয়ে উঠলো দেশভাগের যন্ত্রণাকর তিক্ততার কথা। ছিন্নমূল মানুষের বিপর্যয় ও যন্ত্রণার ছবিপট চিত্রিত হলো, অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘নির্বাস’ উপন্যাসে, নারায়ণ সান্যালের ‘বকুলতলা পিএল ক্যাম্প’ শক্তিপদ রাজগুরুর ‘তবু বিহঙ্গ’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অর্জ ুন’ সমরেশ বসুর ‘সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা’ অতীন বন্দোপাধ্যায়ের ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘আবাদ’, ‘দেব মহিমা’ প্রভৃতি উপন্যাসে। অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘নির্বাস’ উপন্যাস খানি দেশভাগের প্রেক্ষাপটে রচিত। পূর্ববঙ্গ থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন রেলের পড়ে থাকা পতিত জমি ও প্লাটফর্ম গুলিতে।

 এ এক অসহায় জীবন ছবি। এই ধারারই আর একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন সাবিত্রী রায়ের ‘স্বরলিপি’। উক্ত উপন্যাসে বরিশাল এক্সপ্রেসে আসা হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষের জীবন প্রবাহের গল্প চিত্রিত হয়েছে। প্রফুল্ল রায়ের ‘নোনা জল মিঠে পানি’ দেশভাগের প্রেক্ষাপটে লেখা আর একটি স্মরণযোগ্য উপন্যাস। এই উপন্যাসে লেখক প্লাটফর্মবাসী মানুষের বেআব্রæ জীবনযাপনের হৃদয়বিদারক ছবিপট অতি দক্ষতার সাথে অংকন করেছেন।

নারায়ণ স্যান্যাল দেশভাগের প্রেক্ষাপট নিয়ে বেশ কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বাল্মিক’ ও ‘বকুলতলা পিএল ক্যাম্প’। ‘বাল্মিক’ উপন্যাসে লক্ষ্যগোচর হয় হাজার হাজার উদ্বাস্তু গণমানুষের সমস্যার কথা। আবার ‘বকুলতলা পিএল ক্যাম্প’ উপন্যাসে ক্যাম্পবাসী মানুষের ইতরময় জীবন ও যাতনার কথা গভীর উদ্বেগের সাথে চিত্রিত হয়েছে। তবে এখানে একটি কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন, তা হলো দেশ ভাগের আর্তনাদ ও কষ্টের ছবিপট কথাসাহিত্যে লিখিত হলেও, ছিন্নমূল এই মানুষগুলো কিভাবে এ দেশের মাটিতে জায়গা করে নিল, সেই বিষয়ে তেমনভাবে আলোকপাত করেননি কথাসাহিত্যিকগণ।

বিশিষ্ট একজন গবেষক কিছুটা আক্ষেপ করেই লিখেছিলেন, ‘এই উদ্বাস্তু কলোনী গড়ে তোলার, এই ছিন্ন মানুষের নতুন দেশের মাটিতে শিখর বিস্তার করার যে ঐতিহাসিক সংগ্রাম তার প্রায় কোন চিহ্ন বাংলা সাহিত্যে নেই। বাঙালির এই যে প্রচন্ড প্রাণশক্তির পরিচয় আমরা রাতারাতি উদ্বাস্তু উপনিবেশ গড়ে তোলায় পাই, গুন্ডা পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে পাই, কলকাতার পথে পথে মিছিলে পাই, নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পাই, তার কথা বাংলা সাহিত্য বললনা, আমাদের সাহিত্য বোবা হয়ে থাকল’। তবে এ বিষয়ে বেশ ব্যতিক্রমি একটি মানুষ অতীন বন্দোপাধ্যায়, তার সাহিত্য কথায় পাই উদ্বাস্তু মানুষের সংগ্রাম, এ দেশের সমাজ ও মাটিতে শিখর ছড়ানোর ইতিবৃত্তের সব গল্প। আমরা অনেকেই জানি, দেশ বিভাগের অপঘাত খুব কাছ থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। কেননা তিনি নিজেই ছিলেন দেশভাগের শিকার। এই অপ্রত্যাশিত অভিশাপ যখন তিনটি দেশের মানুষের জীবনকে ঘেঁটে তছনছ করে দিয়েছিল, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর।

পরিবারের অন্যদের সাথে তিনিও এসেছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে। ফলে তার লেখাতে দেশভাগ ও দেশভাগের ফলে ছিন্নমূল মানুষগুলোর সংগ্রাম এবং শিখর সন্ধানের ছবিপট বিশ্বস্ততার সাথে অঙ্কিত হয়েছে। তার ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘আলৌকিক জলযান’, ‘ঈশ্বরের বাগান’ প্রভৃতি উপন্যাসে দেশভাগের গভীর ছায়া লক্ষ্যগোচর হয়। আসলে ছিন্নমূল জীবনকে নিজের জীবনে ধারণ করেছিলেন বলেই তাঁর উপন্যাসের চরিত্র ও ছবিপট এতোটা জীবন্ত। তিনি লিখেছেন, ‘যেন জীবন শেষ হয়েও হয় না’। যা লিখি, মনে হয় তারপরও লেখা বাকি থেকে যায়, সেই কবে বাবা, কাকা, জ্যাঠার সঙ্গে বঙ্গ আমার জননী আমার, কথা ভুলে এদেশে পদার্পণ।

 ছিন্নমূল জীবনে দেখেছিলাম এক খন্ড জমি, একটুখানি বাড়ি, একটুখানি আশ্রয়, একটু খানি আহারের জন্য জীবনের সর্বস্ব বাজি রেখে এলাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বের হয়ে পড়েছেন। যাঁরা অতীতে ছিলেন, এখনও যারা আছেন-দুর্গম কঠিন সংগ্রামের ভেতর থিতু হয়েছিলেন বা হয়েছেন, মহাকাল তাঁদের সেই সংগ্রামের ইতিহাস গ্রাস করবেই যতটুকু পারা যায় দর্পণে উদ্ভাসিত করে রাখা। ‘অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর সাহিত্য জীবন জুড়ে এই মহৎ কাজটি সফল ভাবেই করতে সক্ষম হয়েছিলেন’। ওপার বাংলার তথা বর্তমান বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাকার হাসান আজিজুল হক।

দেশভাগের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর একটি অনবদ্য সাহিত্যকাজ ‘আগুন পাখি’ নামক উপন্যাস। উপন্যাসের গল্পপট ভীষন চমৎকার এবং হৃদয় বিদারক। দেশভাগের তিক্ততা ও আবেগঘন বিচ্ছেদ বর্ণনায় উপন্যাসটি অনবদ্য শৈল্পিক মর্যাদার সাক্ষর রেখেছে। দেশভাগের উপর লিখিত অন্য একটি অনবদ্য উপন্যাস সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ পূর্ব ও পশ্চিম ‘ দেশ ভাগের শিকার হয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই। প্রখ্যাত লেখক হর্ষ দত্তের সাথে এক আলাপ চারিতায়, নিজের দেশ, নিজের মাটি থেকে ছিন্নমূল হওয়ার ব্যাথার ছোঁয়া রয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে, কেন এই বিষয়টি ঘুরে ঘুরে এসেছে? এই প্রশ্নের উত্তরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘দেশভাগ নিয়ে আমার বাবার একটি উক্তি আমার সব সময় মনে পড়ে। ‘৪৭ এর ১৫ আগস্টের সকালে বাবা ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলেছিলেন, ভারত স্বাধীন হল, আর আমরা আমাদের দেশ হারালাম। সেই বেদনা এত বছর পরও বুকের মধ্যে টনটন করে’। এই বেদনার স্বরলিপির রূপদান করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ নামক উপন্যাসে। উদ্বাস্তু মানুষগুলোর অসহায় জীবন ও লড়াই করবার প্রতি স্পর্ধার এক অনন্য বিনির্মান এই উপন্যাস। এ ছাড়াও দেশ ভাগের ছায়া মেলে যে সব সাহিত্য কর্ম সমূহে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, গৌর কিশোর ঘোষের ‘প্রেম নেই’, মনোজ বসুর ‘ইয়াসিন মিয়া’, নরেন্দ্র দেবের ‘চলচিত্র’, সমরেশ বসুর ‘নিমাইয়ের দেশত্যাগ’, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘গণনায়ক’ প্রভৃতি আরও অনেক উপন্যাসে।

 লেখকঃ

 সভাপতি, নেত্রকোণা সম্মিলনী, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

 তথ্য সূত্রঃ-

১. বাংলা সাহিত্যে দেশভাগঃ দেবদুলাল মান্না।

২. ছিন্নমূল রাজনীতির উৎস সন্ধানেঃ শিবাজী প্রতীম বসু।

 

Scroll to Top