মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জনাব আব্দুল আউয়াল তালুকদার

আহমেদ সামির

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক  আব্দুল আওয়াল তালুকদার মধ্যনগর উপজেলার দুগনই গ্রামে ১৯৪৮ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মৃত: আরজ আলী তাং, মাতা:  জমিদারের নেছা, স্ত্রী : মোছা: গুলশানারা রিমি। তার এক মেয়ে শাওন ডাক্তার ও জামাতা সেনাবাহিনীর কর্নেল এবং ছেলে আলভী ব্যবসা ও সিলেটে রাজনীতিতে জড়িত।

শিক্ষা ও কর্মজীবন:জনাব  আব্দুল আওয়াল তালুকদার দুগনই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,  ও মধ্যনগর বি.পি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা সরোয়ার্দী কলেজে  ভর্তি হন । পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ঢাকাতে পুরোপুরি  ব্যবসায় মনোযোগী হন এবং অল্প সময়ে সফলতাও পান। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যবসার অবস্থা খারাপ হওয়ায় সুনামগন্জে ফিরে এসে ফিসারী ও ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। তাতে তিনি আবার সফলতা পান এবং নিজেকে সুনামগন্জে একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল আউয়াল ব্যক্তিগত জীবনে রাজনৈতিক হিংসা বিদ্বেষের অনেক উর্ধে ছিলেন। ছিলেন ভিন্ন মতাদর্শ ও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। এ বিষয়ে প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক,প্রাবন্ধিক  অধ্যাপক ননী গোপল সরকারের “স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী “-প্রবন্ধতে উদ্ধৃত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চিত্রবাংলা-র সাংবাদিক জনাব রুহুল চৌধুরীর লিখা থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ধর্মপাশা উপজেলার চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়ালের একটি সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলোঃ “মেহের ভাই আমাদের রাজনৈতিক শিক্ষক ছিলেন। উনার কাছেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৬৫ সালে মেহের ভাই সুনামগন্জ জেলার মধ্যনগর থানার দুগনৈ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে করেন। উনার শ্বশুর জনাব রহমত আলী তালুকদার ছিলেন অত্র অঞ্চলের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি। সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মেহের ভাই সরকার বিরোধী আন্দোলনে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর ৬দফার দাবীসহ ৬৯,৭০,৭১এর আন্দোলন গুলোকে নেত্রকোনার পাশাপাশি এই অঞ্চলেও জনপ্রিয় করে তোলেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি এই অঞ্চলের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা  আকিকুর রেজা ভূইয়া ও আমাকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক   করে মধ্যনগর থানার মধ্যে প্রথম দুগনৈ গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। পরবর্তীতে তিনি    মোঃ আকিকুর রেজা ভ‚ইয়াকে সভাপতি ও আমাকে সহ-সভাপতি এবং বাদল চন্দ্র দাসকে সাধারণ সম্পাদক  করে মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। মেহের ভাইয়ের নেতৃত্তে মধ্যনগর থানার ছাত্র ও যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে থাকি।এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে মেজর  এম এ মোত্তালিব(পরবর্তীতে যিনি সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন)  ও ক্যাপ্টেন গণীর নেতৃত্তে কয়েকশ সামরিক কর্মকর্তা ও ই পি আর সদস্য  দুগনৈ গ্রামে আসলে মেহের ভাইয়ের নেতৃত্তে উনার শ্বশুর বাড়ীতে কয়েকদিনের জন্য তাদের  সকলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করি এবং নিরাপদে ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেই। এছাড়াও মেহের ভাইয়ের নেতৃত্তে আমরা  উনার শ্বশুর  রহমত আলী তালুকদারের বাড়ী থেকে শত শত মণ ধান, চাল, অন্যান্য সামগ্রী মহেষখলা ক্যাম্পে পাঠাই যাহা ক্যাম্প পরিচালণায় অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূ্ণর্ ভুমিকা পালন করে।“- “ মানুষের প্রতি এমন সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের ঘটনা আজকের এ সমাজে বিরল।

রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ষাটের দশকে নেত্রকোনার রাজনীতির কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলীর কাছে জনাব  আব্দুল আওয়ালের রাজনীতির হাতেখড়ি। পরবর্তীতে জনাব  আওয়াল নিজেকে সুনামগন্জের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের এক নম্বর সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন । তিনি দুইবার অবিভক্ত ধর্মপাশা উপজেলার( মধ্যনগর,ধর্মপাশা,জামালগন্জ) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দুগনৈ গ্রাম মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের  সহ-সভাপতি ছিলেন।

মৃত্যু: মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জনাব আব্দুল আউয়াল তালুকদার ২০১১ সালে সিলেটে মৃত্যু বরন করেন।

Scroll to Top