গ্রাম্যতা

পূরবী সম্মানিত

 গ্রাম্যতা আর প্রকৃতিতে নিমজ্জিত হওয়া মানুষের সহজাত ও আদিমতম প্রবণতা। অবশ্য এ প্রবণতাকে যারা অস্বীকার করে গ্রাম্যতাকে তুচ্ছার্থে নাক সিটকায়, যারা গ্রাম্যতাকে অভদ্রতা, অশিষ্ট বা অশ্লীল রীতিনীতি, অশিষ্ট বা অশ্লীল বাক্য বা আচার ব্যবহার, অমার্জিত, অপরিশীলিত এসব শব্দের পাশে পর্যন্ত স্থান দিয়ে রেখেছে তাদের কথা আলাদা। ক্ষেত ভরা ধান, জল ভরা দিঘি, বয়ে চলা আঁকাবাঁকা নদী-নৌকো, বাগানে কত রকম ফলের গাছ, বাঁশ, করচ, হিজল, বিস্তীর্ণ মাঠ, ওপারে নুয়ে পড়া আকাশ, আকাশের ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া রঙের খেলা, সুর্যটাকে জেগে ওঠতে দেখা, রোদে নিজের লম্বা ছায়াটা ছোট হতে হতে ছায়ার মাথায় পা পড়া মানে ঠিক দুপুর, দুপুর পেড়িয়ে ছায়া লম্বা হওয়া মানে বিকেল। সূর্য পশ্চিমে হেলতে হেলতে ডুবে যেতে থাকে, μমশ লাল আভায় চরাচর রাঙা করে সূর্য ডুবে যায়। গোধুলীতে ধূপ-ধূনো আর বুনো ফুলের মাখামাখি গন্ধ। ঝিঙে ফুল টুনটুনিকে ডাকে-আয়না ভাই, খেলি! টুনটুনি ডালিম গাছের খড়কুটোর সংসারে ঢুকে বাচ্চাদের আধার খাওয়ায়। আঁধার না হওয়া পর্যন্ত প্রজাপতিরা ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। সন্ধ্যায়, রাতে কত ফুল ফুটে! সকালে ঝরে যায়! প্রাকৃতিক এ সময় ব্যবস্থাপনায় অভ্যস্থ মানুষেরাই গ্রাম্য। তাদের কাছে মিনিট ঘন্টা হিসেবে ঢং ঢং করা নাগরিক প্রয়োজনীয় দোলন ঘড়িটা অপ্রয়োজনীয় ও বিরক্তিকর।

এমন ফ্রেমহীন, হিসেব ছাড়া সময়ের সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে নিয়ে সাদামাটা জীবন দিব্যি চালানো যায়। যারা চালিয়ে যায় তারা গ্রাম্য, সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবন তাদের। গ্রাম্যতা তাদের বেশ-ভুষণ। নাগরিক জীবনের ইট, পাথর, লোহা, কংক্রিট, কারখানা, রাজপথ, যানবাহনের রুক্ষ, নির্দয়-নির্মম কাঠিন্যের তাÐব নেই এখানে। বরং শান্ত স্নেহময় প্রকৃতির বহমান নদীর মতো কলকল চঞ্চলতায় ছন্দময় জীবন প্রবাহ। এখানেও কোলাহল আছে-নদীতে ছেলেদের সাঁতরানো দাপাদাপির কোলাহল, লোকজ গান, জারি, সারি, ভাটিয়ালি প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে সুরের আবহে মাতাল করে তুলে। আরও কোলাহল আছে যেমন-সকাল সন্ধ্যা পাখিময় হয়ে উঠে গ্রাম্য এ পরিবেশ। সকাল সন্ধ্যার এই কলরব, ওদের কিচির-মিচির ডাকাডাকিতে এক কোলাহলের পরিবেশ হয়। কাক, বক, শালিক, চড়ুই লেজঝোলা কত রকম পাখি! নানান বিচিত্র সুরে ওরা ডাকে, শিষ দেয়। হঠাৎ কেউ গ্রামে এলে, রাতের প্রহরে প্রহরে পাখির বিচিত্র আর কখনো বিভৎস শব্দে রাতের নিরবিচ্ছিন্ন ঘুম কেঁপে কেঁপে ওঠে।

 সন্ধ্যেয় ঝাঁকে ঝাঁকে গো-শালিক উড়ে আসে। গো শালিকের সাথে কাক, বক, শালিক, চড়ুই লেজঝোলারাও সন্ধ্যায় গাছে ফেরে। গাছে, ঘরের ফাঁক ফোঁকরে জায়গা ভাগাভাগি করে ওরাও থাকে। ওদের চেঁচামেচিতে তখন কান পাতা দায়। ঘন্টা দেড়েক চলে এই সান্ধ্য নিবেদন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ওদের চেঁচামেচি থেমে যায়। মাঝে মাঝে ওহু-আহা ছাড়া সারা রাত ওরা চুপচাপ। উঠানের আম গাছে বাচ্চাকাচ্চা সহ বকেদের বাস। কাকেরা এখন এ বাড়িতে সংখালঘু। আগে কাকদের কা কা শব্দে ঘুম ভাঙতো। সকালে কলপাড়ের এঁটোকাঁটা, বাসি পান্তার উপর ঝাঁক বেঁধে পড়তো মুরগী হাঁসেদের সঙ্গে। কাক কমে যাওয়াতে বাড়ির গিন্নি মা খুশি-কোন কিছু নিয়ে টানা হেঁচড়াটা কমেছে, শস্যদানা, মরিচ, কলপাড়ের সাবান, বাসন মাজার লুড়ি-লুচনিটা নিয়ে পর্যন্ত টানাটানি করে আপদগুলো।

 ইদানীং পানকৌড়ি নাকি বকেদের ঘর দখল করছে। বাড়ির গিন্নীরা চেঁচামেচি করছে-উঠান বক, পানকৌড়ির ঘু’তে ভরে আছে। গন্ধে টেকা দায়। জোয়ান পোলা-ফুড়ি গালি খায়-আদিখ্যেতা কত! নারিকেল মালা, ছুবড়া দিয়া ঘর করে অভয়ারণ্য করে যে দিছস, ঘু সাফ করবে কে শুনি? কে শুনে কার কথা? প্রশ্রয় বা অবহেলা যে কোন প্রকারে হোক- কাক, বক, পানকৌড়ি, গো শালিক, বাত শালিক, টিক্কা ময়না, দোয়েল সবাই গাদাগাদি করে বাড়িতেই থাকে। গিন্নিমা অবশ্য বাড়ির পাখি প্রেমীদের অগোচরে সুযোগ পেলে বক খাদকদের বক বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। রাতের শেষ প্রহর না ফুরাতেই ওদের এই কলরবে বাড়ির অতিথির ঘুম ভেঙে যেতে বাধ্য। বাড়ির লোকদের এসবে অভ্যেস হয়ে আছে। এ সময় কুকুরবাহিনীও আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে ওঠে, সতর্ক দৃষ্টি তাদের। বাড়ির কুকুরগুলো রাতের প্রহরী। কোন একটু শব্দে, ওরা গৃহস্থকে ঘেউ ঘেউ করে সতর্ক করে। কুকুর একটানা ডাকলে গৃহস্থ উঠে কারণ অনুসন্ধান করে। গাঁয়ের লোকে বিশ্বাস করে চোরেরা নাকি কুকুরের গায়ে বালিপড়া দিয়ে কুকুরের ডাকাডাকি বন্ধ করে নির্বিঘেœ চুরি করে। বালি পড়ার কেরামতিতে বিশ্বাস নেই আমার। জানি গ্রামে চুরি চামারি হয়। সিলেট সুনামগঞ্জের ভয়াবহ বন্যার পর ডাকাতি হচ্ছে হাওরের গ্রামগুলোতে-এমন রটনা রটে। হাওরে সন্দেহজনক ট্রলারের চলাচল, অবস্থান জানিয়ে পুলিশে ইনফর্ম করা হয়। পুলিশের টহল থাকুক না থাকুক বাড়িগুলোতে আতঙ্কে পাহাড়া বসে। বাড়ির কুকুরগুলো সে সংকটকালীন সময়ে নিজেদের দায়িত্বের কথা ভুলে যায়না। তারাও রাত জেগে পাহাড়া দেয় মুনিবের সঙ্গে। এমনিতে ওদের কোন ঘর বা বিছানা নেই। বারান্দায় শুয়ে বসে, বাড়ির চারপাশে দৌড়াদৌড়ি করে সময় কাটায়।

স্মরণকালে যে বাড়িতে পানি ওঠেনি সে সব ভিটেয়ও পানি ওঠে এ বছর। কুকুররা তখন গোয়াল ঘরে গরু ছাগলের সাথে গাদাগাদি করে থাকে। হাঁস মুরগির ঘর উঠুনের এক কোণে। সন্ধ্যায় ওরা উঠানের ছড়ানো খাবার খেয়ে ঘরে ঢুকে। খাবারের লোভে ওরা ঘরে ঢুকতে দেরি করলে তখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। ওদের ঘরে ঢুকার পথে সবজি মাচার নিচে, এটা ওটার আড়ালে বেজি, বন বেড়াল, শিয়াল উৎ পেতে থাকে। সাধ্যমত একটাকে চুরি করার মতলবে থাকে এরা। তবে কুকুরকে ভয় পায়। কুকুরগুলো হাঁস মুরগিদের ঘেউ ঘেউ করে শাসন করে, নিজ নিজ খুপরিতে উঠার জন্য গিন্নিদের সাথে তারাও তাড়া দেয়। বাছুরগুলো তিড়িং বিড়িং করলে কুকরগুলো ওদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠে। একটা নিবিড় সম্পর্কে বাড়িতে ওরা সবাই জড়াজড়ি করে থাকে। বাড়ির পুরোনো দালানটা প্রায় শত বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দালানের উপর বট, কুডুরা, ঢেঁকিশাক, নানা বনজ আগাছায় জঙ্গল হয়ে আছে। ফুল ফুটছে, ফল পড়ছে, নতুন অংকুরোদগম, নতুন জীবন প্রস্ফুটিত হচ্ছে নির্বিঘ্নে। তাদেরকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকছে কীটপতঙ্গ, কেঁচো, মেরুদন্ডীর নানা শ্রেণির নানা প্রজাতি। জৈব অজৈবের মিথষ্ক্রিয়ায় এখানের আলাদা ফুডচেইন, স্বতন্ত্র বেঁচে থাকার বৈচিত্রতা।

 দালানে উল্টো হয়ে ঝুলে আছে শত শত চামচিকে। ওরা নিশাচর না, তাই নিজেদের ইচ্ছেমতো কিচিরমিচির করে চলাফেরা, প্রসব, বংশবৃদ্ধি। চামচিকের বাচ্চাদের ইঁদুর, সাপ, গুইসাপ খেয়ে ওরাও বেঁচে আছে। ফুড চেইনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক বেঁচে থেকে সংখ্যা বৃদ্ধি করছে। নির্বিঘেœ এখানে এসব চলে। মানুষের উৎপাত নেই বলেই এ ঘরকে কেন্দ্র করে বসবাস করা বাসিন্দাদের এক আলাদা জগৎ। দালানের ভাঙ্গা ইটের স্তুপ, আস্তর, ইটের গুঁড়ার সাথে চামচিকা, বাদুড়ের বিষ্ঠা মিশে প্রাকৃতিক সার তৈরি হয়ে আছে। খুব সন্তর্পনে দালান ঘরের বর্তমান বাসিন্দাদের এড়িয়ে সে সার ওড়া ভর্তি করে নিয়ে লাউগাছ লাগিয়েছে জায়গীর থাকা নতুন মাস্টারনি দিদি। ফনফনিয়ে ওঠা লাউ, সীম, বরবটি গাছ দেখে বাড়ির কর্তারা বিছরায় রবিশস্য করা বউ-ঝিদের দেখায় দেখ, দেখে শিখ (শেখা) এই অইল আদতে শিক্ষা, ফালাইয়া দেয়া জিনিসও শিক্ষার ছোঁয়ায় কেমনে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে! চামচিকের কাছাকাছি প্রজাতি বাদুড়েরাও এখানে একটা বন্দোবস্ত করে থাকছে। বাদুড়েরা নিশাচর। ওদের অবশ্য নিশাচর না হয়ে উপায় নেই। কোভিড-১৯সহ মারাত্মক সব ভাইরাস বহনকারী বাদুড়কে মহামারীর প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী করে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করার পায়তারা যে চলছে, তা কি তারা বুঝেনা! তবু লক্ষ্যণীয় হালকা ওজনের শরীর নিয়ে, লোকের চোখ এড়িয়ে কলাটা, পেঁপেটা পেয়ারাটা খেয়ে দীর্ঘ জীবন পাড়ি দিচ্ছে, টিকে থাকার লড়াই করছে কৃষির জন্য উপকারী এই প্রাণীটি।

 দালানের ভাঁজে ভাঁজে ফোঁকরে, গর্তে আছে সাপ। গরমে সাপগুলো হরহামেশাই বের হয়ে আসে। রাতে বারান্দায় ঝোলানো পোষা কবুতরের খোপে ঢুকে হুড়োহুড়ি শুরু করে মা-বাবা কবুতরের সঙ্গে। গিন্নিমা শুয়ে থেকে চেঁচান-হুস, হাস্, হাস্। টিনের বেড়ায় লাঠি দিয়ে শব্দ করে ভয় দেখান-যা তো আপদরা, তরার লাইগা কইতরগুলাইন ডিম পাড়তে পারেনা, বাচ্চা দিতে পারেনা, নিয়া যাস তরা। হাস্, হুস-কেন্ রে, আমরার কি কইতর খাওনের মুখ নাই? সাপেরা আজন্ম কালা-ত্যাড়া। গিন্নিমার কথা কানে ঢুকে না, ডিম-বাচ্চা নিয়ে যায়! দালানটা গেছো, বড়ো, বাতারি, নেংটি, নানা আকারের ইঁদুরের আস্তানাও। সাপেরা কখনো ধেড়ে ইঁদুর মুখে নিয়ে ধুম করে লাফিয়ে পড়ে উঠোনে। কখনো আয়েশি চালে উঠোনের কোণের স্থলপদ্মের ডালে বসে জিহ্বা নাড়িয়ে হাওয়া খায়! দীর্ঘদিন ভাঙা দালানের ইট, গুঁড়ার ভেতর বাস করে তীব্র বিষধর কাল কেউটে, বিষহীন রূপালি দাঁড়াস সব সাপই ইটালি রঙ ধারণ করেছে। এদের জাত চেনা দায় হয়ে পড়ে লোকের। বাড়ির লোকেরা এদের ভয় পায়না। বরং একটু খাতিরই করে। দুরে দাঁড়িয়ে এদের চলাফেরায় তামাশা দেখে। তাদের বিশ্বাস বাস্তু সাপের ক্ষতি না করলে ওরা কামড়ায়না,ওরা বাড়ির প্রহরী। এমন কত লোকবিশ্বাস গ্রামের মানুষের মধ্যে স্থায়ী হয়ে আছে! শতবর্ষ আগে এ বাড়ির বর্তমান কর্তার ঠাকুমা ঘরের ভিটেয় ইঁদুরের গর্ত ভরাট করতে গেলে সাপের কামড়ে মারা যায়। সে থেকেই বাস্তু সাপের প্রতি বাড়ির লোকদের মান্যিগণ্যি। এখনও শ্রদ্ধা ভরে শাওন মাসে মাসব্যাপী পদ্মপুরাণ পড়া হয়, নাগের দুধ কলা দেওয়া হয়, সংক্রান্তিতে মনসা পুজা হয় জাঁকজমক করে।

শুধু মনসা পুজা কেন, গ্রামীণ সহজ সরল জীবনের সঙ্গে কত পূজা, সিন্নি, ঝাড়ু-ফুঁ, কলতাঝাড়া, গাজীরগান, প্রবাদ প্রবচন, সংস্কার কুসংস্কারের বাড়াবাড়ি মানুষের আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ও এখনও আছে। প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের পূর্বে কৃষি নির্ভর এদেশে গরু ছিল কৃষকের প্রাণ। গরু আর কৃষকের সম্মিলিত শ্রমেই টিকে থাকতো গ্রাম নির্ভর অর্থনীতি আর উন্নয়ন। কৃষক-কৃষানীর প্রায় সকল কর্মকান্ড ছিল গরুকে কেন্দ্র করে। গোয়াল ঘরকে কেন্দ্র করেই ছিল সকল কর্মকাÐ, ছিল আচার অনুষ্ঠানও। বিষু পুজা, গুরুক্ষনাথের সেবা, সিন্নি-কত সব অনুষ্ঠান! যুগ যুগের গ্রামীণ শোষণ নিপীড়ন, চরম দরিদ্রতাকে আড়ালে রেখে গ্রামীণ চিত্রকল্প আঁকতে, গ্রামীণ সমৃদ্ধি বর্ণনায় সাহিত্যের পাতায় পাতায় লিখা হয়েছে-গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু। কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে জমিতে এখন কাঠা প্রতি আধা মণ আউশ ধানের জায়গায় হাইব্রিড ধানের কাগুজে ভাষায় বাম্পার ফলন হয়। এখনও জোতদারের গোলা ভরা ধান, এখনও গ্রাম্য অর্থনীতির গ্যাঁড়া কলে পড়ে প্রান্তিক কৃষক বাধ্য হয় রোদ বৃষ্টি ঝড়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো ফসল মাঠ থেকেই ফরিয়া ব্যবসায়ীর আড়তে তুলে দিতে।

মাঠের পাড়ে ছায়ায় বসা রাখাল, গরু আর প্রকৃতির নিবিড় সখ্যতার মাঝে রাখালের হাতে বাঁশি, কবির এ কল্পনা তাঁর সৃষ্টিতে অনন্য মাত্রা যোগ হয়। কত রচনা যে রাখালের বাঁশির এ জীবন্ত সুরের ছবি আঁকে! সন্ধ্যায় গ্রামের মেঠো পথে ধুলো উড়িয়ে গরুর  পাল লয়ে ঘরে ফিরে রাখাল। কখনো নদীর পাড় ঘেষে সে পথ। পথের মাঝে নিজ নিজ গোয়াল চিনে নিয়ে কৃষকের মনে স্বস্তি ফেরায় গরু ছাগলেরা। গ্রামীণ চিরচেনা এ দৃশ্য বারবার উঠে এসেছে চিত্রকরের চিত্রপটে। সাহিত্যের পাতার গ্রামের সেই গোয়াল ভরা গরু আজ ক্রমশ নিশ্চিহ্ন হবার পথে। হাল বাইতে বাইতে পাজর ক্ষয়ে যাওয়া হাড্ডিসার গরুর দল কালের আবর্তে মেশিনের কাছে পরাজয় মেনে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন গরু আর গোয়ালের যতœ নিতে ভুলে গেছি। ফাঁকা মাঠ, মাঠের পাশের পরিত্যক্ত ভিটা, অনাবাদি ভূমি, ক্ষেতের কান্দা, প্রয়োজনের চেয়ে প্রশস্থ আইল নেই এখন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যে গো সম্পদ নষ্ট হয় তা রিকভারি করা হয়না আর। তার উপর গো সম্পদ যা আছে তার প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণের অভাবে সঠিক ব্যবহারও করতে পারছি না আমরা। দুধ আর মাংসের উৎসের জন্য আমরা আমদানি আর খামার নির্ভর হয়ে গেছি।

যবে থেকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো মোড়কে তামাক ভরে কৃষকের ঠোঁটে গুঁজে দেওয়ার জন্য দোরের কাছে বিড়ি পৌঁছে দিচ্ছে, ডাবার (হুক্কা) মাথায় কল্কির ছিলিমএ আগুন ধরাবার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তবে থেকে গোয়াল ঘরের চব্বিশ ঘন্টার গর্ত আইল্যাটা সন্ধ্যেয় নিয়ম রক্ষা ছাড়া জ্বলে না। নানা কাজে গোয়াল ঘরের এ আইল্যাটা মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় ছিল। শীতের রাতের শেষ প্রহরে এর পাশে বসে তামাকের গুঁড়ার সঙ্গে লালি (তরল গুড় জাতীয়) মিশিয়ে দিনের হিসেবে তামাকের ছিলিম বানানো, এখান থেকেই টিক্কায় (বিশেষ ধরণের ছাই গুলিয়ে টিক্কা বানিয়ে রোদে শুকানো) আগুন জ্বালিয়ে কল্কিতে রেখে গড়গড় করে ডাবা টানতে টানতে চাষের প্ল্যান করতেন কৃষক। অতঃপর অন্ধকার থাকতে থাকতে খড়ের বেনীর মুখে আগুন ধরিয়ে মাঠে যেতেন প্যাকির (কাদা) হাল বাইতে। ফিরে এসে কৃষি যন্ত্রপাতি রেখে হাত পা ধুয়ে গা গরম করতো এই আইল্যায় বসেই। বাড়ির গিন্নিদের কাছে চুলা ধরানো, সান্ধ্য বাতি জ্বালানোর জন্য দিয়াশলাই এর চেয়ে গোয়াল ঘরের আইল্যাটা ছিল সহজলভ্য। পাটকাঠির লাল পোড়া মাথায় ফুঁ দিয়ে আগুন জ্বালানোতে গ্রাম্য বৌ-ঝি’দের ছিল এক শৈল্পিক দক্ষতা। গোয়াল ঘরের মশা তাড়ানোর জন্য একমাত্র উপায় ছিল আইল্যার আগুনের ধোঁয়া, এটা ওটা দিয়ে অন্ধকার করা এক ধোঁয়ার কুÐলী গরু বাছুরদের মশাদের থেকে স্বস্তি দিতো। ধোঁয়ার বদলে গোয়াল ঘরে এখন মশার কয়েল ব্যবহৃত হয়। প্রযুক্তির সহজলভ্য ব্যবহার প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় কত পণ্য এখন মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করে দিয়েছে, তেমনি মানুষের ভেতরের সহজ সরলতাকে ভেঙে খানখান করে মানুষকে নতুন এক অফুরান চাহিদাপূর্ণ জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে প্রযুক্তির বাজারি ও মুনাফা সর্বস্ব ব্যবহার!

লেখকঃ প্রভাষক, তেলিগাতী সরকারি কলেজ, আটপাড়া।

Scroll to Top