আন্তরিক শ্রদ্ধায় ফিরে দেখা ভাষা সৈনিক মোঃ আবুল হোসেন
ড. বুদ্ধদেব বন্দ্যোপাধ্যায়
নেত্রকোণার জনহিতকর প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়ন সংস্থা (অমাস)-র প্রাণপুরুষ মো. ইকবাল হাসান তপু মানুষের সেবায় যে নানাবিধ কর্মসূচি সম্পাদন করে চলেছেন তা নেহাৎই কাকতালীয় নয়। দেশের সেবায় আত্মনিবেদনের গরিমা তিনি লাভ করেছেন তাঁর পিতা, বাহান্ন’র ভাষা আন্দোলনের সৈনিক মোঃ আবুল হোসেন শ্রদ্ধাষ্পদেষু’র কাছ থেকে। এই লেখায় আমরা ফিরে দেখব সেই বরেণ্য মানুষটিকে যিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর দেশের মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভাষিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি আন্দোলনে, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক বৃত্ত অতিক্রম করে নিজেকে প্রসারিত করেছিলেন বৃহত্তর মানুষের কল্যাণের স্বনিষ্ঠ প্রণোদনে।
মো. ইকবাল হাসান তপু তাঁর পিতার স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে গড়ে তুলেছেন ‘ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি’। এই প্রতিষ্ঠানটির তরফে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ মো. ইকবাল হাসান তপু’র সুচারু সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে ‘বিচারপতি ওবায়দুল হাসান: ইতিহাসের পথ বেয়ে ঐতিহ্যময়’, ‘উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত : এক উজ্জ্বল আলোকশিখা’ এবং ‘মুহ. আবদুল হাননান খান : সময়ের সাহসী সন্তান’। আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের কাজ চলছে, ধারাবাহিকভাবে যেগুলি প্রকাশিত হবে একে একে। ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিবিধ প্রকাশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাংলার পূর্বপ্রদেশের ঋদ্ধ লোকসাহিত্য সংরক্ষণের একাগ্র তাগিদে প্রতিষ্ঠানটি দেশের সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু আরও পাঁচটা ভালো কাজ যেভাবে কুচক্রীদের সমালোচনার শিকার হয়, ‘ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি’-ও তার ব্যতিক্রম নয়।
এ বিষয়ে প্রভাষক পিয়াস আহমদ বলেছেন, ‘ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন সাহেবের সুযোগ্য সন্তান জনাব ইকবাল হাসান তপু। তিনি তাঁর পিতা-ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন সাহেবের নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করিতেছেন, যা নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি’। প্রতিষ্ঠানটির জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটির এলাকায় কতিপয় কুচক্র মহল এর বিরোধিতা করে আসিতেছে। কুচক্র মহলটি ইতিপূর্বে মন্ত্রণালয় ও বোর্ডে জায়গার মালিকানা নিয়ে অভিযোগ দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। এখন ভাষা সৈনিক নামকরণ নিয়ে অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন সাহেব মূলত একজন ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন’।
এই প্রসঙ্গে আমরা ফিরে দেখব মোঃ আবুল হোসেনের বর্ণময় জীবনের সংগ্রামী অধ্যায়ের দিকে। আর এক বরেণ্য ভাষা-সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবাসী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালক, চুয়াডাঙা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুহম্মদ ফুলে হুসেন ‘ভাষা সংগ্রামের স্মৃতি কথা’-য় বলেছেন, ‘আমি ১৯৫১ সাল পর্যন্ত নেত্রকোণায় সকল আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত ছিলাম ও পরে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে ভর্তি হবার কারণে সেখান থেকেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি।
নেত্রকোণায় বন্ধু ফজলুর রহমান উল্লেখযোগ্য প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। সিনিয়রদের মধ্যে থেকে আব্দুল মজিদ তারা ভাই, আবুল হোসেন ভাই, আঞ্জুমান স্কুলের শিক্ষক ওয়াজেদ আলী সাহেব-সহ অনেকেই আমাদের জোরালো সমর্থন ও সহযোগিতা করেছিলেন। আমি, ফজলুর রহমান, আবুল ভাই ও নুরুল হুদা একই ইউনিয়ন রৌহার সন্তান থাকায় আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রটি ছিল ভিন্ন মাত্রায়’। অধ্যাপক ফুলে হুসেন আরও লিখেছেন, ‘আমি ছাত্রাবস্থায় আবুল ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা ও পরামর্শ পেয়েছি। স্নেহ-ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি বারবার। রৌহাবাসী বিশেষ করে আমার তেলিগাতি গ্রামের প্রায় সকলেরই ভরসার নাম ছিল আবুল ভাই। আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে বহু গল্প শুনেছি উনার উদার সহায়তার’।
বেশ বুঝতে পারছি, জনাব আবুল হোসেন ছিলেন পরার্থপর ও জনদরদি মানুষ। তাঁর আপন-পর ছিল না। তিনি সর্বদাই মানুষের প্রতি তাঁর হৃদয় প্রসারিত রাখতে পেরেছিলেন। সে-কারণে মান্যবর ফুলে হুসেন বলেছেন, ‘আমার ইউনিয়নের বড় ভাই, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকার আদায়ের সহযোদ্ধা আবুল ভাইয়ের নামে ‘ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমগ্র ভাষা আন্দোলন-কারীদেরই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আমি অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত এজন্য যে, আমার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারছি ভাষা সৈনিকের নামে কলেজ ও গবেষণা একাডেমি প্রতিষ্ঠা হচ্ছে’। কাজেই মো. ইকবাল হাসান তপু তাঁর পিতার নামে সারস্বত প্রতিষ্ঠান গঠন করে একটি ঐতিহাসিক কাজ করেছেন। বাংলাদেশের জাতিসত্তা ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। সে কারণে মোঃ আবুল হোসেন নামের পরার্থপর ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধ-সংগঠকের স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত প্রতিষ্ঠানটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে এবং সেই কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।
২০২০-র ১৫ অগাস্ট ‘জাতীয় শোক দিবস ২০২০’ ও বঙ্গবন্ধুর ৪৫তম ‘শাহাদাৎ বার্ষিকী’ উপলক্ষ্যে ‘ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি’-র আয়োজনে এবং ‘অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়ন সংস্থা’ (অমাস)-র সহযোগিতায় ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করা হয় এবং একটি মনোজ্ঞ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরের ২৫ মার্চের কালো রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রথম প্রতিরোধকারী পুলিশ সদস্য জনাব শাহজাহান মিয়াঁ, কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, সুলেখক, কবি ননীগোপাল সরকার, পরিচালনা পরিষদের সদস্য কামরুজ্জামান আকন্দ, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন। সভাটি পরিচালনা করেন একাডেমি তথা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মাননীয় ইকবাল হাসান তপু। শ্রী তপু সযত্নে, হৃদয়ের উষ্ণ প্রণোদনে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক আকর-গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন। বইটির শুভ প্রকাশ উপলক্ষে মৃত্যুহীন বঙ্গবন্ধুর মহান শহিদানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যথোচিত সম্মাননা জানানো হয়। বিপ্লবী আবুল হোসেনের নামাঙ্কিত কলেজ ও একাডেমি যেহেতু নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংকল্পে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সে-কারণে বঙ্গবন্ধুর জন্ম-শতবর্ষে তাঁর অমলিন স্মৃতির প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা নিবেদন প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ গঠনের কাজে মরহুম আবুল হোসেনের সুমহান আত্ম-নিবেদনের উত্তরাধিকারে ঋদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
‘ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি’ আরও যে তিনটি গ্রন্থ এযাবৎ প্রকাশ করেছেন এবং আগামী দিনে যে প্রকল্পগুলি গ্রহণ করেছেন তা সর্বার্থেই জাতীয় মনীষীদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মাধ্যমে জাতিগঠনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অনুসূত্রে জনাব আবুল হোসেনের অপূর্ণ স্বপ্নপূরণের একটি মহান প্রয়াস-যা তাঁর সুযোগ্য পুত্র সমগ্র জীবন উৎসর্গ করে সার্থক করে তুলতে চাইছেন পরার্থপর কর্মের সুশৃঙ্খল বন্ধনে।
আবুল হোসেনের নামঙ্কিত প্রতিষ্ঠানটিকে নানা কাজের মধ্য দিয়ে সার্থক করে তোলার অর্থ মহান মানুষটির জীবনাদর্শ এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে তুলে ধরা। মানুষ যে কেবলমাত্র নিজে ভালো থাকা, ভালো খাওয়া, ভালো পরার জন্য পৃথিবীতে আসেনি, অন্যের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা যে তার জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য, সেই কথাটি আবুল হোসেনকে সামনে রেখে মানুষকে বুঝতে সাহায্য করা খুবই জরুরি বিষয়। মাননীয় ইকবাল হাসান তপু সেই কাজটিই নিষ্ঠার সঙ্গে করতে চাইছেন।
মোঃ আবুল হোসেন নামটি যতবার জনমানসে ভেসে উঠবে ততবারই নতুন প্রজন্ম সেই মানুষটি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবে। নতুন যুগের ছেলেমেয়েরা যখন তাঁর ত্যাগ ও দেশপ্রেমের কথা জানতে পারবেন, তাঁরা নিজেদের ভাবনাচিন্তাকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারবেন এবং দেশের কাজে আত্মনিবেদনের আন্তরিক একটা তাগিদ অনুভব করবেন। এই কর্মসূচি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং মোঃ ইকবাল হাসান তপু-কে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব পুরস্কার ২০২০’ শিরোপায় ভূষিত করে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুব-সংগঠক হিসেবে বাংলাদেশ সরকার সম্মাননা জ্ঞাপন করেছেন।
মরহুম আবুল হোসেন ছিলেন মহৎপ্রাণ মানুষ। আমরা যে ধরনের মানুষের কথা বইপত্রে পড়ে থাকি তিনি ছিলেন তারই জীবন্ত নিদর্শন। জনাব মো. ইকবাল হাসান তপু একাধিক প্রবীণ মানুষের কাছে তাঁর পিতৃদেব সম্পর্কে যা জেনেছেন তার কিছু-কিছু ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। তেমন একটা মূল্যবান পোস্ট থেকে জানতে পারি- স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানে কলেরার খুব প্রাদুর্ভাব ছিল। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে বহু মানুষ অসহায়ভাবে মারা যেতেন। দুধকুড়া গ্রামের জনাব সোবহান খান মারণ কলেরায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁকে আলাদা একটি ঘরে রেখে দেওয়া হয়েছিল। কাছের লোকজনও তাঁর কাছে আসা-যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে নিরুপায় মানুষটি বাঁচার তাগিদে শরীর ঘেঁষটে ঘেঁষটে কোনোরকমে মেইন রোড (নেত্রকোণা পূর্বধলা সড়ক)-এর একপাশে এসে পড়ে রইলেন। কোনও সহৃদয় ব্যক্তি যদি তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছে দেন সেই ভাবনা থেকেই তিনি পথের পাশে ওইভাবে শুয়ে ছিলেন। কিন্তু পথচারীরা তাঁকে দেখে মুখে হাত চাপা দিয়ে দূরে সরে যাচ্ছিলেন, কেউই তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসার সাহস দেখাচ্ছিলেন না। এই সময়ে, ঘটনাচক্রে জনাব আবুল হোসেন গ্রাম থেকে ওই সড়ক ধরে নেত্রকোণা শহরের নিজ বাসায় যাচ্ছিলেন। পথিপার্শ্বে কলেরা-আক্রান্ত মানুষটিকে দেখে তাঁর হৃদয় করুণায় ভরে উঠল। তিনি কাছে এসে সোবহানকে পরম যতেœ কোলে তুলে নিলেন এবং অনেকটা পথ পার হয়ে তাঁকে নেত্রকোণা মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েই তিনি দায়িত্ব সাঙ্গ করে দেননি, বারেবারে রোগীর খোঁজখবর নিয়েছেন, চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করেছেন।
সোবহান সাহেব তপু ভাইকে বলেছেন, ‘১ দিনেই ভয়াবহ পাতলা পায়খানায় শরীরে তীব্র পানিশূন্যতা তৈরি হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় বহু কষ্টে আমি মেইন রোডে (নেত্রকোণা-পূর্বধলা সড়ক)-এ এসে পড়ে ছিলাম। এমন সময় তোমার বাবা গ্রামের বাড়ি থেকে শহরের দিকে ফিরছিলেন, আমাকে প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় আবুল হোসেন সাহেব তুলে এনে নেত্রকোণা শহরে মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করে আমার সার্বক্ষণিক খুঁজ-খবর রাখার ফলে ডাক্তার সাহেবেরাও ভালো চিকিৎসা দিয়ে আমাকে সারিয়ে তুললেন। সে যাত্রায় যমের দোয়ার থেকে ফিরে এলাম আল্লার রহমত ও তোমার বাবা (শ্রদ্ধেয় আবুল হোসেন)-র সহযোগিতায়’। নিজের জীবন বিপন্ন করে একজন মৃতপ্রায় মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনে আবুল হোসেন পরার্থপরতার যে উদাহরণ তৈরি করেছিলেন তা এককথায় অতুলনীয়।
পরবর্তী জীবনে সোবহান সাহেব সিলেট গোটাটিকর উচ্চ বিদ্যালয় ও পুলিশ লাইন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। আবুল হোসেনের কথা উঠলেই তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন এবং অন্তরের নিবিড় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে মরমী মানুষটিকে স্মরণ করেন।
নেত্রকোণার নিউটাউনের বাসিন্দা জনাব সারোয়ার আলম ছিলেন জনতা ব্যাঙ্কের সাবেক ডিজিএম। তিনি জানিয়েছেন-১৯৬৩ সালে নিউটাউন ও মোক্তারপাড়ার মধ্যে ফুটবল প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দলকে পুরস্কার দেবার জন্য একটি শিল্ড তৈরির আবেদন নিয়ে তাঁরা মানুষের কাছে হাজির হয়েছিলেন। সে সময়ে শহরে যে সম্মানীয়, স্বচ্ছল মানুষজনেরা ছিলেন তাঁদের সকলের কাছেই ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজকেরা চাঁদার জন্য গিয়েছিলেন কিন্তু অনেকেই বেবাক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ব্যতিক্রম ছিলেন মোঃ আবুল হোসেন যিনি এককথায় এককালীন পনেরো টাকা চাঁদা দিয়ে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করেছিলেন। সে সময়ে পনেরো টাকার যথেষ্ট মূল্য ছিল। একজন মানুষ কতটা উদার হলে সামাজিক কাজে এভাবে স্হাায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। মুক্তিযুদ্ধের মহকুমা বি.এল.এফ ডেপুটি কমান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব হায়দার জাহান চৌধুরী ও সাবেক এম.পি ছবি বিশ্বাস (ছবিদা) জাতির প্রতি শ্রদ্ধেয় আবুল হোসেন সাহেবের অবদান নিয়ে মূল্যবান আলোকপাত করেছেন। এইসব শ্রদ্ধেয় মানুষের স্মৃতিচারণ আবুল হোসেন নামের মানব-দরদি, দেশপ্রাণ মানুষটিকে জানতে ও বুঝতে সাহায্য করবে এবং ইতিহাস নির্মাণে সদর্থক ভূমিকা পালন করবে তাতে সন্দেহ নেই।
১৯২৫ সালের ২৭ ফেব্রব্রয়ারি নেত্রকোণা সদর থানার (বর্তমানে উপজেলা) রৌহা ইউনিয়ন-ভুক্ত চরপাড়া গ্রামে জন্মেছিলেন ব্যতিক্রমী নবজাতক মোঃ আবুল হোসেন। তাঁর পিতা মরহুম জহুর উদ্দীন মÐল ও মাতা জনাবা নূরজাহান বেগম। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আবুল হোসেন ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। স্বাভাবিকভাবেই তিনি সকলের আদরে-আহ্লাদে মানুষ হন। কিন্তু, ছোটো বয়েস থেকেই তাঁর মধ্যে আশ্চর্য এক মগ্নতা ও গভীরতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ফলে, বালকসুলভ চাপল্য কোনোদিনই তাঁকে লঘুতার পিচ্ছিল পথে পরিচালিত করতে পারেনি।
স্থানীয় মহাদেবপুর স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি নেত্রকোণা শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়’-এ ভর্তি হন। ছাত্র হিসেবে মেধাবী হলেও নিছক পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার সুখস্বপ্নে তিনি কখনও বিভোর হননি। তাঁর হৃদয় জুড়ে বসত করত সাধারণ মানুষ। তাদের দু:খ দুর্দশা, বেদনা তাঁকে অহরহ পীড়া দিত। কিভাবে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেবা করা যায় সেই ভাবনা তাঁকে প্রতিমুহূর্তে উদ্দীপ্ত করত। পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খলমোচনের স্বপ্ন তাঁর প্রাণে উজ্জ্বল আলোকশিখা জ্বালিয়ে রেখেছিল। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়েই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ও দেশের কাজে আত্মনিয়োগ করার কথা ভাবতে থাকেন।
তাঁর পরিবারের মানুষজন চেয়েছিলেন লেখাপড়া শিখে তিনি আর পাঁচজন মানুষের মতোই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুন। কিন্তু, এই পৃথিবীতে কেউ কেউ নিজের জন্য বাঁচাকে আদৌ বরণীয় মনে করেন না। আবুল হোসেন ছিলেন সেই গোত্রের মানুষ। স্বামী বিবেকানন্দের কথাটি তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন-কেউই পর নয়-সকল জীব এক অভিন্ন সত্তার প্রতিরূপ। তাই, যে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে তার ভালোমন্দের জন্যে বাঁচে, সে-ই বাঁচার প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছে। এই ভাবনা থেকেই ‘গোলামখানার শিক্ষা’ ত্যাগ করে তিনি এসে দাঁড়ালেন মানুষের রাজপথে, ভারতবর্ষের মুক্তি আন্দোলনের মহান ব্রতে নিজেকে নিয়োজিত করলেন, ত্যাগের ক্রম-প্রসরমান ঐতিহ্যে যুক্ত হলেন মানুষের অশেষ ভুবনে।
নেত্রকোণা ছিল ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নেত্রকোণার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নওজোয়ান আবুল হোসেনের সখ্য স্থাপিত হল, নানা ধরণের বৈপ্লবিক কাজে তিনি নিজেকে ষোল আনা যুক্ত করলেন। এমপিএ আব্বাছ আলী খান সাহেবের রাজনৈতিক সঙ্গী হিসাবে তিনি কাজ করতে থাকেন। কিন্তু, কথায় বলে, পরিপার্শ্বের চাপ বড় বালাই। লেখাপড়া না শিখে ঘরের ছেলে ‘বাউÐুলে’ হয়ে যাবে সেটা মেনে নিতে না পেরে তাঁর পরিবারের লোকজন ও বন্ধুবান্ধব তাঁকে চাপ দিতে লাগলেন।
তাঁরা বুঝিয়ে বললেন- ‘বেশ, পড়াশোনা ভালো না লাগে, ছেড়ে দাও। কিন্তু, বেঁচেবর্তে থাকতে হলে কিছু একটা তো করতে হবে। তুমি বরং ছোটোখাটো একটা ব্যবসা শুরু করো’।
সেই ভাবনা থেকেই নেত্রকোণা শহরের তেরী বাজার মোড়ে আবুল হোসেনের জন্য একটা ‘ফার্মেসি’ খুলে দেওয়া হল এবং একপ্রকার বাধ্য হয়েই ওষুধের কারবারে সাময়িকভাবে নিজেকে যুক্ত রেখে ‘ফার্মেসি’ চালাতে লাগলেন তিনি। কিন্তু, যাঁর রক্তে মানুষের জন্য কাজ করার মহৎ প্রেরণার অরুণোদয় ঘটেছে তিনি কী ‘কেজো’ ব্যাপারে তৃপ্তি পেতে পারেন? তাই ওষুধের দোকানটিতে খরিদ্দারের বদলে রাজনীতির লোকজনের অবিরাম আনাগোনা চলতে লাগল, ব্যবসা নামমাত্র টিকে রইল, অর্থ রোজগারের দিকে তাঁর মন গেল না। বেশ বোঝা গেল-তাঁকে দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য হবে না।
১৯৫১ সালে পারিবারিক উদ্যোগে আবুল হোসেনের সঙ্গে বারহাট্টা থানা (বর্তমানে উপজেলা)-র দশাল গ্রামের বাসিন্দা জনাব হাসিম উদ্দীন (দুলু মিঁয়া) সাহেবের কন্যা মাজেদা আক্তার খাতুনের বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহ-পরবর্তী সময়ে সংসারের দায়দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় আবুল হোসেনকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে চেষ্টা-চরিত্র করে নেত্রকোণা পৌরসভার অধীনে ‘লাইসেন্স ইন্সপেক্টর’ পদে নিয়োগ দেওয়া হল। সেটা ছিল ১৯৫৩ সাল। মাত্র দু’দশক সেই পদে যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করার পর ১৯৭৪ সালে স্থায়ী ও লোভনীয় চাকরিটি ছেড়ে দিলেন তিনি।
দেশ ও দশের জন্য কাজ করতে হলে যে সর্বস্ব নিবেদন করতে হয় এবং ‘চাকরি-বাকরি’ এই ক্ষেত্রে বড়ো অন্তরায়-সে কথা বিলক্ষণ জানতেন বলেই ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে মানুষের কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করে মোহাম্মদ আবুল হোসেন সবিশেষ তৃপ্তি বোধ করলেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে তিনি সাতপাই কালীবাড়ির বসতবাড়িটি বিক্রি করে মহাদেবপুর অঞ্চলে জমিজমা-সহ একটি বাড়ি কিনে নতুন বসতি গড়ে তোলেন।
তিনি যে সময়ে চাকরি ত্যাগ করেন সেই সময়কালে তাঁর সাংসারিক দায়িত্ব কিছু কম ছিল না। চার পুত্র ও সাত কন্যা-সহ বিশাল একটি পরিবারের দায়দায়িত্ব তাঁর কাঁধে বর্তেছিল। সংসারের প্রতি উদাসীন না থেকেও বৃহত্তর দায়িত্ব ও কর্তব্যের আহবানে তিনি তাঁর পরিবারকে নিয়ে যেভাবে স্বেচ্ছায় দারিদ্র ও অনিশ্চয়তা বরণ করে নিয়েছিলেন তা বিস্ময়কর বললে অত্যুক্তি করা হয় না।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন মোঃ আবুল হোসেনের এই সাহসী ও পরার্থপর সিদ্ধান্তের দিকে ফিরে তাকাই, আমরা সকলেই সমূহ বিস্মিত ও পুলকিত হই। অনেক রাজনীতিবিদকে দেখেছি জনসেবা করার মানসে তাঁরা স্থায়ী চাকুরি থেকে কয়েক বছরের ছুটি নিয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন, পরে সময় বুঝে আবার ফিরে এসেছেন নিজস্ব পেশায়। ফলে, এদিক-ওদিক দুইই বজায় রেখে তাঁরা দিব্যি সুখের জীবন কাটিয়ে গেছেন। জনাব আবুল হোসেন সেই গোত্রের মানুষ ছিলেন না। তিনি জনসেবাকে জীবনের মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই ব্রতপালনের জন্য নিজের ও তাঁর পরিবারের স্বার্থ সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। এটি আমাদের কাছে একটি চিরকালীন উদাহরণ হিসাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে রয়েছে।
সুবিখ্যাত ‘কালান্তর’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আমরা পরের উপকার করিব মনে করিলেই পরের উপকার করিতে পারি না। যে বড়ো সে ছোটোর উপকার সহজেই করিতে পারে কিন্তু ছোটোর উপকার করিতে হইলে কেবল বড়ো হইলে চলিবে না, ছোটো হইতে হইবে, ছোটোর সমান হইতে হইবে। মানুষ কোনোদিন কোনো যথার্থ হিতকে ভিক্ষারূপে গ্রহণ করিবে না, ঋণরূপেও না, কেবলমাত্র প্রাপ্য বলিয়াই গ্রহণ করিতে পারিবে। কিন্তু আমরা যখন লোকহিতের জন্য মাতি তখন অনেক স্থলে সেই মত্ততার মধ্যে একটি আত্মাভিমানের মদ থাকে। আমরা লোকসাধারণের চেয়ে সকল বিষয়ে বড়ো এই কথাটাই রাজকীয় চালে সম্ভোগ করিবার উপায় উহাদের হিত করিবার আয়োজন। এমন স্থলে উহাদেরও অহিত করি, নিজেদেরও হিত করি না’।
নিজের জীবনের ব্যাপ্ত অভিজ্ঞতা থেকে জনাব আবুল হোসেন স্বমহিম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথাগুলির মর্মার্থ অনুধাবন করেছিলেন। লোকসাধারণের জন্য কাজ করতে হলে ভাবের ঘরে ফাঁকি দেওয়ার মনোভাবকে যে কোনোমতেই প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না তা তিনি বিলক্ষণ উপলব্ধি করেছিলেন। তাই এক পা নিজস্ব পেশায়, আর এক পা জনসেবায়-এমন অসম্ভব সমীকরণে জনদরদি মানুষটি আদৌ আস্থা রাখতে পারেননি।
ব্যক্তিগত লাভালাভের মায়ামোহ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেই তিনি মানুষের সেবায় নিজের সবটুকু নিবেদন করেছিলেন। সে-কারণে তাঁর জন্মের দীর্ঘ পঁচানব্বই বছর পরে রাজনীতির সর্বব্যাপী গূঢ় অবক্ষয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রগতিশীল চিন্তন আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। আমরা আশা করব ২০২৬ সালে তাঁর জন্ম-শতবর্ষে শুভ সূচনা হলে আমরা আলোকময় মানুষটিকে সামনে রেখে এবং তাঁর জীবন ও কর্মের মহনীয়তা অনুসরণ করে নতুন করে দেশ ও জাতিগঠনের স্বপ্ন সদর্থে লালন করতে পারব এবং সেই স্বপ্ন বাংলাদেশের সীমা অতিম করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও প্রসারিত হয়ে অসংখ্য মানুষকে জেগে ওঠার প্রেরণা যোগাবে।
বীর যোদ্ধা মান্যবর মো. আব্দুল আজিজ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ‘ব্রিটিশ শাসনের শেষ ক্রান্তিকালটা অতিক্রম করে যখন পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান হয়ে গেল অর্থাৎ এদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হল, তখন অল্প ক’টা দিন বাঙালি জাতি আশায় ছিল দিন বদলের কিন্তু তাদের সে মোহ ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগেনি। মাতৃভাষার উপর প্রথম আঘাতটা আসে। বাঙালি ছাত্রসমাজ রুখে দাঁড়ায়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে মুখর হয়ে ওঠে বাংলা। ছাত্রদের পাশাপাশি সুশীল সমাজও যুক্ত হয় এ আন্দোলনে। জনাব আবুল হোসেনও তাদের সাথে যুক্ত হয়ে মাঠে নামেন মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে’। ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতিসত্তার স্মারক হয়ে উঠেছিল এবং এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের মানুষ পৃথক রাষ্ট্রতন্ত্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আবুল হোসেন এই আন্দোলনে রৌহার সংগ্রামী মানুষকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, ভাষা হল মানুষের শিকড়ের অনশ্বর গান, তার বেঁচে থাকার আশ্চর্য প্রেরণা। তাই, ভাষার ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ রুখে দিতে না পারলে জাতিসত্তার আন্দোলন দানা বাঁধবে না।
নেত্রকোণায় ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করে আবুল হোসেন মানুষের কাছে সংগ্রামের সঠিক দিকচিহ্ন নির্ণয় করেছিলেন এবং সব ধরনের সুপরামর্শ, নেতৃত্ব ও সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমে মাতৃভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। মো. আব্দুল আজিজ লিখেছেন- ‘রৌহার চার কৃতী সন্তানের ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল। আমার ছেলেবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম স্বাধিকার আন্দোলনের লড়াইয়ে নামার। ৬৬’র ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়ী করেছি। আমি-সহ মকবুল, রশিদ ভাই, নাজিম, হাকিমকে জনাব আবুল হোসেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেরণা দিয়েছেন এবং আমরা ভারতে গিয়ে সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই দেশকে শত্রু মুক্ত করতে’।
রৌহার চার কৃতী সন্তান ফজলুর রহমান খান, ফুলে হুসেন, নুরুল হুদা ও আবুল হোসেন নতুন বাংলাদেশ গঠনের কাজে নিজেদের সর্বাংশে নিবেদন করেছিলেন এবং তাঁদের অপার দেশপ্রেম সাধারণ মানুষকে সবিশেষ উদ্বুদ্ধ করেছিল। জনাব ফজলুর রহমান খান নেত্রকোণা অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন এবং ভারতের মেঘালয়ে ঢালু ক্যাম্পের ইনচার্জ হিসাবে অসীম সাহসিকতায় যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। একাধিকবার ইনি সাংসদ হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন।
চুয়াডাঙ্গা কলেজের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ফুলে হুসেন ৮-নং সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। ইনি প্রবাসী সরকারের প্রেস কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেছেন। জনাব নুরুল হুদা ছিলেন জবরদস্ত সংগঠক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে ভারতে গিয়েছিলেন। বাঘমারা ক্যাম্পের কোয়ার্টার মাস্টারের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
এমপিএ আব্বাস আলী খানের বন্ধু, সহযোদ্ধা মোঃ আবুল হোসেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গোপনে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতেন এবং নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন ও অনুপ্রেরণা দিতেন। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পথে ভাষা আন্দোলন ছিল একটি অনিবার্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ যা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে হানাদার পাকিস্তানি শত্রæদের বিনাশ করে নতুন রাষ্ট্রগঠনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। আবুল হোসেনের প্রেরণায় নেত্রকোণা অঞ্চলের ভাষাযোদ্ধারা যেমন মাতৃভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তেমনই সংলগ্ন অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে গিয়ে সশস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে আপসহীন লড়াই-সংগ্রামে যে প্রবল শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তা ছিল সর্বার্থেই একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রিক আন্দোলনের সুচারু পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপের মধ্যে মোঃ আবুল হোসেনের দূরদর্শিতা তথা সাংগঠনিক দক্ষতার অনন্য পরিচয় স্বাধীন বাংলাদেশে ঐতিহ্যময় ঔজ্জ্বল্য লাভ করেছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সরকার বলেছেন, ‘আন্দোলন (ভাষা আন্দোলন) আর ঢাকায় বসে থাকেনি। সারা বাংলায় দাবানলের মতো দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। নেত্রকোণায় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। ছাত্র, সুশীল সমাজ, শিক্ষক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে মিছিলে নামে। মিছিল, মিটিং, অবরোধ চলতে থাকে। পুলিশ অনেককে গ্রেপ্তার করে, নির্যাতন চালায়, জেলে পাঠায়, রাস্টিকেট করে, চাকুরি চলে যায় তবু আন্দোলন দমেনি। মাতৃভাষা রক্ষার এই আন্দোলনে রৌহা ইউনিয়নের ৪ কৃতি সন্তান অংশগ্রহণ করেন। সামনের সারি থেকেই নেতৃত্ব দেন। তৎকালীন ছাত্রনেতা জনাব ফজলুর রহমান খান গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, জনাব ফুলে হুসেন পালিয়ে বেড়িয়েছেন পুলিশের তাড়ায়। জনাব আবুল হোসেন ও জনাব নুরুল হুদার অবস্থাও তাই ছিল। আন্দোলনে অংশ নেবার কারণে পুলিশ তাঁদের শাসিয়েছে অনেকবার। আমার ইউনিয়নের এই ৪ মহান ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধেও সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ৪ জনের ৩ জনই প্রয়াত হয়েছেন। অধ্যাপক ফুলে হুসেন এখনও বেঁচে আছেন’।
রৌহায় জমিদারদের অত্যাচার ও শোষণের ফলে সাধারণ মানুষের যে দুর্বিষহ অবস্থা হয়েছিল, খাদ্য, শিক্ষা ও বাসস্থানের যে তীব্র অভাব জনপদের মানুষজনকে পশ্চাদপদ করে তুলেছিল, সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও রৌহার মানুষেরা যেভাবে নিজেদের দু:খকষ্টের কথা ভুলে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলেন তার মূলে মোঃ আবুল হোসেনের উজ্জ্বল ভূমিকার কথা মানুষ বিস্মৃত হননি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন বলেছেন, ‘আবুল দাদার প্রেরণা ও উৎসাহে আমি, আজিজ, রশিদ, হাকিম, নাজিম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ফজলুর রহমান খান ভারতের ঢালু ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন, নুরুল হুদা সাহেবও বাঘমারায় থেকে মুক্তিযুদ্ধের কাজ করেছেন। মরহুম ফজলুর রহমান খান একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হয়ে আমাদের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট হিসাবে বহুদিন কাজ করেছেন। আজ তাঁর সুযোগ্য কন্যা (মাননীয়া হাবিবা রহমান খান) এমপি হয়ে আমাদের রৌহাকে সম্মানিত করেছেন’।
মরহুম আবুল হোসেন তাঁর জীবনে কী কঠিন কাজ করেছিলেন তা আমরা বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি। মকবুল হোসেন সরকার লিখেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনটাই আমাদের স্বাধিকার আদায়ের প্রথম ধাপ। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে। বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণা করার সাথে সাথেই নিরস্ত্র বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ৭ মার্চের ভাষণের পরেই আসলে বাঙালি বুঝে গেল-বঙ্গবন্ধু তো স্বাধীনতা অর্জনের কথাই বলেছেন। আমরা রৌহাবাসীও বসে ছিলাম না। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে নিম্নলিখিত ব্যক্তিরা (নেত্রকোণা অঞ্চলের চারজন সংগঠক, আঠারো জন সশস্ত্র যোদ্ধা ও পাঁচজন প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী) চলে গেলাম সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। দেশের ভিতরে থেকেও অনেকে আমাদের তথ্য দিয়ে, খাবার ও রসদ সরবরাহ করেছেন। পাক আর্মির গতিবিধি জেনে আমাদের জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করেছেন বেশ নিখুঁতভাবেই যার ফলে আমরা সফলভাবে ত্রিমোহনী সড়ক সেতু চল্লিশা রেল সেতু উড়িয়ে পাক হানাদারদের পর্যুদস্ত করতে পেরেছিলাম’। মোঃ আবুল হোসেন যে নিপুণ দক্ষতায় গোয়েন্দা তথ্যাদি সরবরাহ করে পাক আর্মির গতিবিধি মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক সময়ে জানিয়েছেন তার ফলেই নেত্রকোণা ও সংলগ্ন অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে সফল অপারেশন করে পাক সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে পেরেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খাবার ও রসদ সরবরাহ করা, তাদের অপারেশন কিভাবে সময়োপযোগী ও সফল হতে পারে, সেইসব বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দেওয়া এবং গোটা প্রক্রিয়াটি তদারকির মধ্যে রাখা ছিল আবুল হোসেনের বিশেষ দায়িত্ব। এই কার্যক্রম যে কতটা বিপজ্জনক ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। চূড়ান্ত লড়াইয়ে নেত্রকোণাবাসীরা ১৯৭১ সালের ০৯ ডিসেম্বর নেত্রকোণাকে পাক হানাদারদের দখলদারি থেকে মুক্ত করে ফেলেন। এই দিনটি আজও ‘নেত্রকোণা মুক্ত দিবস’ হিসাবে সসম্মানে প্রতিপালিত হয়ে থাকে।
মোঃ আবুল হোসেনের দু’টি ঐতিহাসিক অবদানের মূল্যায়ন এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে হাজির করতে চাই। ২০০৯ সালে ঢাকার সুখ্যাত ‘বিভাস প্রকাশন’ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ‘একুশে ফেব্রæয়ারি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ শিরোনামভুক্ত মূল্যবান গ্রন্থটিতে অধ্যাপক ফুলে হুসেন লিখেছেন, ‘১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের (তখনকার পূর্ব বাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান) সর্বত্র মাতৃভাষা বাংলার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ১১ মার্চে ধর্মঘট শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ধর্মঘট পালনের ডাক পৌঁছে যায় প্রত্যন্ত শহরেও। হাইস্কুলের নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। নেত্রকোণা শহরে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। (মেয়েদের স্কুলসহ) শহরের চারটি হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রী ক্লাস বর্জন করে মিছিলে অংশগ্রহণ করে। তার সঙ্গে যোগ দেয় সাতপাইয়ের ‘জয় দুর্গা’ ও ‘কালী বাড়ি’ পাঠশালার ছেলেমেয়েরা। ১১ মার্চের হরতাল ও মিছিল সংগঠনে আমাদের উৎসাহ-দান ও সহায়তা করেন ওয়াজেদ আলী, আবুল হোসেন, আব্দুল মজিদ তারাভাই (৭১-এ এম.পি) প্রমুখ’। ঐতিহাসিক এই দলিল থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় মোঃ আবুল হোসেন ও তাঁর কতিপয় সহকর্মী অশেষ সাহসে ভর করে ও গভীর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নেত্রকোণার বুকে মহান ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে নেত্রকোণার ঐতিহাসিক ভূমিকার গৌরব মানুষ কোনোদিন বিস্মৃত হবে না। নেত্রকোণার মাটিতেই সংগঠিত হয়েছে পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহ যার প্রবল অভিঘাতে কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত। কৃষক নেতা টিপু শাহ পাগল নেত্রকোণার বুকে বিদ্রোহের যে আগুন জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন তার অনন্য স্পর্শে ‘টংক-তেভাগা আন্দোলন’ শাসকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, ‘সারা ভারত কৃষক সম্মেলন’-এর জোরালো প্রতিবাদ, আন্দোলনে শাসক-শোষক ও মহাজনদের হাড়ে কাঁপন ধরেছিল এবং বাহান্ন সালের ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ছুঁয়ে একাত্তরের বৃহত্তম ও মহত্তম স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্ততি-পর্বে ও সামগ্রিক বিস্তারে নেত্রকোণা ঐতিহাসিক ভূমিকার স্বাক্ষর রেখেছিল। এমন একটি মহান পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত হয়ে মরহুম আবুল হোসেন নেত্রকোণার সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিলেন সে-সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুন্সিগঞ্জের ‘আদর্শ কলেজ’-এর সাবেক অধ্যক্ষ ও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী ড. হালিম দাদ খান ইতিহাসের সরণি বেয়ে মো. ইকবাল হাসান তপু সম্পাদিত ‘আলোর পথে’ শীর্ষক গবেষণামূলক পত্রিকার ২৫ জানুয়ারি ২০২০ সংখ্যায় লিখেছেন, ‘১৯৭১ সাল বাংলা ও বাঙালির জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এপ্রিল মাসে আবুল হোসেন তৎকালীন এমপিএ আব্বাছ আলী খান-সহ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেষখলা গমন করেন এবং কয়েকদিন
এলাকায় ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে তরুণদের প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে প্রেরণ ও প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধে সহায়তা দানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরই প্রেরণায় নিজ পরিবারের পাঁচজন (আজিজ, রশিদ, নাজিম, হাকিম ও মকবুল) মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং তাঁরা ত্রিমোহনী সড়ক-সেতু উড়িয়ে দেওয়া-সহ বিভিন্ন সফল অপারেশন পরিচালনা করেন’।
শ্রদ্ধেয় ড. হালিম দাদ খান সাহেবের মূল্যায়নটি বিশ্লেষণ করলে আমরা মোঃ আবুল হোসেনের কয়েকটি বিরল গুণাবলির কথা বুঝতে পারব। প্রথমত, তিনি নিজে ভারত গমণ করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে পরামর্শ করতে এবং সেখান থেকে এমপিএ আব্বাছ আলী খানের পরামর্শ নিয়ে এসে আগামী দিনের মুক্তিযোদ্ধাদের জোরালো প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে পাঠাবার জন্য উৎসাহিত করেছেন যাতে তাঁরা বিবেকহীন পাক-সেনাদের কড়া হাতে মোকাবিলা করতে পারেন। নিজে অস্ত্র হাতে লড়াইয়ের ময়দানে নামার চেয়েও বেশ কিছু তরুণ যোদ্ধাকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করে তোলা অনেক বড় কাজ। সেই কঠিন কাজটি সু-সম্পাদন করে আবুল হোসেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বরেণ্য অবদান রেখে গেছেন।
দ্বিতীয়ত, অনেক প্রশিক্ষক ও সংগঠক নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রেখে অন্যদের বিপদের মুখে ঠেলে দেন। আবুল হোসেন তেমন হীন চরিত্রের মানুষ ছিলেন না। তিনি জানতেন যে-কোনও মহান কাজ ঘর থেকেই শুরু করতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি তাঁর পরিবারের পাঁচজনকে মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত করেন এবং দেশের কাজে তাঁদের উৎসর্গ করেন। তৃতীয়ত, গোপনে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে পাক হানাদারদের গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত হয়ে এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু বিনষ্ট করে হানাদারদের অগ্রগমন কার্যত রুখে দিয়ে তাদের পর্য ুদস্ত করার কৌশল বাস্তবায়িত করে তিনি গেরিলা যুদ্ধের কম্যান্ডারের গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন যা নেত্রকোণার বুকে পাক-হানাদারদের তছনছ করে দিয়েছিল। তাঁর এই রণকৌশল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ প্রেরণা সঞ্চার করেছিল তাতে সন্দেহ নেই।
মোঃ আবুল হোসেন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের অমলিন ভূমিকার কথা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে বর্তমান জটিল সময়ে ‘ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি’ এবং ‘অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়ন সংস্থা’ নেত্রকোণার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে এবং বিশেষ করে লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে তথা বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে যে বনিয়াদি কার্যμম গ্রহণ করে চলেছেন তা নি:সন্দেহে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের মহান ব্রতসাধনে সরকারের সহযোদ্ধা-রূপে বিশিষ্ট সারস্বত প্রতিষ্ঠান দু’টির ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের অঙ্গীকারকে সার্থক করে তুলবে। আমাদের মনে রাখতে হবে মরহুম আবুল হোসেনের মতো আলোকময় মানুষের কখনও মৃত্যু হয় না। তাঁর জীবন ও কর্মের অনশ্বর প্রবাহ আমাদের সকল শুভকর কর্মে নিরন্তর উদ্দীপ্ত করতে থাকবে এই বিশ্বাস রেখে মহীয়ান মানুষটির চরণে বিনম্র প্রণতি জানাই।
লেখক :
১. নজরুল গবেষক ও বহুমাত্রিক লেখক।
২. সাবেক সহ-সচিব, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ভারত।
