ঈদুল আযহা : অর্থ, তাৎপর্য ও শিক্ষা

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার

মুসলিম সমাজে দু’টি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো– ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। এখানে ঈদুল আযহা সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোকপাত করা হলো।

অর্থ: আরবি ঈদ শব্দের অর্থ হলো–আনন্দ এবং আযহা শব্দের অর্থ হলো উৎসর্গ বা ত্যাগ। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হলো ঈদুল আযহা। প্রতি যিলহজ্জ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে ঈদুল আযহা পালিত হয়। নির্দিষ্ট দিনে ভোরে ঈদের নামাজ শেষে শরীয়ত সম্মত পশু জবাই করাকে কোরবানী বলা হয়। মহান আল্লাহতালার সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করাই হলো ঈদুল আযহার অর্থ।

উল্লেখ্য যে, আরবের জনমানবহীন মিনা প্রান্তরে হযরত ইব্রাহিম(আ:) ও তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল( আ:) যে অতুলনীয় আনুগত্য, তাকওয়া ও ত্যাগের মহিমা সৃষ্টি করেছিলেন, তাই হলো পবিত্র ঈদুল আযহার স্মারক। অবশ্য আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে হজরত ইব্রাহিমের উপর দুম্বা জবাই করার আদেশ নাজেল হয়েছিলো। অতপর দুম্বা, উঠ বা গবাদি পশু কোরবানী করার রেওয়াজ চালু হয়। পবিত্র কুরআন শরীফে সুরা কাওসারে বলা হয়েছে, ” তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করো এবং কুরবানী করো”।

পশু কুরবানীর মাধ্যমে মূলত মনের পশুত্ব, অহংকার ও লোভ-লালসা বিসর্জন ও সর্বশক্তিমান আল্লাহতালার প্রতি গভীর আনুগত্য প্রকাশ করাই বিধি। কুরবানী হলো আত্মত্যাগ ও সমর্পণের নিদর্শন। এর মাধ্যমে আল্লার আদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়।

তাৎপর্য : ঈদুল আযহার তাৎপর্য সমধিক। খুব অল্প কথায় এই ঈদের তাৎপর্য তুলে ধরা এক কঠিন বিষয়। কুরবানী হচ্ছে নিবেদনের একটি প্রতীক। স্রষ্টার প্রতিটি আদেশ পালন ও তাঁর নিকট নিজেকে নি:শর্ত নিবেদন তথা সমর্পণ করার তাৎপর্য এই কুরবানীর মধ্যে নিহিত আছে। পবিত্র কুরআন শরীফের সুরা হজ্জের ৩৬ আয়াতে বলা হয়েছে, ” আর কুরবানীর পশু সমূহকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে”।

এই যে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি–তা কেবল ত্যাগ ও সমর্পণের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। যে প্রাণ আল্লাহর প্রতি নিবেদিত ও সমর্পিত সেই প্রাণ , সেই মানুষ অত্যন্ত গৌরবের। ধর্মীয় বিধি-বিধান চিরকাল মানুষকে সঠিক পথ নির্দেশ করে এবং মানুষকে সৎ, নিষ্ঠাবান উপাসক এবং সৎচ্চরিত্রের অধিকারি করে গড়ে তুলে। এরূপ মানুষ হয় পরস্পর ভাই ভাই। তাঁরা পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রী গড়ে তুলেন। এখানে মানবতা তথা মানুষ হিসেবে জীবনের সার্থকতা প্রকাশ পায়। মানুষ হয়ে ওঠে মানবিক ও ধার্মিক। এরূপ মানুষ সমাজের জন্য কল্যাণকর ফল নিয়ে আসেন। এর পেছনে অবশ্যই মানুষকে ত্যাগী হতে হবে। পবিত্র ঈদুল আযহা ত্যাগের মহান শিক্ষা দান করে।

শিক্ষা : ইসলাম ধর্মে কুরআন ও হাদিসের শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। মহানবী হজরত মুহাম্মদ(সা:) এই মহান শিক্ষা মানুষকে দিয়ে গেছেন। ইসলাম ধর্মে একটি চমৎকার বিষয় হলো সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব। ইসলামী বিধানে মানব সমাজে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের কথা গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে। যাকাত প্রথা এর উৎকৃষ্ট নিদর্শন। একই সাথে ঈদুল আযহাতেও সাম্যের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। কুরবানীর মাংসকে সমান ৩টি ভাগে বিভক্ত করতে হয়। একভাগ নিজের পরিবারের জন্য, ২য় ভাগ আত্মীয়-বান্ধবদের জন্য এবং ৩য় ভাগ সমাজের গরীব-দুঃখিদের মাঝে বন্টন করে দিতে হয়।

এই যে সাম্যভিত্তিক বন্টন ব্যবস্থা–এর ফলে সমাজে আনন্দ ও বস্তুগত সম্পদের পারস্পরিক ভাগ-ভাটোয়ারার বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকার। ইসলামী অর্থনীতির এই দিকটি সঠিক ভাবে পালিত হলে সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমতে বাধ্য। ইসলামে বলা হয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ মানবতার সেবায় ব্যয় করতে হবে। চিত্ত আর বিত্তের মিল ঘটাতে হবে। ঈদুল আযহা এই চিত্ত ও বিত্তের মিল ঘটাতেও শিক্ষা প্রদান করে। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এটি খুব খুব প্রয়োজন।

সকলের সাথে নম্রতা ও সদ্ভাব বজায় রাখা জরুরী। পারস্পরিক আচরণ হবে–আন্তরিকতা ও বিনম্র আচরণের প্রকাশ। ঈদের ময়দানে নামাজ আদায় করতে তো ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। মানুষে মানুষে বিভেদ বা ভেদাভেদ রাখা যাবে না। ঈদুল আযহা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দারিদ্র্যের কষাঘাত দূর করা সামর্থ্যবান মানুষের কর্তব্য। কুরবানী অগনিত মানুষকে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের বাস্তব শিক্ষা দান করে। এজন্যই বলা হয়–ইব্রাহিমী ঈমান এবং ইসমাইলী আত্মত্যাগ অনুসরণ করতে হবে। পরিশেষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে চাই—

” তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে,

ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ”।

তথ্যসূত্র:

১| ঈদুল আযহা: গুরুত্ব ও তাৎপর্য—ড. মুহাম্মাদ আজিবার রহমান ২| ইন্টারনেট।

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকারের প্রবন্ধসমূহ:

বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকদাদ চৌধুরী

বাউল কবি রশিদ উদ্দিন: বাউলদের বাউল

নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর

লোক-সাহিত্য ও সংস্কৃতি  লোককবি নগেন সরকার 

একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক ভাষা সৈনিক  সানাউল্লাহ নূরী

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোনা

বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোঃ নুরুল ইসলাম খান (এন আই খান)

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. মো. ফজলুর রহমান খান

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম ফজলুল কাদের

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাছ আলী খান

অগ্নিযুগের সূর্য সৈনিকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী

স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ: বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন সরকার

তথ্যসুত্রঃ

  1. 1 সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৩ ডিসেম্বর ২০২২),” স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৩-৩৮
  2. হাসান, প্রধান বিচারপতি জনাব ওবায়দুল(এপ্রিল ২০২৩),” মহেষখলা ইয়ুথ ক্যাম্প, মুক্তিযুদ্ধে মোহনগন্জ :মহেষখলা ইয়ুথ ক্যাম্প ও ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ”, পৃষ্ঠা ১০১-১০৩
  3. Khan, Fazlur Rahman Khan (25 June 1994). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Dinkal. p. 6.
  4. Kalamia, Islam Uddin (18 May 2005). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Samachar.
  5. Ahmed, Sadir Uddin (18 May 2005). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Samachar.
  6. Rahman, Golam Arshadur (1997). Muktisangrame Netrakona (in Bengali). Dhaka
  7. Nuri, Sanaullah (25 June 1994). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali in Netrakona”. The daily Dinkal. p. 6.
  8. Khan, Ashraf Ali Khan Khoshru (23 May 2005). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Ittefaq. p. 8.
  9. Kader, A K Fazlul Kader (25 June 1994). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Dinkal. p. 6.
  10. Uddin, Hadis (2021). Ashomapta Golpa (in Bengali). Dhaka: Anirban Printing and Publications.
  11. বিশ্বাস, সাংবাদিক প্রিয়ঙ্কর(২৩ ডিসেম্বর ২০২২), “মুক্তিযোদ্ধার আত্মকথা: বীর মুক্তিযোদ্ধা মো:শামছুজ্জোহা, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৯৩-১০০
  12. চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). নেত্রকোণার রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ মরহুম জননেতা আব্দুল খালেক এমপি”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা পৃষ্ঠা 01-06
  13. Shamsusjuha, Md (25 June 1994). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Dinkal. p. 6.
  14. চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান(সহ-সভাপতি, নেত্রকোণা ক্লাব) ,“মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী’র স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত” Rupashi TV,
  15. বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শামসুজ্জোহা  (সভাপতি ,সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১, নেত্রকোণা জেলা)“নানান কর্মসূচীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী’র ৫১তম প্রয়ান দিবস পালন।“, Meghna TV , ,18/05/2022
  16. চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শিশু সংগঠন কচি-কাঁচার মেলা”, বিজয় একাত্তর ৫ম সংখ্যা পৃষ্ঠা 129-132
  17. Chowdhury, Khalekdad (1985). Shatabdir Dui Diganta (in Bengali). Dhaka.
  18. চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২),”নেত্রকোণায় বঙ্গবন্ধু”, বিজয় একাত্তর ৫ম সংখ্যা পৃষ্ঠা ৭৭-৮১
  19. চৌধুরী, হায়দার জাহান(২৩ ডিসেম্বর ২০২২),”শহীদ মেহের আলী একটি নাম, একটি ইতিহাস”,আলোর পথে,পৃষ্ঠা ৬১-৬৪
  20. চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). ষাটের দশকে ছাত্র রাজনীতি ও ৭১’- র মুক্তিযুদ্ধ”, বিজয় একাত্তর বিজয় একাত্তর ৫ম সংখ্যা পৃষ্ঠা ৮২-৯২
  21. Momeen, Abdul Momeen (25 June 1994). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Dinkal. p. 6.
  22. Talukder, Nurul Amin (2021). Ashomapta Golpa (in Bengali). Dhaka: Anirban Printing and Publications.
  23. Khan, Motiur Rahman (18 May 2005). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Samachar.
  24. সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (ফেব্রয়ারী ২০২০),”মুক্তিযুদ্ধের একনিষ্ঠ সংগঠক ডঃ আখলাক হোসেন আহমদ”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা পৃষ্ঠা ৬০-৭০.
  25. প্যানেল মেয়র নজরল ইসলাম,“নেত্রকোণায় বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী সড়ক উদ্ভোধন”- MY TV, 05/05/2015
  26. বীর মুক্তিযোদ্ধা মেয়র নজরল ইসলাম খান, ),“শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা- ২০২২”, Rajdhani TV, 04/10/2023
  27. বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু আক্কাস আহমেদ(সভাপতি-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),“শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা- ২০২২”, Rajdhani TV, 04/10/2023
  28. কবি তানভীর জাহান চৌধুরী(সা:সম্পাদক-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),,,“শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা- ২০২২”, Rajdhani TV, 04/10/2023

 

Scroll to Top