ভারতের তুরায় প্রথম ব্যাচে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশে প্রথম অপারেশন
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু আক্কাস আহমেদ
প্রায় দেড় মাস পর আমরা সরাসরি চলে এলাম আমাদের বাড়ি গ্রাম নাড়িয়াপাড়ায়। আমার জানামতে আমার গ্রামের বাড়িটাই ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম ক্যাম্প অফিস।সে খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে নেত্রকোণা শহরসহ সমস্ত এলাকায়। আমাদের কোম্পানি কমান্ডার তারা ভাই প্রথম বার আসেননি। তিনি আরো ক’জনকে নিয়ে থেকে গিয়েছিলেন রংরা ক্যাম্পে।এছাড়া সিদ্দিক ভাইতো আছেনই। এলাকার ছেলে হিসেবে তিনিই হয়ে উঠলেন কোম্পানির সব চেয়ে করিৎকর্মা সদস্য। আমাদের গ্রাম থেকে নেত্রকোণা শহরের দূরত্ব প্রায় ৫/৬ কিলোমিটার। শহর থেকে গেলে ৪ কিলোমিটার দূরে কংস নদ। নদীপথে আরো সোয়া কিলোমিটার উজানে গিয়ে সেখান থেকে আরো আধা কিলোমিটার পথ দূরে আমাদের গ্রামের বাড়ি। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আমাদের আসার খবর পেয়ে কংস নদের অপর পারে বড়ওয়ারী ফেরী ঘাটে এসে অবস্থান গ্রহণ করে। সাথে সাথে আমরা ওদের প্রতিরোধে সিদ্ধান্ত নেই। পরিকল্পনা হয় ওরা আমাদের ওপর আক্রমণ করতে এদিকে আসার জন্যে নৌকায় ওঠার সাথে সাথে হামলা চালাতে হবে। প্রথম কাজ দেয়া হলো গোয়েন্দা দলকে। ওদের এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে বড়ওয়ারী ফেরীঘাট থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নৌকায় ওঠার সংবাদটি দু’এক মিনিটের মধ্যে আমাদের গ্রামে অবস্থানরত যোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়। গ্রামের খড়ের ঘর আর জংগলে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা কে কোথায় অবস্থান নেবে তাও দেখিয়ে দেয়া হলো। গোয়েন্দা দলের সদস্যরা ছদ্মবেশে ফেরীঘাট থেকে আমাদের গ্রাম পর্যন্ত এমন দূরত্বে দাঁড়াবে যেন একজন আরেকজনকে দেখতে পারে। পাকিস্তানী সৈন্যরা নৌকায় উঠলেই সবচেয়ে কাছের জন লাল কাপড় উড়িয়ে ইংগিত দেবে। তারপরের জন দেবে এর পরবর্তী জনকে। এমনভাবে খবরটি দু’এক মিনিটে আমরা পেয়ে যাবো। বড়ওয়ারী ঘাট থেকে আমাদের গ্রাম পর্যন্ত এ কাজে নিয়োজিত গোয়েন্দা সংখ্যা ছিল ৬ জন।
এতো সব পরিকল্পনা বুঝি কল্পনাই রয়ে যাবে। কখনো বাস্তবায়িত হবে না। আমরা নিরাশ হয়ে গেলাম। সিদ্দিক ভাই এসে আকস্মিকভাবে জানালেন যে, আমাদের সবাইকে এখনই রংরা ক্যাম্পে ফিরে যেতে হবে। আমরা হতবাক। এ ধরনের হঠাৎ সিদ্ধান্তে আমাদের সবার মন খারাপ হয়ে গেল। আমরা নিজেরা অনেকেই বলাবলি করলাম যে, এটা ঠিক হয়নি। সিদ্দিক ভাই এ সিদ্ধান্ত ঠিক নেননি।তিন দিন অপেক্ষার পর এভাবে যুদ্ধের ময়দান থেকে পশ্চাদপসারণ স্বেচ্ছায় পরাজয় স্বীকার করে নেয়ারই সামিল। আর আমরা এভাবে বিনা প্রতিরোধে পালিয়ে যাওয়ার পর হানাদার বাহিনীর সাহস বেড়ে যাবে। ওরা এসে আমাদের গ্রামের সকলের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবে। নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাবে। যাকে পাবে তাকেই নির্বিচারে পিটাবে আর জোর করে মৃত পাকিস্তানের নামে জিন্দাবাদ স্লোগান দেওয়াবে এবং ঘরে ঘরে পাকিস্তানী পতাকা তুলে যাবে। অথচ কি খুশিই না লেগেছিল ট্রেনিং থেকে ফিরে। আমাদের গ্রামের প্রায় সকলের ঘরের ওপর আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখেছি। তখন অকস্মাৎ মনে পড়ে গিয়েছিল কিছু দিন আগের একটি কথা। তখন মার্চের মাঝামাঝি হবে। ঢাকায় সে পতাকা উড়াবার জন্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে পতাকা দিবস পালনের কর্মসূচি দেয়া হয়। সে আহবানে সাড়া দিয়ে ঢাকা শহরের সকল কূটনৈতিক মিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি ভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন পতাকা উত্তোলন করা হয়। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছিল তথাকথিত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার খোঁড়া যুক্তি, চীনতো প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেই ছিল। অবশ্য শেষ পর্যন্ত সেখানেও বাংলাদেশের পতাকা উঠেছিল। সংগ্রামী ছাত্র-জনতা নিজ উদ্যোগে গিয়ে সে কাজটি করে এসেছিল। মার্কিন যুক্তেরাষ্ট্রের দূতাবাসে পতাকা স্ট্যান্ড ছিল খালি আর চীনা দূতাবাসের স্ট্যান্ড থেকে পাকিস্তানী পতাকা খুলে বিদ্রোহী তারুণ্য সেদিন তা পুড়িয়ে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিয়েছিল। এই পতাকা বাংলাদেশের বর্তমান পতাকার মতো ছিল না। এখনকার পতাকার লাল বৃত্তে আঁকা ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র।স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সকল মহলের মতৈক্যের ভিত্তিতে সেই ম্যাপ বাদ দেয়া হয়েছে।
সে দিন যে কথাটি মনে পড়েছিল, তা হচ্ছে এই যে, মার্চের প্রথম দু’এক দিনের মধ্যেই নেত্রকোণা আওয়ামী লীগ অফিস থেকে সেই পতাকা বিক্রি করা হতে থাকে। কে এই মহান উদ্যোগ নিয়েছিল তা এখন মনে নেই।
তবে প্রতিটি পতাকার দাম নেয়া হতো চৌদ্দ আনা। মানে ৮৫ নয়া পয়সা। তখন সরকারি ভাবে আনার হিসাব না থাকলেও সবাই নয়া পয়সাকে আনা-র হিসাবে গণনা করতো। গর্বের কথা এই যে, সিদ্দিক ভাই থেকে চৌদ্দ আনা পয়সা নিয়ে আমি একটি পতাকা কিনেছিলাম এবং তা নিয়ে আমাদের বাড়িতে উঁচু বাঁশ দিয়ে ২৩ শে মার্চ সকালে টানিয়ে দিয়েছিলাম। ট্রেনিংয়ের পর প্রায় সকলের বাড়িতে এসে সেই পতাকা দেখে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলাম।
আমরা চলে গেলে পতাকাওয়ালা বাড়িতে অত্যাচারের কেমন নরক সৃষ্টি করবে পাক হানাদার বাহিনী, তা কল্পনা করেও শংকিত হচ্ছিলাম। অবশ্যই এই শংকাবোধ করা ছাড়া আমাদের করার কিছু ছিল না। কেননা, ইতোমধ্যে আমরা শিখে গেছি সামরিক শৃঙ্খলার কথা। এখানে কমান্ডিং অথরিটিকে চ্যালেঞ্জ করার কোন অধিকার নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে কমান্ডিং অথরিটির নির্দেশই শেষ কথা। কোন প্রশ্ন করা যাবে না। দ্বিধাগ্রস্থ দেখানো যাবে না। যেই আদেশ, সেই কাজ। অগত্যা আমরা কমান্ডারের নির্দেশে রংরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করালাম। যাওয়ার আগে আমাদের বাড়ির আশপাশের যে ২০/২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তারা পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করে বিদায় নিয়ে এলো। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার সময় কিন্তু অধিকাংশই কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে গিয়েছিল। পাছে তারা তাদের সন্তানদের যুদ্ধের মতো রিস্কি কাজে যেতে না দেন, সে জন্যেই পালিয়ে গিয়েছিল। এখন ট্রেনিং নেয়া ছেলেদের আর কিছুতেই বেঁধে রাখার মতো দৃঢ় বন্ধন অভিভাবকদের মহলের নেই।
আমরা যাত্রা শুরু করি বিকেলে। প্রায় ৪ কিলোমিটার যাওয়ার পরেই সন্ধ্যা নেমে এলো। ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা বিরাট মাঠের মধ্যে আসার পর সিদ্দিক ভাই সবাইকে থামার নির্দেশ দিলেন। কিছু বুঝতে পারলাম না আমরা। সিদ্দিক ভাইয়ের ওপর আমার অভিমান তখনো তরল হয়নি। তার নির্বোধ সিদ্ধান্তের জন্যেই আমরা পাক হানাদারদের হাতের কাছে পেয়েও খতম করতে পারলাম না। এছাড়া আমরা তো নেত্রকোণা-মোহনাগঞ্জ রেল লাইনের ঠাকুরাকোণা ব্রিজ ভাঙ্গারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সেই ব্রিজ ভাঙ্গার পরিকল্পনাটিও হয়তো সিদ্দিক ভাই জানতেন। সে পরিকল্পনা আমরা নিয়েছিলাম আমাদের প্রকৌশলী দলের ইনচার্জ হাবিব ভাইয়ের নেতৃত্বে। আমাদের সে পরিকল্পনা নেয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পাকবাহিনীর সরবরাহ লাইন বিপর্যস্ত করা। ঠাকুরাকোণা ব্রিজটি ভেঙ্গে দেয়া গেলে মোহনগঞ্জে অবস্থিত পাক বাহিনী সম্পূর্ণ বিছিন্ন হয়ে যাবে নেত্রকোণা তথা ঢাকা থেকে।
মাঠে জমায়েত মুক্তিযোদ্ধাদের বৃত্তাকারে বসিয়ে তাদের উদ্দেশে সিদ্দিক ভাই যে কথাটি বললেন, তা শুনে আমরা আবার উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। সিদ্দিক ভাইয়ের প্রতি মনে মনে জমা অভিমানের সকল কালো মেঘ অকস্মাৎ কেটে গিয়ে সকলের হৃদয়ে জ্বলে উঠল উজ্জ্বল রৌদ্রের হাসি। তিনি বললেন, আমরা রংরায় ফিরে যাবো না। সেখানে যাওয়ার এই অভিনয় করা হয়েছে একটা উদ্দেশে। আমরা তিন দিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু পাকবাহিনী আসেনি। আমার ধারণা, ওরা আমাদের শক্তি সম্পর্কে কোন ধারণা করতে পারছিল না বলেই ভয় পাচ্ছিলো। সে জন্যে আমাদের ওপর আক্রমণ চালাবার সাহস পায়নি। এখন খবর যাবে আমরা চলে গেছি। ভাববে এটাই সুবর্ণ সুযোগ। কোন বাধা নেই। গ্রামে এসে খালি মাঠে যুদ্ধ জয়ের উম্মাদনায় উল্লাস করবে। মুক্তিবাহিনীর অবস্থানস্থল তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করবে, কোথাও কোথাও অগ্নিসংযোগ করবে এবং নিরিহ মানুষকে ধরে গুলি করে মারবে অথবা তাদের ওপর চালাবে অকথ্য নির্যাতন। সিদ্দিক ভাই বললেন, কিন্তু আমরা তা হতে দেবো না। এর আগেই আবার নাড়িয়াপাড়ায় ফিরে যাবো। রাতের অন্ধকারে গোপনে গিয়ে আমাদের পূর্ব নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নিয়ে বসে থাকবো। ওরা নৌকায় ওঠার আগেই পূর্বের ব্যবস্থামতো খবর পাওয়ার সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়বো শত্রু বাহিনীর ওপর।
ঘটনাটা এতোই সাবধানে করতে হবে যে, গ্রামবাসিও জানতে পারবে না তা। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের ওপরই অধিক দায়িত্ব দেয়া হলো। ওরা এলাকার ১জন অন্য ৪/৫ জনকে নিয়ে আসলো এবং গ্রামের নিরাপদ স্থানে গোপন করে রাখলো। নির্দেশ দেওয়া হলো গোয়েন্দা দলের সেই ৬ জনকে, যারা লাল কাপড় নেড়ে দু’এক মিনিটের মধ্যে পাকবাহিনীর নৌকায় আরোহণের খবর যথাযথভাবে দিতে পারে সেই অবস্থানে চলে যাওয়ার।
রাতে ফেরার আগেই দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় বাজারে। সেখান থেকে ৩দিনের মতো খাবার নিয়ে আসলো তারা, চিড়া-গুড়। আমরা নিশ্চিত হলাম। আমাদের আর গ্রামের বাইরে যেতে হবে না। সবাই আশ্রয় নিলো খড়ের ঘর আর জংগলে। নির্দেশ রইলো হুইসেল বাজার সাথে সাথে সবাইকে দৌড়ে গিয়ে কংস নদীর তীরে অবস্থিত বাঁশাটি গ্রামের কাছে সমবেত হতে হবে।
রাত এভাবেই কেটে গেল। পরদিন সকাল ১০টায় সেই মহেন্দ্রক্ষণে লাল কাপড়ের নিশান ডাক দিলো আমাদের। হুঁইসেল বেজে উঠলো। আমরা সবাই মুহর্তে সমবেত হলাম বাঁশাটি গ্রামের কাছে। সিদ্দিক ভাই কোম্পানির সকল সদস্যকে দু’ভাগে ভাগ হয়ে নদীর তীরঘেঁষা সড়কের পাশে ৭০/৮০ গজ ব্যবধানে অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দিলেন। বললেন, প্রথম গুলিটি ছুঁড়বেন তিনি। এর আগে যেন কেউ একটি গুলি না ছুঁড়ে। ওদিকে হানাদার বাহিনীর নৌকা এগিয়ে আসছে। একসময় আমাদের দু’গ্রুপের অবস্থানের মাঝামাঝি এসে গেল। আমরা সব কিছু দেখতে পাচ্ছি। ভাবছি, গুলি করা হচ্ছে না কেন, এখনইতো সুযোগ। সিদ্দিক ভাই কি আবার সিদ্ধান্ত পাল্টালেন। না পাল্টাননি। হঠাৎ করে প্রচন্ড শব্দে গর্জে উঠলো তার স্টেনগান। নেত্রকোণার মাটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রথম আক্রমণের গৌরব ধন্য সেই গুলির শব্দ হওয়ার সাথে সাথে আমাদের অস্ত্র থেকেও শুরু হল ফায়ারিং। শত্রুর টার্গেটে অব্যর্থ প্রতিটি ফায়ারিং থেকে যেন আগ্নেয়শিখা নয়, আমাদের হৃদয়ের রক্তমাখা বুলেট ছুটতে থাকলো। আমাদের ফায়ারিংয়ে ঝাঝড়া হয়ে যাওয়া নৌকাটি কিছুক্ষণের মধ্যে ডুবে যায়। সে যুদ্ধে শত্রু পক্ষের বেশ ক’জন ঘটনাস্থলেই খতম হয়। অবশিষ্টরা সাঁতার কেটে নদীর অপর পাড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমাদের আকস্মিক আক্রমণে ওরা হতচকিত হয়ে যায় এবং প্রতিরোধের কোন সুযোগই পায়নি। যুদ্ধ জয়ের মুখ দেখালাম আমরা। সিদ্দিক ভাই ফায়ারিং বন্ধের নির্দেশ দিলেন।নৌকা নিয়ে সাঁতার কেটে পালিয়ে পাওয়া পাকবাহিনীর সদস্য ও ওদের সহযোগী বাঙ্গালি বিশ্বাসঘাতকদের ধরে আনার জন্যে নির্দেশ দিলেন।
আমাদের দলের সবচেয়ে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিম ও আমার ভাই মোস্তফা বাঁশাটি গ্রামের লোকদের সহযোগিতায় ৭ জনকে ধরে আনতে সক্ষম হয়। কয়েক জন পালিয়ে যেতেও সক্ষম হয়। ধৃত ৭ জনের মধ্যে যাদের নাম মনে পড়ে তারা হচ্ছে, নেত্রকোণা থানার তৎকালীন দারোগা আবদুর রশিদ ও আনসার এডজুট্যান্ট লাল মিয়া, আব্দুল মালেক অন্যতম। আমাদের তুরা ক্যাম্পের চার্জে ছিলেন ক্যাপ্টেন চৌহান। সিদ্দিক ভাই ধৃত ৭ জনকে সেখানে পাঠিয়ে দিলেন। জববার ও মোস্তফা ভাইয়ের তত্তাবধানে ক’জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল নিয়ে গেল ওদের। সিদ্দিক ভাই এই দলের সদস্যদের মারফত ক্যাপ্টেন চৌহানের কাছে একটা চিঠি পাঠালেন। সে চিঠিতে প্রথম অপারেশনের সাফল্যের বিস্তারিত বিবরণের সাথে গোলাবারুদের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। আমাদের বরাদ্দের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। সিদ্দিক ভাই ক্যাপ্টেন চৌহানের কাছে লেখা চিঠিতে আরো গোলাবারুদের ব্যবস্থা করার জন্যে অনুরোধ জানালেন।
ধৃত যুদ্ধ বন্দিদের তুরায় পাঠিয়ে দিয়ে আমরা যখন প্রথম সাফল্যের আনন্দে অনেকটা আত্মহারা, ঠিক তখনই আমাদের গোয়েন্দা দলের অন্যতম সদস্য পরেশ সংবাদ নিয়ে আসে যে, নেত্রকোণা থেকে পাকহানাদার বাহিনীর একটা বড় দল আবার বড়ওয়ারী ফেরীঘাটে এসে গেছে। নদী পাড় হয়ে এদিকে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওরা। তখন দুপুর দেড়টা-দু’টা হবে। সংবাদ পাওয়ার পরপরই আবার প্রস্তুত হতে বললেন সিদ্দিক ভাই। আমাদের তখন খাওয়া দাওয়াও হয়নি। না খেয়ে আমরা আবার রণক্ষেত্রে যাত্রা করলাম। যথাসম্ভব অল্প সময়ের মধ্যে এবার আমরা গিয়ে জড়ো হলাম হাতকুন্ডলী গ্রামে। সিদ্দিক ভাই সে গ্রামের হাতেম আলী সাহেবের বাড়ির কাছে সকলকে অবস্থান নিতে বললেন। সেখান থেকে বড়ওয়ারী ঘাট দেখা যায়। আমাদের বরাদ্দে প্রতি রাইফেলে যে ২০রাউন্ড বুলেট বরাদ্দ ছিল সকালের যুদ্ধে তা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে জন্যে আবার আমাদের যুদ্ধের কৌশল পাল্টে দিলেন সিদ্দিক ভাই। বললেন আমরা কিছুতেই প্রথম ফায়ার ওপেন করবো না। আমাদের এবারের যুদ্ধ আক্রমণাত্মক হবে না। আমরা এবার যে কৌশল নেবো তার নাম ডিফেন্সিভ। আত্মরক্ষামূলক। যেহেতু আমাদের বুলেট কম, সেহেতু ওরা ফায়ার করবে, আর আমরা তার উত্তর দিয়ে ক্রমশ পিছিয়ে আসবো। এতে ওরা বিনা বাধায় গ্রামে প্রবেশ করে জনগণের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার করতে পারবে না। ওদের এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঠেকানো গেলে, রাতে কিছুতেই গ্রামে আসার সাহস পাবে না। আনুমানিক ৩ টার দিকে নদী পেরিয়ে ওরা প্রথম ফায়ার ওপেন করলো এবং সেই কাভারিং ফায়ারের মধ্যে ক্রলিং করে এগুতে থাকলো। আর পরিকল্পনামতো কাভারিং করে আমরা পিছু হটতে লাগলাম। এভাবে প্রায় ৪ ঘন্টা যুদ্ধ চললো। ততক্ষণে ওরা এগিয়ে এলো মাত্র সোয়া কিলোমিটার জায়গা। এর মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সূর্য ডোবার সাথে সাথে অন্ধকার নেমে এলো। অচেনা রাস্তা ও পরিবেশে আর এগিয়ে এলোনা ওরা। পিছু হটে চলে গেল আবার বড়ওয়ারী ফেরীঘাটে। এভাবেই সে দিন সিদ্দিক ভাইয়ের বিচক্ষণতায় হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলো গ্রামবাসী। নিশ্চিত মৃত্যু ও মৃত্যুর চেয়ে কঠোর নির্যাতনের হাত থেকে বেঁচে গেল ওরা। জানমাল বাঁচলো নির্বিচার অগ্নিসংযোগের হাত থেকে।
এরপর আমরা যতদিন ছিলাম, ততদিন সে এলাকায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর প্রবেশের চেষ্টা করেনি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন একদিনেই এদুটি অপারেশনের সফল নেতৃত্বে দেন আমার অগ্রজ আবু সিদ্দিক আহমেদ। ঠাকুরকোণা ব্রিজ ভাঙ্গার জন্যে প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক আনতে জব্বার ভাই ইতিপূর্বে রংরা চলে গিয়েছিলেন। সে যাই হোক, অচিরেই আমাদের কোম্পানির এই সাফল্যের স্বীকৃতি এলো। আমাদের কোম্পানির নাম দেয়া হলো টাইগার কোম্পানি।স্বাধীনতা যুদ্ধে এটাই ছিল আমাদের প্রথম অপারেশন।
