বিপাশা মন্ডল
আবদুল খালেক কঠোর চোখে রেহেনা বেগমের দিকে তাকিয়ে থাকেন। স্ত্রী রেহেনা বেগম অনেকসময়ই ভেবেছেন স্বামীর কঠোর দৃষ্টিকে পাত্তা দেবেন না। তিনি না দেখার ভান করে আবদুল খালেকের বা দিকে এগিয়ে যান সাদা শার্টটা হাতে করে। মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ান আবদুল খালেক, একরকম ছিনিয়ে স্ত্রীর হাত থেকে শার্টটা নেন, ঠুঁটো বাঁ হাতের কনুই গলিয়ে গলার কাছে টেনে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেন, ডান হাত শার্টের হাতার মধ্যে গলান। রেহেনা বেগম অসহায় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন। একান্ন বছর ধরে তিনি এমনই দেখছেন। শার্ট দাঁতে কামড়ে পড়তে হয় তাই আবদুল খালেক একান্ন বছর হল পান খাওয়া ছেড়েছেন, শার্টে দাগ পড়বে এই ভয়ে। কিন্তু একান্তই অসুখে অসমর্থ হয়ে না পড়লে কখনো কোনো সাহায্য নেন না স্ত্রী বা সন্তানদের কাছ থেকে।
আবার কোনো জোচ্চুরি ঠকবাজির শিকার হতে চান না আবদুল খালেক তাই তাড়াহুড়া করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। পিছন থেকে স্ত্রী রেহেনা বেগম কয়েকবার আওয়াজ দেন, ‘কই যান এই দুপুর বেলা, রৌদ লাগবো মাথায়।’ তিনি আমল দেননা। বেডিনদের পিছু ডাক শুনতে নাই। কাজে অনিষ্ট আসে। আগে ভাগে গিয়ে মাছের মার্কেটের সামনের ছোটো চায়ের দোকানটার একটা বেঞ্চিতে সীট নিয়ে বসে থাকতে হবে। চোখের কোন দিয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে কখন আসে জালুরা। মাছ নিয়ে পাইকাররা এসে পড়লেই কালু মাঝির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। চোখের সামনে কম দামে পাইকারী মাছ কিনে খুব বেশি দামে আবদুল খালেকের কাছে বিμি করতে পারবে না কালু। তিনি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে ঠকতে না হয়। যদিও এরকম দু’একটা ক্ষুদ্র বিষয় ছাড়া প্রায় প্রত্যেক বিষয়েই তিনি ঠকছেন। ঠকেই যাচ্ছেন। এমনকী নিজের প্রাণের বাজি ধরে যে জিনিসটা তারা অর্জন করেছিলেন তাতেও প্রতিদিন বিভিন্ন জনে বিভিন্নভাবে নিজেদের সুবিধামতো ভেজাল মেশাচ্ছে। বাহাত্তর বছর বয়সের ন্যুব্জ দেহ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই তিনি ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে কাটা জায়গায় হাত বোলান মমতায়।
নাছুমের দোকানে আগে থেকেই বেঞ্চি দখল করে বসে আছে রাফাত, জগনু, ধীরেশ, পাপ্পু আর সোলায়মান। সবকটা উঠতি বয়সী পোলাপান। এরমধ্যে সোলায়মানই কলেজে যায়, জগনু অটো চালায়, ধীরেশ সব্জির ঠিকাদারী ব্যবসা করে, পাপ্পু আর রাফাত কিছুই করে না। বাপের পয়সায় খায় দায় ঘোরে ফেরে। শুধু যদি ঘোরা-ফেরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত ব্যাপারটা! আবদুল খালেক একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস চাপেন। তার নাতি রকিবও এদের বয়সী। এখন তাকে এদের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে না। হয়তো বিকেলে দাদাজান মাছ কিনতে আসে বলেই অন্য কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে। সব কয়জনের চোখই লাল। কেমন একটা অস্বস্তিকর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে ওদের চারপাশে। আবদুল খালেক বেঞ্চির দিকে এগোন না। বাঁ হাতের কাটা কনুইয়ে দোকানের চালার একটা খুঁটি ঠেস দিয়ে ডান হাতে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। নাছুম ব্যাপারটা খেয়াল করে। নাছুমের চোখও লাল। এদেরই ইয়ার-দোস্ত সে। নাছুম ইশারায় ডাবলুকে একটা আলগা প্লাস্টিকের টুল দেখিয়ে দেয়। চায়ের দোকানে খদ্দেরদের কাপ-প্লেট এগিয়ে দেওয়া চৌদ্দ বছর বয়সী ছোটোখাটো মোটা ছেলে ডাবলু এই জেলায় একরকম অভিবাসী। কয়েক বছর হল ওরা পাশের জেলার শিমুলতলী ইউনিয়ন থেকে এখানে চলে এসে জমি কিনে ঘরবাড়ি করে করে বসবাস করছে। ছেলেটা একটা বিশেষ কারণেই আবদুল খালেককে সমীহ করে।
ডাবলু টুলটা নিয়ে আবদুল খালেকের পাশে রাখে। আবদুল খালেক সস্নেহ দৃষ্টিতে পরিশ্রমী কিন্তু পড়াশোনায় আগ্রহী ডাবলুকে দেখে। ডাবলু শ্রদ্ধাভরে তার খালেক নানার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবে রকিব ভাই কি নানার আসল পরিচয় জানে না?
বাজারে আজ মাছ বেশি সুবিধা হয়নি। পুকুরের চাষের মাছ তাও ২২০ টাকা দর সিলভার কার্পের। আবদুল খালেক অনেক দেখেশুনে মগড়া নদীর একটা কাতলা কেনে। সরকার এখন তাকে যে টাকা পেনশন দেয় তা দিয়ে সে ভালোভাবেই মাছ খেতে পারছে পরিবারের সকলকে নিয়ে। চাল তো তার জমির ধানেই হয়ে যায়। এই পুরুষ্ট কাতলা মাছ দিয়ে সুস্বাদু মুড়িঘণ্ট হবে। পিঁয়াজ-আদা-রসুন বেটে মাছের পেটির ভুনা হবে কিন্তু আবদুল খালেকের মনে কোনো শান্তি নাই। মাছ নিয়ে বাজার থেকে নিজেদের বাড়ির পীচ রাস্তায় ঢুকতেই মনটা আরো খিঁচড়ে যায়।
বাড়ির দিকে পঞ্চাশ গজ যেতেই প্রতিবেশি আজমল ব্যাপারির নারকেল বাগান। ছোটো একটা পুকুরের চারপাশে প্রচুর নারকেল গাছ লাগিয়েছে। ব্যাপারি থাকে শহরে। তার বাগান এখানে। পুরো বাগানের চারপাশে দেওয়াল ঘেরা। রাস্তার দিকে বড় গেট, লোহার গরাদ দেওয়া। রাস্তা দিয়ে বাগানের পুরোটা স্পষ্ট দেখা যায়। নারকেলের নিরাপত্তার জন্য দেওয়াল ও গেট ব্যাপারি দিতেই পারে। প্রতি বছর নারকেল বিক্রি করে ব্যাপারি এখন ভালো টাকা রোজগার করে। তা করুক তাতে আবদুল খালেকের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু জায়গাটা খোলা না রেখে এভাবে ঘিরে রাখায় মানুষজন ভিতরে ঢুকতে পারে না। সন্ধ্যারাত থেকেই এলাকার জুয়ারিরা দেওয়াল ও গেট ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকে চাদর বিছিয়ে গাজা টানতে টানতে জুয়া খেলতে শুরু করে চার্জার লাইট ধরিয়ে। সীমান্ত কাছে হওয়ায় খুব সহজেই এসব নেশাদ্রব্য তরুণ যুবকদের হাতে হাতে পৌঁছে যায়। রাত্রি দুইটা তিনটা পর্যন্ত চলে এই জুয়ার আড্ডা। লোকগুলো প্রত্যেকেই অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন অন্তত এসএসসি পাশ। এলাকায় কমপক্ষে পনেরটা পাবলিক লাইব্রেরি আছে। অথচ এরা লাইব্রেরি শব্দটা বানান পর্যন্ত করতে পারে না।
নিজের মনে গজগজ করতে করতে বাড়ি ঢোকে আবদুল খালেক। রেহেনা বেগম তাড়াতাড়ি এসে স্বামীর হাত থেকে বাজারের ব্যাগ নেয়। কখন কী কারণে তার স্বামীর রাগ মাত্রাছাড়া হয়ে গিয়ে বকাবাজি শুরু করে কে জানে। স্ত্রীর হাতে বাজারের ব্যাগটা দিয়ে পাঞ্জাবি খুলে হো হো করে হাপাতে থাকে আবদুল খালেক। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে তার বাহাত্তর বছর বয়সের লোলচর্ম শরীরের দড়ি পাকানো পেশিগুলো থলথল করে কেঁপে ওঠে।
রেহেনা বেগম বাজারের ব্যাগ ঢেঁকিঘরের মধ্যে বড় ঢেঁকিটার পাশে রাখে। ঘরটার পিছন দিকে বাঁশের তৈরি চালুন, কুলা, খালুই, পলো, মাথাল ; বেতের তৈরি ধামা, সাঁজি, টুকরি নানা আকারের শিকায় বাঁশের কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো। আটষট্টি বছর বয়সী ছোটোখাটো ভারী চেহারার রেহেনা বেগম মমতাভরে এসব হাতে তৈরি তৈজসপত্রের দিকে তাকান। এসবের বেশিরভাগ তার স্বামীর হাতে তৈরি। কামলা নসুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এসব তৈরি করেছেন। তিনি মাছ কুটে রাখার জন্য একটা বাঁশের ঝুড়ি নামাতে গিয়ে থেমে যান। এখন আর তিনি ধোয়া-পরিস্কার করার কাজ করতে পারেন না। ঘরের সব কাজ করে দুই ছেলের বউ মালা আর স্বপ্না। এরা সব কাজে প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করে। এখন আর নতুন প্রজন্ম কবিগান, যাত্রা, রামমঙ্গল, সোনাই বিবির পালা, মহুয়া মলুয়ার গীত পছন্দ করে না। একটা অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানে সিডি ছেড়ে হিন্দি গান শোনে, অশ্লীল বাংলা গানের সঙ্গে উদ্দাম নাচে। কুটিরশিল্পের তৈজসপত্রের সঙ্গে সঙ্গে এদের যেন সংস্কৃতিও বিলুপ্ত হতে যেতে বসেছে।
রকিব বাড়িতে ঢোকার আগে আড়চোখে লক্ষ্য করে দাদাজান কোথায়। কলপাড়ে দাদাকে দেখে ও সাৎ করে বাড়ির ভিতরে ঢুকে যায়। দাদা আজকাল চোখে অনেক কম দেখছেন। এতে রকিবের সুবিধাই হয়েছে। নয়তো কটর কটর বকাবকি শুনতে হতো। ঘরে ঢুকে নিজের টেবিলের ড্রয়ার খোলে, ওখানে একটা গোপন কুঠুরী বানিয়েছে সেটাতেও ক্ষুদ্র একটা তালা লাগানো। এদিক ওদিক তাকিয়ে পকেট থেকে একটা ছোটো হলুদ কাগজের পুরিয়া বের করে রাখে কুঠুরীতে। জগনু রাখতে দিয়েছে। ড্রয়ার বন্ধ করার আগে ভালোভাবে সাজিয়ে রাখে, কলম, পেনসিল, স্কেল, কয়েকটা টাকা, স্ট্যাপলার, জেমস ক্লিপ আরও দু’একটা টুকিটাকি পাঠ সহায়ক জিনিসপত্র।
কলপাড় থেকে ধুঁকতে ধুঁকতে ফিরে আসেন আবদুল খালেক। কোনো ভাবেই আর শরীরটাকে আয়ত্তে রাখা যাচ্ছে না। যতদিন যাচ্ছে তত যেন বেগড়বাই বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় দেড়শ টাকার ওষুধ গলাধকরণ করেন। তারপরও এখানে অসুবিধা ওখানে সমস্যা লেগেই থাকে। সে সঙ্গে আছে স্ত্রী রেহেনা বেগমের দিনরাতের আফসোস মনস্তাপের ধাক্কা। সংসারে সমাজে অসুবিধাগুলোর কথা তিনি রেহেনা বেগমের চেয়ে বেশিই বোঝেন, একটা একটা সমাধানের উপায়ও ভাবেন, কিন্তু কোনো সমাধানই শেষ পর্যন্ত করতে পারেন না। সব ভেস্তে উল্টে যায়। এর উপর স্ত্রীর হায়-হাহাকার। তার ব্যর্থতার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়। এই যে তিনি জানেন, বড় ছেলে সাইফুলের বড় সন্তান রকিব নেশাগ্রস্তদের পাল্লায় পড়েছে। তিনি তাকে হাতে নাতে ধরতেও পারছেন না। ফিরাতেও পারছেন না। আকারে ইঙ্গিতে তার মা মালাকে যদি এ বিষয়টা নিয়ে কিছু বলতে যাওয়া হয়, আহত কুকুরীর মতো মালা চিৎকার চেঁচামেচি করে পুরো পাড়া মাথায় তোলে। তখন নাতির ভবিষ্যতের ভাবনা ছেড়ে বুড়ো-বুড়িকে নিজেদের মান-সম্মান ও বাড়ির ইজ্জত বাঁচানোর জন্য হার মেনে ছেলেবউয়ের কাছে মাফ চাইতে হয়। সাইফুলের আরো দুটা ছেলে-মেয়ে আছে। ছোটো ছেলে শাকিব পড়াশোনায় ভালো কিন্তু মিথ্যাবাদী। ক্লাস সেভেনে পড়া ছেলে এমন বানিয়ে-গুছিয়ে মিথ্যা বলবে যেন মিথ্যাটাই সত্যি। মেয়ে সালেহা চুপচাপ থাকে। প্রাইমারী স্কুলে ফাইভে পড়ে। কাজ করার ভয়ে কখনো পড়ার টেবিল ছেড়েই ওঠে না। একগ্লাস পানি চাইলেও নাকিকান্না শুরু করে। তার পড়ায় অসুবিধা হবে। অথচ রেজাল্টও গড়পড়তা।
তথৈবচ অবস্থা ছোটো ছেলে মকবুলের ছেলেমেয়েদের বেলায়ও। বড় মেয়ে মিতারা এসএসসি দেবে। একটু বোকা বোকা আর স্মার্টফোনে আসক্ত। বড় ছেলে জহির সিক্সে পড়ে। মেধাবী। এই ছেলেটাই কিছুটা স্বাভাবিক ও সামাজিক এ পরিবারের বাচ্চাদের মধ্যে। মকবুলের ছোটো ছেলে মনিরকে এখানো বিবেচনায় আনতে চান না আবদুল খালেক। মনির মাত্র প্রাইমারীতে আসা-যাওয়া শুরু করেছে। শিশু ওয়ান।
বংশের ভবিষ্যত বংশধরদের অবস্থা যদি এমন হয় বৃদ্ধ অভিভাবকদের স্বস্তি থাকার কথা নয়। যতো ভাবেন আল্লাহর নাম নিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দেবেন। সংসারের মায়ায় আর নিজেদের কলুষিত করবেন না, কিন্তু পারেন না। এই যেমন, এখন পর্যন্ত দুই ছেলেবউয়ের কোনো পাত্তা নেই। কোথায় যায়, কেন যায় বলে যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করে না। বেরোনোর সময় জিজ্ঞাসা করলে বলে, শহরে যাই। রোজ রোজ তোমাদের শহরে যাওয়া কেন? চাকরি কর? কিন্তু একথা রাগের বশে বললেও রক্ষা নেই। তুলকালাম কান্ড শুরু হবে বাড়িতে।
অবস্থা বেগতিক দেখে রেহেনা বেগম পাকঘর থেকে একটা প্লাস্টিকের গামলা আনলেন। নিজের হেজে যাওয়া নখের হাত দিয়েই মাছ কুটতে শুরু করলেন। তিনি জানেন এই হাতে মাছ কুটলে ছাই আঁশ ঢুকে এমন যন্ত্রণা হবে, যে তিনি সারারাত ঘুমাতে পারবেন না। স্ত্রীর দুরবস্থা দেখে আবদুল খালেকের মাথা চিড়বিড় করে উঠল রাগে। তিনি রেগে কিছু বলার আগেই বাড়িতে একটা লোক এসে ঢুকল। লোকটিকে চেনেন তিনি। আশ্চর্য হলেন, এই ধরনের লোক তার বাড়িতে ঢোকার সাহস পেল কোথা থেকে?
“আস্সালামুআলাইকুম, চাচা।” সামনাসামনি দুর্ব্যবহার না করে খালেক সাহেব নীরস কণ্ঠে জবাব দিলেন, “ওয়ালাইকুম সালাম, কি দরকার?” “আপনাদের দোয়া চাচা। এইবার ইলেকশনে দাঁড়াইবাম। হাতি মার্কা চাইছি। মার্কা যেডাই হউক ভোট আমারে দিয়েন। আমি ইনসান হক, আমিলিগের খাঁটি সেবক, মনে করেন যে শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের একুশ শতকের প্রতিনিধি।”
বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যান আবদুল খালেক। মানুষ এতো নিলর্জ্জ হয় কিভাবে। এই লোক ২০০১ এর আগে ছিলো একটা দলে, ২০০১ এর পরে প্রেস কনফারেন্স ডেকে দল বদল করেছে। এখন আবার আওয়ামীলীগ! কিন্তু এদের মুখোমুখি কিছু বলার উপায় নাই। প্রতিদিন এরকম অনাকাঙ্খিত মানসিক অত্যাচার সহ্য করে যাওয়াই তার নিয়তি। দাঁতে দাঁত চেপে ক্রোধ ও বিবমিষা গিলে ফেলেন আবদুল খালেক। দশগজ দূরে রেহেনা বেগম হরিণশাবকের মতো ভীত আকুল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। কাতলা মাছটা দু’হাতের থাবায় আঁকড়ে ধরে বিমূঢ় তিনি। তার শরীরের ভাষায় শুধুই মিনতি, যেন আবদুল খালেক ধৈর্য হারিয়ে বেফাঁস কিছু বলে না বসেন।
রেহেনা বেগমের এই আত্মপলায়নমুখী বহিঃপ্রকাশ আবদুল খালেকের জন্য লজ্জার, আত্মগ্লানি, অবমাননার। কিন্তু পরিস্থিতির কাছে অসহায় তিনি। তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বা হাতের ঠুঁটো কনুইয়ে হাত রাখেন।
ইনসান হক চোখ নাচিয়ে বলে, “এইবার জিততে পারলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে ডিপ বসাইয়া দিবাম। একটা বাড়িও আর কারেন্টের আওতার বাইরে থাকতো না। …।”
কিছু বলবেন না বলবেন না ভেবেও আবদুল খালেক বলে ফেলেন, “আদাড়ে-বাদাড়ে, ঘরের কোণাকাইচে, বাজারে গলিতে যে জুয়া আর মদ-গাঞ্জার আসর বসতাছে সেইগুলা বন্দ করবান না? পোলাপানরে কাজ-কাম দিবান না?”
মুখে একপোচ কালি লেপে দেয় কেউ ইনসান হকের মুখে। এধরনের আμমণ সে প্রত্যাশা করেনি। নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে কথা জোগায়, “আপনি আগের যুগের মানুষ চাচা। এখনকার পোলাপানের দিকটাও দেখা লাগে। কন তো এই শহরে কোনো আনন্দ-ফূর্তির জাগা আছে? যেখানে গিয়ে নিজের মনরে ভোলান যায়? পোলাপানেরও তো একটা জীবন আছে! আচ্ছা যাউকগা, ভোটটা আমারেই দিয়েন। দেশের উন্নয়ন কইরাই ছাড়বাম। উন্নয়নের জোয়ারে ভাসাই লই যাইবাম।…।” ইনসান হক হয়তো আরো কিছু বলে, কিন্তু আবদুল খালেকের কানে আর কিছু ঢোকে না। তার কানে শুধু একটা কথাই প্রতিধ্বনিত হয়, “পোলাপানেরও তো একটা জীবন আছে!”
পোলাপানের জীবন! আবদুল খালেক কি পোলাপানের বয়স পার না কইরা মায়ের পেট দিয়া মাটিতে ভূমিষ্ঠ হইয়াই অমনি এই বাহাত্তুর বছর বয়সে পৌঁছাই গেছে? আবদুল খালেক যখন যুবক তখন গ্রামগঞ্জে আকাল ছিল। তার প্রাইমারী স্কুলের বেতন ছিল নামমাত্র। তবুও মাসকাবারী বেতন পাবার কারনে যা হোক দুই ছেলেকে কোনক্রমে তার দিনগুজরান হয়ে যেত। ছোটো মেয়েদুটি তখনও জন্মগ্রহন করেনি।
পোলাপানের জীবন! মাত্র নয় বছর বয়স থেকে কৃষক বাবার সঙ্গে প্রতিদিন ক্ষেতে যেতে হয়েছে তাকে। চৌদ্দ বছর বয়সে এতো বড় তামাকে বোঝা তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিত বাবা যে তার একটা কুঁজই বেরিয়ে যেতে চাইছিল। কুঁজ যেন না বেরোয় সেজন্য প্রতি রাতে মা কালিজিরা আর সরিষার তেল দিয়ে তার পিঠ মালিশ করে দিত। তাও এখনো সে একটু কুঁজিয়ে কুঁজিয়ে হাঁটে।
আর কী আশ্চর্য, এই কুঁজিয়ে কুঁজিয়ে হাঁটার কারণেই সেবার তার মাথাটা সহযোদ্ধাদের মাঝে থেকেও বেঁচে গিয়েছিল। সঙ্গের অন্য চারজনের প্রত্যেকের লাশ পড়েছিল। তার মাঝ থেকে তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন। পরে আরো সাতটা অপারেশন সফলভাবে শেষ করেছিলেন তিনি। আটবারের বার সহযোদ্ধা নকিবের হিংসামূলক বিশ্বাসঘাতকতায় তার বাঁ হাঁতটা চিরদিনের মতো …।
আবদুল খালেক একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন। “পোলাপানের জীবন?” পোলাপানের জীবনেই তিনি গাঁজা না টেনে জুয়া না খেলে প্রাণবাজি রেখে যুদ্ধে গেছেন। নিজের ধূসর স্মৃতিকে সচেতনতার তোয়ালে দিয়ে ঘষে মেজে কখন যে নিজের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান ও নিজের আশা-আকাঙ্খা-বাসনার কথা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা, ইচ্ছা ও কামনার কথা, স্বকীয়তা ও মানবতার কথা, দেশপ্রেম ঐতিহ্য-শেকড় অনুসন্ধানের কথা শোনাতে শুরু করেন পরবর্তী প্রজন্মকে তা তিনি টেরও পান না।
রেহেনা বেগম মাছ ধুয়ে ফ্রিজে রেখে এসেছেন। এরমধ্যে বাড়ি ফিরে এসেছে স্বপ্না ও মালা। দুজনের হাতেই বড় বড় চটের ব্যাগ, বোধহয় সংসারের তৈজসপত্র কিনতেই গিয়েছিল। কিন্তু বলে গেলে কী হয়? অন্য নাতি নাতনিরা এর মধ্যে দাদার চারপাশে টুল চাটাই বা পিড়ি নিয়ে বসে পড়েছে। রেহেনা বেগমের মনের মধ্যে জিওল মাছের মতো ঘাই দিয়ে উঠল দুর্দমনীয় আবেগ, কেন যে আজ তার স্বামী এতো আয়োজন করে এসব বলতে বসেছে! হয়তো ইনসান হকের আকস্মিক আগমন ও উদ্ধত আচরণ তাকে খাপছাড়া করে দিয়েছে। রেহেনা বেগমও একটা চেয়ার নিয়ে স্বামীর কাছাকাছি বসলেন, বয়স হয়েছে তার স্বামীর, খেই হারিয়ে গেলে তাকে ধরিয়ে দিতে হবে।
আবদুল খালেক প্রথমে কয়েকবার হা হা করে গভীর নিঃশ্বাস টানেন, এরপর বলতে শুরু করেন, “আমার মামাত ভাই মিন্নাত যখন ঢাকা থিক্যা আইসা খবর দিল যে দেশের পরিস্থিতি খারাপ তখন বুঝতে পারি নাই। প্রতিদিন স্কুলে যাইতেছি, বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের রান্না খাইতেছি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতেছি কাছুমের দোকানে। কাছুমরে চিনছ, নাছুমের দাদা। আগে অই দিত দোকান। মামাতো ভাই বেড়াতে আইসা বলল, ছোটো ভাই দেশের পরিস্থিতি কওন যায় না, পাকিস্তানী সরকার খুব যন্ত্রণা করতেছে। মনে মনে একটা প্রস্তুতি নিয়া রাখো, যে কোনো সময় দেশে একটা ল্যাজেগোবরে অবস্থা হতে পারে। তখনও বুঝি নাই যে পরিস্থিতি এমন হবে যে ‘পোলাপানের জীবন’ সরাইয়া রাইখ্যা বন্দুক কাঁধে যুদ্ধে যাইতে হবে।’ বলে তিনি আবছা দৃষ্টি দিয়েই নাতি রকিবের দিকে তাকালেন। রকিব সঙ্গে সঙ্গে চোখ নিচু করল। দাদার চোখে চোখ রাখার সাহস তার নেই। রকিব দাদার ইদানীংকার কথায় বুঝতে পারছে, দাদা তার অসৎসঙ্গের কথা জানে। গলা খাকারি দিয়ে আবদুল খালেক আবার বলতে শুরু করেন, ‘যুদ্ধ সত্যি সত্যি লাইগ্যা গেলো। মার্চের পঁচিশ তারিখের কথা তো তোমরা সকলে জান। জান না যেটা সেটা হল, আমাদের তরুণদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। শক্তিশালী পাকিস্তানী বাহিনী, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, তার বিপরীতে আমরা নিরস্ত্র, প্রশিক্ষণবিহীন বাঙালি। শুধু আবেগ দিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায় না। আমরা অনেকেই তাই প্র্যাকটিক্যালি ভাবতে শুরু করলাম। এর মধ্যে সেই মামাতো ভাই মিন্নাত বাড়ি আসলো। পালাইয়া। আমাদের খবর দিল মুক্তিযোদ্ধাগো ইন্ডিয়ায় ট্রেনিং দিতেছে। আমি তখন বাইশ বছরের যুবক। তোমাগোর ভাষায় পোলাপান। আমার মায়েরে একটা সালাম কইরা সোজা গিয়া রেলে উঠলাম। একসঙ্গে উনিশজন। ইন্ডিয়ায় ট্রেনিং। ফিরা আসলাম সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি।”
একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে বড় বড় দম নিলেন আবদুল খালেক। জহির সাহস করে মৃদুস্বরে প্রশ্ন করে, “দাদাজান, তাইলে আপনার হাত কি কাটান গেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়?”
আবদুল খালেক একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়েন। রকিব বিস্মিত ও আহত। এতোবড় একটা ঘটনা ও জানে না। ওর বাবা-মাও তো কোনোদিনও রকিবদের বলেননি যে তাদের দাদা মুক্তিযোদ্ধা। ও তো ভেবেছিল কোনো রোড এ্যাকসিডেন্টে ওনার হাত কাটা পড়ছে।
বিস্মিত স্বপ্না ও মালাও। ওরাও এসবের কিছুই জানত না। বিড় বিড় করে মালা একবার শুধু বলে, ‘আপনি তা’লে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পান না কিআরে?’
মালার প্রশ্নের জবাবে আবদুল খালেক গুম মেরে বসে থাকেন। রেহেনা জবাব দেন, “তোমার শ্বশুরে তো সরকারি প্রাইমারীর টিচার ছিলেন। সে আবার ভাতা পাইবে কেন, তবে সম্মান অনেক পাইছে।”
স্বপ্ন ঠোঁট উল্টায়, “সম্মান দিয়া কি হইব? দরকার তো টাকার।”
এবারও রেহেনা বেগম উত্তর দেন, “ক্যান টাকা কী তোমরা পাও নাই?”
স্বপ্না বলে, “টাকা আবার কবে দিলেন আম্মা? আব্বা যে পেনশন পায় তা দিয়া তো নিজের হাতেই বাজার খরচ করে।”
“কেন? সাইফুল মকবুল বেতন পায় না? একজন প্রাইমারীর টিচার, অন্যজন স্বাস্থ্যবিভাগে চাকরি করে?”
“তো” খেঁকিয়ে ওঠে স্বপ্না, “এয়ারা তো পড়ালেহা করছে, হেরপর চাকরী করতেছে। খাইট্টা বেতন আনতেছে। এতে আব্বার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার টাকা আইসে কোথা দিয়া?
” হি হি করে কিশোরী মেয়েদের মতো হেসে ওঠেন রেহেনা বেগম, তার তোবড়ানো গাল কুচকে যায় হাসির দমকে। হাসতে হাসতে বলেই ফেলেন, “কোনো সুমায় দেখছ স্বামী দেবরের সার্টিফিকেট, মার্কশিট, ঐটা দেখলে আর এটা কইতা না।”
স্বপ্না বুঝতে পারে কোথাও একটা গÐগোল আছে, জিজ্ঞাসা করে, “মানে?”
“মানে হইল এইডা যে, ওদের পড়াশোনার সার্টিফিকেটের যে ধার তাতে চাকরি পাওনের ভার কাটতো না। তোমার শ্বশুরের মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটের ধার দিয়া চাকরির অসুবিধাগুলার ভার কাটানো হইছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় হেরা চাকরি পাইছে।”
স্বপ্না ও মালার গর্বিত মুখ মুহূর্তে কালিতে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। একারণেই এই দুজন মেরুদন্ডহীনের মতো বাবা-মার মুখের উপর কোনো কথা বলার সাহস করে না। প্রতিটা ঈদে শ্বশুর যে তার তিন কন্যার শ্বশুর বাড়িতে বোনাসের টাকাগুলো পাঠিয়ে দেন এ নিয়ে টু শব্দটিও করে না ছেলে দুজন। বরং বাড়ির জন্য কাপড় কেনার সময় সবচেয়ে আগে শ্বশুর-শাশুড়ীর জন্য কাপড় কেনে।
জহির ছোটো হলেও বুঝতে পারছে, এখন একটা তর্কাতর্কি শুরু হবে। সে ভদ্র কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে, “দাদাজান, আপনার যুদ্ধের গল্প তো কমপক্ষে ছয়মাসের হবে, আপনি আমাদের আপনার হাতকাটার ঘটনাটা বলেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে।” মালা ও স্বপ্নাও প্রসঙ্গ পাল্টে যেতে খুশি হয়।
“নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি আমাদের উপরে নির্দেশ এসেছিল একটা সেতুকে উড়িয়ে দিতে হবে। তোমরা চেন না সেই সেতুটা। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পরে তিন বছরের মধ্যে চাকরির বদলি নিয়ে আমি বাবার বসতভিটা বিক্রি করে এখানে এসে নতুন বাড়ি করি, তোমার দাদিকে বিয়ে করি, তোমাদের বাবা ও ফুপুদের জন্ম হয়। ওখান থেকে চলে আসার পিছনে বড় কারণ ছিল এই কাটা হাত। কাটা হাতের কারণে সবসময় মানুষ আমাকে করুণার চোখে দেখত। বলত হাতকাটা খালেকইয়া। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি বলে বার বার সংবাদের পাতায় আমাকে নিয়ে আসতে চাইতো। আমি দৃঢ়ভাবে সকল প্রচার প্রচারণার বিপক্ষে থেকেছি। এছাড়া সহযোদ্ধা নকিবের বিশ্বাসঘাতকতার কথা আমি জানতে দিতে চাইছিলাম না মানুষকে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যাবে। আমার মামাতো ও চাচাতো ভাইদের জানিয়ে দিয়েছিলাম যেন তারা না জানায় আমার নতুন বসতি কোথায়।”
এ পর্যন্ত বলে আবদুল খালেক আবার হা হা করে নিঃশ্বাস টানতে শুরু করেন। রেহেনা বেগম পানির গ্লাস এগিয়ে দেন। একটানে পানিটুকু পান করে তিনি আবার বলতে শুরু করেন, “ব্রীজ উড়াবার জন্য আমাদের দলটা ছিল খুব ছোটো মাত্র চারজনের। দলনেতা ছিলাম আমি। নকিব আমার প্রধান সহকারী। ব্রীজ উড়িয়ে দেওয়া অত সোজা না। আমি নির্দিষ্ট দূরত্বে ডিনামাইট লাগাচ্ছি। ডিনামাইট লাগানো হয়ে গেলে নকিব গেল দড়িতে আগুন লাগাতে। যাবার আগে একটা ছোটো বম আমার হাতে দিয়ে গেল তাড়াতাড়ি। আমরা সকলে তখন উত্তেজনায় ফুটছি। এই ব্রিজটা উড়ে গেলে এরপর পাঁচটা গ্রামের মানুষের জীবন নিশ্চিন্ত। ঘন জঙ্গলের ভিতর গ্রামের গভীরে মানুষের বসতি। ব্রিজটা উড়ে গেলে পাঞ্জাবী সৈন্যরা আর জিপ নিয়ে ঢুকতে পারবে না। ওরা সহজে ছোটোখাটো যানবাহনে নদী পাড়ি দেবে না। পানিতে ওদের ভীষণ ভয়। আমি একটা গাছে বম ধরে রাখা বা হাঁতটা দিয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ডান হাতে গোলাবারুদের ব্যাগ। হঠাৎ একই সঙ্গে ডিনামাইট ও আমার হাতের বম ফেটে গেল। প্রচন্ড যন্ত্রণায় জ্ঞান হারালাম। তবে অমন চূড়ান্ত অবস্থায়ও নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করেছে। আমি হাতের গোলাবারুদভর্তি ব্যাগটা দুরে সবুজ ঘাসের ভিতর ছুড়ে দিয়েছিলাম। অন্যদুই সঙ্গী বাসেত ও দিপক আমাকে কাঁধে তুলে ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল। নকিব দড়িতে আগুন লাগিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে যে কোথায় পালিয়ে গেল, আর কখনো নকিবকে আমি দেখিনি। আমার জ্ঞান ফিরে এসেছিল দুই দিন পরে। নকিব ছিল আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির ছেলে, আমরা একই সঙ্গে গিয়ে রেলে উঠেছিলাম ট্রেনিং নিতে যাবার দিন। কেন যে ও এমনটা করেছিল তা আজও আমি বুঝে উঠতে পারিনি। শুধু এটুকু বুঝতে পারি যে, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই কোনো ধরনের ইন্ধন ছাড়াই অনেক মানুষ তোমাকে ঈর্ষা করবে, হিংসা করবে ক্ষতি করতে চাইবে, একারণে সবসময় সতর্কভাবে পা ফেলাই মানুষের ধর্ম হওয়া উচিত।”
রেহেনা বেগম কথার খেই ধরে বলে, “আপনেরে দলনেতা করায় মোনেহয় তার হিসুন হইছিল।”
আবদুল খালেক ধীরে ধীরে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ায়।
জহিরসহ অন্যরা হতভম্ব হয়ে গেল। কেন কেউ কাউকে শুধু শুধু মেরে ফেলতে চাইবে? আবদুল খালেক দীর্ঘ সময় নিরব থেকে ধীরে ধীরে বলেন, “রকিব আমার সামনে আসো দাদাজান।”
রকিব দাদার সামনে আসে।
রকিব জানতো এই দিনটা একদিন আসবে। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি তা ও ভাবতেও পারে নি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। আবদুল খালেক বলেন, “একটা হাত দিয়ে অনেক কিছুই করা যায় না। অনেক পিছিয়ে থাকতে হয় অন্যদের চেয়ে। তোমার বাঁ হাতটা আমার ডান হাতে দাও। তোমার ডান হাতটা দিয়ে আমার বাঁ কনুই স্পর্শ করো।” রকিব ডান হাতে তার দাদার ঠুঁটো বাম কনুইটা ধরে, ওর শরীরের মধ্যে একটা শিরশির অনুভূতি তৈরি হয়। এর আগে কখনো সে দাদার কাটা হাতটায় স্পর্শ করেনি। কোনো মানুষ তার নিজের শরীরকে কীভাবে দেশের জন্য দিয়ে দিতে পারে? প্রাণের পর্যন্ত পরোয়া না করে পারে?
রকিবের বাম হাতটা নিজের অস্থিচর্মসার ডান হাতে নিয়ে আবদুল খালেক গভীর ভেজা কণ্ঠে বলেন, “আমারে তুমি কথা দাও দাদাজান আর কখনো তুমি, জগনু, সোলায়মান, ধীরেশ, পাপ্পুদের সাথে মিশবা না। কথা দাও দাদাজান।”
রকিব হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে। স্বপ্না চমকে যায়, তাহলে এতদিন আকারে ইঙ্গিতে তার শ্বশুর শাশুড়ি যা বলছে সেসব কি সত্যি? রকিব কি গাঁজাখোর হয়ে গেছে? জুয়া খেলে ও? নয়তো শ্বশুরের কথায় কাঁদছে কেন ছেলে?
রেহেনা বেগম এবার উঠে দাঁড়ান। বলেন, “আবু তুমি বোজো না কেন? তুমি আমাগোর ভবিষ্যত। তুমি যদি নষ্ট হও, সবাই নষ্ট হবে। বাড়িটা ধ্বংস হইয়া যাবে।”
রকিব এবার রুদ্ধ কণ্ঠে বলে, “আমি পারমু না দাদী, বিকাল হইলেই আমার শরীলের মধ্যে কেমন করে, মাথা খারাপ খারাপ লাগে।”
আবদুল খালেক নাতির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন, “দেশের জন্য আমি জীবনটা পর্যন্ত ছাড়তে রাজি ছিলাম, তুমি নিজের ভবিষ্যতের জন্য কুসঙ্গটাও ছাড়তে পারবা না!”
হঠাৎ রকিব বলে ওঠে, “পারবাম দাদাজান, পারবাম,” বলেই উঠানে রোদে শুকাতে রাখা জ্বালানির কঞ্চির একটা হাতে টেনে নেয়, আর সপাং করে নিজের হাতেই সজোরে বাড়ি মারে। দৌড়ে আসে স্বপ্না, “ও কি করস রে আবু,” বলে হাতটা টেনে নিয়ে দেখে রকিবের হাত থেকে দরদর করে রক্ত বের হচ্ছে। রকিবের চোখ এখন শুষ্ক। মালা এর মধ্যে ডেটল আর তুলো নিয়ে আসে। রেহেনা বেগম নাতির হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে বলেন, “আইজ বাড়িতে ভোট চাইবার আইছিলো, রাজাকার জলিল হকের নাতি, ইনসান হক। নামেই ইনসান, কামে কুবুদ্ধিতে এখনো তার দাদার মতোই রাজাকার। এরা নাইরকেল গাছের গিরগিট্টির মতোন যহন তহন রঙ পাল্টায়। এগোর একটাই দল, সুবিধাবাদীর দল। সুবিধামতোন নানান দলে গিয়া ভেড়ে। আইজ আমিলীগ, কাইল বিম্পি, পরশু জনতা পাট্টি, তরশু শ্রমিক পাট্টি। এগোর দিয়া সাবধান থাকতে হইবে আমাগোর। চিনতে হইবে এগোরে। নিজেরাই যদি পাও লকবকাও, ঠিক কইরা খাড়াইতে না পারো, এগোরে চিনবা কেমনে। তোমরা তো মুক্তিযোদ্ধার নাতি, দেশটারে পবিত্র মানুষের বাসযোগ্য করার জন্য আইজও তোমাগোর দাদা চেষ্টা করে। মন্দ মানুষে দেশ ভরা। মানুষ ঠিকমতোন না চললে, দেশের অবস্থা রসাতলে গেলে তোমাগোর দাদায় কষ্ট পায়। একলা একলা আগুনের জ্বালায় জ্বলে। রাজাকারের মতো দেশ সমাজ বা পরিবারের ক্ষতি হওনের কাম তোমাগোর মানায় না আবু।”
রকিব আড়চোখে দেখে দাদা নিজের কষ্ট লুকাতে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। মুখটাও যথাসম্ভব ওদের থেকে আড়াল করা। হঠাৎ রকিবের মনে হয় ওর দাদার শুকনো ঝুলঝুলে চামড়া ঢাকা শরীরটায় যেন বাংলাদেশের মানচিত্র ফুটে উঠছে, সেখানে অনেক দগদগে ক্ষত। রকিব নিজের আহত হাতের ব্যান্ডেজের উপরে হাত রাখে, উপর থেকেও ব্যান্ডেজটা আগুনের মত গরম লাগছে, ভিতরটা টসটস করছে যন্ত্রণায়। দাদার বুকের মধ্যেও কি এমন জখম সবসময় যন্ত্রণা দিচ্ছে? রকিব উঠে গিয়ে দাদার চোখে মুখে চোখ রাখে, সাদাটে ঘোলা দুই চোখে যেন দাদা স্বপ্ন দেখছে। কী সেই স্বপ্ন? সেই স্বপ্নকে অবয়ব দিতে পারছে না রকিব।
লেখক : কবি ও প্রফেসর
