মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. মো. ফজলুর রহমান খান
অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার
ষা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকজনাব মো. ফজলুর রহমান খান ১৯৩৩ সালের ১ মার্চ নেত্রকোণা সদর উপজেলার কুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা- ইদ্রিছ আলী খান, মাতা-ফজরেন্নেসা খানম।পরবর্তীতে তিনি নেত্রকোণা সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কাজী রোডে বসতি স্থাপন করেন। তিনি নেত্রকোণা সদর আসনের তিনবারের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে নেত্রকোণা চন্দ্রণাথ উচ্চ বিদ্যালয়, নেত্রকোণা-এর সাবেক প্রধান শিক্ষিকা হাবিবা রহমান খান শেফালী একাদশ জাতীয় সংসদের এমপি (সংরক্ষিত মহিলা আসন-১৭) ছিলেন।
শিক্ষা: বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মো. ফজলুর রহমান খান ১৯৪৯ সালে আঞ্জুমান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা, ১৯৫১ সালে নেত্রকোণা কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৬৩ সালে ঢাকা কলেজ থেকে মোক্তারশীপ এবং ১৯৭৪ সালে বার কাউন্সিল ঢাকা থেকে এডভোকেসি সনদ লাভ করেন।
রাজনৈতিক ও কর্ম জীবন: তিনি নেত্রকোণা মুসলিমলীগ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ১৯৫১ সালে নেত্রকোণা কলেজ ছাত্র সংসদ গঠিত হলে উক্ত সংসদের প্রথম নির্বাচিত ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৪৯ সালে আওযামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নে ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনের সম্মেলনে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সংগঠক এডভোকেট মো. ফজলুর রহমান খান ‘৭১ সালে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হন। ১৯৭৩, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য (১৯৯৬-২০০২) মনোনীত হন। ভাষা আন্দোলনে স্থানীয়ভাবে সক্রিয় ভুমিকার কারণে ১৯৫২ ১৯৫৩ সালে কারাবরণ করেন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পর ‘৫৪ সালে কারাবরণ, ‘মুক্তির পর একই সালে আবার কারাবরণ করেন । ‘৬৬ সালে ৬-দফা আন্দোলনের সময়ও কারাবরণ করেন। এরশাদ কর্তৃক সামরিক আইন জারির প্রথম দিন সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার ও ২ বৎসর কারাবরণ করেন।
সমাজসেবা: তিনি বহু স্কুল, কলেজহ ও মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। কুনিয়া ফজরেন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নেত্রকোণা চন্দ্রণাথ কলেজ,ইসলামপুর,নেত্রকোণা-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, চন্দ্রণাথ উচ্চ বিদ্যালয়, বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী সড়ক,ইসলামপুর, নেত্রকোণা ,জাহানারা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়, বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী সড়ক,ইসলামপুর, নেত্রকোণা ও আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং বারহাট্টা কলেজ ও মদনপুর শাহ সুলতান ডিগ্রি কলেজের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ২৭ মার্চ নেত্রকোণা আওয়ামী লীগ অফিসে নেত্রকোণার তৎকালীন মহকুমা আওয়ামীলীগ এর নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এডভোকেট ফজলুর রহমান খান, তার সম্মানীত সদস্য নির্বাচিত হন। নেত্রকোণা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও আটপাড়া মদন খালিয়াজুরী এলাকার এম.পি আব্দুল খালেক সাহেবকে আহবায়ক করে নেত্রকোণা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সকল নির্বাচিত এম.এন.এ তথা জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল মমিন, মোঃ জুবেদ আলী, সাদির উদ্দিন আহমেদ ও এম.পিগণ তথা প্রাদেষিক পরিষদ সদস্য আব্বাছ আলী খান,ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ,আব্দুল মজিদ তারা মিয়া, মোঃ হাদীস উদ্দীন চৌঃ, মোঃ নাজমুল হুদা সংগ্রাম পরিষদে অন্তর্ভূক্ত হন। তাছাড়া নেত্রকোণা পৌর চেয়ারম্যান এন আই খান,খালেকদাদ চৌধুরী,এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের, মোঃ মেহের আলী,মৌলানা ফজলুর রহমান খান, নুরু মিয়া,জামাল উদ্দিন আহমেদ, সাফায়েত আহম্মদ খান,মোঃ শামছুজ্জোহা, গোলজার হোসেন,গোলাম এরশাদুর রহমান, হায়দার জাহান চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হয় মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ । মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মো. ফজলুর রহমান খান ‘৭১ সালে বাঘমারা ক্যাম্পের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশ সংবিধানে স্বাক্ষরকারী একজন ঐহিতহাসিক মানুষ। আজীবন বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থেকে অসাম্প্রদায়িক ভাবে কাজ করেন। তিনি বহু স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সাথে জড়িত ছিলেন।
সাংস্কৃতিক সংগঠন: রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৬৩ সনের জানুয়ারি মাসে মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার উপদেষ্টা মন্ডলীর সম্মানীত সদস্য ছিলেন । মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার প্রধান উদ্যেক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী [১][২][৩][৪]কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মেলার পরিচালক হিসেবে ছিলেন জনাব এডভোকেট একে ফজলুল কাদের, আর উপদেষ্টা মন্ডলীতে ছিলেন- সর্বজনাব এন আই খান,জনাব আব্দুল খালেক, জনাব খালেকদাদ চৌধুরী, ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত ,মাওলানা ফজলুর রহমান খান,হাবিবুর রহমান খান প্রমুখ। জনাব মেহের আলী শামসুজ্জোহা[৫]কে আহ্ববায়ক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আয়েশা খানমকে আহ্ববায়িকা করে কমিটি গঠন করে দেন। নেত্রকোণা মধুমাচি কচিঁ কাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠায় তিনি যুক্ত থেকে শিশুদের মাঝে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের বিকাশ ঘটিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। ২০০৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নেত্রকোণার লৌহমানব এ বর্ণিল রাজনৈতিক মানুষটি মৃত্যৃবরণ করেন।
পুরষ্কার ও সম্মানণা: ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute [৬] [৭][৮][৯] Silver Award-2023” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়।
অধ্যাপক ননী গোপাল সরকারের প্রবন্ধসমূহ:
বাউল কবি রশিদ উদ্দিন: বাউলদের বাউল
নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস
লোক-সাহিত্য ও সংস্কৃতি লোককবি নগেন সরকার
একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক ভাষা সৈনিক সানাউল্লাহ নূরী
বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোঃ নুরুল ইসলাম খান (এন আই খান)
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. মো. ফজলুর রহমান খান
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম ফজলুল কাদের
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাছ আলী খান
তথ্যসুত্রঃ
- Chowdhury, Bir Muktijudha Khalekdad (Bangla academy and Ekushe Award winner 1985),“Shatabdir Dui Diganta (in Bengali)”. Dhaka.
- Nuri, Journalist Bhasha Sainik Sanaullah(Ekushe Award winner, Editor-Daily Dinkal) (25 June 1994). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali in Netrakona”. The daily Dinkal. p. 6.
- Khan, Bir Muktijudha Ashraf Ali Khoshru(Ex-Minister,23 May 2005). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Ittefaq. p. 8.
- সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৩ ডিসেম্বর ২০২২),” স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৩-৩৮
- বিশ্বাস, সাংবাদিক প্রিয়ঙ্কর(২৩ ডিসেম্বর ২০২২), “মুক্তিযোদ্ধার আত্মকথা: বীর মুক্তিযোদ্ধা মো:শামছুজ্জোহা, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৯৩-১০০
- চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান(সহ-সভাপতি, নেত্রকোণা ক্লাব),“মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় অতন্দ্র,প্রহরীঃ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ইনস্টিটিউট, অস্ট্রেলিয়া”, নেত্রকোণা জার্নাল,২৪/১০/২০২৩
- বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু আক্কাস আহমেদ(সভাপতি-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),“শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা- ২০২২”, Rajdhani TV, 04/10/2023
- কবি তানভীর জাহান চৌধুরী(সা:সম্পাদক-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),“নেত্রকোণায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের(মরণোত্তর) সম্মাননা — ২০২২ প্রদান” দৈনিক একুশে নিউজ ২/১০/২০২৩
- কবি তানভীর জাহান চৌধুরী(সা:সম্পাদক-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),“নেত্রকোণায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের(মরণোত্তর) সম্মাননা — ২০২২ প্রদান” দৈনিক একুশে নিউজ ২/১০/২০২৩
