মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার

১৯২৬ সালের ১৫ অক্টোবর গ্রাম হাটনাইয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। পিতার নাম মরহুম আহমেদ হোসাইন তালুকদার এবং মাতা ছিলেন মরহুম আয়েশা আক্তার চৌধুরী।

শিক্ষা জীবন: তিনি সহিলদেও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। অতপর নেত্রকোণা আঞ্জুমান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি এবং ময়মনসিংহ মৃত্যুঞ্জয় হাই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেমান পাসের পর আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে ঢাকা মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল থেকে ডাক্তারী বিদ্যা পাস করেন।  ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এঁর সুযোগ্য সহধর্মিণী মিসেস হোসনে আরা চৌধুরী এবং তাঁর তিন পুত্র ওবায়দুল হাসান (পরবর্তীকালে মাননীয় বিচারপতি), সাজ্জাদুল হাসান (পরবর্তীকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব) এবং সাইফুল হাসান সোহেল (পরবর্তীকালে গ্রামীণ ফোনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা)

কর্ম জীবন: শিক্ষা জীবন সমাপ্তির পর একজন ডাক্তার হিসেবে তিনি সরকারি চাকুরীতে নিযুক্ত হন। ঘুরেছেন বিভিন্ন হসপিটাল এবং চ্যারিটেবল ডিস্পেনসারিতে। রোগে-শোকে কাতর মানুষের পাশে একজন ডাক্তার হিসেবে তাঁর সেবা আজও ভাটি-বাংলার মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।

রাজনৈতিক জীবন: পরাধীন আমলে মানুষের রোগ মুক্তির পাশাপাশি তিনি তাদের রাজনৈতিক মুক্তিও কামনা করতেন। আর যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সত্তরে নির্বাচনের ডাক দিলেন, তখন বঙ্গবন্ধু প্রেমিক ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ সাথে সাথে সরকারি চাকুরী ছেড়ে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। উল্লেখ্য ১৯৬৯ সালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং নেত্রকোণার আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল খালেক সহযোগিতায় আঙয়ামীলীগ পরিবারের সদস্য হয়েছিলেন। শুরু হয় তাঁর জীবনে রাজনীতির নতুন অধ্যায়।বঙ্গবন্ধু ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত মোট ৬ বার নেত্রকোণায় এসেছিলেন- দলীয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে। একবার ভাটি-বাংলার প্রাণকেন্দ্র মোহনগঞ্জে (only once)বঙ্গবন্ধুর আগমন উপলক্ষে যাঁরা বঙ্গবন্ধুর পাশে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ অন্যতম। তিনি বঙ্গবন্ধুকে ধ্যানে-জ্ঞানে-আদর্শ- নৈতিকতায় মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করতেন।১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে বাঙালি ছাত্র-জনতার অগ্নিঝরা আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী আয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার স্থলাভিষিক্ত হয় কুখ্যাত নরখাদক জেনারেল এহিয়া খান। শেষ পর্যন্ত ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে একযোগে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ঘোষণা করা হয়- Legal Frame Work order (আইনগত কাঠামো আদেশ)’। এতে জাতীয় পরিষদে নেত্রকোণার জন্য ৩টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের জন্য ৬টি আসন নির্ধারিত। জাতীয় পরিষদে নেত্রকোণার ৩টি আসনে যথাক্রমে সর্বজনাব আব্দুল মমিন, জুবেদ আলী এবং এডভোকেট সাদির উদ্দিন আহমেদ নির্বাচিত হন। আর প্রাদেশিক প্ররিষদের ৬টি আসনে নির্বাচিত হন যথাক্রমে – সর্বজনাব হাদিস উদ্দিন চৌধুরী, ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ, আব্বাস আলী খান, আব্দুল মজিদ তারা মিয়া এবং নজমুল হুদা। ইনারা সবাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সৈনিক এবং আওয়ামীলীগের নেতা ও সংগঠক।উল্লেখ্য, সত্তরের নির্বাচনে নেত্রকোণায় সবকটি আসনে আওয়ামীলীগ প্রার্থীরা শতাধিক সভায় বক্তব্য প্রদান করেন। ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ একজন সুবক্তাও ছিলেন। মোহনগঞ্জসহ ভাটি-বাংলায় বিভিন্ন সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিলে তিনি দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সকলে মিলে আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইস্তেহার এবং বঙ্গবন্ধুর আহবান তাঁরা গ্রামে-গ্রামে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: এদিকে ৭ই মার্চের ভাষণের পর বঙ্গবন্ধুর অনুসারি নেতা-কর্মীগণ প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পেয়ে যান। ভাষণে বঙ্গবন্ধু যা যা যেভাবে ইঙ্গিতে-অকপটে বলেছিলেন, তার ভিত্তিতে নেতা-কর্মীগণ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। নেত্রকোণাতেও শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি।২৭ মার্চ নেত্রকোণা আওয়ামী লীগ অফিসে নেত্রকোণার তৎকালীন মহকুমা আওয়ামীলীগ এর নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ তার সম্মানীত সদস্য নির্বাচিত হন।নেত্রকোণা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও আটপাড়া মদন খালিয়াজুরী এলাকার এম.পি আব্দুল খালেক সাহেবকে আহবায়ক করে নেত্রকোণা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সকল নির্বাচিত এম.এন.এ তথা জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল মমিন, মোঃ জুবেদ আলী, সাদির উদ্দিন আহমেদ ও এম.পিগণ তথা প্রাদেষিক পরিষদ সদস্য আব্বাছ আলী খান,,আব্দুল মজিদ তারা মিয়া, মোঃ হাদীস উদ্দীন চৌঃ, মোঃ নাজমুল হুদা সংগ্রাম পরিষদে অন্তর্ভূক্ত হন।তাছাড়া নেত্রকোণা পৌর চেয়ারম্যান এন আই খান,এডভোকেট ফজলুর রহমান খানখালেকদাদ চৌধুরী,এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের, মোঃ মেহের আলী,মৌলানা ফজলুর রহমান খান, নুরু মিয়া,জামাল উদ্দিন আহমেদ, সাফায়েত আহম্মদ খান,মোঃ শামছুজ্জোহা, গোলজার হোসেন,গোলাম এরশাদুর রহমানহায়দার জাহান চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হয় মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ ।

মোহনগঞ্জ এলাকার এমপি  ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এঁর নেতৃত্বে মোহনগঞ্জ আওয়ামীলীগের নেতা সর্বজনাব আব্দুল কদ্দুছ আজাদ, মীর্জা গণি, আমির উদ্দিন আহমেদসহ নেত্রকোণা মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলামএরশাদুর রহামান,মীর্জা তাজুল ইসলাম,রফিকুল ইসলাম, মন্তাজ উদ্দিন আরো কয়েকজন মিলে নৌকাযোগে মোহনগঞ্জের ভাটি এলাকার গ্রামে-গ্রামে ঘুরে-ঘুরে জনগণকে সংগ্রাম কমিটির সাথে ঐক্যবদ্ধ করেন। এ ক্ষেত্রে ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এর ভমিকা ছিলো অনবদ্য। ২৯ এপ্রিল’৭১ পাকিস্তানি আর্মি প্রথম নেত্রকোণায় প্রবেশ করে এবং ক্রমে খালিয়াজুরী থানা ব্যতীত সকল থানায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মী ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ভারতের মেঘালয় সীমান্তে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বাঘমারা, রংঢ়া, মহাদেও ও মহেশখলা এই চারটি স্থানে নেত্রকোণার মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রটিং ও ইউথ ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়। মহেশখলা ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী ও ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। তবে চৌধুরী সাহেব সুনামগঞ্জের এমপি বিধায় নেত্রকোণার ভাটি অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা রিক্রটমেন্টের মূল দায়িত্ব পালন করেন ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। ফলে মহেষখলা ক্যাম্পে আগত দু’লাখের উপর শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার গুরু দায়িত্ব পালন করতে হয় ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ ও তাঁর সহযোগীদেরকে। ১১ সদস্য বিশিষ্ট মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য যারা ছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব নেত্রকোণার ১. ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ(সভাপতি-জুন – ডিসেম্বর), ২. সুনামগন্জের(ধর্মপাশা) আব্দুল হেকিম চৌধুরী(সভাপতি-এপ্রিল – জুন),৩. এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের(নেত্রকোণা), ৪. বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, ৫. মোঃ মেহের আলী ( নেত্রকোণা সদর), ৬. ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত,(নেত্রকোণা সদর),৭. জনাব আব্দুল কুদ্দুস আজাদ(মোহনগঞ্জ), ৮. জনাব নুরুজ্জামান চিশতী(বারহাট্টা),৯. জনাব মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান,১০. জনাব ইনসান উদ্দিন খান(বারহাট্টা),  ১১. আব্দুল বারী তলুকদার(নেত্রকোণা সদর) । পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান । উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন -এমপি, নেত্রকোনার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক এমপি, কিশোরগঞ্জের এমপি আব্দুল কাদের, নেত্রকোনার হাদিছ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মহেষখলা হয়ে ইন্ডিয়া চলে যান এবং কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে মু্ক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্ত্ব পালন করতে থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন চৌহান মাঝে মাঝে মহিষখলা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন। ক্যাম্পের বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্যে বিভিন্ন কমিটি করে দেয়া হয়। সে সব উপ কমিটির সদস্য যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন সর্বজনাব – ধর্মপাশার শওকত আলী, মণীন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী, খালিয়াজুড়ির বিমলেন্দ্র রায় চৌধুরী, রাজাপুরের মহারাজ মিয়া, মোহনগঞ্জের প্রিন্সিপ্যাল তারা মিয়া, মহরম আলী, বিষ্ণুপুরের অক্ষয় কুমারসহ, বংশীকুন্ডার হামিদপুরের আলী আকবর, সানুয়ার বসন্ত দাশ গুপ্ত, মোহনপুরের দিলু মড়ল, রাফায়েল মাস্টার, বনগাঁর আব্দুল হক, কার্তিকপুরের রাইজুদ্দিন মেম্বার, মহিষখলার কালা মিয়া মড়ল, আব্দুর রশিদ, শ্রীপুরের সুধীর চন্দ্র হাজং, সুমাই গিরি,বারহাট্টার সেকান্দর নূরী, সাউদপাড়ার ইয়াকুব আলী পঞ্চায়েত, কালীপুরের শাহাব উদ্দিন মহালদার, মোহনপুরের কেনারাম হাজং, হরিপদ বানাই, রামপুরের ছমির ফকির প্রমুখ। পরবর্তীতে ক্যাম্পের কাজকে তরান্বিত ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা , অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে দ্রুত ট্রেনিংয়ের জন্যে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রতিটি থানা ও গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেয়া হয় । মহিষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয় মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। সর্বজনাব গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরী ছিলেন মুজিব বাহিনী নেত্রকোণা জোনের কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। আর তোরার নিকটস্থ খেরাপাড়া ছিল মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর। খেরাপাড়াতে ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ জোয়ারদার বাবুল নেত্রকোণার পক্ষে কর্মরত ছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ,শেরপুর,জামালপুর ও টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক। মুজিব বাহিনীর মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সর্বজনাব রুহুল আমীন  (নেত্রকোণা সরকারী কলেজের বর্তমান সিনিয়র প্রভাষক), মোহনগঞ্জের প্রাক্তন জাসদ নেতা গোলাম রব্বানী চৌধুরী, এ,কে,এম আশ্রাব আলী (আবুল কুরেশ) ও সচিব উজ্জ্বল কুমার দত্ত। কিছুদিনের জন্য শিবগঞ্জ রোডের স্বনামধন্য কৌতুকাভিনেতা সিরাজ উদ্দিন, মতিয়র রহমান তালুকদার ও মোস্তাফিজুর রহমান রেজভী ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। এখানেই এই ক্যাম্পে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরকে রিক্রুট করে উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সিনিয়রদেরকে দেরাদুন এর তান্ডুয়া আর জুনিয়রদের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুজিব বহিনীর প্রশিক্ষণ মুক্তিবাহিনী অপেক্ষা ভিন্নতর ছিল। মুজিব বাহিনী পরিচালনার জন্য সকল ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হতো তৃণমূলের কমান্ড স্ট্রাকচার। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। মুজিব বাহিনী ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের জয়লাভের পরিকল্পনার ফসল।”   মহেষখলা ক্যাম্পে নেত্রকোণার ব্যাংক টাকা সংগ্রহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। সেকান্দর নুরী ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে অহেতুক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন । নুরীর বিরুদ্ধে বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা,নির্যাতন,র্ধষন ও বহু লুটের অভিযোগ ছিল) । এক পর্যায়ে আওয়ামীলীগের অত্যন্ত সৎ ও নির্ভীক কর্মী জনাব মেহের আলীকে নুরীর লোকেরা হত্যা করে ।জনাব মেহের আলী ছিলেন নেত্রকোনা মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ও  মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য,নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি( বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন), জেলা শ্রমিকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নেত্রকোনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম স্থপতি, মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার প্রধান উদ্যেক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক এবং জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক’৭১পর্যন্ত।(ষাটের দশকে ছাত্রদের পর শ্রমিক ও কৃষক গোষ্ঠী সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল। এই দুটি গোষ্ঠী নেত্রকোণায় স্বাধিকার আন্দোলন,সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।) বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে একমাত্র শহীদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অন্যতম (সরকার নির্ধারিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংজ্ঞা অনুযায়ী) যিনি বীর মুক্তিমুযোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৭ই মে মহেষখলা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন কালে শহীদ হন । মুক্তিযুদ্ধের খরচ ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্যে জাতীয় প্রয়োজনে জয়বাংলা বাহিনীর প্রধান কোম্পানী কমান্ডার সাবেক আওয়ামীলীগের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মো: শামসুজ্জোহার নেতৃত্তে বীরমুক্তিযোদ্ধা  বুলবুল ইপিআর সদস্যসহ অন্যান্যদরকে নিয়ে অস্ত্রাগার ও নেত্রকোণার ন্যাশনাল ব্যাংকের Volt ভেঙ্গে টাকা পয়সা , সোনা  সংগ্রহ করেন (“মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনা” বইটিতে  সাবসেক্টর কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা  হায়দার জাহান চৌধুরী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন)। মেহের আলীকে হত্যার পরপরই বীরমুক্তিযোদ্ধা মো: শামসুজ্জোহা ও মোহনগঞ্জের আমীর উদ্দিন আহমেদকেও গ্রেফতার করা হয় হত্যার জন্যে। সৌভাগ্যক্রমে তারা প্রাণে বেচে যান। স্মরণীয় যে, স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৭ দিনের মধ্যে পরবর্তীকালে সেকান্দর নুরী নিহত হয়েছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, এটি ছিলো জনাব মেহের আলী হত্যার অনিবার্য পরিণতি। এরূপ প্রেক্ষাপটে উদ্ভত জটিল পরিস্থিতিকে ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ অত্যন্ত মেধা ও ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। এক্ষেত্রে ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এঁর নেতৃত্বের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। মহেষখলা ইয়ুথ ক্যাম্প অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালিত হয়েছিলো। বিশেষ করে নেত্রকোণা এবং সুনামগঞ্জের ভাটি এলাকার অগণিত মুক্তিযোদ্ধা এই ক্যাম্পের মাধ্যমে রিক্রটেড হয়েছিলেন। ক্যাম্প পরিচালকগণ এইসব বাছাইকৃত যুবকদেরকে বাঘমারা জনাব এন আই খান পরিচালিত ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিতেন। সেখান থেকে তাদেরকে তুরা জেলায় প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হতো। স্বল্প সময়ে এসকল কাজ সঠিকভাবে নিষ্পন্ন করা অবশ্যই কষ্ট সাধ্য ছিলো। মহেষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয়েছিলো মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। সেখানে একটি ট্রেনিং সেন্টারও খোলা হয়েছিলো। আনসার, পুলিশ, বিডিআর (বিজিবি) সমন্বয়ে জনাব মোবারক আলী খান একটি অস্থায়ী বাহিনী গঠন করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সেকান্দর নুরী, আনসার কমান্ডার দারগ আলী, আনসার ইন্সট্রাক্টর আ: হামিদ, আনসার কমান্ডার আলী ওসমান তালুকদার এবং আওয়ামীলীগ নেতা আ: জব্বার আনসারী সেখানে দায়িত্ব পালন করতেন। তবে বরাবরই সেকান্দর নুরী ছিলেন বিতর্কিত ও সন্দেহভাজন। এসকল ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন, নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনার গুরু দায়িত্ব পালন করেছিলেন ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এবং সহযোগী নেতৃবৃন্দ। বস্তুত তখন উত্তেজনা প্রশমনে সমন্বয়ের কোনো বিকল্প ছিলোনা; যখন মূল লক্ষ্য ছিলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। সাউথ গারোহিলের এই মহেষখলা ক্যাম্প থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। একদিকে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং এবং অপরদিকে ভাটি অঞ্চলসহ নেত্রকোণার বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ পরিচালনা করা ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য ও রসদ সংগ্রহের ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করতেন ক্যাম্প কমিটি। জলমগ্ন ভাটি এলাকায় পাক-আর্মিরা সহজে চলাফেরা করতো না। বস্তুত: এসব এলাকা মুক্তাঞ্চল হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে ছিলো। এই সকল এলাকার হাট-বাজার সপ্তাহ ভিত্তিতে ইজারা দিতেন ক্যাম্প কমিটি। ইজারার টাকা জমা নেওয়া এবং হিসাব রক্ষণ পূর্বক পরিচালনা ব্যয় নির্বাহ করাটাও একটি জটিল দায়িত্ব ছিলো। অপর একটি কাজ ছিলো ট্রাইব্যুনাল বিষয়ক। যে সকল রাজাকার-আলবদর বা পাক-আর্মিদের ধরে আনা হতো এদের বিচার কার্য ক্যাম্প কমিটি একটি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে পরিচালনা করতেন। এ প্রসঙ্গে ‘মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা’ গ্রন্থে বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। উল্লেখ্য জনাব  ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ খালেকদাদ চৌধুরীও ট্রাইব্যুনালের একজন সদস্য নিযুক্ত করেছিলেন। সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী ‘শতাব্দীর দুই দিগন্ত’ গ্রন্থে এবং নেত্রকোণা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি,নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”-এর লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দীর্ঘদিনের কমান্ডার,সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১, নেত্রকোণা জেলা- সহ-সভাপতি,মহেষখলা সাব-সেক্টরের ডেপুটি কমান্ডার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল- নেত্রকোণার সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার “মহেষখলা ক্যাম্প, ট্রাইবুনালের বিচারপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী” প্রবন্ধতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মহেষখলা ক্যাম্পের পরিচালনা কমিটির কার্যক্রমের বিবরণ দিয়েছেন যথা- প্রশাসনিক কার্যক্রম, শরণার্থীদের আগমন ও পুনর্বাসন, ত্রাণ বিতরণ, মুক্তিযোদ্ধা রিক্রটমেন্ট, দালাল ও অপরাধী বন্দীদের বিচার, রোগ-শোকে চিকিৎসা সেবা প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে। এ সকল কার্যক্রমে ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

গণআদালত: ১৬ই ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হয়। মহেষখলা থেকে বিজয় গর্বে নেতৃবৃন্দ ফিরে আসেন নেত্রকোণায় নিজ নিজ আবাস স্থলে। দেশে এসেও ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ বেশকিছু গুরু দায়িত্ব পালন করেন। ৯ই ডিসেম্বর নেত্রকোণা শত্রু মুক্ত হয়। ১২ই ডিসেম্বর গণআদালতের মাধ্যমে দালাল-রাজাকারদের বিচার কার্যে তিনি ছিলেন প্রধান বিচারক। উল্লেখ্য, মোহনগঞ্জ উপজেলায় দালাল-রাজাকারেরা অগ্নি সংযোগ, হত্যা, ধর্ষণসহ হিন্দু অধ্যুসিত মাইলোরা, দেওতান, দৌলতপুর, খুরশিমূল-এসব ৬টি গ্রামে পাঁচ শতাধিক হিন্দু বাড়িতে ব্যাপক লুটতরাজ করে এবং তাদের বসত-ভিটা দখল করে নেয়। এলাকায় তাদের বিচারের জন্য জোর দাবী উঠে। অবশেষে ১২ই ডিসেম্বর লোহিয়ার মাঠে (বর্তমানে শহীদ উসমান পার্ক) হাজারো জনতার উপস্থিতিতে ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ গণআদালতে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান, মীর্জা তাজুল ইসলাম, আমির উদ্দিন উক্ত গণআদালতে রাজাকার-আলবদরদের কৃত অমানবিক ও নারকীয় নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। উপস্থিত হাজারো জনতা চিৎকার করে তাদের মৃত্যুদন্ডের দাবী করেন। তখন গণআদালত থেকে ১৩ জন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হয়। এসব অপরাধীরা ছিলো-যথাক্রমে নজরুল শেখ, নরু শেখ, সম্রাট, আ: খালেক, নান্নু, নুরুল ইসলাম, লাল হোসেন, সব্দু মিয়া, ইব্রাহিম, চাঁন মিয়া এবং গিয়াস উদ্দিন। স্মরণীয় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই ছিলো প্রথম গণআদালত। এই বিচার কার্যের ৪৫ বছর পর ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এঁর সুযোগ্য পুত্র মাননীয় বিচারপতি জনাব ওবায়দুল হাসান শাহিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। মাননীয় বিচারপতি জনাব ওবায়দুল হাসান শাহিন এবং সিনিয়র সচিব জনাব সাজ্জাদুল হাসান সম্প্রতি তাঁদের লেখায় ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এঁর তথ্যবহুল ও জ্ঞানগর্ভ স্মৃতিচারণ করেছেন।

জীবনাবসান: মহান মুক্তিযুদ্ধে এইসব অবদান সামান্য একটি প্রবন্ধে লিখে শেষ করা যায় না। ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসীম সাহসিকতা ও দায়িত্ব পালনের জন্য ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন। ২০১২ সালের ২৮ আগস্ট এই মহান কর্মবীরের জীবনাবসান ঘটে !

পুরষ্কার ও সম্মানণা: মুক্তিযুদ্ধে অবদানের ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি সম্মাননা স্মারক ২০২২  প্রদান করা হয়।ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute Silver Award-2023” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়।

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকারের প্রবন্ধসমূহ:

বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকদাদ চৌধুরী

বাউল কবি রশিদ উদ্দিন: বাউলদের বাউল

নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর

লোক-সাহিত্য ও সংস্কৃতি  লোককবি নগেন সরকার 

একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক ভাষা সৈনিক  সানাউল্লাহ নূরী

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোনা

বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোঃ নুরুল ইসলাম খান (এন আই খান)

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. মো. ফজলুর রহমান খান

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম ফজলুল কাদের

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাছ আলী খান

অগ্নিযুগের সূর্য সৈনিকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী

স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী 

Scroll to Top