মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না-১

আহমেদ সামির

মুক্তিযুদ্ধে ১১ নং সেক্টরের অন্তর্গত মহেষখলা সাব-সেক্টর-১ তথা  মহেষখলা ক্যাম্প[১]টি ছিল  তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার অধীন। ভারতের সীমান্তঘেঁষা ও হাওরবেষ্টিত দুর্গম জনপদ হওয়ায় এটি ছিল মুক্তাঞ্চল। মহেষখলা ক্যাম্পটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিশালী ঘাঁটি।এই ক্যাম্পটি ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা জেলার মহেষখলা থানা ও বাংলাদেশ অংশের মহেষখলা মিলিয়ে।

নেত্রকোণা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি,নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”-এর লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দীর্ঘদিনের কমান্ডার,সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১, নেত্রকোণা জেলা- সহ-সভাপতি,মহেষখলা সাব-সেক্টরের ডেপুটি কমান্ডার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল- নেত্রকোণার সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার “মহেষখলা ক্যাম্প, ট্রাইবুনালের বিচারপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী[২]” প্রবন্ধতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনা কমিটির প্রশাসনিক কার্যক্রম, স্মরণার্থীদের আগমন ও পূনর্বাসনকরণ, ত্রাণ বিতরণ, মুক্তিযোদ্ধা রিক্রটমেন্ট, দালাল ও অপরাধী বন্দিদের বিচারের ব্যবস্থা, রোগ-শোকের বিবরণ ও চিকিৎসা সেবাসহ নানাবিধ কর্মকান্ডের একটি সুন্দর চিত্র অংকন করেছেন । তিনি মহিষখলা ক্যাম্পের কার্যক্রম সম্পর্কে লিখেছেন – “ মহিষখলা আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি পরিচালিত হতো সম্পূর্ণরূপে নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বদের দ্বারা, ভারত সরকার বা আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা এর দায়িত্ব নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কমিটিই এটির সম্পূর্ণ পরিচালনার কাজ করতো। মুক্তিফৌজ রিক্রট করা (ভর্তি) এবং তাদের আশ্রয় ও প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এ ক্যাম্প কমিটি চালাতো। ট্রেনিং পরিচালনার প্রাথমিক ব্যবস্থা ও তাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানো (তুরাতে) এবং ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে ফিরে আসার পর ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল, সিলেটের পশ্চিমাঞ্চলের অভ্যন্তরে আক্রমণ পরিচালনার জন্য নৌকা সংগ্রহ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সকল রকম দায়িত্ব সুষ্ঠভাবে পালন করতো এখানকার এই ক্যাম্প কমিটি ।নতুন ভর্তি করা মুক্তিফৌজদের ট্রেনিং সমাপ্তির পর প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা ক্যাম্প ছিলো। এখানেই তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থ সংগ্রহ, রিক্রট ও দেশের অভ্যন্তরে যোদ্ধাদের প্রেরণ, তাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শরণার্থীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপকমিটি গঠন করে বিভিন্ন সদস্যদের উপর ভার দেওয়া হতো। সে উপ কমিটিগুলো তাদের নির্বাচিত কার্য সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করতো। ক্যাম্প কমিটি প্রতিদিনই একবার কাজ পরিদর্শন এবং তাদের কাজের সমন্বয় সাধন করতো।“

প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ভাষা আন্দোলন [৩]ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার “মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”-প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদ গঠন সম্পর্কে লিখেছেন – “ ১১ সদস্য বিশিষ্ট মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য যারা ছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব নেত্রকোণার ১. ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ(সভাপতি-জুন – ডিসেম্বর), ২. সুনামগন্জের(ধর্মপাশা) আব্দুল হেকিম চৌধুরী(সভাপতি-এপ্রিল – জুন),৩. এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের(নেত্রকোণা), ৪. বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, ৫. মোঃ মেহের আলী(নেত্রকোণা সদর), ৬. ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত,(নেত্রকোণা সদর),৭. জনাব আব্দুল কুদ্দুস আজাদ(মোহনগঞ্জ), ৮. জনাব নুরুজ্জামান চিশতী(বারহাট্টা),৯. জনাব মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান,১০. জনাব ইনসান উদ্দিন খান(বারহাট্টা),  ১১. আব্দুল বারী তলুকদার(নেত্রকোণা সদর) । পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান । উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন -এমপি, নেত্রকোনার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক এমপি, কিশোরগঞ্জের এমপি আব্দুল কাদের, নেত্রকোনার হাদিছ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মহেষখলা হয়ে ইন্ডিয়া চলে যান এবং কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে মু্ক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্ত্ব পালন করতে থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন চৌহান মাঝে মাঝে মহিষখলা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন। ক্যাম্পের বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্যে বিভিন্ন কমিটি করে দেয়া হয়। সে সব উপ কমিটির সদস্য যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন সর্বজনাব – ধর্মপাশার শওকত আলী, মণীন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী, খালিয়াজুড়ির বিমলেন্দ্র রায় চৌধুরী, রাজাপুরের মহারাজ মিয়া, মোহনগঞ্জের প্রিন্সিপ্যাল তারা মিয়া, মহরম আলী, বিষ্ণুপুরের অক্ষয় কুমারসহ, বংশীকুন্ডার হামিদপুরের আলী আকবর, সানুয়ার বসন্ত দাশ গুপ্ত, মোহনপুরের দিলু মড়ল, রাফায়েল মাস্টার, বনগাঁর আব্দুল হক, বারহাট্টার সেকান্দর নূরী, কার্তিকপুরের রাইজুদ্দিন মেম্বার, মহিষখলার কালা মিয়া মড়ল, আব্দুর রশিদ, শ্রীপুরের সুধীর চন্দ্র হাজং, সুমাই গিরি,বারহাট্টার সেকান্দর নূরী, সাউদপাড়ার ইয়াকুব আলী পঞ্চায়েত, কালীপুরের শাহাব উদ্দিন মহালদার, মোহনপুরের কেনারাম হাজং, হরিপদ বানাই, রামপুরের ছমির ফকির প্রমুখ। পরবর্তীতে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠনের পর মহিষখলা সাব-সক্টরের অধীনে মহিষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয় মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। সর্বজনাব গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরী ছিলেন মুজিব বাহিনী নেত্রকোণা জোনের কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। আর তোরার নিকটস্থ খেরাপাড়া ছিল মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর। খেরাপাড়াতে ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ জোয়ারদার বাবুল নেত্রকোণার পক্ষে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ,শেরপুর,জামালপুর ও টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক। মুজিব বাহিনীর মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সর্বজনাব রুহুল আমীন  (নেত্রকোণা সরকারী কলেজের বর্তমান সিনিয়র প্রভাষক), মোহনগঞ্জের প্রাক্তন জাসদ নেতা গোলাম রব্বানী চৌধুরী, এ,কে,এম আশ্রাব আলী (আবুল কুরেশ) ও সচিব উজ্জ্বল কুমার দত্ত। কিছুদিনের জন্য শিবগঞ্জ রোডের স্বনামধন্য কৌতুকাভিনেতা সিরাজ উদ্দিন, মতিয়র রহমান তালুকদার , মোস্তাফিজুর রহমান রেজভী,সুলতান নুরী , খন্দকার আনিস, মনজুর উল হক ও নজরুল ইসলাম খানসহ আরো অনেকেই ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। এই ক্যাম্পেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরকে রিক্রুট করে উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সিনিয়রদেরকে দেরাদুন এর তান্ডুয়া আর জুনিয়রদের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুজিব বহিনীর প্রশিক্ষণ মুক্তিবাহিনী অপেক্ষা ভিন্নতর ছিল। মুজিব বাহিনী পরিচালনার জন্য সকল ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হতো তৃণমূলের কমান্ড স্ট্রাকচার। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। মুজিব বাহিনী ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের জয়লাভের পরিকল্পনার ফসল। মহিষখলা ক্যাম্প পরিচালনা কমিটি প্রতিদিনই একবার সবগুলো ইউনিটের কাজ পরিদর্শন এবং তাদের কাজের সমন্বয় সাধন করতো। মহিষখলায় (বাংলাদেশের এবং মেঘালয়ের মুক্তাঞ্চল) তখন লক্ষাধিক শরণার্থী। এখানকার ক্যাম্প পরিচালণা পর্ষদ নিজেরাই শরনার্থীরা জন্যে সকল ব্যবস্থা করতো। কোনরূপ বাইরের সাহায্য পাবার সুযোগ সেখানে ছিল না। পরবর্তীতে ক্যাম্পের কাজকে তরান্বিত ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা , অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে দ্রুত ট্রেনিংয়ের জন্যে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রতিটি থানা ও গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেয়া হয়।   

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার “মহেষখলা ক্যাম্প, ট্রাইবুনালের বিচারপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী” প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্পে ট্রাইবুনাল তথা আদালত গঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে লিখেছেন – “ মুক্তিযোদ্ধা রিক্রটিং কেন্দ্রটি ছিল মহিষখলা বাংলাবাজারের সন্নিকটে একটি বড় মজবুত টিনের চৌচালা ঘরে। এটি ছিল বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগের কার্যালয়। সেটাতেই রিক্রটিং কেন্দ্রের সমস্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় উপ-কমিটির কয়েকজন ট্রেনিং প্রাপ্ত ও আনসার কমান্ডারের উপর। মুক্তযোদ্ধাদের ভর্তি হওয়ার পর দুপুর বারোটায় প্রায় দু’মাইল দূরে অবস্থিত ইয়্যুথ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এই ঘরটির বারান্দায়ও রিক্রটিংয়ের কাজ চলতো সকাল ৯টা থেকে ৪টা পর্যন্ত। রিক্রটিং অফিসের কাজ দেখার জন্য ক্যাম্প কমিটির সদস্যদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে সেখানে যেতেন। ক্যাম্প কমিটির চেয়ারম্যান হেকিম চৌধুরী ও ডাঃ আকলাকুল হোসেন এম.পি সাহেব প্রায়ই সেখানে যেতেন। খালেকদাদ চৌধুরীকে ক্যাম্প কমিটির সদস্য করার পর তাকেও তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। খালেকদাদ চৌধুরী মহিষখলা আসার ও ক্যাম্প কমিটির সদস্য হওয়ার দু’দিন পরই তাকে সঙ্গে করে তারা রিক্রটিং অফিসে নিয়ে যান। বিকেল দু’টার পর তারা সেখানে যেতেন। তারা দ্বিতীয় দিন সেখানে যান। এর কার্য পদ্ধতি লক্ষ্য করেন নিরবে বসে। রিক্রটিং সেন্টারের প্রহরার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের ও তা রক্ষণাবেক্ষণের পরিচালক ছিলেন একজন আনসার কমান্ডার। ঐদিন খালেকদাদ চৌধুরী বসে বসে যখন রিক্রটিং এর কাজ দেখছেন এমন সময় প্রহরারত আনসার কমান্ডার (যিনি তার পূর্ব পরিচিত এবং একজন ভাল নাম করা ফুটবল খেলোয়ার ছিলেন। বাড়ী ধরমপাশা। নেত্রকোণা মোহামেডাম টিমের সদস্য ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও সৈনিক ছিলেন। লোকটি খুবই বিশ্বস্ত এবং কর্তব্য পরায়ন) খালেকদাদ চৌধুরীর কাছে এসে কানে কানে বললেন যে, হাজতে বন্দী একটি ছেলে চৌধুরীর সাথে দেখা করতে চায়। সে নাকি উনাকে চেনে। জনাব চৌধুরী রিক্রটিং এর কাজ শেষ হওয়ার পর তাকে দেখবার কথা বলেন। এখানে যে একটি হাজত খানা আছে এবং বন্দীদের যে সেখানেই রাখা হয় তা খালেকদাদ চৌধুরী এই প্রথম জানতে পারেন এবং শুনে আশ্চর্য হন। চারটায় রিক্রটিং এর কাজ শেষ হতেই সভায় যাওয়ার জন্য সেখান থেকে চলে যান । দর্শণপ্রার্থী যুবকটির কথা মনেই হয়নি। ভিতরের বড় হলটি ছিল ধৃত শত্রু বা সন্দেহ ভাজন ও দালাল বলে কুখ্যাত বন্দীর হাজত খানা। বেশ কিছুদিন পর পর বিচারের জন্য এদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো বিএসএফ ক্যাম্পে। এখানেই সেই ঘরের সামনে সপ্তাহে একটি নির্ধারিত দিনে বাজার ব্যবস্থাপনা উপ-কমিটির বৈঠক বসত। নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার হাওড় ও মুক্তাঞ্চলে অবস্থিত হাট-বাজারগুলি ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রাধীন ছিল। সেখানকার স্থানীয় লোকেরা বাজার ডাকের নির্দিষ্ট দিনে এখানে এসে উপস্থিত হতো। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে তা নীলামে বিক্রী করা হতো। সর্বোচচ বিডারকে সে সপ্তাহেই সেই নির্দিষ্ট হাট-বাজারের টোল তোলা বা আদায়ের বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে তারা নির্ধারিত টাকা জমা দিয়ে দেয়। ইয়্যুথ ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের খরচের বেশীর ভাগই বাজারের এই আয় থেকে করা হয়। এছাড়া আওয়ামীলীগের কর্মীরা মুক্ত এলাকার নিজ নিজ থানায় ঘুরে ঘুরে চাঁদা সংগ্রহ করে এনে এখানকার অফিসে জমা দিয়ে যেতো। তাও ছিল বেশ আশাপ্রদ এবং তা ক্যাম্প পরিচালনার কাজে ব্যয় হতো। এগুলিই ছিল ইয়্যুথ ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের ব্যয় নির্বাহের অন্যতম প্রধান সহায়ক। খালেকদাদ চৌধুরী দু’দিন পর আবার সেখানে যান। কাজ শেষে চারটার দিকে ফিরে যাবার জন্য উঠবার উপক্রম করতেই আনসার কমান্ডার খালেকদাদ চৌধুরীকে সেদিনের যুবকটির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। খালেকদাদ চৌধুরী অন্যদের একটু অপেক্ষা করতে বলে দাঁড়ান। পাশের দরজা খুলে দেওয়া হয়। যুবকটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। খালেকদাদ চৌধুরী ব্যাপার কি জানতে চান। কান্না জড়িত কন্ঠেই তার পরিচয় দিয়ে বলে যে, সে আটপাড়া থানার একজন অধিবাসী। নুরী সাহেব তাকে ধরিয়ে এনে এখানে বন্দী করে রেখেছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে যে, সে নাকি একজন দালালের ছেলে এবং নেত্রকোণা ব্যাঙ্ক লুটের অনেক টাকা নাকি তার কাছে আছে এবং তার গ্রামেরই আর একটি ছেলেকে খুন করেছে। সে খালেকদাদ চৌধুরীকে চেনে। যে পরিচয় সে দিল তাতে জনাব খালেকদাদ চৌধুরী তাকে চিনলেন। তার বাবাকে ভাল করেই চেনেন। এদের সঙ্গে গ্রাম্য দলাদলিতে নিহত সেই ছেলের বাবা ছিলো তার বাবার প্রতিদ্বন্ধী। তবে খুনের সঙ্গে সে জড়িত ছিল কি না জানা ছিল না। বিষয়টি সম্বন্ধে ভালো করে জানবার চেষ্টা করার কথা বলে বিদায় হতে যাবেন এমন সময় আর একটি লোক (গাল ভরা দাঁড়ি) খালেকদাদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে চায়। সেও জনাব চৌধুরীকে চেনে। তাকে পূর্বেও দু’একবার দেখেছেন। কিন্ত তখন তার দাঁড়ি ছিল না। সে জনাব চৌধুরীদের গ্রামের তার এক প্রতিবেশী আত্মীয় বলে পরিচয় দেয়। সেই নাকি এই ক্যাম্প খোলার সময় থেকে একজন মুক্তিফৌজ হিসাবে আসে এবং এ পর্যন্ত অনেক কাজ তাকে করতে হয়েছে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা ও তার পরিচালনার কাজে সাহায্য করার জন্য। আন্তরিকভাবে ও সততার সঙ্গে সে তা করেছে। কিন্তু  কিছু দিন আগে তাকে নিরস্ত্র করে বন্দী করে রাখা হয়েছে। নুরী সাহেবের কাছে বিষয়টি জানবার কথা বলে বিদায় নিতে গেলে একটি বাড়ীর কথা উল্লেখ করে বললো যে, সেখানে তার মা আছেন। তাকে দেখে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। দু’তিন দিন পর তার মার সঙ্গে দেখা করে যে কথা শুনলেন তা সহজে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তবু রাতে শুবার সময় ডাক্তার সাহেবের (ডাঃ আকলাকুল হোসেন আহমেদ) কাছে ব্যাপারটা জানতে চাইলেন। তিনি যে কথা বললেন তা আনসার কমান্ডারের মার কথার সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে তাকে এ ব্যাপারে কিছু করা দরকার বলে মত প্রকাশ করায় তিনি বললেন যে, এ ব্যাপারে তিনিও চিন্তা ভাবনা করছেন এবং সেখানে যে সব অবাঞ্চিত ব্যাপার ঘটেছে তার বিস্তারিত বিবরণ দিলেন এবং এসব ভেবেই জনাব খালেকদাদ চৌধুরীকে আনার জন্য তিনি তার ভাতিজা বুলবুলকে পাঠিয়েছিলেন। নেতৃস্থানীয় আরো কয়েকজন এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে আলোচনা করেছেন। এরপর ডাঃ আকলাকুল হোসেন আহমেদ বললেন যে, খালেকদাদ চৌধুরীসহ অন্যান্যরা  আসায় তারা এখন এসব বন্ধ করার চেষ্টা নেবেন । ক্যাম্প কমিটির অনেকের মতও তাই। বেশ কিছুদিন পর ক্যাপ্টেন চৌহান একদিন এখানে এসে যান। তারা পরামর্শ করলেন যে, বাংলাদেশের অনেক লোককে দালালী ও লুটতরাজের অজুহাতে বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং এর সংখ্যা বর্তমানে কমে এলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। এদিকে হাজতেও স্থান সংকুলান হচেছ না। যখনই এরূপ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে ,তখনই বন্দী কিছু লোককে বিএসএফ এর হাতে বিচারের নামে সোপর্দ করে দেওয়া হতো। এরা ফিরে আসেনি কোনদিন। তবে সবার ধারণা যে, ওদের হত্যা করা হয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার ঐ প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্পে ট্রাইবুনাল তথা আদালত গঠনের বিষয়ে ক্যাপ্টেন চৌহানের সাথে বৈঠক সম্পর্কে লিখেছেন – “ তখন আলোচনা করে  সিদ্বান্ত নেওয়া হলো যে, ক্যাপ্টেন চৌহানকে সবাই মিলে অনুরোধ করে বন্দীদের  বিএসএফ-এর নিকট পাঠানোর আগে এদের সম্বন্ধে সত্যাসত্য জানবার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হবে। সেইদিনই বিকালে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তারা  ক’জন দেখা করেন। ডাঃ সাহেব, হেকিম চৌধুরী এবং আরও কয়েকজন তাতে প্রস্তাব জানালে ক্যাপ্টেন অল্পক্ষণ চিন্তা করেই বললেন যে, শুধু অনুসন্ধান নয় আপনারা এক কাজ করুন, একটি ট্রাইবুনাল গঠন করে তাদের বিচার সেই ট্রাইবুনালেই করবেন এবং আপনাদের রায়ই হবে চুড়ান্ত। এর মধ্যেই আপনারা ট্রাইবুনাল গঠন করে আমাকে(ক্যাপ্টেনকে) লিখিতভাবে জানান। আমি(ক্যাপ্টেনকে)  তা অনুমোদন করব। এরপর আরো কিছুক্ষণ অন্যান্য  ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করে তারা বিদায় হন। পরদিন ক্যাম্প কমিটির সদস্যদের এক সভা আহবান করা হয়, ট্রাইবুনাল গঠনের ব্যাপারে। একজন সদস্য মোহনগঞ্জের আওয়ামীলীগের সম্পাদক আঃ কদ্দুছ ট্রাইবুনালের সদস্য হিসেবে ডাঃ আখলাক হোসেন, আঃ হেকিম চৌধুরী ও খালেকদাদ চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন। ছাতকের এমপি শামসু মিয়া ও আরও একজন সদস্য তা সমর্থন করেন। সভায় কিছুক্ষণ নিরবতা অবলম্বন করে এক সময় হেকিম সাহেব বলেন, তিনি একাই ট্রাইবুনালের কাজ চালাবেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সদস্যরা আপত্তি করে। একজন তো বলেই ফেলে যে, এতবড় দায়িত্বপূর্ণ কাজ যাতে একটি লোকের জীবন মরণের প্রশ্ন তা একজনের উপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। তা ছাড়া ট্রাইবুনালের অর্থই হলো তিনজন নিয়ে গঠিত বিচারক মন্ডলী। তবুও হেকিম সাহেব তর্ক জুড়ে দেন। তখন সবাই এক বাক্যে প্রস্তাবের সমর্থন করায় তিনি চুপ করে যান। শেষটায় সর্বসম্মতভাবে এই প্রস্তাব হয় যে, ক্যাম্প কমিটির চেয়ারম্যানই পদাধিকার বলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান থাকবেন। এই প্রস্তাব করা হলে তাও যথারীতি সমর্থিত হয় ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার ঐ প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্পে ট্রাইব্যুনালের প্রথম অধিবেশন সম্পর্কে লিখেছেন – “ ট্রাইব্যুনালের প্রথম অধিবেশনের দিন ধার্য্য করা হয় এবং ক্যাম্প কমিটির অফিসেই তা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে অফিসের দ্বিতীয় ঘরে প্রতিদিনই একটি নির্দিষ্ট সময়ে ট্রাইব্যুনালের  অধিবেশন বসে। প্রথমেই হাজতে বন্ধীদের তালিকা প্রস্তত করা হয়। তাতে নাম,ঠিকানা, গ্রেফতারের কারণ ও তারিখ উল্লেখ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ প্রস্ততির পরই ৩ জন বন্দীকে ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে  সাহায্য আনার সুযোগে নাকি তারা লুট করেছে। এই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ । এরই জন্য এদের বন্দী করে রাখা হয়েছে। যার নির্দেশে তাদের বন্ধী করা হয় তিনি সেকান্দর নুরী, সেখানে নেই, সাক্ষীও নেই কেউ। তাদের মহেষখলাতেই অবস্থান করতে এবং ক্যাম্পে অন্য তিনজন সদস্যের নিকট থাকতে বলা হয়। তাদেরকে তাদের অভিযোগ থেকে প্রমাণের অভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তী কেসের আসামীকে হাজির করা হয়। বাদী সেকান্দর নুরী অনুপস্থিত। বাদীর বাড়ী আটপাড়া থানায়। অভিযোগ, সে এলাকায় লুটতরাজ করে এবং একজন লোককে হত্যা করেছে। জিজ্ঞেসিত হয়ে আসামী বলে যে, লুট সে করেনি মোটেই। তবে খুনের কথা সে অকপটে স্বীকার করে বলে যে, সে এসেছিল মুক্তিবাহিনীতে ভর্তি হতে। সেকান্দর সাহেব তাকে আটপাড়া থানার তিনটি দালাল খুন করার জন্য বলে এবং তাতে কৃতকার্য হলে তার পুরস্কার হিসাবে তাকে মুক্তিফৌজে ভর্তি করা হবে। তার উল্লেখিত তিনজন দালালের মধ্যে সবাইকে খালেকদাদ চৌধুরী চেনেন, বিশেষ করে হেদায়েত উল্লা ও মুজিবর রহমান  এ-দু’জন রাজকারদের নেতা, নেত্রকোণা শহরে পাকিস্তানীদের সাহায্যে জনগণের উপর অকথ্য উৎপীড়ন চালাচেছ। প্রাইমারী শিক্ষকটি নুরীর প্রতিবেশী। তার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা। লোকটি দালাল ছিল না বরং অন্যান্য প্রাইমারী শিক্ষকদের মত ছিল অসহযোগী ও মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে। বিষয়টি খালেকদাদ চৌধুরীরও জানা ছিল। তাকে কঠোর শাস্তি দেয়ার কথা বললে তৎক্ষণাৎ সে বলে যে, আপনারা এই মুহূর্তে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলুন। আমি একটুকুও কষ্ট পাব না। কিন্ত নুরীর (যার বিরুদ্ধে বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা,নির্যাতন,র্ধষন ও লুটের অভিযোগ ছিল।) হাতে আমাকে ছেড়ে দিবেন না। তার বিরুদ্ধেও কোন সাক্ষী প্রমাণ নেই। তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং সেদিনই মহিষখলা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।“

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী ঐ প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্পে ট্রাইব্যুনালের সবচেয়ে জটিল অধিবেশন সম্পর্কে লিখেছেন – “ এমনিভাবে বিচার চলাকালে খালেকদাদ চৌধুরী মাঝে মাঝে কয়েকজন লোককে ট্রাইব্যুনাল ঘরের সামনে দেখতে পান ঘোরা ফেরা করতে। ওরা এসে হেকিম চৌধুরী সাহেবের কাছে কি নিয়ে যেন আলাপ করে। মাঝে মাঝে ওরা উঠে গিয়ে ঘরের ভিতর তাদের(খালেকদাদ চৌধুরীদের) দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে। মনে হয় কি যেন ওরা কিছু বলতে চায়। কিন্তু সাহস করে  বলতে পারে না। খালেকদাদ চৌধুরীর মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ  দানা বেঁধে উঠে। এদের মধ্যে একজন তার কাছে পরিচিত বলে মনে হয়। একদিন হেকিম চৌধুরী সাহেবকে খালেকদাদ চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন, ওরা কারা ? কোথাকার লোক ? ওরা এত ঘন ঘনই বা আসে কেন ? জবাবে তিনি বলেন যে, তাদের একটা কেস আছে এবং এজন্য তারা আসে। খালেকদাদ চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন, কেস তালিকায় আছে ? তিনি জানান যে আছে। তা হলে ওদের কেসটা শেষ করে দেন না কেন ? তিনি বললেন যে, ওদের কেসটা খুব জটিল এবং দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ। আমি বললাম হোক না। কেসটা শুরু করলে তো ব্যাপারটা পরিস্কার হয় এবং রায়ও দেওয়া যায়। ওদের এই আসা যাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। তবু তিনি বলেন যে, শেষের দিকে এ কেসটা ধরা যাবে। খালেকদাদ চৌধুরী চুপ করে গেলেন। সেদিন রাতে খালেকদাদ চৌধুরী ডাঃ আখলাক সাহেবের কাছে ব্যাপারটা কি জানতে চাইলে তিনি সব কথা খুলে বললেন। ডাঃ সাহেব বলেন, এর পিছনে এক বিরাট রহস্য ও চক্রান্ত রয়েছে। চৌধুরী সাহেব নিজেও সে জটিলতায় জড়িত। তাই এই দীর্ঘ সূত্রিতা। খালেকদাদ চৌধুরী ডাঃ সাহেবকে বললেন, চলুন না আমরা এদের কেসটা ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য তারিখ নির্ধারণ করি। তিনি তাতে কেবল সম্মত নন খুব তাড়াতাড়ি তা শুরু করবার জন্য জোরও দেন। একমত হয়ে পরদিন ট্রাইব্যুনালে বসেই খালেকদাদ চৌধুরী এই কেসটার জন্য তারিখ নির্ধারণের কথা উঠান। হেকিম চৌধুরী সাহেব আবারও জটিলতার কথা তুলে তা আরো পরে শুরু করবার জন্য মত প্রকাশ করেন। তারা দু’জন তাকে অনেক বুঝান। অনেক কথাকাটির পর তারা দু’জন একমত হয়ে দৃঢ়তা প্রকাশ করায় শেষটায় হেকীম চৌধুরী সাহেব রাজী হন। সবাই এক সপ্তাহের মধ্যে কেসটা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। সেদিনও হাফেজ মতিয়র রহমান চৌধুরীসহ সেই লোকগুলো এসেছিল। ট্রাইব্যুনালের কাজ শেষ হওয়ার পর খালেকদাদ চৌধুরী তাদের  ঘরে ফিরে যান । খাবার পর বিশ্রামের জন্য খালেকদাদ চৌধুরী যখন শুয়ে আছেন, এমন সময় সেই লোকদের তিনজন খালেকদাদ চৌধুরীর কাছে আসেন। তিনি ওদেরকে ভিতরে ডাকেন। এদের একজনকে(হাফেজ মতিয়র রহমান চৌধুরী) তিনি যেন পূর্বেই কোথাও দেখেছেন। তাই তাদের বাড়ী কোথায়,ব্যাপার কি জানতে চান। লোকটি তথা মধ্যনগর থানা ও দুগনৈ গ্রাম মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের সদস্য মেহের আলীর সমন্ধী মতিয়ুর রহমান চৌধুরী যেন সাহস ফিরে পায় এবং বলে যে, সে খালেকদাদ চৌধুরীকে চেনে। সুনামগঞ্জে চাকুরী করার সময় খালেকদাদ চৌধুরীকে দেখেছে এবং কার্যোপলক্ষে একবার তাদের গ্রামেও গিয়েছিলেন। সেখানেও খালেকদাদ চৌধুরীকে দেখেছে। দিত্বীয়বার জনাব খালেকদাদ চৌধুরী সেখানে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী খালেকদাদ চৌধুরীর দুগনৈ গ্রামে গমন সম্পর্কে লিখেছেন, – “বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলীর নিহতের পর কোন একদনি খালেকদাদ চৌধুরী জনাব মেহের আলীর[৯] শ্বশুরের বাড়ীতে যান । মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আকিকুর রেজা জনাব চৌধুরীকে মেহের আলীর শ্বশুরের বাড়ী লুটের ঘটনাটি খুলে বলেন। উনাকে বলেন, কিভাবে তাদের বাড়ীর ও এলাকার মেয়েদেরকে লাঞ্চিত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়া ও সার্বিকভাবে সহায়তা করার অপরাধে কিভাবে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। এরই মধ্যে জনাব খালেকদাদ চৌধুরীর উপস্থিতির কথা জানতে পেরে শত শত লোক জনাব মেহের আলীর শ্বশুরের বাড়ীতে হাজির হয়। তারা তাদের প্রিয় নেতা মেহের আলীর হত্যার বিচার চায় এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবী করে। জনাব  চৌধুরী তাদের কথা ধৈর্য্য সহকারে শুনেন এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেন। জনাব চৌধুরী মেহের আলীর শ্বশুরের পরিবারের সদস্যবৃন্দসহ দুগনৈ গ্রামের এলাকাবাসীর প্রতি মুক্তিযোদ্ধারের থাকা খাওয়া ও ক্যাম্প পরিচালনায় বিভিন্ন ভাবে সহায়তার জন্যে ধন্যবাদ জানান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, আপনাদের অবদান জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। তাদের লুট হয়ে যাওয়া সম্পদ উদ্ধারের জন্যে তিনি সরবাত্তক চেষ্টা করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। পরবর্তীতে খালেকদাদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে মহেষখলা ক্যাম্পের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডাঃ আখলাক হোসেন, আব্দুল হেকিম চৌধুরীর সাথে কথা বলেন। তারা বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় লুটে যাওয়া কিছু সম্পদ ফিরিয়ে দেন। যার বর্নণা মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্যবৃন্দসহ উপরোল্লেখিত জাতীয় ব্যক্তিদের লেখা ও বক্তব্য এবং অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার সম্পাদিত গবেষণাধর্মি পত্রিকা “বিজয় একাত্ত্বরে” প্রকাশিত নেত্রকোণা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দীর্ঘদিনের কমান্ডার হায়দার জাহান চৌধুরীর লেখক প্রবন্ধ ” মহেষখলা ক্যাম্প ও মুক্তিসংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী এবং মেহের আলী প্রসংগ”-থেকে পাওয়া যায়।

লোকটি তথা হাফেজ মোঃ মতিয়ুর রহমান চৌধুরী বলে যে, “বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলীকে[১০] অন্যায়ভাবে হত্যা করার  পর একদিন ক’জন সশস্ত্র লোক (আনসার) ওদের এখানে যায় এবং তাদের ক্যাম্পের জন্য জিনিসপত্র দিতে বলে। তারা ভয় পেয়ে একশো মণ ধান দিয়ে দেয় এবং নিজেদের নৌকায় তা ক্যাম্পে পৌঁছিয়ে দেয়। তার সপ্তাহ দু’এক পর আরো বেশী সশস্ত্র লোক নিয়ে তাদের বাড়ী ঘেরাও করে এবং ধান চাল গরু ছাগল এবং বাড়ীর সমস্ত জিনিস আসবাবপত্র এক কথায় বাড়ীতে যা ছিলো সব নিয়ে যায়। তারা সঙ্গে এনেছিল বেশ কয়েকটি বড় নৌকা। প্রচুর ধান, কয়েকটি গরু, একটি বড় ষাঁড়সহ বাড়ীর যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে যায়। বাড়ীতে ঢুকেই আমাদের হাত পা বেঁধে ফেলে। ইতিমধ্যে বাড়ীর সমস্ত জিনিসপত্র নৌকায় বোঝাই করে বিকেলের দিকে তারা চলে যায়। গ্রামের লোকজন ভয়ে আগেই পালিয়ে যায়। “

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী  মেহের আলী সম্পর্কে লিখেছেন “ মেহের আলী ছিলেন আওয়ামীলীগের একজন অত্যন্ত সৎ ও নির্ভীক কর্মী এবং নেত্রকোনা মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য, মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা,

 
আহমেদ সামিরের প্রবন্ধসমূহ:

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না–৩

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব–৪

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব–৫

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব–৬

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব–৭

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব–৮

তথ্য সূত্রঃ

  1.  আহমেদ সামির (15 Jan 2026)” মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব-২
  2.  আহমেদ সামির (15 Jan 2026)” মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব
  3.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). নেত্রকোণার রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ মরহুম জননেতা আব্দুল খালেক এমপি”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা পৃষ্ঠা 01-06
  4.  আহমদ, ভাষা সৈনিক আজিম উদ্দীন (২০২২)। অসমাপ্ত গল্প। ঢাকা: অনির্বান পাবলিকেসন্স। পৃ. ২, ১২।
  5.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (03rd Jan 2026)”নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস”
  6.  Nuri, Sanaullah (25 June 1994). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali in Netrakona”. The daily Dinkal. p. 6.
  7.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(মে ২০২৩). নেত্রকোণার শহীদ মিনারের ইতিকথা, বিজয় একাত্তর সপ্তম সংখ্যা পৃষ্ঠা  ৮১
  8.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শিশু সংগঠন কচি-কাঁচার মেলা, বিজয় একাত্তর পৃষ্ঠা 129-132
  9.  Shamsusjuha, Md (25 June 1994). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Dinkal. p. 6.
  10.  Khan, Ashraf Ali  Khoshru (23 May 2005). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Ittefaq. p. 8.
  11.  রহমান, গোলাম এরশাদুর,” মুক্তি সংগ্রামে নেত্রকোনা”
  12.  ইসলাম, মঈনউল,” ‘মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনায় গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধন”, নেত্রকোনার সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস নেত্রকোনা, জেলা প্রশাসন
  13.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”, বিজয় একাত্তর ১১তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১-১২
  14.  জামান  ইন্জীনিয়ার (২৩ ডিসেম্বর ২০২২),” নেত্রকোনার শহীদ বুদ্ধিজীবিবৃন্দ”,বিজয় একাত্তর, পৃষ্ঠা ৮৫-৯২
  15.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(মে ২০২২),”শহীদ মেহের আলী একটি নাম, একটি ইতহিাস”, মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনা পৃষ্ঠা ২০২-২০৫
  16.  Khan, Motiur Rahman (18 May 2005). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Samachar.
  17.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(এপ্রিল ২০২২). “),”শহীদ মেহের আলী একটি নাম, একটি ইতহিাস,”, শহীদ মেহের আলীর সংক্ষিপ্ত জীবনী পৃষ্ঠা 1-3(সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১,নেত্রকোণা জেলা শাখা।)
  18.  চৌধুরী,বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান ( ১৪ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”, আলোরপথে ৫তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৫-২০
  19.  আচার্য, সাংবাদিক জয়ন্ত,( ১৪ ডিসেম্বর ২০২১),মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধীজীবিবৃন্দ” সাপ্তাহিক-২০০০ পৃষ্ঠা ২০-২৪
  20.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৩ ডিসেম্বর ২০২২),” স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী”,বিজয় একাত্তর, পৃষ্ঠা ১৩-৩৮
  21.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (ফেব্রয়ারী ২০২0),” নেত্রকোনা জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা ”, স্মরণে বঙ্গবন্ধু
  22.  খান, আলী আহাম্মদ আইয়োব,”নেত্রকোনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস”, গতিধারা
Scroll to Top