বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বুদ্ধিজীবী  প্রভাষক আরজ আলী  

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আহমেদ সামির

শহীদ বুদ্ধিজীবী  প্রভাষক আরজ আলী  মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নৃসংশভাবে নিহত হন। ২০২০ সালে তৎকালীন সরকার তাকে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

জন্ম : বীর মুক্তিযোদ্ধা  শহীদ  প্রভাষক আরজ আলী ১৯৪৫ সালে সুসঙ্গ দুর্গাপুরের নওয়াপাড়া গ্রামে আলী জন্মগ্রহণ করেন। তার এক ভ্রাতস্পুত্র  সনামধন্য গবেষক  জনাব মোঃ রফিকুল ইসলাম অধ্যাপনায় নিযুক্ত আছেন।

শিক্ষাজীবন : শহীদ আরজ আলী নওয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করে ভর্তি হন এন জারিয়া ঝাঞ্জাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৬১ সালে মাধ্যমিক ও নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয় থেকে বিএ এবং  ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনৈতিক কর্মজীবন : ১৯৬৫ সালে আইয়ুবের দোসর স্থানীয়  বিডি মেম্বারদের দুর্নীতি প্রতিরোধ করে তার সাহসিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় দেন। যতটুকু জানা যায়, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন থেকেই তিনি প্রচ্ছন্ন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সদস্য পদ লাভ করেন। তিনি ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ডাকসু ইকবাল হল শাখা সংসদে ১ নম্বর কার্যকরী সদস্য পদ অলংকৃত করেন। যে সংসদের ভিপি ছিলেন জননেতা তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধু প্রণীত ছয় দফার তিনি ছিলেন অন্ধভক্ত। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে শরীক হওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজ সংসদীয় এলাকায় ছয় দফা আন্দোলনের অন্যতম প্রচারক ও সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।  শিক্ষাজীবন শেষ করেই বেশ ক’জন সহপাঠী ও বন্ধুদের সাথে ১৯৬৮ সালে(প্রতিষ্ঠিত) ঈশ্বরগঞ্জ কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে তিনি নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন। এই দু’টো প্রতিষ্ঠানেই অধ্যাপনা করাকালে প্রভূত জনপ্রিয়তা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন সর্বমহলের। 

মুক্তিযুদ্ধে অবদান : দুর্গাপুরের প্রবীণতম বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব খলিফার বরাতে জানা যায় যে ১ মে ১৯৭১ তারিখে বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএ আমীর উদ্দীনের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এক গোপন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়, যে মিটিংএ অত্র সংসদীয় এলাকার এমএনএ, এমপিএ, থানা ও মহকুমা নেতৃবৃন্দের সাথে শহীদ  প্রভাষক আরজ আলীও উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকে তিনি অত্র এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহে, উদ্বুদ্ধকরণে এবং নিরাপদে ভারত গমনে তিনটি গ্রহনযোগ্য প্রস্তাব রাখেন। প্রস্তাব তিনটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলে এমএনএ এডভোকেট সাদির উদ্দীন আহমেদ শহীদ  প্রভাষক আরজ আলী আলীকে বলেন, ‘সমগ্র নেত্রকোণা জুড়ে আপনার ভক্ত ছাত্রসমাজ। আপনি ভেতরে থেকে খুবই কৌশলে ও নিরাপত্তার সাথে ছাত্র-তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধে পাঠাবেন। আমরা তাদেরকে গ্রহণ করে নেবো’। শহীদ  প্রভাষক আরজ আলী এ নির্দেশ সাদরে মেনে নেন এবং ভেতরে থেকে কাজ করতে থাকেন। এদিকে তার বাড়িতে কলেজ অধ্যক্ষ কর্তৃক কলেজে যোগদানের নোটিশ গেলে তিনি কলেজে এসে যোগদান করেন। কলেজের অবসরে তিনি ছাত্র-তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে চিরকুটসহ পাঠাতে থাকেন বাঘমারা, রংড়াসহ অন্যান্য ইয়থ ক্যাম্পগুলোতে। পথিমধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধা তার নওয়াপাড়ার বাড়িতে সাময়িক আশ্রয় নিয়ে ছদ্মবেশে সীমান্ত অতিক্রম করতেন। এরই এক পর্যায়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে পাকি কর্ণেল রাজ্জাক মির্জা তাকে নেত্রকোণা সেনানিবাসে তলব করে জানিয়ে দেন যে, তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ, তিনি যেন আগামী সাতদিন কোন অবস্থাতেই স্টেশন লিভ না করেন।  একদিনেই এ খবর পৌঁছে যায় আশেপাশের গুপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পগুলোতে। রাত্রিবেলায় ছদ্মবেশে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হান্নান ঠাকুর এসে হাজির হন প্রফেসরস মেসে। তিনি তাকে বলতে থাকেন, ‘আরজ তুমি ধরা পড়ে গেছো, তুমি এখনই চল আমার সাথে’। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, ‘এখন আর তা সম্ভব নয়, আমাকে ওরা না পেলে- বাড়িতে আমার মা, ভাই-ভাবী ও ছেলেমেয়েদের মেরে ফেলবে, আমার কলিগদের নির্যাতন করবে, আমি তো তা হতে দিতে পারি না’। 

১২ আগস্ট পাক বাহিনী তাকে বন্দী করে নিয়ে যায় পিটিআই ক্যাম্পে। ও দিকে তার গ্রামের বাড়ি লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়।  তার মা ছাড়া অন্য সকলে দিক্বিদিক ছুটতে থাকে নিরাপদ আশ্রয়ে।  মুক্তিযোদ্ধাদের নাম-তালিকা উদ্ধারের জন্য দু’দিন ধরে তার উপর চলে নির্যাতন। ১৪ আগস্ট চোখ বেধে- ট্রেনে করে শ্যামগঞ্জ হয়ে তাকে নিয়ে আসে জারিয়া স্টেশনে।  সেখান থেকে গয়না নৌকায় কংস-সোমেশ্বরী হয়ে নিয়ে আসে বিরিশিরি সেনাক্যাম্পে। ক্যাম্প ইনচার্জ মেজর সুলতান প্রথম দু’দিন তার সাথে অতিথির ন্যায় আচরণ শুরু করেন এবং তাকে প্রস্তাব দেন, তিনি যেন তার সমস্ত অনুসারীদের নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে চলে আসেন, বিনিময়ে তিনি পাবেন অগাধ সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা। প্রফেসর আরজ এ প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন। এদিকে পাকি দোসরেরা ব্যাংকে জমানো ৩২ হাজার টাকা প্রাপ্তির জন্য চেকে শহীদ  প্রভাষক আরজ আলীর সই নিয়ে নেয়। বিস্মিত পাকি মেজর ১৬ আগস্ট বিকালে প্রহসনের খেলা শুরু করে। শহীদ  প্রভাষক আরজ আলীকে ছেড়ে দিয়ে এক কিলোমিটার দূর থেকে আবার ফেরত আনে। সন্ধ্যায় তার জীবনের শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে- শহীদ  প্রভাষক আরজ আলী ওজুর জন্য পানি চান। তিনি অজু শেষ করে নামাজ পড়ে নেন। রাত দশটার দিকে সোমেশ্বরী নদীর লিচুবাগান ঘাটের পাশে তাকে হাজির করা হয়। মেজর সুলতান উচ্চস্বরে বলছে, ‘প্রফেসর, এখানে তোমাকে মেরে ফেলার জন্য হাজির করেছি, এখনো সময় আছে, তুমি যদি একবার পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলো, তাহলে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। ‘শহীদ  প্রভাষক আরজ আলী ঘৃণাভরে মেজর  সুলতানের মুখে থুতু ছিটিয়ে বলতে থাকেন, ‘এর চেয়ে মৃত্যুই আমার কাছে শ্রেয়’। এরপর পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলানোর জন্য তার উপর ২৯ বার চালানোহয় বেয়োনেট। কিন্তু তিনি প্রতিবারই নাকি বলেছিলেন জয়বাংলা। সমস্ত পৈশাচিক প্রয়াস ব্যর্থ হলে-পরাস্ত মেজর শহীদ  আরজ আলী আরজের বুকে গুলি ছুড়ে। শহীদ  প্রভাষক আরজ আলী আর্তনাদ করে বলে উঠেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি স্বাধীন করো সোনার বাংলা’।

মৃত্যুঃ ১৯৭১ সালের ১৩ আগস্ট পাক সেনারা তাকে আটক করে, এরপর ১৬ আগস্ট তাকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেয় 

পুরষ্কার সম্মানণা :  ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য অবদান ও মুক্তিযুদ্ধে জীবন বিসর্জনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের  ”ডাক বিভাগ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এ  বুদ্ধিজীবীর ছবি দিয়ে স্মারক ডাক টিকিট প্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধে জীবন বিসর্জনের জন্য “বিজয় একাত্তর সম্মানা-২০২২” প্রদান করা হয়। নেত্রকোণা সরকারী কলেজ তার নামে একটি লাইব্রেরীর নামকরণ করে “শহীদ বুদ্ধিজীবী আরজ আলী গ্রন্থাগার এবং দর্শন বিভাগে শহীদ বুদ্ধিজীবী আরজ আলী সেমিনার কর্নার”। ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute Silver Award-2026” সম্মাননা প্রদানের জন্যে তাকে মনোনীত করা হয়।

Scroll to Top