বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী

আহমেদ সামির

জাতীয় সাহিত্যিক বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত লেখক জনাব খালেকদাদ চৌধুরী ও বেগম হামিদা চৌধুরীর কণিষ্ট পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক হায়দার জাহান চৌধুরীর জন্ম ৭ জুলাই ১৯৫০ ইং মসজিদ কোয়ার্টার নেত্রকোণাতে। ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যা সন্তানের পিতা হায়দার জাহান চৌধুরী।

শিক্ষাজীবন: নেত্রকোণা দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যট্রিক, নেত্রকোণা সরকারী কলেজ থেকে বিএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস এম এ ২য় বর্ষ ছাত্র অবস্থায় বাংলাদেশ রেডক্রস এর ইউনিট অফিসার হিসাবে চাকুরিতে যোগদান করেন। স্কুল জীবন থেকেই শিশু সংগঠন কচিকাঁচা মেলার সদস্য হিসাবে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতি ও খেলাধুলার মাধ্যমে কিশোর ও যৌবনের দূরন্তপনার মধ্য দিয়ে তার পথ চলা শুরু ।১৯৬৩ সনের জানুয়ারি মাসে কিংবদন্তী ছাত্রনেতা জনাব মেহের আলীর হাতে গড়া সংগঠন মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার  আহ্বায়ক হিসাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে গুণগত মান অর্জনের পাশাপাশি খেলাধুলায় বিশেষ করে একজন চৌকস ফুটবলার হিসাবে আন্তঃস্কুল, আন্তঃকলেজ ও আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টগুলোতে অংশগ্রহন করেন। এছাড়া ঢাকা ও ময়মনসিংহ ফুটবল লীগে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে অংশগ্রহন। একজন খ্যাতিমান ফুটবল খেলোয়ার হিসাবে তৎকালিন মহকুমা ও জেলার গন্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সুনাম অর্জন করেছেন।

রাজনৈতিক জীবন: ৬০ ও ৭০ দশকের ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় খেলাধুলার জীবনের অনেকটা ভাটা পরে যায়। নেত্রকোণা কলেজের ছাত্র অবস্থায় হায়দার জাহান চৌধুরী ৬০ দশকের ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রলীগের হয়ে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন সহ তৎকালিন পাকিস্তানের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একজন বলিষ্ট ছাত্রকর্মী হিসাবে নেত্রকোণার ছাত্র আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।১৯৬২ সালে নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে হায়দার জাহান চৌধুরীর রাজনীতির পথ চলা শুরু হয়। ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যান্য সদস্য যারা ছিলেন তারা হলেন সভাপতি  জনাব মেহের আলী ও সেক্রেটারী জনাব শামসুজ্জোহা,জনাব জামাল উদ্দিন আহম্মেদ, বিপ্লব চক্রবর্তী, মতিয়র রহমান খান, শহিদ উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল ওয়াহেদ, আ: মান্নান, আব্দুর রহমান, আলাউদ্দিন খান, আশরাফ আলী খান খসরু, ধীমান রঞ্জন বিশ্বাস (ভারত প্রবাসী)(জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন)।১৯৬৪ সালে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে প্রথম শহীদ মিনারের অন্যতম স্থপতিও  হায়দার জাহান চৌধুরী । সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু দত্ত উচচ বিদ্যালয়ের উত্তর পশ্চিম কোণে কাচারি রোডের সংযোগস্থলে তিন রাস্তার মোড়ে বর্তমান শহীদ মিনারের প্রধান গেইটের জায়গায় তৎকালীন নেত্রকোণা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সর্বজনাব মেহের আলী(জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন), প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী শামসুজ্জোহা, জামাল উদ্দিন আহমেদ( জনাব মেহের আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাবার পর সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়),  মতিউর রহমান খান,আশরাফ আলী খান (খসরু),গাজী মোশারফ হোসেন, হাবিবুর রহমান খান(খসরু),সাখাওয়াত হোসেন এর নেতৃত্বে প্রথম শহীদ মিনারটি স্থাপিত হয়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ৫০ পূর্ব বাংলার রাজনীতি ছিল মূলত আঞ্চলিক দশকে স্বায়ত্বশাসনের দাবীকে কেন্দ্র করে। যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৬ দফা দাবীর মধ্যে দিয়ে। ৬ দফা ও ১১ দফা দাবীর ভিত্তিতে গড়ে উঠা ছাত্র আন্দোলন, গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। এবং পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের মুক্তি ও ৭০ এর নির্বাচন এর প্রতিটি আন্দোলনে নেত্রকোণার ছাত্রলীগ নেতা হিসাবে হায়দার জাহান চৌধুরীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আজও অম্লান।

কর্মজীবন: মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে বিভিন্ন সামাজিক, সংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত থেকে সমাজ উন্নয়নে কাজ করেছেন। তিনি এখনো এসব কজে নিজেকে জড়িত রেখেছেন। নেত্রকোণা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার হিসাবে দীর্ঘদিন মুক্তিযোদ্ধাদের খ্যাতি অর্জন। জীবন মান উন্নয়নে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে জেলা প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছেন এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি জেলা ইউনিটের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া নেত্রকোণা জেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি হিসাবে দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন । নেত্রকোণার বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন অসংগতি, অনাচার, অত্যাচার, নির্যাতনসহ সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করছেন। তিনি নেত্রকোণা সাধারণ গ্রন্থাগারের দীর্ঘ নয় বছর (১৯৯০-৯৮) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নেত্রকোণা সামাজিক সংগঠন জন উদ্যোগ এর নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসাবে জনগণের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে জনগণের চাহিদা ও প্রত্যাশা পুরনে উদ্যোগ গ্রহনের মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ সহ-নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ, নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ নির্মূল, মাদক ও দুর্নীতি মুক্ত সমাজ ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনে একজন নির্ভীক কর্মী হিসাবে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজে হায়দার জাহান চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।তিনি নেত্রকোণা উন্নয়নে নাগরিক আন্দোলন এর একজন সক্রিয় সদস্য হিসাবে নগর ও নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জেলার বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সেবা মূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে নিজকে জড়িত রেখে সমাজ সেবা মূলক কর্মকাণ্ড সহ জেলার সর্বিক উন্নয়নে কাজ করছেন ।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে তৎকালিন নেত্রকোণা মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে নেত্রকোণা স্বাধীনতাকামি ছাত্র যুবকদেরকে সংগঠিত করে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চালিকা শক্তি ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসাবে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে সময়ের সাহসী সন্তান হিসাবে হায়দার জাহান চৌধুরী স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। ১লা মার্চ ‘৭১ থেকে শুরু হওয়া স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নেত্রকোণার ছাত্র জনতার সশস্ত্র মিছিলে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে নিরস্ত্র আন্দোলনকে সশস্ত্র আন্দোলনে রূপদান করতে গিয়ে হায়দার জাহান চৌধুরী যথাযথ ভাবে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। ২৭ মার্চ নেত্রকোণা আওয়ামী লীগ অফিসে নেত্রকোণার তৎকালীন মহকুমা আওয়ামীলীগ এর নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। হায়দার জাহান চৌধুরী তার সম্মানীত সদস্য নির্বাচিত হন। নেত্রকোণা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও আটপাড়া মদন খালিয়াজুরী এলাকার এম.পি আব্দুল খালেক সাহেবকে আহবায়ক করে নেত্রকোণা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সকল নির্বাচিত এম.এন.এ তথা জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল মমিন, মোঃ জুবেদ আলী, সাদির উদ্দিন আহমেদ ও এম.পিগণ তথা প্রাদেষিক পরিষদ সদস্য আব্বাছ আলী খান,ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ,আব্দুল মজিদ তারা মিয়া, মোঃ হাদীস উদ্দীন চৌঃ, মোঃ নাজমুল হুদা সংগ্রাম পরিষদে অন্তর্ভূক্ত হন। তাছাড়া নেত্রকোণা পৌর চেয়ারম্যান এন আই খান,এডভোকেট ফজলুর রহমান খান, খালেকদাদ চৌধুরী,এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের, মোঃ মেহের আলী,মৌলানা ফজলুর রহমান খান, নুরু মিয়া,জামাল উদ্দিন আহমেদ, সাফায়েত আহম্মদ খান,মোঃ শামছুজ্জোহা, গোলজার হোসেন,গোলাম এরশাদুর রহমান, সমন্বয়ে গঠিত হয় মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ ।

পরবর্তীতে জয়বাংলা বাহিনী গঠন ও পুলিশ অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে সশস্ত্র মুক্তিবাহিনী গঠন, সেই সাথে স্বাধীনতার ইসতেহার বিতরণসহ সীমান্ত এলাকায় ইপিআর ক্যাম্পগুলো বাঙ্গালী সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণে এনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করানো, মুক্তিযুদ্ধের সুচনালগ্নে এসব দু:সাহসীক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন । পরবর্তীতে তিনি ছাত্রলীগ নেতা হিসাবে ভারতের দেরাদুন ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিশেষ গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে ১১ নং সেক্টরে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) মুজিব বাহিনীর মহেষখলা সাবসেকটরের ডেপুটি কমন্ডার হিসাবে ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকে সংঘঠিত করে দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধে রূপান্তরিত করার মহান দায়িত্ব পালনসহ হানাদার বাহিনীর বিরোদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন । মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য যারা ছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব নেত্রকোণার ১. ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ(সভাপতি-জুন – ডিসেম্বর), ২. সুনামগন্জের(ধর্মপাশা) আব্দুল হেকিম চৌধুরী(সভাপতি-এপ্রিল – জুন),৩. এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের(নেত্রকোণা), ৪. বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, ৫. মোঃ মেহের আলী ( নেত্রকোণা সদর), ৬. ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত,(নেত্রকোণা সদর),৭. জনাব আব্দুল কুদ্দুস আজাদ(মোহনগঞ্জ), ৮. জনাব নুরুজ্জামান চিশতী(বারহাট্টা),৯. জনাব মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান, ১০. জনাব ইনসান উদ্দিন খান(বারহাট্টা),  ১১. আব্দুল বারী তলুকদার(নেত্রকোণা সদর) । পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান । উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন -এমপি, নেত্রকোনার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক এমপি, কিশোরগঞ্জের এমপি আব্দুল কাদের, নেত্রকোনার হাদিছ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মহেষখলা হয়ে ইন্ডিয়া চলে যান এবং কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে মু্ক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্ত্ব পালন করতে থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন চৌহান মাঝে মাঝে মহিষখলা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন। ক্যাম্পের বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্যে বিভিন্ন কমিটি করে দেয়া হয়। সে সব উপ কমিটির সদস্য যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন সর্বজনাব – ধর্মপাশার শওকত আলী, মণীন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী, খালিয়াজুড়ির বিমলেন্দ্র রায় চৌধুরী, রাজাপুরের মহারাজ মিয়া, মোহনগঞ্জের প্রিন্সিপ্যাল তারা মিয়া, মহরম আলী, বিষ্ণুপুরের অক্ষয় কুমারসহ, বংশীকুন্ডার হামিদপুরের আলী আকবর, সানুয়ার বসন্ত দাশ গুপ্ত, মোহনপুরের দিলু মড়ল, রাফায়েল মাস্টার, বনগাঁর আব্দুল হক, কার্তিকপুরের রাইজুদ্দিন মেম্বার, মহিষখলার কালা মিয়া মড়ল, আব্দুর রশিদ, শ্রীপুরের সুধীর চন্দ্র হাজং, সুমাই গিরি,বারহাট্টার সেকান্দর নূরী, সাউদপাড়ার ইয়াকুব আলী পঞ্চায়েত, কালীপুরের শাহাব উদ্দিন মহালদার, মোহনপুরের কেনারাম হাজং, হরিপদ বানাই, রামপুরের ছমির ফকির প্রমুখ। মহিষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয় মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। জনাব গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরী ছিলেন মুজিব বাহিনী নেত্রকোণা জোনের কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। আর তোরার নিকটস্থ খেরাপাড়া ছিল মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর। খেরাপাড়াতে ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ জোয়ারদার বাবুল নেত্রকোণার পক্ষে কর্মরত ছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ,শেরপুর,জামালপুর ও টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক। মুজিব বাহিনীর মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সর্বজনাব রুহুল আমীন  (নেত্রকোণা সরকারী কলেজের বর্তমান সিনিয়র প্রভাষক), মোহনগঞ্জের প্রাক্তন জাসদ নেতা গোলাম রব্বানী চৌধুরী, এ,কে,এম আশ্রাব আলী (আবুল কুরেশ) ও সচিব উজ্জ্বল কুমার দত্ত। কিছুদিনের জন্য শিবগঞ্জ রোডের স্বনামধন্য কৌতুকাভিনেতা সিরাজ উদ্দিন, মতিয়র রহমান তালুকদার ও মোস্তাফিজুর রহমান রেজভী ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। সুলতান নুরী , খন্দকার আনিস, মনজুর উল হক ও নজরুল ইসলাম খানসহ আরো অনেকেই মহেষখলা ক্যাম্পে কিছুদিন অবস্থান করে ভারতে যান প্রশিক্ষণ গ্রহনের জন্যে। এখানেই এই ক্যাম্পে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরকে রিক্রুট করে উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সিনিয়রদেরকে দেরাদুন এর তান্ডুয়া আর জুনিয়রদের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুজিব বহিনীর প্রশিক্ষণ মুক্তিবাহিনী অপেক্ষা ভিন্নতর ছিল। মুজিব বাহিনী পরিচালনার জন্য সকল ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হতো তৃণমূলের কমান্ড স্ট্রাকচার। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। মুজিব বাহিনী ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের জয়লাভের পরিকল্পনার ফসল।”

পুরষ্কার ও সম্মানণা: ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute Silver Award-2022” , ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি সম্মাননা স্মারক ২০২২  এবং মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক কমান্ড সম্মাননা ২০২২ প্রদান করা হয়।

 

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অব:) এম এ মোত্তালিব 

বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান

ভাষা সৈনিক আজিম উদ্দিন আহমেদ

বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফায়েত আহম্মেদ খান

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী

তথ্যসুত্রঃ

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার

মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত, পিতা: সতীশ চন্দ্র দত্ত, মাতা: চিত্রবালা দত্ত, নেত্রকোণা অঞ্চলের এক পরিচিত নাম। ডাক্তার হিসেবে, রাজনীতি ও সংষ্কৃতি কর্মী, শিক্ষক, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তিনি সবার মনে চির অম্লান। মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে তাঁর সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত দায়িত্ব পালন করে অবসর নিয়েছেন।  আরেক সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতা দত্ত কানাডা প্রবাসী।

জন্ম: বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত ১৯৩২ সনের ১ ভাদ্র নেত্রকোণা শহরের উপকন্ঠে নুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

কর্ম জীবন: বাবু জগদীশ দত্ত কর্মজীবন শুরু করেন পারলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে কিন্তু শিক্ষক পেশাকে ছড়িয়ে তিনি হয়ে উঠলেন একজন সংষ্কৃতি ও রাজনীতি কর্মী। পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি ডাক্তারি কোর্স করে দুস্থ মানুষের সেবায়ও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক: রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের  সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৬৩ সনের জানুয়ারি মাসে মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার উপদেষ্টা মন্ডলীর সম্মানীত সদস্য ছিলেন । মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার প্রধান উদ্যেক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত  মেলার পরিচালক হিসেবে ছিলেন জনাব এডভোকেট একে ফজলুল কাদের, আর উপদেষ্টা মন্ডলীতে অন্য যারা ছিলেন- সর্বজনাব এন আই খান,জনাব আব্দুল খালেকজনাব খালেকদাদ চৌধুরী, এডভোকেট ফজলুর রহমান খান,মাওলানা ফজলুর রহমান খান,হাবিবুর রহমান খান  প্রমুখ। জনাব মেহের আলী[১][২] [৩][৪]শামসুজ্জোহাকে [৫]আহ্ববায়ক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আয়েশা খানমকে আহ্ববায়িকা করে কমিটি গঠন করে দেন। তিনি একজন অসাধারণ নাট্যকর্মী হিসেবে নেত্রকোণা অঞ্চলের মানুষের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নেত্রকোণা মধুমাচি কচিঁ কাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠায় তিনি যুক্ত থেকে শিশুদের মাঝে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের বিকাশ ঘটিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান: প্রখ্যাত হোমিও ডা. জগদীশ দত্ত ১৯৩৮ সাল থেকেই স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ব্রিটিশদের এদেশ থেকে চিরতরে বিতাড়নের জন্য মাঠে কার্যকর ছিলেন। নিষ্ঠা আর সততায় তিনি নেতাজী সুভাষ বোসের আজাদ হিন্দ ফোর্সের নেত্রকোণা অঞ্চলের ‘হোমগার্ড ক্যাপ্টেন’ হয়ে যান ১৯৪০ সালেই। নেতাজীর নেত্রকোণা আগমনে যে কয়জন তরুণ ভলান্টিয়ার ক্যারিশম্যাটিক কাজ প্রদর্শন করেছিলেন তার মধ্যে ডা. জগদীশ দত্ত অন্যতম। ১৯৪৫ সালে সারা ভারত কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় নেত্রকোণায় নাগড়ার মাঠে। এখানেও তার ব্যাপক সহযোগিতা ছিল। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তা বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে শেষ হয়। আর প্রতিটি ধাপেই ছিল তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত নেত্রকোণায় একজন নিবেদিত প্রাণ সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ছাপিয়ে নাট্যকার ডা. জগদীশ বাবুকেই নেত্রকোণাবাসী এখনও উজ্জ্বলভাবেই মনে রেখেছে। অথচ তিনি মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করেন। তিনি একজন ভাষা সংগ্রামী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা।

মহেশখলা ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন মুক্তিযুদ্ধে। মহেশখলা ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী ও ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী মাত্র ২ মাস মহেশখলা ক্যাম্পের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ও তবে চৌধুরী সাহেব সুনামগঞ্জের এমপি বিধায় পরবর্তীতে তিনি টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান।মুক্তিযুদ্ধের  প্রায় পুরো সময়জুরে নেত্রকোণার ভাটি অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা রিক্রটমেন্টের মূল দায়িত্ব পালন করেন মহেশখলা ক্যাম্পের সভাপতি ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। ফলে মহেষখলা ক্যাম্পে আগত দু’লাখের উপর শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার গুরু দায়িত্ব পালন করতে হয় ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ ও তাঁর সহযোগীদেরকে। ১১ সদস্য বিশিষ্ট মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য যারা ছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব নেত্রকোণার ১. ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ(সভাপতি-জুন – ডিসেম্বর), ২. সুনামগন্জের(ধর্মপাশা) আব্দুল হেকিম চৌধুরী(সভাপতি-এপ্রিল – জুন),৩. এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের(নেত্রকোণা), ৪. বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, ৫. মোঃ মেহের আলী ( নেত্রকোণা সদর), ৬. ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত,(নেত্রকোণা সদর),৭. জনাব আব্দুল কুদ্দুস আজাদ(মোহনগঞ্জ), ৮. জনাব নুরুজ্জামান চিশতী(বারহাট্টা),৯. জনাব মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান,১০. জনাব ইনসান উদ্দিন খান(বারহাট্টা),  ১১. আব্দুল বারী তলুকদার(নেত্রকোণা সদর) । পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান । উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন -এমপি, নেত্রকোনার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক এমপি, কিশোরগঞ্জের এমপি আব্দুল কাদের, নেত্রকোনার হাদিছ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মহেষখলা হয়ে ইন্ডিয়া চলে যান এবং কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে মু্ক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্ত্ব পালন করতে থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন চৌহান মাঝে মাঝে মহিষখলা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন। ক্যাম্পের বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্যে বিভিন্ন কমিটি করে দেয়া হয়। সে সব উপ কমিটির সদস্য যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন সর্বজনাব – ধর্মপাশার শওকত আলী, মণীন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী, খালিয়াজুড়ির বিমলেন্দ্র রায় চৌধুরী, রাজাপুরের মহারাজ মিয়া, মোহনগঞ্জের প্রিন্সিপ্যাল তারা মিয়া, মহরম আলী, বিষ্ণুপুরের অক্ষয় কুমারসহ, বংশীকুন্ডার হামিদপুরের আলী আকবর, সানুয়ার বসন্ত দাশ গুপ্ত, মোহনপুরের দিলু মড়ল, রাফায়েল মাস্টার, বনগাঁর আব্দুল হক, কার্তিকপুরের রাইজুদ্দিন মেম্বার, মহিষখলার কালা মিয়া মড়ল, আব্দুর রশিদ, শ্রীপুরের সুধীর চন্দ্র হাজং, সুমাই গিরি,বারহাট্টার সেকান্দর নূরী, সাউদপাড়ার ইয়াকুব আলী পঞ্চায়েত, কালীপুরের শাহাব উদ্দিন মহালদার, মোহনপুরের কেনারাম হাজং, হরিপদ বানাই, রামপুরের ছমির ফকির প্রমুখ। পরবর্তীতে ক্যাম্পের কাজকে তরান্বিত ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা , অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে দ্রুত ট্রেনিংয়ের জন্যে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রতিটি থানা ও গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেয়া হয় । মহিষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয় মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। সর্বজনাব গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরী ছিলেন মুজিব বাহিনী নেত্রকোণা জোনের কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। আর তোরার নিকটস্থ খেরাপাড়া ছিল মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর। খেরাপাড়াতে ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ জোয়ারদার বাবুল নেত্রকোণার পক্ষে কর্মরত ছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ,শেরপুর,জামালপুর ও টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক। মুজিব বাহিনীর মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সর্বজনাব রুহুল আমীন  (নেত্রকোণা সরকারী কলেজের বর্তমান সিনিয়র প্রভাষক), মোহনগঞ্জের প্রাক্তন জাসদ নেতা গোলাম রব্বানী চৌধুরী, এ,কে,এম আশ্রাব আলী (আবুল কুরেশ) ও সচিব উজ্জ্বল কুমার দত্ত। কিছুদিনের জন্য শিবগঞ্জ রোডের স্বনামধন্য কৌতুকাভিনেতা সিরাজ উদ্দিন, মতিয়র রহমান তালুকদার ও মোস্তাফিজুর রহমান রেজভী ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।

সুলতান নুরী , খন্দকার আনিস, মনজুর উল হক ও নজরুল ইসলাম খানসহ আরো অনেকেই মহেষখলা ক্যাম্পে কিছুদিন অবস্থান করে ভারতে যান প্রশিক্ষণ গ্রহনের জন্যে।

 এখানেই এই ক্যাম্পে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরকে রিক্রুট করে উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সিনিয়রদেরকে দেরাদুন এর তান্ডুয়া আর জুনিয়রদের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুজিব বহিনীর প্রশিক্ষণ মুক্তিবাহিনী অপেক্ষা ভিন্নতর ছিল। মুজিব বাহিনী পরিচালনার জন্য সকল ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হতো তৃণমূলের কমান্ড স্ট্রাকচার। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। মুজিব বাহিনী ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের জয়লাভের পরিকল্পনার ফসল।” মহেষখলা ক্যাম্পে নেত্রকোণার ব্যাংক টাকা সংগ্রহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। সেকান্দর নুরী ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে অহেতুক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন । নুরীর বিরুদ্ধে বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা,নির্যাতন,র্ধষন ও বহু লুটের অভিযোগ ছিল) । এক পর্যায়ে আওয়ামীলীগের অত্যন্ত সৎ ও নির্ভীক কর্মী জনাব মেহের আলীকে নুরীর লোকেরা হত্যা করে ।জনাব মেহের আলী ছিলেন নেত্রকোনা মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ও  মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য,নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি( বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন), জেলা শ্রমিকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নেত্রকোনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম স্থপতি, মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার প্রধান উদ্যেক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক এবং জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক’৭১পর্যন্ত।(ষাটের দশকে ছাত্রদের পর শ্রমিক ও কৃষক গোষ্ঠী সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল। এই দুটি গোষ্ঠী নেত্রকোণায় স্বাধিকার আন্দোলন,সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।) বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে একমাত্র শহীদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অন্যতম (সরকার নির্ধারিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংজ্ঞা অনুযায়ী) যিনি বীর মুক্তিমুযোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৭ই মে মহেষখলা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন কালে শহীদ হন । মুক্তিযুদ্ধের খরচ ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্যে জাতীয় প্রয়োজনে জয়বাংলা বাহিনীর প্রধান কোম্পানী কমান্ডার সাবেক আওয়ামীলীগের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মো: শামসুজ্জোহার নেতৃত্তে বীরমুক্তিযোদ্ধা  বুলবুল ইপিআর সদস্যসহ অন্যান্যদরকে নিয়ে অস্ত্রাগার ও নেত্রকোণার ন্যাশনাল ব্যাংকের Volt ভেঙ্গে টাকা পয়সা , সোনা  সংগ্রহ করেন (“মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনা” বইটিতে  সাবসেক্টর কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা  হায়দার জাহান চৌধুরী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন)। মেহের আলীকে হত্যার পরপরই বীরমুক্তিযোদ্ধা মো: শামসুজ্জোহা ও মোহনগঞ্জের আমীর উদ্দিন আহমেদকেও গ্রেফতার করা হয় হত্যার জন্যে। সৌভাগ্যক্রমে তারা প্রাণে বেচে যান। স্মরণীয় যে, স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৭ দিনের মধ্যে পরবর্তীকালে সেকান্দর নুরী নিহত হয়েছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, এটি ছিলো জনাব মেহের আলী হত্যার অনিবার্য পরিণতি।এরূপ প্রেক্ষাপটে উদ্ভত জটিল পরিস্থিতিকে মহেশখলা ক্যাম্পের সভাপতির নেতৃত্বে ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত অত্যন্ত মেধা ও ধৈর্যের সাথে অন্যান্য নেতৃবৃন্দদেরকে সঙ্গে নিয়ে  উদ্বুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি পরিবার নিয়ে বেশ অনেক বছর বড় বাজার এলাকায় ছিলেন এবং পরে নাগড়ায় দত্ত ভিলা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে চলে আসেন। ছেলে মেয়েদের শিক্ষায় ও মননে খুব উচচমান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সন্তানরা সবাই দেশ-বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে।

মৃত্যু: শেষ জীবনে তিনি নাগড়া ছেড়ে কানাডায় যান মেয়েদের কাছে এবং সেখানেই (মন্ট্রিলে) তিনি ৭ জুলাই ২০১৩ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলেন ৮৯ বছর। তিনি ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে সন্তান, স্ত্রী ও বহু বন্ধু বান্ধব, গুণগ্রাহী রেখে যান

পুরষ্কার ও সম্মানণা: ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute[৬] [৭][৮][৯][১০]Silver Award-2023” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়।

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকারের প্রবন্ধসমূহ:

বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকদাদ চৌধুরী

বাউল কবি রশিদ উদ্দিন: বাউলদের বাউল

নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর

লোক-সাহিত্য ও সংস্কৃতি  লোককবি নগেন সরকার 

একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক ভাষা সৈনিক  সানাউল্লাহ নূরী

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোনা

বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোঃ নুরুল ইসলাম খান (এন আই খান)

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. মো. ফজলুর রহমান খান

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম ফজলুল কাদের

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাছ আলী খান

অগ্নিযুগের সূর্য সৈনিকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী

স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী 

তথ্যসুত্রঃ

  1.  Chowdhury, Bir Muktijudha Khalekdad (Bangla academy and Ekushe Award winner 1985),“Shatabdir Dui Diganta (in Bengali)”. Dhaka.
  2.  Nuri, Journalist Bhasha Sainik Sanaullah(Ekushe Award winner, Editor-Daily Dinkal) (25 June 1994). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali in Netrakona”. The daily Dinkal. p. 6.
  3.  Khan, Bir Muktijudha Ashraf Ali  Khoshru(Ex-Minister,23 May 2005). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Ittefaq. p. 8.
  4.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৩ ডিসেম্বর ২০২২),” স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৩-৩৮
  5.  বিশ্বাস, সাংবাদিক প্রিয়ঙ্কর(২৩ ডিসেম্বর ২০২২), “মুক্তিযোদ্ধার আত্মকথা: বীর মুক্তিযোদ্ধা মো:শামছুজ্জোহা, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৯৩-১০০
  6.  বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু আক্কাস আহমেদ(সভাপতি-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),“শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা- ২০২২”, Rajdhani TV, 04/10/2023
  7.  কবি তানভীর জাহান চৌধুরী(সা:সম্পাদক-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),,,“শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা- ২০২২”, Rajdhani TV, 04/10/2023
  8.  চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান(সহ-সভাপতি, নেত্রকোণা ক্লাব),“মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় অতন্দ্র,প্রহরীঃ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ইনস্টিটিউট, অস্ট্রেলিয়া”, নেত্রকোণা জার্নাল,২৪/১০/২০২৩
  9.  কবি তানভীর জাহান চৌধুরী(সা:সম্পাদক-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),“নেত্রকোণায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের(মরণোত্তর) সম্মাননা — ২০২২ প্রদান” দৈনিক একুশে নিউজ ২/১০/২০২৩
  10.  অধ্যাপক অলিউল্লাহ,“নেত্রকোণায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের(মরণোত্তর) সম্মাননা — ২০২২ প্রদান”,দৈনিক  বাংলার অধিকার ১/১০/২০২৩
 

Scroll to Top