ক্যাপ্টেন আনোয়ারুল হক ভূঞা : হৃদয়ে কষ্ট পুষে রাখা এক নাম
রতিশ মজুমদার
উজ্জ্বল নভেম্বর এলে মন বিষন্নতায় ভরে উঠে বিশেষ করে ৩-৭ নভেম্বর। ৭৫ সনের এই সময়টুকু বাঙালি জাতীয় জীবনে গভীর ক্ষত রেখে গেছে যার পরিনতিতে জাতি হিসাবে আমরা এখনও বিভাজনের পঙ্কিল আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি। আজ আমি এমন একজনের কথা উল্লেখ করছি যিনি মগরার জলধারায় অবগাহন করে বিকেলে মোক্তারপাড়া মাঠে খেলাধূলা আর শিশু কিশোরদের দেশগড়ার উপযোগী করে গড়ে তোলার ঐতিহ্যবাহি সংগঠন মধুমাছি কচিকাঁচার মেলা নিয়ে নিত্যজীবন কাটাতেন, যাকে নিয়ে লিখতে বসে হাত কাপে, চোখ জলে ভরে উঠে, কেমন যেন মনে হয় নিজেকে; একটা বিরূপ সময়ের বলি এই মানুষটি। মা-বাবা অপেক্ষায় থেকে থেকে ধরাধাম থেকে চলে গেলেও ভাই-বোনেরা আজো অপেক্ষার প্রহর গুনে কখন ঘরে ফিরবে আদরের ভাইটি। হ্যাঁ আমি এমন একজনের কথা বলছি যিনি নেত্রকোণাবাসীর গর্বের ধন, ক্যাপ্টেন আনোয়ারের কথা। ১৯৫২ সনের ২১ শে ফেব্রুয়ারি জনাব নোয়াফিজ উদ্দিন ভূঞা (শিক্ষক-এডভোকেট) এবং এরশাদ খাতুনের ওরসে নেত্রকোণার আটপাড়া গ্রামে যার জন্ম। সুপ্রাচীন বিদ্যাপীঠ দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করে কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় তাঁর নেতৃত্বে নেত্রকোণা কলেজ হকি টিম পূর্বপাকিস্তান হকি লীগে চ্যাম্পিয়ন হয়। ৭০ সনে আই এ পাশ করার পর ৭১ সনের প্রথমদিকে রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন।
ইতোমধ্যে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে ছুটিতে নেত্রকোণা এসে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্রোতধারায় জড়িয়ে পড়েন, শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম; একজন অকুতোভয় যোদ্ধা হিসাবে বাংলা মায়ের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারেননি স্কুল জীবনে ডানপিটে স্বভাবের এই ছেলে। দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার প্রধান উদ্যেক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক মেহের আলী, প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক শামছুজ্জোহা, মতিউর রহমান খান, আব্দুল ওয়াহেদ প্রমুখের সান্নিধ্যে হয়ে উঠেন সবদিক দিয়ে পারদর্শী, ললাটে জুটে অধিনায়কের স্থানটি। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মার্চপাস্টে নেতৃত্ব দিতেন তিনি। একসময় বাংলা মায়ের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রণী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির পতাকাকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে ১৯৭০-৭১ সনে গোলাম এরশাদুর রহমান-হায়দার জাহান চৌধুরীর কমিটিতে ঠাঁই করে নেন। অন্যরা হলেন বাদল মজুমদার, তৃষিত বিশ্বাস জহিরুল হক হীরা, খন্দকার আনিসুর রহমান, নির্মল কুমার দাস প্রমুখ। যদিও ক্যাপ্টেন আনোয়ার ছিলেন বয়সের দিক থেকে অনেকের চেয়ে কনিষ্ঠ।
১৯৭১ সনে বাংলা মায়ের স্বাধীনতা সংগ্রামে সারা বাংলা প্রস্তুত হতে শুরু করলে নেত্রকোণা মোক্তারপাড়া মাঠে জয়বাংলা বাহিনীর অধিনায়ক শামছুজ্জোহার নেতৃত্বে বাঁশের লাঠি এবং ক্যাডেট কোরের রাইফেল নিয়ে ট্রেনিং সম্পন্ন করেন। ইতিমধ্যে নেত্রকোণায় মালখানার অস্ত্র লুন্ঠিত হলে সেই অস্ত্র জয়বাংলা বাহিনীর সদস্যদের মাঝে বিতরণ করা হয়। এসময় ২৩ শে এপ্রিল পাকবাহিনী বিমান আক্রমণ করলে রাইফেল উচিয়ে গুলি করে বিমান হামলা প্রতিহতের প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চালান। অবশেষে ২৯ শে এপ্রিল পাক বাহিনী নেত্রকোণা আগমন করলে অবস্থা বুঝে মেঘালয় পাহাড়ে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তেলঢালা শিবিরে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।
দীর্ঘ একমাস ট্রেনিং শেষ করে ১৩০ জন সহযোদ্ধার সাথে সাফায়েত কোম্পানীতে ঠাঁই নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে কলমাকান্দা, ধর্মপাশা. আনুয়া-কামালপুর, বাঘমারা, রংরা, মহেশখলাসহ অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য এই কোম্পানীর প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন চকপাড়া নিবাসী জনাব আশরাফ উদ্দিন খান। কামালপুর যুদ্ধে ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল (বীর প্রতীক), আটপাড়ার সেনাবাহিনীর সদস্য মোসলেম উদ্দিন, দেওশ্রী গ্রামের হেলালুজ্জামান পান্না সাহসী ভূমিকা রাখেন। আরো উল্লেখ্য যে সাফায়েত কোম্পানীর ছেলেরা কামালপুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এই বাহিনীর অনেক ছেলে প্রবাসী সরকারের নির্দেশে আর্মি অফিসারের বিমান ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দেরাদুনে ট্রেনিং সম্পন্ন করেন। যাঁদের মাঝে ক্যাপ্টেন আনোয়ার একজন। ১৯৭১ সনে দেশ স্বাধীন হলে বিজয়ের আনন্দ আর স্বজন হারানোর ব্যাথা নিয়ে স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করে সদ্য স্বাধীন দেশকে গড়ার প্রত্যয়ে সেনাবাহিনীতে কমিশন অফিসার পদে যোগদান করেন। ক্যাপ্টেন আনোয়ার শৈশব থেকেই ছিলেন ভালো খেলোয়ার। ফুটবল, ক্রিকেট এবং হকি খেলায় পারদর্শী।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হকি দলের নিয়মিত খেলোয়ার ছিলেন, শুধু তাই নয় জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক হিসাবে ‘ব্যাংককে’ বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেন। খেলাই হয়ত জীবন প্রদীপ নির্বাপিতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৫ সনের ১৫ ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে দেশে নেমে আসে কালো অধ্যায়, যার বলি হয় দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সেনাবাহিনীর সদস্যরা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগতের নোংরা খেলায় মেতে উঠে কতিপয় সেনা কর্তা। কখনো ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই অফিসারের রক্ত চাই শ্লোগানে’ অনেক মায়ের কোল খালি করা হয়। ১১৫৪ জন অফিসারকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্থ্য করে ফাঁসি দেয়া হয়। এমন এক দুর্ভাগা সময়ের প্রত্যুষের শিকার ক্যাপ্টেন আনোয়ার। ১৯৭৫ সনের ৩রা নভেম্বর থেকে ৭ই নভেম্বর ক্যু পাল্টা ক্যুর মাঝে স্টেডিয়ামে হকি খেলা প্রাকটিসরত অবস্থায় হত্যা করা হয় ক্যাপ্টেন আনোয়ারকে। মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরী এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এই ঘটনার করুণ বর্ণনা দেন। আজো নেত্রকোণার মানুষ এই প্রানবন্ত সাহসী সন্তানের জন্য অশ্রু বিসর্জন দেয়। ক্যাপ্টেন আনোয়ারের প্রতি গণমানুষের গভীর ভালোবাসার কথা চিন্তা করে নেত্রকোণা পৌরসভা ১৯৯৭ সনে শৈশবের বিচরণ ক্ষেত্র নাগড়ায় ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আনোয়ার’ নামে একটি সড়কের নামকরণ করে। ক্যাপ্টেন আনোয়ারকে স্মরণকালে বিধাতার কাছে প্রার্থনা থাকবে আমাদের নিষ্পাপ সন্তানটিকে বেহেস্তবাসী করুন। রাষ্ট্রের কাছে দাবী আমাদের নিষ্পাপ ভাইটির হত্যার বিচার করে পরিবারের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে কিছুটা হলেও দায়িত্ব পালন করুন।
লেখকঃ সাবেক ব্যাংকার।
