মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব-৪

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আহমেদ সামির
 

মধ্যনগর উপজেলার  বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী:

আব্দুল আউয়াল তালুকদার

আব্দুল আউয়াল তালুকদার

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জনাব আব্দুল আউয়াল তালুকদার: মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক  আব্দুল আওয়াল তালুকদার মধ্যনগর উপজেলার দুগনই গ্রামে ১৯৪৮ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মৃত: আরজ আলী তাং, মাতা:  জমিদারের নেছা, স্ত্রী : মোছা: গুলশানারা রিমি। তার চাচা জনাব রহমত আলী ও চাচা জনাব আক্কেল আলী তালুকদার বৃটিশ শাসিত ভারত ও পূর্বপাকিস্থানের সুনামগন্জ জেলার অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। জনাব আক্কেল আলী সুনামগন্জ কোর্টের অত্যন্ত প্রভাবশালী জুরী তথা বিচারক ছিলেন। জনাব আব্দুল আউয়াল তালুকদারের এক বড় ভাই বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ আকিকুর রেজা বাংলাদেশ সচিবালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় আমলা ছিলেন। আরেক ছোট ভাই জনাব মাসুক তাং ছিলেন মধ্যনগর সদর ইউিয়নের প্রভাবশালী চেয়ারম্যান। তার এক বোন নাজনীন সুলতানা কণা এক সময়কার সিলেটের নারী নেত্রী ছিলেন। তার এক মেয়ে শাওন ডাক্তার ও জামাতা সেনাবাহিনীর কর্নেল এবং ছেলে আলভী ব্যবসা ও সিলেটে রাজনীতিতে জড়িত। জীবনের সব জায়গায় সফল এই রাজনীতিবিদ জনাব আব্দুল আওয়াল তালুকদার অনেক মুক্তিযোদ্ধার মত  ইচ্ছে করেই মুক্তিযুদ্ধের সনদ নেননি। তার অভিমত ছিল এই যে, আমরা দেশকে মুক্ত করার জন্যে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি , জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি , দেশকে মুক্ত করেছি । সনদের জন্যে এসব করিনি।

শিক্ষা ও কর্মজীবন: জনাব আব্দুল আওয়াল তালুকদার দুগনই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,  ও মধ্যনগর বি.পি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা সরোয়ার্দী কলেজে  ভর্তি হন । পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ঢাকাতে পুরোপুরি  ব্যবসায় মনোযোগী হন এবং অল্প সময়ে সফলতাও পান। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যবসার অবস্থা খারাপ হওয়ায় সুনামগন্জে ফিরে এসে ফিসারী ও ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। তাতে তিনি আবার সফলতা পান এবং নিজেকে সুনামগন্জে একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল আউয়াল ব্যক্তিগত জীবনে রাজনৈতিক হিংসা বিদ্বেষের অনেক উর্ধে ছিলেন। ছিলেন ভিন্ন মতাদর্শ ও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। এ বিষয়ে প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক,প্রাবন্ধিক  অধ্যাপক ননী গোপল সরকারের “স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী “-প্রবন্ধতে উদ্ধৃত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চিত্রবাংলা-র সাংবাদিক জনাব রুহুল চৌধুরীর লিখা থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ধর্মপাশা উপজেলার চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়ালের একটি সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলোঃ “মেহের ভাই আমাদের রাজনৈতিক শিক্ষক ছিলেন। উনার কাছেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৬৫ সালে মেহের ভাই সুনামগন্জ জেলার মধ্যনগর থানার দুগনৈ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে করেন। উনার শ্বশুর জনাব রহমত আলী তালুকদার ছিলেন অত্র অঞ্চলের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি। সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মেহের ভাই সরকার বিরোধী আন্দোলনে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর ৬দফার দাবীসহ ৬৯,৭০,৭১এর আন্দোলন গুলোকে নেত্রকোনার পাশাপাশি এই অঞ্চলেও জনপ্রিয় করে তোলেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি এই অঞ্চলের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা আকিকুর রেজা ভূইয়া ও আমাকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক   করে মধ্যনগর থানার মধ্যে প্রথম দুগনৈ গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। পরবর্তীতে তিনি    মোঃ আকিকুর রেজা ভ‚ইয়াকে সভাপতি ও আমাকে সহ-সভাপতি এবং বাদল চন্দ্র দাসকে সাধারণ সম্পাদক  করে মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। মেহের ভাইয়ের নেতৃত্তে মধ্যনগর থানার ছাত্র ও যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে থাকি।এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে মেজর  এম এ মোত্তালিব(পরবর্তীতে যিনি সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন)  ও ক্যাপ্টেন গণীর নেতৃত্তে কয়েকশ সামরিক কর্মকর্তা ও ই পি আর সদস্য  দুগনৈ গ্রামে আসলে মেহের ভাইয়ের নেতৃত্তে উনার শ্বশুর বাড়ীতে কয়েকদিনের জন্য তাদের  সকলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করি এবং নিরাপদে ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেই। এছাড়াও মেহের ভাইয়ের নেতৃত্তে আমরা  উনার শ্বশুর রহমত আলী তালুকদারের বাড়ী থেকে শত শত মণ ধান, চাল, অন্যান্য সামগ্রী মহেষখলা ক্যাম্পে পাঠাই যাহা ক্যাম্প পরিচালণায় অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূ্ণর্ ভুমিকা পালন করে।“- “ মানুষের প্রতি এমন সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের ঘটনা আজকের এ সমাজে বিরল।

রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ষাটের দশকে নেত্রকোনার রাজনীতির কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলীর কাছে জনাব  আব্দুল আওয়ালের রাজনীতির হাতেখড়ি। পরবর্তীতে জনাব  আওয়াল নিজেকে সুনামগন্জের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের এক নম্বর সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন । তিনি দুইবার অবিভক্ত ধর্মপাশা উপজেলার( মধ্যনগর,ধর্মপাশা,জামালগন্জ) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দুগনৈ গ্রাম মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের  সহ-সভাপতি ছিলেন।

মৃত্যু: মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জনাব আব্দুল আউয়াল তালুকদার ২০১১ সালে সিলেটে মৃত্যু বরন করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মরুহম আব্দুর রউফ: বীর মুক্তিযোদ্ধা মরুহম আব্দুর রউফের পিতার নাম : মৃত: মকবুল হোসেন, মাতার নাম : মৃত: বিনদজান বিবি, স্ত্রীর নাম : বুলবুল আক্তার, বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : সাজদাপুর, পোস্ট অফিস : মাসুদপুর, উপজেলা : মধ্যনগর, জেলা : সুনামগঞ্জ।তার পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে। এক ছেলে এমদাদুল হক মধ্যনগর, উপজেলা  মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

শিক্ষা ও কর্মজীবন: মধ্যনগর বিপি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শেষে ব্যবসা করেন ।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে ৫নং সেক্টরের কমান্ডার কর্ণেল মীর শওকতের অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম

বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম

বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম: বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের পিতার নাম : মোঃ সিদ্দিক আলী মাতার নাম : মৃত: মজিদা বেগম, স্ত্রীর নাম : রাজিয়া খাতুন, বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম :  বিছরাকান্দা, পোস্ট অফিস : ফারুকনগর, উপজেলা : মধ্যনগর জেলা : সুনামগঞ্জ। তিনি দীর্ঘদিন মধ্যনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার ছিলেন।  তিনি মেজর জেনারেল (অব.) ইজাজ আহমেদ চৌধুরী  ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ আকিকুর রেজার মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে গেছেন। তার এক ছেলে রেজুয়ান তানভীর(মধ্যনগর, উপজেলা  মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেটে উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করে চাকুরী করছেন।

শিক্ষা ও কর্মজীবন: বংশীকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মোহনগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শেষে  মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ব্যবসা করেন ও কৃষিকাজে মনোযোগী হন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: সর্ব প্রথম মহাদেব উইং ক্যাম্প হইয়া ১১ নং সেক্টরের বাঘমারা সাব সেক্টরের তুরা তেল ডালা মহেন্দ্রগঞ্জ গিয়ে তিনি ২৯ দিন ট্রেনিং পর আসামের নিকট বর্তী পাহাড়ে ট্রেনিং সেন্টারে আসেন। এর ১ দিন পর কোরআন খতম করে তিনি জসগ্রাম রেস্ট হাউজ চলে আসেন। সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করেন, পথ যুদ্ধ করেন। দূর্গাপুর, বিরিশিরি, নাজিরপুর, কলমাকান্দা, নেত্রকোণা, শ্যামগঞ্জ, পূর্বধলা,  জাটিমাথাং, চারাইমা পাড়া, সবশেষে ময়মনসিংহ গিয়ে তাদের যুদ্ধ শেষ হয়। ময়মনসিংহে ২ মাস থাকিয়া অস্ত্র জমা দিয়া বাড়িতে চলে যান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আতাউর রহমান

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আতাউর রহমান

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আতাউর রহমান: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আতাউর রহমানের পিতার নাম : মৃত: জয়েন উদ্দিন মাতার নাম : মৃত: মুক্তারেরন্নেছা বিবি, স্ত্রীর নাম : মোছা: সালেহা খাতুন, বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : চামরদানী পোস্ট অফিস : চামরদানী, উপজেলা : মধ্যনগর, জেলা : সুনামগঞ্জ। তার ছিল ৮ জন সন্তান। এক ছেলে মোঃ রেজুয়ানুর রহমান প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

শিক্ষা ও কর্মজীবন: চারমদানী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মোহনগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শেষে  মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ব্যবসা করেন ও কৃষিকাজে মনোযোগী হন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ১১নং সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মোঃ আবু তাহের নেতৃত্বে, ইউং কমান্ডার আবুল হোসেনের নি্দের্শনায় যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন।তিনি মহেন্দগঞ্জ, তেলঢালা, তোরা ,ভারত থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। ১১ সদস্য বিশিষ্ট মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য যারা ছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব নেত্রকোণার ১. ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ(সভাপতি-জুন – ডিসেম্বর), ২. সুনামগন্জের(ধর্মপাশা) আব্দুল হেকিম চৌধুরী(সভাপতি-এপ্রিল – জুন),৩. এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের(নেত্রকোণা), ৪. বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, ৫. মোঃ মেহের আলী(নেত্রকোণা সদর), ৬. ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত,(নেত্রকোণা সদর),৭. জনাব আব্দুল কুদ্দুস আজাদ(মোহনগঞ্জ), ৮. জনাব নুরুজ্জামান চিশতী(বারহাট্টা),৯. জনাব মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান,১০. জনাব ইনসান উদ্দিন খান(বারহাট্টা),  ১১. আব্দুল বারী তলুকদার(নেত্রকোণা সদর) । পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান । উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন -এমপি, নেত্রকোনার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক এমপি, কিশোরগঞ্জের এমপি আব্দুল কাদের, নেত্রকোনার হাদিছ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মহেষখলা হয়ে ইন্ডিয়া চলে যান এবং কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে মু্ক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্ত্ব পালন করতে থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন চৌহান মাঝে মাঝে মহিষখলা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন। মহিষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয় মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। সর্বজনাব গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরী ছিলেন মুজিব বাহিনী নেত্রকোণা জোনের কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। আর তোরার নিকটস্থ খেরাপাড়া ছিল মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর। খেরাপাড়াতে ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ জোয়ারদার বাবুল নেত্রকোণার পক্ষে কর্মরত ছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ,শেরপুর,জামালপুর ও টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক। মুজিব বাহিনীর মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সর্বজনাব রুহুল আমীন  (নেত্রকোণা সরকারী কলেজের বর্তমান সিনিয়র প্রভাষক), মোহনগঞ্জের প্রাক্তন জাসদ নেতা গোলাম রব্বানী চৌধুরী, এ,কে,এম আশ্রাব আলী (আবুল কুরেশ) ও সচিব উজ্জ্বল কুমার দত্ত। কিছুদিনের জন্য শিবগঞ্জ রোডের স্বনামধন্য কৌতুকাভিনেতা সিরাজ উদ্দিন, মতিয়র রহমান তালুকদার ও মোস্তাফিজুর রহমান রেজভী ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। এখানেই এই ক্যাম্পে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরকে রিক্রুট করে উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সিনিয়রদেরকে দেরাদুন এর তান্ডুয়া আর জুনিয়রদের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুজিব বহিনীর প্রশিক্ষণ মুক্তিবাহিনী অপেক্ষা ভিন্নতর ছিল। মুজিব বাহিনী পরিচালনার জন্য সকল ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হতো তৃণমূলের কমান্ড স্ট্রাকচার। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। মুজিব বাহিনী ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের জয়লাভের পরিকল্পনার ফসল।মহেষখলা ক্যাম্পের বিভিন্ন উপ কমিটির সদস্য যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন সর্বজনাব – বারহাট্টার সেকান্দর নূরী,ধর্মপাশার শওকত আলী, মণীন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী, খালিয়াজুড়ির বিমলেন্দ্র রায় চৌধুরী, রাজাপুরের মহারাজ মিয়া, মোহনগঞ্জের প্রিন্সিপ্যাল তারা মিয়া, মহরম আলী, বিষ্ণুপুরের অক্ষয় কুমারসহ, বংশীকুন্ডার হামিদপুরের আলী আকবর, সানুয়ার বসন্ত দাশ গুপ্ত, মোহনপুরের দিলু মড়ল, রাফায়েল মাস্টার, বনগাঁর আব্দুল হক, কার্তিকপুরের রাইজুদ্দিন মেম্বার, মহিষখলার কালা মিয়া মড়ল, আব্দুর রশিদ, শ্রীপুরের সুধীর চন্দ্র হাজং, সুমাই গিরি, সাউদপাড়ার ইয়াকুব আলী পঞ্চায়েত, কালীপুরের শাহাব উদ্দিন মহালদার, মোহনপুরের কেনারাম হাজং, হরিপদ বানাই, রামপুরের ছমির ফকির প্রমুখ। পরবর্তীতে ক্যাম্পের কাজকে তরান্বিত ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা , অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে দ্রুত ট্রেনিংয়ের জন্যে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রতিটি থানা ও গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেয়া হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আতাউর রহমান সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর এ দেশকে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করার জন্য বাবা মার অঘোচরে ঘর থেকে বেরিয়ে মহেষখলা সাব সেক্টরে ১ম ভর্তি হন। এখানে ১৫ দিন থাকার পর তারা ৩৫ জন ফায়ার ট্রেনিং শেখার জন্য মহরদেব ও লংড়া জসগ্রাম হয়ে জালু সাব সেক্টর হয়ে তোরা সাব সেক্টরে অংশগ্রহণ করেন। এখানে ৭ দিন রাইফেল ট্রেনিং ও অন্যান্য ট্রেনিংসহ ২১ দিন ফায়ার ট্রেনিং করেন। তারপর তিনদিন জঙ্গল প্যারেড করেন। এরপর একদিন কুকাওয়াজ শেষে পাঞ্জাবীদের সাাথে সংঘর্ষ করে তারা জিতে যান। এরপর বাঘমারা থেকে রাঙ্গাচর যুদ্ধে প্রায় দেড় মাস পর তারা জয়ী হন।

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা  মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব

বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অব:) এম এ মোত্তালিব 

বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান

ভাষা সৈনিক আজিম উদ্দিন আহমেদ

বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফায়েত আহম্মেদ খান

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী

তথ্যসুত্রঃ

  1.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”, বিজয় একাত্তর ১১তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১-১২
  2.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (03rd Jan 2026)”নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস”
  3.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(মে ২০২৩). নেত্রকোণার শহীদ মিনারের ইতিকথা, বিজয় একাত্তর সপ্তম সংখ্যা পৃষ্ঠা  ৮১
  4.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (ফেব্রয়ারী ২০২০),”মুক্তিযুদ্ধের একনিষ্ঠ সংগঠক ডঃ আখলাক হোসেন আহমদ”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা পৃষ্ঠা ৬০-৭০
  5.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫),” ভাষা সৈনিক জনাব সানাউল্লাহ নূরী”, বিজয় একাত্তর ১১তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৯
  6.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শিশু সংগঠন কচি-কাঁচার মেলা”, বিজয় একাত্তর ৫ম সংখ্যা পৃষ্ঠা 129-132
  7.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). নেত্রকোণার রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ মরহুম জননেতা আব্দুল খালেক এমপি”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা পৃষ্ঠা 01-06
  8.  চৌধুরী,বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান ( ১৪ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”, আলোরপথে ৫তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৫-২০
  9.  আচার্য, সাংবাদিক জয়ন্ত,( ১৪ ডিসেম্বর ২০২১),মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধীজীবিবৃন্দ” সাপ্তাহিক-২০০০ পৃষ্ঠা ২০-২৪
  10.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (ফেব্রয়ারী ২০২0),” নেত্রকোনা জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা ”, স্মরণে বঙ্গবন্ধু
  11.  আহমেদ সামির (15 Jan 2026)” মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব
Scroll to Top